[জাপান কাহিনী ] -প্রথম জাপানী বন্ধু



আশির আহমেদ::

{গত পর্বের কন্টিনিউনিটি দিচ্ছি। আমার পিতৃতুল্য যেই ব্যাক্তির কথা বলছি, উনার নাম আওয়ানো মিকিও। উনার ফিউনারেল নিয়েই এই পর্বে লিখার কথা। লিখতে গিয়ে মনে হলো, উনার সাথে কিভাবে পরিচয় হলো, তা জানানো দরকার} আওয়ানো ফ্যামিলির সাথে প্রথম দেখা ২৫ বছর আগে। ১৯৮৮ সালের ২২শে অক্টোবর। জাপানে আসার মাত্র ১৯ দিন পর। পরিচয়ের পর্ব টা ও বেশ নাটকীয়। আমাদের জাপানীজ স্কুলে একটা অনুষ্ঠান হচ্ছিল। প্রথম দেখা উনাদের একমাত্র ছেলে শিমনের সাথে। অনুষ্ঠান বলতে তেমন কিছু না। বিদেশী ছাত্রদের জন্য টোকেনের মাধ্যমে অতি সস্তায় দৈনন্দিন ব্যবহারযোগ্য জিনিস পত্র বিক্রি হচ্ছিল। বাংলাদেশ থেকে আসা আমরা তিন কিশোর টোকেনের নিয়ম কানুন বুঝতে না বুঝতেই সব সাবাড় হয়ে গেল। স্কুল আঙিনার এক পাশে দাড়িয়ে হতাশায় আক্রান্ত আমরা তিন জন গল্প করছিলাম। দেখি নয়-দশ বছরের একটা ছেলে। আমাদের দিকে হ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। কাধে একটা ক্যামেরা ঝুলানো। ক্যানন অটোবয়। আমার কাধে ও একই ক্যামেরা। খাচ বাংলায় গিয়ে বললাম, দ্যাখ তোর ক্যামেরা আর আমার ক্যামেরা এক। দিলাম তোরে একটা চিমটি। ছেলেটা খট খট করে হেসে উঠলো। আমরা যাই বলি ছেলেটা কেবলই হাসে। কিছুক্ষণ পর ওর বাবা-মা এসে হাজির হল। কারো কথা কেউ বুঝিনা। আমরা কিছু বলি, উনারা হাসেন। উনারা বলেন, আমরা হাসি। ডায়েরী থেকে কাগজ বের করে আমাদের ডরমিটরীর ঠিকানা আর ফোন নম্বর দিলাম। উনারা ও দিলেন। বাবা ইংরেজীতে ঠিকানা লিখছেন- মা ও ছেলে গর্বের সাথে দেখছেন। ঠিকানা লেখা শেষ, আবার ও হাসাহাসি। কথা শেষ, বল্লাম একটা ছবি নিতে চাই। ছবি নিতেই আমার রিল শেষ হয়ে গেল। ডিজিটাল ক্যামেরা তখনো আবিষ্কার হয়নি। ছেলেটাও ছবি নিল। তার ও রিল শেষ হয়ে গেল। আমি আবার ও গিয়ে চিমটি দিলাম। ছেলেটা হো হো করে হেসে উঠলো ।

