আরাকান অধিবাসীদের প্রাথমিক ইতিহাস



ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ

বাংলা ও আরাকান সীমান্তগত দিক থেকে শুধু প্রতিবেশীই নয় বরং বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের কোনো কোনো অঞ্চল বিচ্ছিন্নভাবে প্রায় ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দের পূর্ব পর্যন্ত বেশিরভাগ সময় আরাকানের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ফলে বাংলায় ইসলাম প্রচারের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে যেমন চট্টগ্রামে ইসলাম প্রচারকে আলোচনা করা হয় তেমনি আরাকানে ইসলামের আগমন আলোচনা করতে হলেও চট্টগ্রামের আলোচনা অপরিহার্য। মূলত: চট্টগ্রামে ইসলামের আগমন অর্থই হলো আরাকানে ইসলাম প্রচারের সূচনা। খ্রিস্টপূর্ব ২৬৬৬ অব্দ থেকেই আরাকানে রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোগতভাবে সংঘবদ্ধ সমাজ জীবনের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। অস্ট্রো-এশীয় এবং ভোট-চীনা গোত্রীয় মানুষই আরাকান ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের খ্রিস্টপূর্ব যুগের আদিবাসী বলে অনুমান করা হয়। মারু বংশীয় রাজারা বংশ পরম্পরায় তখন আরাকান শাসন করতেন। অযোধ্যা ও বিহার অঞ্চলের জৈন এবং পরবর্তীতে জড়বাদী হিন্দু ধর্মদর্শন কর্তৃক প্রভাবিত ছিল তৎকালীন আরাকানের সমাজ ব্যবস্থা। ক্রমশ এতে ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দু প্রভাব ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়, এমনকি ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দু ধর্মবিশ্বাসের লোকেরা আরাকানের শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীতে মগধ থেকে আগত চন্দ্র-সূর্য বংশের রাজাদের প্রভাবে আরাকানে ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দু ধর্মের পাশাপাশি বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব বিস্তার ঘটে। এভাবে পুরোপুরিভাবে ভারতীয়কৃত সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় আরাকানের বিভিন্ন স্থানের নাম ভারতীয় অনুকরণে আমরাপুর, রামাবতী, ধন্যাবতী, বৈশালী, হংসবতী প্রভৃতি নাম করণ হয়। রাজবংশের নামও ছিল ভারতীয় অনুকরণে মারু, কানরাজগজি, চন্দ্র-সূর্যবংশ, পিনসা প্রভৃতি এবং আরাকানে রাজাদের নামও রাখা হতো ভারতীয় প্রথা অনুসারে। সেখানে ভারতীয় বর্ণমালা ব্রাহ্মীলিপিতে সংস্কৃত ভাষায় উৎকীর্ণ শিলালিপি ও শিবাদি দেবতার প্রতিষ্ঠা ছিল এবং মুদ্রায় বৃষমূর্তি, ধ্বজ প্রভৃতি অংকিত ছিল। খ্রিস্টপূর্ব থেকে খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতক পর্যন্ত চট্টগ্রাম ও আরাকান একটি অখন্ড রাজ্য হিসেবে চন্দ্রসূর্য রাজাদের হাতে শাসিত হলেও সময়ের ধারাবাহিকতায় চট্টগ্রামের সমাজ গড়ে ওঠে ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দু ধর্মীয় সভ্যতার আলোকে এবং আরাকানী সমাজ গড়ে ওঠে বৌদ্ধ ধর্মীয় সভ্যতার আলোকে।
প্রাচীন চট্টগ্রাম ও আরাকানের হিন্দু সম্প্রদায় মূলত ভারতবর্ষের হিন্দু জাতির অংশ। ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, বৈদ্য, শুদ্র এই চার প্রধান বর্ণ ও ছত্রিশ জাত নিয়ে এখানকার হিন্দু সম্প্রদায় গঠিত হয়েছে বলা হলেও প্রকৃত অর্থে ৪১টি উপবর্ণের সমন্বয়ে তা গঠিত ছিল। প্রাচীনকালে গোত্রগত পেশার ভিত্তিতে হিন্দু সম্প্রদায়ের শ্রেণীবিন্যাস করা হয়েছিল। খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতকের মধ্যভাগে আর্যবংশীয় হিন্দুদের সাথে স্থানীয় আদিম জনগোষ্ঠীর বৈবাহিক সম্পর্কের ভিত্তিতে নিম্নবর্ণের হিন্দু সম্প্রদায়ের উদ্ভব হয়। তৎকালীন সময়ে আরাকান ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের হিন্দু সমাজে কৌলিন্য প্রথা প্রবল ছিল। বিয়ে-শাদী-নৃত্য নিমন্ত্রণে সামাজিক সিঁড়ি প্রথা প্রচলিত ছিল এবং তা কড়াকড়িভাবে পালন করা হতো। সামাজিক বৈঠকে কৌলিন্যের মান অনুসারে বংশের প্রধান ব্যক্তিরা সিঁড়ি বা লাইনের প্রথম স্থানে বসত। এরপর কৌলিন্যের মান অনুসারে সবাই পরপর লাইনে বসত। তাদের মধ্যে ছুৎবাই ছিল খুব বেশি। কুলীনরা অকুলীন বাড়িতে সচরাচর নিমন্ত্রণ গ্রহণ করতো না; বিশেষ কারণে বিশেষ কোনো বাড়িতে নিমন্ত্রণে গেলেও সেখানে যাওয়ার সময় পারিবারিক গোলাম বা দাস দ্বারা নিজেদের থালাবাটি সঙ্গে নিয়ে যেত। আরাকানের শাসকগোষ্ঠী হিন্দু ধর্মের অনুসারী হলেও সাধারণ জনগণ বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি ঝুঁকে পড়েছিল। বিশেষত হিন্দুদের বর্ণ প্রথার কারণে ভারতের নিম্নবর্ণের হিন্দুরা ত্রিপুরা হয়ে আরাকানে এসে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী হয়ে যেত। ক্রমশ আরাকানের শাসকরারও সামাজিক পরিবেশের আলোকে নিজেদেরকে বৌদ্ধ মতাবলম্বী হিসেবে প্রকাশ করতে থাকে। বিশেষ করে আরাকান রাজা ছান্দা থুরিয়া (১৪৬-১৯৮) আরাকানের সমাজে বৌদ্ধ ধর্মমতের বিস্তার ঘটান। এভাবে ইসলাম আগমণের পূর্ব পর্যন্ত আরাকানী সমাজে বৌদ্ধ ধর্মের প্রায় একচেটিয়া প্রভাব প্রতিষ্ঠিত ছিল।

