ভেরি ব্যাড পলিটিক্স..!



দৃশ্য ১. জাহিয়া রহমান ও জাফিয়া রহমানের খুব মন খারাপ। মালয়েশিয়ায় বিএনপির মতো কোনও দল নেই কেন? তাদের দাদীর মতো কোনও নেত্রী নেই কেন? থাকলে তাদের এত তাড়াতাড়ি মালয়েশিয়ায় ফিরে যেতে হতো না। দাদীর সাথে দাদীর অফিসে থাকতে পারত। এখানে কত থ্রিল। দাদীর অফিসের চারপাশে পুলিশ, গোয়েন্দা, সাংবাদিক গিজগিজ করে। মধ্যরাতে হঠাৎ ইলেকট্রিসিটি চলে যায়। মোমবাতি জ্বালিয়ে রাত পার করতে হয়। তারা অত রাজনীতি বোঝে না। তাদের কাছে পিকনিক পিকনিক লাগে। কিন্তু এখন বাবাকে হারানোর ব্যথা কাটানোর আগেই তাদের মালয়েশিয়া গিয়ে বসতে হবে পরীক্ষায়। কোনও মানে হয়!

দৃশ্য ২. অনিন্দ্য রহমান আর জাকিয়া আহমেদেরও মন খুব খারাপ। সারাবছর প্রস্তুতি নিয়েছে এসএসসি পরীক্ষার জন্য। পরীক্ষা নিয়ে মায়েদের যত মাথাব্যথা, তাদের ততটা নয়। পরীক্ষা নিয়ে তাদের টেনশন আছে। তবে তাদের প্রতীক্ষা পরীক্ষা শেষ হওয়া নিয়ে। পরীক্ষা শেষে কী কী করবে, কোথায় কোথায় যাবে, তার লম্বা তালিকা তৈরি। এসএসসি পরীক্ষা শেষ মানেই বড় হয়ে যাওয়ার লাইসেন্স। শুধু জাহিয়া, জাফিয়া, অনিন্দ্য আর জাকিয়া নয়; আসলে গোটা বাংলাদেশেরই মন খারাপ। সকালে ঘুম ভাঙে পেট্রোল বোমায় ৭ জনের পুড়ে অঙ্গার হওয়ার খবর দিয়ে। বাংলাদেশ ঘুমোতে যায় টানা হরতালের ঘোষণা নিয়ে। দেখা হলেই একজন আরেকজনকে জিজ্ঞাসা করেন, ভাই এর শেষ কোথায়? কী হচ্ছে, কোথায় যাচ্ছে দেশ? কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তর কেউ জানে না। দেশটা যেন মগের মুল্লুক হয়ে যাচ্ছে। কে যে কী করছে বোঝা যাচ্ছে না। টানা অবরোধের বিশ্ব রেকর্ডের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। মৃত্যুর তালিকায় প্রতিদিনই যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন নাম। বিরোধী দল দাবি করছে, তারা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করছে। তাহলে বোমাগুলো মারছে কে? পত্রিকায় লেখা হয়, দুর্বৃত্তরা বোমা মারছে। এই দুর্বৃত্ত কারা?
বেগম খালেদা জিয়া ৩ জানুয়ারি রাত থেকে তার গুলশান অফিসে থাকছেন। বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সরকার তাকে অবরুদ্ধ করে রেখেছে। তবে সরকার বলছে, বেগম জিয়াকে অবরুদ্ধ করা হয়নি। তিনি নাটক করছেন। তবে বাস্তবে বিএনপির দাবিই সত্য বলে মনে হয়েছে। পুলিশ ইটের ট্রাক, বালুর ট্রাক দিয়ে পথরোধ, গেটে তালা দিয়ে সরকারের দাবি মিথ্যা আর বিএনপির দাবিকে সত্য প্রমাণ করেছে। কিন্তু সত্যি সত্যি যখন সরকার সব ধরনের অবরোধ তুলে নিলো, তখনও বেগম জিয়া অফিসেই রয়ে গেছেন। জানা গেছে, বেগম খালেদা জিয়া অফিস থেকে বেরুলেই তার অফিসটি সিলগালা করে দিতে পারে সরকার। গত ৩ জানুয়ারি রাত থেকে নয়াপল্টন অফিস সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে। তাই এই অফিসটি রক্ষায় বেপরোয়া বেগম জিয়া। কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক দেশে একটি গণতান্ত্রিক দলের অফিস কেন সিলগালা করে রাখা হবে? বেগম জিয়াকে গুলশানের অফিস থেকে বের করার জন্য সরকার নানা কায়দা কৌশল করছে। শ্রমিক, দিনমজুর, শিক্ষার্থীরা যাচ্ছে বেগম জিয়ার অফিস ঘেরাও করতে। তবে সবচেয়ে খারাপ কৌশলটা করেছেন নৌ পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান। গত শুক্রবার বিকেলে এক সমাবেশে তিনি ঘোষণা করেন, বেগম জিয়ার অফিসের পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হবে। এমনকি বেগম জিয়ার খাবারের সরবরাহও কেড়ে নেয়ার ঘোষণা দেন তিনি। যাতে বেগম জিয়া গুলশান অফিসে না খেয়ে মরে পড়ে থাকেন।

