নজরুলের রাজনীতি এবং বিদ্রোহ



মোমিন মেহেদী
মাগো! আমায় বলতে পারিস/ কোথায় ছিলাম আমি/ কোন-না জানা দেশ থেকে তোর কোলে এলাম নামি?/ আমি যখন আসিনি, মা তুই কি আঁখি মেলে/ চাঁদকে বুঝি বলতিস -ঐ ঘরছাড়া মোর ছেলে?/ শুকতারাকে বলতিস কি আয়রে নেমে আয়/ তোর রূপ যে মায়ের কোলে বেশী শোভা পায় ‘কোথায় ছিলাম আমি’ শীর্ষক ছড়ায় এভাবেই বলেছেন নতুন প্রজন্মের জন্য নিবেদিত কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি আমাদের বাংলাদেশীদের জাতীয় কবিও। পাশাপাশি সাম্যের কবি, বিদ্রোহের কবি, সাহসের কবি এবং শিশু-কিশোর তথা নতুনের কবি। তিনিই একমাত্র কবি বাংলা সাহিত্যে যিনি নির্মাণ করেছেন নতুনদের জন্য অসংখ্য নিরিক্ষাধর্মী লেখা। শুধু এখানেই শেষ নয়; পড়ার ছলে ছড়ার ছলে তিনি নিয়ে এসেছেন ন¤্রতা-ভদ্রতা আর শুদ্ধতার শিক্ষাও। যার প্রমাণ মেলে মানুষ নয়; প্রজাপতির সাথে তাঁর কথা বলার মধ্য থেকে। যেমন তিনি নিজেকে অ- নে-ক বিনয়ী করে প্রজাপতির কাছে প্রশ্ন করছেন, প্রজাপতি, প্রজাপতি,/ কোথায় পেলে ভাই অমন রঙিন পাখা?/ ওই লাল-নীল ঝিলিমিলি আঁকাবাঁকা…