আরাকানে ইসলামের আগমন
পঞ্চম শতাব্দীর শেষ থেকে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুদের হাতে নিম্নবর্ণের হিন্দু-বৌদ্ধরা ব্যাপকভাবে নির্যাতনের শিকার হয়। আরাকানের শাসকরা হিন্দুধর্মে বিশ্বাসী হলেও বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি অনুরাগী হওয়ার কারণে আরাকান অঞ্চলে বৌদ্ধ ধর্মের দ্রুত প্রসার ঘটে। হিজরি প্রথম শতকের শেষ দিকে (৯৬ হিজরী) ৭১২ খ্রিস্টাব্দে উমাইয়া শাসনামলে মুসলিম সেনাপতি মুহাম্মদ বিন কাসিমের নেতৃত্বে সিন্ধু অঞ্চলে ইসলামের বিজয় নিশ্চিত হওয়ার মধ্যদিয়ে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় রাজনৈতিকভাবে ইসলামের প্রতিষ্ঠা শুরুহলেও মূলত পবিত্র মক্কায় ইসলাম প্রতিষ্ঠার প্রায় সমসাময়িক কালে মহানবী (স.) এর জীবদ্দশাতেই ভারতীয় উপমহাদেশসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিশেষত আরাকান অঞ্চলে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছায়। কেননা খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতাব্দীর পূর্ব থেকে আরব বণিকরা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্যিক পথে ভারত, বার্মা ও চীনের ক্যান্টন বন্দরে বাণিজ্যিক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিল। সে সূত্রেই আরবের কুরাইশরাও ইসলাম পূর্ব যুগেই এ বাণিজ্যপথে তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করে। বিশেষত পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতাব্দীতে পারস্য (ইরান) ও রোমান সাম্রাজ্যের মধ্যে অব্যাহত যুদ্ধ বিগ্রহের কারণে আরবদের স্থল বাণিজ্যপথ মারাত্মকভাবে বিপদ সংকুল হয়ে পড়েছিল। ইয়েমেন ও হাজরা মাউতের আরব বণিকদের নৌবাণিজ্যের পূর্ব অভিজ্ঞতার সুবাদে আরবের কুরাইশরাও নৌবাণিজ্যে আগ্রহী হয়ে পড়ে। সে সূত্রেই মহানবী (স.) এর আগমনের আগেই তারা ভারতীয় উপমহাদেশ, বার্মা, কম্বোডিয়া ও চীনের ক্যান্টন পর্যন্ত বাণিজ্যিক যোগাযোগ স্থাপন করেছিল এবং ষষ্ঠ ও সপ্তম শতাব্দীর সূচনা লগ্নেই তারা দক্ষিণ ভারতের মালাবার, কালিকট, চেররবন্দর, তৎকালীন আরাকানের চট্টগ্রাম ও আকিয়াবের সমুদ্রোপকূলে স্থায়ী বাণিজ্যিক উপনিবেশও গড়ে তোলে। পূর্ব অভিজ্ঞতার আলোকেই ইসলাম প্রতিষ্ঠার সমসাময়িক কালের মুসলমানরাও বাণিজ্যিক কারণে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাণিজ্য করতে আসে এবং সপ্তম শতাব্দী থেকে একাদশ শতাব্দী পর্যন্ত চীনা বাণিজ্যে মুসলিম প্রভাব অব্যাহত রাখে। তৎকালীন দক্ষিণ চীনের ক্যান্টন বন্দর ‘খানফু’ নামে পরিচিত ছিল। মুসলিম বণিকরা এ সময় ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল বিশেষত মালাবার এবং চট্টগ্রাম থেকে কাঠ, মসলা, সুগন্ধী দ্রব্য ও ঔষধি গাছ-গাছড়া সংগ্রহ করতেন। বাণিজ্যিক কারণে মুসলমানরা এ সব অঞ্চল সফর করলেও মূলত ইসলাম প্রচার তাদের মুখ্য বিষয় ছিল।