মন্ত্রিসভার একজন সিনিয়র সদস্য, একজন আইন প্রণেতা এমন বেআইনী কথা বলতে পারেন, এটা আমার বিশ্বাস হয়নি। তারপরও আমি নিজেকে সান্ত্বনা দিয়েছি, রাজনীতিবিদদদের মেঠো বক্তৃতা হিসেবে। কিন্তু আমার বিস্ময়ের সীমা অতিক্রম করে শাজাহান খানের ঘোষণার ১২ ঘণ্টার মধ্যে বেগম জিয়ার অফিসের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। পরদিন বিচ্ছিন্ন করা হয়, ক্যাবল টিভি ও ব্রডব্যান্ড সংযোগ। ১৯ ঘণ্টা পর বিদ্যুৎ সংযোগ ফিরিয়ে দেওয়া হলেও এখনও ক্যাবল টিভি আর ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট নেই। অফিসের লোকজনের সময় কাটে বিটিভি দেখে। এটা কম শাস্তি নয়। কিন্তু মজাটা হলো বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার বিষয়টি নিয়ে ধূম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে। মন্ত্রীর ঘোষণার ১২ ঘণ্টার মধ্যে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হলেও শাজাহান খান বলছেন, সরকার এটা করেনি, বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছেন। গুলশান থানা বলছে, তারা এ ব্যাপারে কিছু জানেন না। ডেসকোর চেয়ারম্যান বলছেন, তিনি কিছু জানেন না। এমনকি বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, তিনিও কিছু জানেন না। কী আশ্চর্য! সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বাসার বিদ্যুৎ সংযোগ কেটে দেওয়া হবে, আর কেউ কিছু জানবেন না, এটা কিভাবে সম্ভব। সরকার তাহলে কে চালাচ্ছে? শাজাহান খানের কথা যদি সত্য হয়, যদি সবার অজান্তে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরাই বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে থাকে, তাহলে সেই বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের বিরুদ্ধে তো আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। আর যারা বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছে, তারা মধ্যরাতে এলেও গোপনে আসেনি। রীতিমত টিভিতে সাক্ষাতকার দিয়েছে তারা। বেগম জিয়ার অফিসের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা সম্পর্কে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু বলেছেন, ‘এ বিষয়ে কিছুই জানি না। ইটস এ ব্যাড পলিটিক্স। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা রাজনীতির অংশ হতে পারে না।’ মাননীয় প্রতিমন্ত্রী ঠিক বলেছেন, দেশে যা চলছে, তা নিছক ‘ব্যাড পলিটিক্স’ নয়, ‘ভেরি ব্যাড পলিটিক্স’। আমরা দিন গুনছি উজ্জ্বল বাংলাদেশের, গুড পলিটিক্সের।
লেখক: সাংবাদিক ও অ্যাসোসিয়েট হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ।
ইমেইল: Probhash2000@gmail.com

(* প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রকাশিত লেখার জন্য দশদিক কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।)

পাতাটি ২৭৩৩ বার প্রদর্শিত হয়েছে।


জাতীয় নেতৃত্বের কাছ থেকে চাই রাজনৈতিক প্রজ্ঞা

এমাজউদ্দিন আহমেদ:: বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী দিল্লি গিয়েছিলেন বাংলাদেশ-ভারত যৌথ পরামর্শ কমিশন বা…


ভেরি ব্যাড পলিটিক্স..!

দৃশ্য ১. জাহিয়া রহমান ও জাফিয়া রহমানের খুব মন খারাপ। মালয়েশিয়ায় বিএনপির মতো কোনও দল…


জাপানের বৃদ্ধাশ্রম

আশির আহমেদ: পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশিদিন বাঁচে কোন দেশের মানুষ? আবার জিগায়। জাপান। মহিলাদের গড়ায়ু ৮৭…


রমযান মানেই ফ্রি ইনকাম

মুফতি হাবীব আহমাদ খান:: “কম পুঁজিতে বেশি লাভ” এ চাহিদাটি কোন্ মানুষের না আছে? সবাই…


জঙ্গিবাদ দমনে প্রয়োজন সামাজিক প্রতিরোধ

ড. মীজানুর রহমান বর্তমানে আমরা যাকে জঙ্গিবাদ বলছি, মূলত তা হলো ধর্মীয় উগ্রপন্থা। এই জঙ্গিবাদের…