তিনি নিজেকে কখনোই অন্যদের মত করে উপস্থাপন করেন নি। বরং অন্য কবি-ছড়াকারদের বিপরীতে হেঁটেছেন। তুলে ধরেছেন মায়ের প্রতি অগাধ সম্মান আর শ্রদ্ধার কথা, তুলে ধরেছেন বাবার প্রতি নিরন্তর আনুগত্যের কথা। পাশাপাশি শিক্ষক, বন্ধু, সহপাঠি; কার সাথে কিভাবে কথা বলতে হবে তাও তুলে ধরতেন তাঁর লেখায়। ব্যাক্তি জীবনে নিজেকে কখনোই অন্যদের মত আরাম-আয়েশে রাখার সুযোগ পান নি। বাবা মারা গেছেন খুব ছোট বয়সে, ঘরে অভাব লেগেই থাকতো সবসময়; কিন্তু তারপরও তিনি পড়বেন, গড়বেন নতুন জীবন। এমন প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে চলেছেন সবসময়। যে কারনে লেটোর দলে গান গেয়ে, মসজিদে মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব পালন করে, মক্তব্যে ওস্তাদজি হিসেবে শিক্ষা দান করে পড়ালেখা-জীবন যাপনের খরচ বহনের চেষ্টা করেছেন। পরে যখন তাতেও আর চলছিলো না, তখন আসানসোল শহরের রুটির দোকানে এসে চাকুরী নেন। দিনে রুটি বানান, রাতে বই পড়েন, সুর করে পূঁথি পড়েন। আসলে নজরুল তুলনাহীন একজন মানুষ, একজন কবি। যার রাজনীতি, যার সাহিত্যনীতি, যার সমাজনীতি, যার উদারনীতি আজো বাংলাদেশে সমাদৃত। আর এ কারনেই তিনি আমাদের মত একটা বীরের জাতির জাতীয় কবি। যাকে বলা যায়, আলোর পথের পথিকৃৎ। ছোটোবেলা থেকেই নজরুল খুব প্রতিভাধর ছিলেন। পাশাপাশি সাহসী, প্রত্যয়ী এবং বিশ্বাসী। যে কারনে জীবনে অনেক কষ্ট করে নিজেকে এত উঁচু পর্যায়ে আনতে পেরেছিলেন। তিনি ১৮৯৯ সালের ২৪ মে ( ১১ জ্যৈষ্ঠ, ১৩০৬ বঙ্গাব্দ) পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম কাজী ফকির আহমদ। মা জায়েদা খাতুন। খুব ছোটবেলায় নজরুলের বাবা-মা মারা যান। তারপর শুরু হয় দারিদ্র্য এবং অন্যসব প্রতিকূলতার সঙ্গে তার লড়াই। ছোটবেলা থেকেই অনেক কষ্ট করতে হয়েছিল বলে নজরুলের ডাকনাম ছিল ‘দুখু মিয়া’। এই দুখু মিয়ার মত হাজারো দুখু মিয়া আমাদের চারপাশে এখনো আছে, কিন্তু তাঁর মত তারা প্রত্যয়ী না। যে কারনে তাদের পরিবর্তন আসে না। পরিবর্তন তখন-ই আসে যখন নিজেকে বিজয়ী করার জন্য নিবেদিত থাকে। আর সেই নিবেদিত থাকার তালিকায় আমাদের নতুনের কবি কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন এক নম্বরে। যে কারনে গ্রামের মক্তব থেকে প্রাথমিক শিা শেষ করেন নজরুল। মাত্র বারো বছর বয়সে যোগ দেন গ্রামের লেটো গানের দলে। গ্রামের মক্তবেও কিছুদিন শিকতা করেন তিনি। তারপর আসানসোলে রুটির দোকানে কাজ নেন। সেখানে এক বাঙালি পুলিশ অফিসারের নজরে পড়ে যান তিনি। সেই অফিসার তাকে ময়মনসিংহের ত্রিশালে নিয়ে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেন। দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় নজরুল প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সেনাবাহিনীর হাবিলদার হিসেবে যোগদান করেন। এখানেই তার প্রাতিষ্ঠানিক শিার সমাপ্তি ঘটে। তিনি কিন্তু এর মধ্যেও তার প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন। সাংবাদিক হিসেবেও দেখিয়েছেন কৃতিত্ব। তার সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে নবযুগ, লাঙ্গল ও ধূমকেতু পত্রিকা। নজরুলের প্রকাশিত প্রথম কবিতা ছিল ‘মুক্তি’। কিন্তু তাকে খ্যাতি এনে দেয় ‘বিদ্রোহী’ নামক কবিতা। এ কবিতার কারণে পরবর্তীতে তিনি বিদ্রোহী কবি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতাটি রচনা করে নজরুল ব্রিটিশ শাসকদের ব্যঙ্গ করেছিলেন। এ কারণে রাষ্ট্রদ্রোহিতার দায়ে তাকে কারাগারে বন্দি করা হয়।

তবুও লেখালেখি ছাড়েননি নজরুল। একের পর এক কালজয়ী সব লেখা সৃষ্টি করেছেন। তিনি লিখেছেন, কারার ঐ লৌহ কপাট/ ভেঙে ফেল কর রে লোপাট শিকল পূঁজার পাষাণ বেদি/ ওরে ও তরুণ ঈষাণ বাজারে বাজারে বিষাণ বাজারে বাজা…
চির বিদ্রোহী মানুষ সবসময় আমাদের দেশের মানুষের মঙ্গলের জন্য নিবেদিত থেকেছেন। যে কারনে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ‘বিদ্রোহী’ কবিতা লিখেছেন। সেখানে তিনি বলেছেন, বিদ্রোহী বল বীর, বল উন্নত মম শির…

অন্যদিকে একটি জাতিকে বীরের জাতি হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে থাকার জন্য লিখেছেন, চল চল চল/ উর্ধ¦ গগণে বাজে মাদল চলরে চলরে চল/ অরুণ প্রাতের তরুণ দল/ চলরে চলরে চল…