চীনের কোয়াংটা শহরে একটি মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন কাদেসিয়া যুদ্ধের বিজয়ী সেনাপতি হযরত সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাসের পিতা আবু ওয়াক্কাস মালিক ইবনে ওয়াইব। এরই অদূরে তাঁর মাজার এখনো বিদ্যমান। আবু ওয়াক্কাস (রা.) মহানবী (সা.) এর নবুয়তের সপ্তম বছরে হযরত কায়স ইবনে হুযায়ফা (রা.) হযরত ওরওয়াহ ইবনে আছাছা (রা.) এবং হযরত আবু কায়স ইবনে হারেছ (রা.) কে সঙ্গে নিয়ে একখানা সমুদ্র জাহাজে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্যিক পথে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে বের হয়েছিলেন বলে জানা যায়। তারা উক্ত জাহাজে প্রথমত ভারতের মালাবারে এসে উপস্থিত হন এবং সেখানকার রাজা চেরুমল পেরুমলসহ বহুসংখ্যক লোককে ইসলামে দীক্ষিত করে চট্টগ্রামে এসে যাত্রা বিরতি করেন। অতঃপর তিনি ৬২৬ খ্রিস্টাব্দে চীনের ক্যান্টন বন্দরে গিয়ে উপস্থিত হন। আবু ওয়াক্কাস (রা.)এর দলটি ৬১৭ খ্রিস্টাব্দে রওয়ানা দিয়ে প্রায় নয় বছর পর চীনে পৌঁছায়। এ থেকে অনুমান করা যায় যে, এ নয় বছর তারা পথিমধ্যে বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোতে ইসলাম প্রচারের কাজে ব্যয় করেছেন। কারণ চীনে আগমনের জন্য আরবদেশ থেকে রওনা করলে বাতাসের গতিবেগের কারণে বিভিন্ন স্থানে নোঙ্গর করতে হতো। বিশেষত বণিকেরা এক্ষেত্রে মালাবার, চেরর, চট্টগ্রাম, আকিয়াব, চীনের ক্যান্টন প্রভৃতি স্থানে জাহাজ নোঙ্গর করত। অতএব, অনুমান করা যায় যে, তিনি মালাবারের পর চট্টগ্রাম ও আকিয়াবেও জাহাজ নোঙ্গর করে ইসলাম প্রচারের কাজ করেছেন এবং সে সূত্রেই হিন্দের (বৃহত্তর ভারতের কোন অঞ্চলের) জনৈক রাজা কর্তৃক মহানবী (সা.) এর কাছে তোহফা পাঠানোর উল্লেখ পাওয়া যায়। হযরত আবু সাইদ খুদরি (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, হিন্দের জনৈক শাসক মহানবী (সা.) এর কাছে এক পোটলা হাদিয়া পাঠিয়েছিলেন যার মধ্যে আদাও ছিল। মহানবী (সা.) সাহাবিদেরকে তার (আদার) এক টুকরা করে খেতে দিয়েছিলেন এবং (রাবি বলেন) আমাকেও এক টুকরা খেতে দেয়া হয়েছিল। হিন্দের কোন শাসক মহানবী (সা.) এর কাছে হাদিয়া পাঠিয়েছিলেন সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানা যায় না। তবে, রুহমী রাজ্যের শাসকরা বহুকাল আগে থেকেই পারস্যের শাসকদের কাছে মূল্যবান হাদিয়া-তোহফা পাঠাতো। সম্ভবত এ রুহমী রাজাদেরই কোনো রাজা মহানবী (সা.) এর কাছে হাদিয়া পাঠিয়েছিলেন।
উল্লেখ্য, রুহমী রাজ্য সম্পর্কে বিভিন্ন ধরনের তথ্য থাকলেও বেশিরভাগ ঐতিহাসিক রুহমী বলতে আরাকান রাজ্যকে বুঝিয়েছেন। কেননা, আরাকানের পূর্ব নাম ‘রোখাম’। এটি আরবি শব্দ; যার অর্থ শ্বেতপাথর এবং আরাকানের প্রাচীন রাজধানী ম্রোহংয়ের পূর্বনাম কায়কপ্রু। এটি বার্মিজ শব্দ; যার অর্থও শ্বেত পাথর। এদিক থেকে কায়াকপ্রু অঞ্চল ও রোখাম একই অঞ্চল। সে কারণে রুহমী বলতে রোখাম বা আরাকানকেই বুঝানো যায়। মনে করা হয় যে, রোখাম শব্দটির বিকৃতরূপই রুহমী। তবে কেউ কেউ রুহমী বলতে রামুকে বুঝিয়েছেন। যদি এটা ধরে নেয়া হয় তবুও আরাকানই হয়। কেননা তখন রামু আরাকানেরই অংশ ছিল। তাছাড়া হাজার বছরের স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আরাকানের ঐতিহ্যও অস্বীকার করা যায় না।