সাত দিন পরের কথা। আমার পোষ্ট বক্সে দেখি একটা ফলের বাক্স আর সাথে জাপানী ভাষায় লিখা একটা চিঠি। দোভাষী দিয়ে চিঠি পড়ালাম। দোভাষী বল্লেন, আওয়ানো নামে এক ফ্যামিলির সাথে তোমাদের দেখা হয়েছিল। উনারা তোমাদের সাথে আবার দেখা করতে চান। আমি উত্তর দিলাম- আগামী ২৩ শে নভেম্বর আমাদের কোমাবা ফরেন স্টুডেন্ট্স হাউসে “ওপেন হাউস” ফেস্টিভাল হবে। আপনারা আমাদের দাওয়াত গ্রহন করুন। উনারা ওপেন হাউসে আসলেন। আমাদের সংগে সারাদিন কাটালেন। ইতিমধ্যে আমাদের জাপানীজ ভাষার ভালো উন্নতি হয়েছে। টুকটাক শব্দ বলি, উনারা চরম উৎসাহে শুনেন এবং হাসেন। নুতন বাচ্চারা নুতন শব্দ উচ্চারণ করলে সবাই যেমন হাততালি দিয়ে উঠে, ঠিক তেমন অবস্থা। টোকিও র ভাষা স্কুলে আমরা ছয়মাস কাটালাম। মোটামুটি প্রতি সপ্তাহেই উনারা আসতেন। আমাদের এদিক ওদিক নিয়ে যেতেন। রবিবার দুপুরের খাবার প্রায়ই একসংগে খেতাম। ১৯৮৯ সালের মার্চ মাস। আমাদের ভাষা শিক্ষা শেষ। আমরা তিনজন টোকিও ছাড়লাম। স্ব স্ব কলেজে লেখাপড়া শুরু করলাম। আমার চিঠি লেখার নেশা ছিল। উনাদের সাথে প্রতিনিয়ত পত্র ও টেলিফোন যোগাযোগ ছিল। ১৯৯০ সালের মার্চ মাস। বসন্তের ছুটিতে প্রথম বারের মতো বাংলাদেশে যাচ্ছি। টোকি ও এসেই দেখি মহা কান্ড। আওয়ানো আম্মাজান একটি সুটকেস তৈরী করে রেখেছেন। আমার ভাই-বোন, বাবা-মা, কাজিন, বন্ধু-বান্ধব সবার জন্য গিফ্ট কিনে ব্যাগ ভর্তি করে রেখেছেন। আমি বাংলাদেশে পৌছে এক বিরাট চিঠি দিলাম। গিফট পেয়ে কার কি অনুভূতি সব লিখে পাঠালাম। এক মাস পর জাপানে ফিরে এসে টোকিও স্টেশনের কাছে এক রিভলভিং রেষ্টুরেন্টে বসলাম। বিল্ডিং টার উপরের তলাটা ঘুরে। খেতে খেতে ৩৬০ ডিগ্রী টোকিও দেখা যায়। আজ ছেলেটা আসেনি। ৪ ঘন্টা যাবৎ শুধু বাংলাদেশের গল্পই বলেছি। । গল্প আর শেষ হয় না।গল্প শুধু আমিই বলে যাচ্ছি। এক সময় মনে হলো উনারা ও কিছু বলতে চান। একজন আরেকজনের দিকে তাকাচ্ছেন, “আমি বলি- না তুমি বলো, না-না তুমি বলো” টাইপের চোখ চাওয়া চাওয়ির পিং পং চলছে। অতঃপর আমার জাপানী বাবা মুখ খুললেন। বল্লেন- আমাদের ছেলে শিমন একটু অসুস্থ। এই কথা বলার সাথেই সাথেই আম্মাজান রুমাল নিলেন। কি ঘটতে যাচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছিনা। বাপজান বল্লেন, নির্ধারিত সময়ের আগেই শিমনের জন্ম হলো। ওর ব্রেইন টা পর্যাপ্ত পরিমানে ডেভেলপ করেনি। জন্ম থেকে ও অমন ভাবে কখনো প্রাণ খুলে হাসেনি । ঐদিন স্কুলের আঙিনায় তোমাদের সঙ্গে যেদিন শিমনের প্রথম দেখা, তখন শিমন তোমাদের সাথে হাসাহাসি করছিল। শিমনের আম্মা আমাকে ডেকে নিয়ে দুর থেকে দেখালো। আমরা দুর থেকে নয়ন ভরে শিমনের উৎফুল্লতা দেখলাম। পরে আমরা ডাক্তারের সাথে এই কাহিনী বলেছি। ডাক্তার বল্লেন, যত পারো শিমন কে ওদের সাথে মিশতে দাও। ওর ব্রেইন ততই এক্টিভ হবে, পূর্ণতা আসবে। এইবার মা জিজ্ঞাস করলেন- আচ্ছা বলতো, তোমরা বাংলাদেশী ছেলেগুলো এতো হাসি-খুশি কেন? এত উচ্ছ্বাস তোমরা কোথায় পাও? এই প্রশ্নের উত্তর কিভাবে দিব? আমি বোকার মত উত্তর দিলাম- আমাদের মত ছেলে মেয়ে বাংলাদেশে বস্তায় বস্তায় আছে। মা বলে উঠলেন, তাহলে আমার ছেলেকে তোমরা একবার বাংলাদেশে নিয়ে যাবে? ওর সমবয়সী ছেলে মেয়েদের সাথে খেলাধুলা করবে। আমি কি উত্তর দিয়েছি, মনে নেই। তবে আজ হলে বলতাম, “আবার জিগায়” । যেই কথা সেই কাজ। ১৯৯৩ সালের বসন্তের ছুটিতে ১৩ বছরের শিমন আমাদের সাথে বাংলাদেশে এল। ১৯৮৮ সালে প্রথম ব্যাচে আমরা ৩ জন। ৮৯ সালে ২ জন। ৯০ সালে ৩ জন। এরকম করে মোটামোটি ডজন খানেক বাংলাদেশি ছাত্র-ছাত্রী তখন জাপানে। সবার সাথেই আওয়ানো ফ্যামিলির একই রকম সম্পর্ক। আমরা সবাই শিমন কে নিয়ে বাংলাদেশে ব্যস্ত হয়ে গেলাম। ১৩ বছরের ধবধবে সাদা একটা জাপানী বাচ্চা। যেখানেই নিয়ে যাই সেখানেই সে মধ্যমণি। ঢাকার এক বিয়েতে নিয়ে গেলাম। ওর সমবয়সী এক মেয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলাম। সে মহা খুশী। ঐ মেয়ের সাথে ছবি তোলার জন্য একটু পর পর আমাকে খোচায়। বুঝলাম, ছেলে নরমাল আছে। ১৪ দিন ছিল তার ভিসার মেয়াদ। আমরা তাকে এয়ারপোর্ট পৌছে দিতে যাচ্ছি, অনেক লাজুক ভঙ্গিতে কানে কানে বললো – আর কয়েকদিন থাকা যায়না? আমার তো এখনো স্কুল বন্ধ। আমার এক বছরের জুনিয়র ছেলেটা বলে উঠলো, “আশির ভাই, চলেন রেখে দেই, কাল অন্তত বলতে পারবো, বাংলাদেশে জাপানী এক পিস ইলিগ্যাল আছে”। অনেক বুঝিয়ে শুনিয়ে শিমন কে বিমানে উঠিয়ে দিলাম। শিমনের অবস্থা অনেকটা ইম্প্রুভ করলেও মাঝে মাঝে আবার সে তার নিজস্ব জগতে ফিরে যায়। এখন শিমন একজন মঞ্চ অভিনেতা। টি,ভি তে বাইলিংগুয়েল মুভি গুলোতে আবহ কথক হিসাবে ও কাজ করে। আওয়ানো ফ্যামিলি মনে করেন, শিমনের অবস্থা যতটুকু ইম্প্রুভ করেছে তার পুরো ক্রেডিট জাপানে পড়তে আসা এই বাংলাদেশী ছাত্র ছাত্রীদের। মা-জান মনে করেন, বাপ-জান যে অতিরিক্ত ৩ টি মাস বেচেছিলেন- তার ক্রেডিট ও একই ব্যাক্তিদের। পৃথিবীটা আসলেই ছোট। মানুষের মন তার চাইতে অনেক বড়। এই বড়ত্ব টুকু কাকতালীয় ভাবেই বের হয়ে আসে। পড়াশুনা আর ট্রেনিং দিয়ে কি আর সব হয়?
[চলবে]