অবশ্য সবচেয়ে আনন্দের বিষয় হলো, আমাদের রণ সঙ্গীত-ই হলো এই চলরে চলরে চল। এই রণ সঙ্গীতের মাধ্যমে আমাদের সেনা বাহিনী নিবেদিত হয় আমাদের দেশের জন্য। প্রাণপন লড়ে যায় এই দেশের জন্য। সেই রণ সঙ্গীতের জনক জাতীয় কবির প্রতি তিব্র ভালোবাসা-সম্মান আর শ্রদ্ধার ফুলের ডালা-ফুলের মালা।
তিনি সবসময়-ই পৃথিবী বিজয়ের স্বপ্ন দেখতেন। যখন বৃটিশরা দেশ চালাতো, তখন নজরুল পৃথিবী বিজয়ের স্বপ্নে বিভোর হয়ে লিখতেন, থাকব নাকো বদ্ধ ঘরে/ দেখব এবার জগৎটাকে/ কেমন করে ঘুরছে মানুষ/ যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে…
কেননা, নজরুল জানতেন আমি বিজয় না করতে পারলেও বাঙালি জাতি একদিন ঠিকই বিজয় ছিনিয়ে আনবে ব্রিটিশদের কাছ থেকে, বেনিয়াদের কাছ থেকে অথবা অন্য কোন পরাশক্তির কাছ থেকে। হয়তো একারনেই আমি হব সকাল বেলার পাখি/ সবার আগে কুসুমবাগে উঠব আমি ডাকি/ সূর্যিমামা ওঠার আগে উঠব আমি জেগে/ হয়নি সকাল, ঘুমোও এখন মা বলবেন রেগে… লিখে আমাদের মত নতুনদের মনে নতুন আশার বীজ বুনেছেন। যাতে করে আমরা আমাদের দেশকে রাখি শত্রু মুক্ত।

তিনি শিশু-কিশোরদের জন্য অনেক লিখেছেন। তার লেখা শিশুতোষ কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ঝিঙেফুল, সঞ্চয়ন, পিলে পটকা, ঘুম জাগানো পাখি, ঘুমপাড়ানি মাসিপিসি এবং ছোটদের জন্য নাটকের মধ্যে আছে ‘পুতুলের বিয়ে’সহ অসংখ্য লেখা তিনি লিখেছেন নতুনের ঘুম ভাঙানের লক্ষ্যে, সাহসের পক্ষে।

যাইহোক, কষ্ট করতে করতে কান্ত কবি কাজী নজরুল ইসলাম কারাগারে থাকা অবস্থায় ১৯৪২ সালে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং বাকশক্তি হারান। পরে চির বিদ্রোহী এই কবিকে বাংলাদেশ সরকার দেশে এনে জাতীয় কবির সম্মান প্রদান করে। এরপর বাংলাদেশে থাকা অবস্থায় ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট তিনি চিরদিনের জন্য পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। কিন্তু রেখেন নিরন্তর সব সম্পদ; যা কালে কালান্তরে নতুনদেরকে জাগিয়ে তুলবে বাংলাদেশকে ভালোবাসার জন্য, বিজয়ী করার জন্য। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর-ই লেখা গান, ‘মসজিদের-ই পাশে আমায় কবর দিও ভাই/ যেন সেথায় থেকে মুয়াজ্জিনের আজান শুনতে পাই’ কথাকে গুরুত্ব দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে তাকে সমাহিত করা হয়। তিনি এখনো আজান শুনছেন, আর অপেক্ষা করছেন সেই বিজয়ের, যে বিজয় তিনি আনতে না পারলেও বাঙালি জাতি আনবেই। সেই চির বিজয়ীর জন্য নিবেদিন করছি আমাদের পঙতিমালা, বিদ্রোহী হয়ে বিদ্রোহ করে দেখালেন যেই পথ/ সেখানে নতুন আলো/ আপনার মত তৈরি আমরা সরাতে আঁধার কালো/ নজরুল প্রিয় ঝিঙেফুল প্রিয় প্রিয় আপনার সুর/ আপনার পথে হেঁটে যেতে যেতে যাবোই বহুদূর/ আনবো বিজয় আপনার সেই স্বপ্ন পুরন করে/ সাজানো থাকবে বাংলাদেশে সম্মান থরে থরে…

মোমিন মেহেদী : কলামিস্ট ও আহবায়ক, নতুনধারা বাংলাদেশ


শেষ গোঁ-টা ত্যাগ করুন, দেশের জন্য ভাল নিজের জন্যও ভাল

সাঈদ তারেক নির্বাচন হবে কিনা হলে কি ধরনের হবে না হলে কি হবে এসব নিয়ে…


নজরুলের রাজনীতি এবং বিদ্রোহ

মোমিন মেহেদী মাগো! আমায় বলতে পারিস/ কোথায় ছিলাম আমি/ কোন-না জানা দেশ থেকে তোর কোলে…


দেশ বাঁচলে তবেই আপনারা বাঁচবেন

বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম দেখতে দেখতে ২১ দিন হয়ে গেল। কত মানুষের কত কথা, রাস্তায়…