সপ্তম শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে আরব মুসলিম বণিকরা চট্টগ্রাম-আরাকান অঞ্চলে বাণিজ্য মিশন নিয়ে যাতায়াত শুরু করলেও অষ্টম শতাব্দীতে তাদের আগমন আরো বেড়ে যায়। এ সময় চট্টগ্রাম ও আরাকানে আগত আরব বণিকদের সংস্পর্শে এ এলাকার মানুষ ইসলাম সম্পর্কে জানার সুযোগ পায়। বণিকরা কেউ সপরিবারে আসেননি। অন্যদিকে মৌসুমী বায়ুর জন্য তাদেরকে প্রায় ৫/৬ মাস অপেক্ষা করতে হতো। এ সময় তারা স্থানীয় হিন্দু-বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মহিলাদের বিয়ে করতেন। বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ মহিলারা যেমন ইসলাম গ্রহণ করতেন তেমনি তাঁদের গর্ভস্থ সন্তানরাও ইসলামের সুমহান আদর্শকে গ্রহণ করেই বেড়ে ওঠেন। এভাবে ক্রমশ আরব বণিক, বহিরাগত মুসলিম দরবেশ, সুফি, উলামা ও ইসলাম প্রচারকদের উৎসাহ উদ্দীপনায় চট্টগ্রাম ও আরাকানে বসবাসরত নির্যাতিত হিন্দু ও বৌদ্ধরা ব্যাপক হারে ইসলাম গ্রহণ করে। ফলে চট্টগ্রামসহ মুসলিম পরিবারের সমন্বয়ে একটি মুসলিম সমাজ গড়ে ওঠে। দশম শতাব্দীতে সেখানে মুসলিম সমাজের প্রভাব এতটা বেড়ে গিয়েছিল যে, কোনো কোনো গবেষক একে ছোটখাট মুসলিম রাজ্য হিসেবে চিহ্নিত করে এর আমীরকে ‘সুলতান’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। এ সুলতানের অধীনস্ত এলাকা ছিল মেঘনা নদীর পূর্বতীর থেকে নাফ নদীর উত্তর তীরবর্তী সমুদ্রোপকুলবর্তী ভূ-ভাগ পর্যন্ত।

আরাকানের জাতীয় ইতিহাস রাজোয়াংয়ের সূত্রে তারা উল্লেখ করেন যে, আরাকানরাজ সুলতইঙ্গ-ৎ-চন্দ্র (৯৫১-৯৫৭) ৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে রাজ্য জয়ে বের হন। তিনি নিজ রাজ্যের সীমা অতিক্রম করে ‘থুরতন’কে পরাজিত করে চেত্তাগৌং – এ একটি পাথর নির্মিত বিজয়স্তম্ভ নির্মাণ করে পাত্র মিত্রের অনুরোধে তিনি স্বরাজ্যে ফিরে যান। এ ‘চেত্তাগৌং’ অর্থ যুদ্ধ করা অনুচিত। এ শব্দ থেকেই চট্টগ্রাম নামকরণ হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। উল্লেখ্য যে, এখানে ‘থুরতন’কে পরাজিত করা বলতে অর্থাত সেই মেঘনা অববাহিকায় প্রতিষ্ঠিত নব ইসলামী রাজ্যের সুলতানকে বুঝানো হয়েছে বলে কেউ কেউ মন্তব্য করেন। কিন্তু এ বিষয়টি বিতর্কের উর্ধ্বে নয়। তবে বাংলায় ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠা হওয়ার অনেক আগেই যে চট্টগ্রাম আরাকানে ইসলামী পরিবেশ সম্বলিত সামাজিক অবকাঠামো নির্মিত হয়েছিল তা নিঃসন্দেহে বলা যায় এবং বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পর তা যে আরো সুদৃঢ়রূপ লাভ করেছিল তা সহজেই অনুমান করা যায়।