কেউ জানে কেউ জানেনা (২৯তম সংখ্যা)

শরাফুল ইসলাম (গত সংখ্যার পর) টিনার অপমৃত্যু একজন নিষ্ঠাবার শিল্পীকে ছিনিয়ে নেয়। দৌলদিয়া ফেরীতে গাড়ী…


কেউ জানে কেউ জানেনা (৩১তম সংখ্যা)

শরাফুল ইসলাম (গত সংখ্যার পর) ব্যক্তিগত উদ্যোগে অনেকেই কবি সাহিত্যিকদের পরিচিতিমূলক গ্রন্থ সংকলন করেছেন। বাংলা…


কেউ জানে কেউ জানে না (৩২তম সংখ্যা)

শরাফুল ইসলাম ১৯৮৩ সালে সাপ্তাহিক সচিত্র স্বদেশে একটি তথ্য এবং ইতিহাস ভিত্তিক প্রতিবেদন লিখেছিলাম। শিরোনাম…


Then in time and history (38 issue)

Recapping the story told so far: A young man still in his teens arrives in…


[জাপান কাহিনী ] -প্রথম জাপানী বন্ধু

আশির আহমেদ:: {গত পর্বের কন্টিনিউনিটি দিচ্ছি। আমার পিতৃতুল্য যেই ব্যাক্তির কথা বলছি, উনার নাম আওয়ানো…