নাইম বিন হাম্মাদ এর উদ্ধৃতিতে রুহমী রাজা কর্তৃক খলিফা উমর বিন আব্দুল আজিজকে (৭১৭-৭২০ খ্রি.) চিঠি পাঠানোর তথ্য পাওয়া যায়। সে চিঠিতে বলা হয়েছে-“রুহমী শাহেন শাহের পক্ষ থেকে যিনি হাজার বাদশাহর অধঃস্তন পুরুষ, যার স্ত্রীও হাজার বাদশাহের অধঃস্তন কন্যা এবং যার হাতিশালায় সহস্ত্র হাতি ও যার রাজ্যে দু’টি নহর রয়েছে সেগুলোতে উদ উৎপন্ন হয়। এছাড়া কর্পুর, করমচা, বাদাম গাছও রয়েছে এবং যার প্রতিপত্তি ১২ শত মাইল দূর থেকেও পাওয়া যায়। এর পক্ষ থেকে আরবের বাদশাহ যিনি আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করেন না তার প্রতি। অতপর: আমি আপনার নিকট কিছু হাদিয়া পাঠাচ্ছি। বস্তুত এটি হাদিয়া নয় বরং কৃতজ্ঞতা। আমি আশা করি আপনি আমার কাছে এমন একজন ব্যক্তিকে পাঠাবেন যিনি ইসলাম বুঝাবেন ও শুনাবেন।

আরাকানের চন্দ্র-সূর্য বংশের প্রথম রাজা মহৎ ইঙ্গ চন্দ্র (৭৮৮-৮১০ খ্রি.)৭৮৮ খ্রিস্টাব্দে বৈশালীতে রাজধানী স্থাপন করে শাসনকাজ পরিচালনা শুরুকরেন। তার উদারনীতির কারণে মুসলমানরা ইসলাম প্রচারের ব্যাপক সুযোগ পায় এবং সে সূত্রেই আরব মুসলিম বণিকরা রাহাম্বী বন্দরসহ আরাকানের নৌবন্দরগুলোতে ব্যাপকভাবে বাণিজ্যিক ও ইসলাম প্রচার মিশন পরিচালনা করতে থাকে। এ রাজার শাসনামলেই কয়েকটি আরব মুসলিম বাণিজ্যবহর রামব্রী দ্বীপের পাশে বিধ্বস্ত হলে জাহাজের আরোহীরা রহম বলে চিৎকারের মাধ্যমে সাহায্যের আবেদন করতে থাকে। এ সময় স্থানীয় লোকজন তাদেরকে উদ্ধার করে রাজার কাছে নিয়ে যায়। রাজা তাদের বুদ্ধিমত্তা ও উন্নত আচরণে মুগ্ধ হয়ে আরাকানেই স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি দেন। এভাবে অষ্টম শতাব্দী থেকে দশম শতাব্দী পর্যন্ত আরাকানের উপকূলীয় অঞ্চল হতে শুরু করে মেঘনা নদীর পূর্ব তীরবর্তী বিস্তীর্ণ বন্দরগুলো আরব বণিকদের কর্মততপরতায় মুখরিত হয়ে ওঠে। এমনকি মুসলমানদের সুমহান আদর্শেরপ্রতিও শাসকরা মনস্তাত্বিক দিক থেকে দুর্বল হয়ে পড়ার নিদর্শন পাওয়া যায়। কেননা খলিফা উমর বিন আবদুল আজিজ (৭১৭-৭২০ খ্রি.) এবং আব্বাসীয় খলিফা মামুনকে (৮১৩-৮৩৩ খ্রি.) রুহমীর রাজা চিঠি লিখেছিল। রুহমী বলতে আরাকান বুঝানো হলে আরাকানের শাসক যথাক্রমে রাজা সূর্যক্ষিতি (৭১৪-৭২৩ খ্রি.) এবং সূর্য ইঙ্গ চন্দ্র (৮১০-৮৩০ খ্রি.) এ চিঠিগুলো লিখেছিলেন।

দশম ও একাদশ শতাব্দীতে আরব বণিক ও সুফি দরবেশদের মধ্যে বদরুদ্দিন (বদর শাহ) নামে একজন ইসলাম প্রচারক এ অঞ্চলে আসেন এবং ধর্মীয় ও সামাজিক ক্ষেত্রে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেন। তার নামানুসারে অসমের সীমা থেকে শুরু করে মালয় উপদ্বীপ পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে ‘বদর মোকাম’ নামে মসজিদও নির্মিত হয়েছে। ড. মুহাম্মদ এনামুল হক ও আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ বলেন, খ্রিস্টীয় নবম ও দশম শতাব্দীতে আরাকানে ইসলাম বিস্তৃতি ও মুসলমানদের প্রভাব অন্যান্য ঐতিহাসিকও স্বীকার করেছেন। এই সময় হইতেই অসমের সীমা হতে মালয় উপদ্বীপ পর্যন্ত সমদ্র তীরবর্তী ভূ-ভাগের নানা স্থানে ‘বুদ্ধের মোকাম’ নামক এক প্রকার অদ্ভূত মসজিদ গড়ে উঠতে থাকে; এই মসজিদগুলোকে বৌদ্ধ, চীনা ও মুসলমান জাতি সমভাবে সম্মান করে থাকে।

উপরোক্ত তথ্যের ভিত্তিতে বদর মোকাম মসজিদটি নবম অথবা দশম শতাব্দীর বলে অনুমান করা হলেও আরাকানী লেখক ডা. মুহাম্মদ ইউনুস একে ৭ম শতাব্দীর শেষভাগে নির্মিত বলে দাবি করেছেন। এমনকি ঐতিহাসিক ড. আবদুল করিমের বইতেও বদর মোকামের ছবি দিয়ে এটাকে সপ্তম শতাব্দীর শেষ ভাগে রচিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পক্ষান্তরে, বিভিন্ন বর্ণনায় চতুর্দশ, অষ্টাদশ প্রভৃতি শতাব্দীতে নির্মিত বলে তথ্য পাওয়া যায়। কিন্তু দশম ও একাদশ শতাব্দী থেকেই বদর উদ্দীন, বদরশাহ প্রভৃতি নামে পির বদরের সন্ধান পাওয়া যায়। এ প্রেক্ষাপটে চিন্তা করলে ‘বদর মোকাম’কে দশম শতাব্দীর মনে করা যেতে পারে।

আকিয়াবে অবস্থিত বদর মোকামে দু’টি দালান আছে। একটি টিলার উপরে। এটির উত্তর ও দক্ষিণ পাশে দু’দিকে দু’টি দরজা আছে। সেখানে একটি মসজিদ রয়েছে। মসজিদটি চার কোণা মিনার ও গম্বুজ বিশিষ্ট। পশ্চিমের দেয়ালে বদর মোকামের মূল পরিচালকের নিযুক্তিপত্র ফারসি ভাষায় লেখা হয়েছে। এ মসজিদটি বৌদ্ধ প্যাগোডা ও ভারতীয় মসজিদের মিশ্র নির্মাণ শৈলীতে নির্মিত। উল্লেখিত বদর মোকাম মসজিদের মধ্যে নির্দিষ্ট স্থানে একটি পাথর রয়েছে যেখানে পির বদরের পায়ের পাতার চিহ্ন ও হাটুর দাগ স্পষ্টভাবে দেখা যায়। অনুমান করা হয় যে, হযরত বদর উদ্দীন (রহ.) অনবরত ইবাদত ও সাধনা করার ফলে উক্ত পাথরে তাঁর পায়ের হাঁটুর দাগ বসে গেছে। আরাকানী জনগণসহ সমুদ্রপথে চলাচলকারী বণিক ও নাবিকরা তাঁকে ব্যাপকভাবে ভক্তি ও শ্রদ্ধা করে থাকে। পির বদর সমুদ্র পথে যাতায়াত করতেন বলে নাবিকরা তাকে ‘দরিয়া পির’ বলে বিশেষভাবে স্মরণ করে; এমনকি তাঁর আস্তানা, চিল্লাখানা বা দরগাহও সমুদ্রের উপকূলে। তাই তিনি হয়তো আরব দেশ থেকেই এসে থাকবেন। যদি তাই হয়ে থাকে তবে সপ্তম শতাব্দীর শেষ ভাগে যেসব বণিক ও নাবিক ইসলাম প্রচারের জন্য এসেছিলেন তাদের মধ্যে কেউ ‘বদর’ নামে ছিলেন না তা কি করে বলা যাবে? হয়তো তখন থেকে আকিয়াবে মসজিদ স্থাপিত হলেও ত্রয়োদশ কিংবা চতুর্দশ শতাব্দীতে বদর উদ্দীন নামক কোনো অলী এসে সে মসজিদে নতুনভাবে আবাদ করেন এবং ১৭৫৫ খ্রিস্টাব্দে সওদাগর ভ্রাতৃদ্বয় ওই মসজিদ আবার সংস্কার করেন। মসজিদের ভেতরে রক্ষিত পা ও হাঁটু চিহ্নিত পাথরটি পির বদরের জীবদ্দশাতেই ‘বদর মোকামে’র অস্তিত্ত্ব বজায় থাকার প্রমাণ বহন করে।

এভাবে চট্টগ্রাম এবং আরাকানে আগত ও বসতি স্থাপনকারী আরব বণিক সম্প্রদায়, নাবিক, সুফি, দরবেশ শ্রেণী এবং ত্রয়োদশ শতকের পর থেকে তুর্কি, পাঠান ও মোগলদের শাসনামলে বাংলা থেকে আগত মুসলমানদের সঙ্গে এ অঞ্চলের (চট্টগ্রাম-আরাকান) নিম্নবর্ণের হিন্দু ও বৌদ্ধদের সংমিশ্রণ ঘটে এবং তারা ব্যাপকহারে ইসলামে দীক্ষা গ্রহণ করেন। সেই সঙ্গে চট্টগ্রাম অঞ্চল ছিল বাংলা, আরাকান, ত্রিপুরা ও বার্মার লক্ষ্যস্থল এবং আরাকান রাজ্যের অধীনে চট্টগ্রাম দীর্ঘদিন শাসিত হওয়ার ফলে চট্টগ্রামে বসবাসরত জনগোষ্ঠী, নবদীক্ষিত মুসলমান, বহিরাগত ইসলাম প্রচারক-বণিক, সুফি-দরবেশ, উলামা সম্প্রদায় অবাধে আরাকানে ইসলাম প্রচারের জন্য যাতায়াত করতেন। ফলে, চট্টগ্রামের মতো আরাকানেও একটি ইসলামী পরিবেশ সম্বলিত সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। পর্দা প্রথা, খাদ্যাভ্যাস, রান্না পদ্ধতি, এমনকি মানবীয় আচরণেও ইসলামের প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে। পরবর্তীতে বরেণ্য পির-দরবেশদের মধ্যে চকপিউ এর মুন্সী আবদুন নবী, আকিয়াবের শাহ মোনায়েম (বাবাজি), হায়দার আলী শাহ (কাহারুশাহ), নূরুল্লাহ শাহ (কৈলা শাহ) এবং আজল উদ্দীন শাহের (আজলা শাহ) নাম উল্লেখযোগ্য। বদরুদ্দীন বদরে আলম যাহিদী নামক একজন অলী তিন/চারশ’ অনুগামী ইসলাম প্রচারক নিয়ে ভারতের মিরাঠাবাদ থেকে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে এসেছিলেন। তিনি ১৩৮০ খ্রিস্টাব্দে বিহারে চলে যান এবং ১৪৪০ খ্রিস্টাব্দে সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন। তারা নানারূপ বিকৃত বৌদ্ধ-হিন্দুয়ানী আচরণ ও প্রথা রহিত করে মুসলমানদের ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবন সত্যিকারের ইসলামী মূল্যবোধের আলোকে গড়ে তোলার জন্য আমরণ চেষ্টা করেছেন। এভাবে আরাকানের সামাজিক অবকাঠামোগত ভিত্তিতে ইসলামের সম্পৃক্ততা দ্রুত বেড়ে যায়।

বাংলার সুলতান জালাল উদ্দীন মুহাম্মদ শাহের (১৪১৫-১৬; ১৪১৮-৩৩ খ্রি.) সহায়তার সুবাদে নরমিখলা কর্তৃক আরাকান পুনরুদ্ধারের মধ্যদিয়ে পঞ্চদশ শতাব্দীর চল্লিশের দশকে সেখানকার রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোতে ইসলামের সুমহান আদর্শের প্রতিফলন ঘটলেও একাদশ শতাব্দীতেও রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে মুসলমানদের ততপরতা পরিলক্ষিত হয়। আরাকানের পিনসা বা চাম্পাওয়াত বংশের শেষ রাজা পোন্যাক এর রাজত্বকালে ১০৫৭ খ্রিস্টাব্দে পগাঁ রাজা আনওয়ারাথা আরাকান জয় করে পঁগা রাজ্যের সীমাকে বৃদ্ধি করেন এবং কৌলিন্য অর্জন ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর জন্য আরাকানের বৈশালী রাজকন্যা পঞ্চকল্যানীকে বিয়ে করেন। অতঃপর তিনি ১০৫৯ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম ও পাট্টিকারা (বর্তমান বাংলদেশের বৃহত্তর কুমিল্লা) জয় করে ততকালীন বাংলার সীমান্ত পর্যন্ত রাজ্যের বিস্তৃতি ঘটান।

উল্লেখ্য, প্রাচীনকালে বার্মার একক কোনো অস্তিত্ব ছিল না। সে সময় থেটন, পেগু, পঁগা, আভা, প্রোম, প্রভৃতি পাঁচটি রাজ্যের অস্তিত্ব লক্ষ্য করা যায়। এর মধ্যে আনওয়ারাথা কর্তৃক ১০৪৪ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত পঁগা রাজ্য মাত্র পনের বছরের মধ্যে বিশাল শক্তিশালী সাম্রাজ্যে পরিণত হয়। এর আগে বার্মা, আরাকান ও বাংলায় মহাযান বা তান্ত্রিক বৌদ্ধ মতবাদ প্রচলিত ছিল। কিন্তু আনওয়ারাথা’র শাসনামলে আরাকান, চট্টগ্রাম ও পাট্টিকারা অঞ্চলে হীনযান বা থেরবাদ বৌদ্ধমত প্রচারিত হয়। রাজা আনওয়ারাথাই উদার ধর্মীয়নীতি গ্রহণের মাধ্যমে মুসলমান বণিক, নাবিক, ধর্ম প্রচারকদের অবাধ সুযোগ সৃষ্টি করে দেন এবং রাজ্যের সৈন্য বিভাগসহ তাঁর নিজের দেহরক্ষী বাহিনীতেও মুসলমানদের নিয়োগ দেন। শুধু তাই নয়, তার সন্তানের গৃহশিক্ষক হিসেবে জনৈক মুসলিম ব্যক্তিকে নিয়োগ দেন। ফলে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে প্রথমবারের মতো মুসলমানদের কর্মতৎপরতা পরিলক্ষিত হয়।

আনওয়ারাথা’র মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র সাউলু ১০৭৭ খ্রিস্টাব্দে সিংহাসনে আরোহণ করেন। তাঁর শৈশবকালের মুসলিম গৃহ শিক্ষকের পুত্র, দুধভাই ও বাল্যবন্ধু আবদুর রহমান খানকে (বর্মী ভাষায় ইয়ামানকান) বন্ধুত্বপ্রীতির নিদর্শন স্বরূপ উস্ সা নগরীর (বর্তমান পেগু) শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন। কিন্তু, পরবর্তীতে দু’বন্ধুর মাঝে ভুল বুঝাবুঝির কারণে যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধে সউলুর বিরুদ্ধে আবদুর রহমান বিজয়ী হলেও সউলুর অন্য ভাই কানজিত্থা’র ষড়যন্ত্রে তিনি নিহত হন। এভাবেই আবদুর রহমান খানের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বার্মা তথা আরাকান অঞ্চলে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে মুসলিম প্রভাবের সূচনালগ্নেই সূর্য অস্তমিত হয়। ফলে, আরাকান তথা বার্মার প্রশাসনে মুসলিম প্রভাব শুরুতেই সমাপ্তি ঘটে।

আরাকানের মুসলিম প্রভাব বেড়ে যাওয়ায় চট্টগ্রাম-আরাকানে তান্ত্রিক বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব কমতে থাকে এবং চট্টগ্রামের পন্ডিত বিহার ক্রমশ অধঃপতিত হয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। অন্যদিকে, ত্রয়োদশ শতকের পর থেকে তুর্কি, পাঠান ও গৌড় থেকে আগত মুসলমানদের সংস্পর্শে আরাকানী সমাজে ইসলামের প্রভাব বিস্তৃত হয় এবং গৌড়ের মুসলমান সমাজ-সংস্কৃতির সঙ্গে চট্টগ্রাম-আরাকানের অবিচ্ছেদ্য যোগাযোগ স্থাপিত হয়। চতুর্দশ শতাব্দীতে মরক্কোর পর্যটক ইবনে বতুতা ১৩৪৬ সালে যখন চট্টগ্রাম-আরাকান সফর করেন। তখন তিনি সেখানে অনেক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবার দেখেছিলেন। মূলত পঞ্চদশ শতাব্দীর মধ্যে আরাকানি সমাজে ইসলামের যে প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে তার প্রধান বিষয় হচ্ছে পর্দা প্রথা। ততকালীন আরাকানি সমাজে মুসলমান নারীদের পর্দা পালনের প্রভাবে আরাকানের অমুসলিম নারীদের মাঝেও এর বিস্তার ঘটে। এ সূত্রেই আরাকানি মুসলমানদের বিস্তৃতি। এছাড়া প্রাচীনকালে আরব মুসলমান বণিকরা নৌ-বিদ্যায় দক্ষ ছিলেন। তাদের সংস্পর্শে এসে চট্টগ্রাম-আরাকানের মুসলমানরাও নৌ-বিদ্যায় পারদর্শী হয়ে ওঠেন। সেই সঙ্গে চট্টগ্রাম-আরাকানের বিভিন্ন শহরের নানা স্থানের আরবি নাম, খেলাধুলা, রীতিনীতি ও আচার ব্যবহারে আরবীয় প্রভাব রয়েছে। এমনকি কথা বার্তায় আরবী ভাষার অনুকরণে ‘লা’ (না বোধক শব্দ বাক্যের সূচনালগ্নে ‘আঁই ন যাইয়ুম’) ব্যবহার সুস্পষ্টভাবে আরব প্রভাবের ফল- এতে কোনো সন্দেহ নেই।

লেখক: ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ
সহকারী অধ্যাপক,
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ,
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।


আরাকান অধিবাসীদের প্রাথমিক ইতিহাস

ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ বাংলা ও আরাকান সীমান্তগত দিক থেকে শুধু প্রতিবেশীই নয় বরং বাংলাদেশের…


যেভাবে আমরা বই পেলাম এবং আমাদের ঐতিহ্য

মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বইয়ের যাত্রা কবে শুরু তা নির্দিষ্ট দিনক্ষণ উল্লেখ করে কেউ বলতে পরেনি…


মসনবীর কবি রুমী

মসনবীর কবি রুমী রাজু রফিক সাহিত্য মানুষের জীবনের নানা কথার বিচিত্র কথক। আর এক কথায়…


রবীর উপর বাউলের প্রভাব

রবীর উপর বাউলের প্রভাব কবীর হুমায়ুন বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বলতম জ্যোতিষ্ক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। একজন মানুষের…