রবীর উপর বাউলের প্রভাব



রবীর উপর বাউলের প্রভাব

কবীর হুমায়ুন

বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বলতম জ্যোতিষ্ক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। একজন মানুষের জীবন ও কর্ম-পরিধির আলোকে বাঙালী সংস্কৃতির সর্বোচ্চ ও সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত। তাঁর ভেতর সর্বাধিক পরিমানে প্রকাশ ঘটেছে বাঙালীর সৌন্দর্যবোধ ও মননশীলতার উপাদানসমূহ। রবীন্দ্রনাথ নিজেই রবির ন্যায় উজ্জ্বলতম। তাঁকে বাংলা ভাষা-ভাষীদের মাঝে পরিচয় করে দেয়ার প্রচেষ্টা মূর্খতা বা দৃষ্টতার সামীল। তবুও তাঁর পরিচয় তুলে ধরতে গিয়ে সবকিছু ছাপিয়ে একটি বিশেষভাবে উল্লেখ্য বিশেষণকেই আমরা বেশি ব্যবহার করি ‘কবিগুরুর’। কবিগুরুও জন্ম ১৮৬১ খ্রীষ্টাব্দে আর মৃত্যু ১৯৪১ এ। এই প্রায় আশি বছরের জীবনের সময়কালে বাংলাদেশ, বাঙ্গালী সমাজ, বাংলা সাহিত্য তাঁর অবদানে এতো ব্যাপকতম বিস্তৃত; তা পরিমাপের কোন মাপকাঠি অদ্যাবধি কোন বাঙ্গালী লেখক, সাহিত্যিক, কবি, সমালোচক, বা বাংলা সাহিত্যে বিজ্ঞজনেরা উদ্ভাবন করতে সক্ষম হননি। বাংলা সহিত্যের এমন কোন ক্ষেত্র নেই-কবিতা, গল্প, উপন্যাস, গান ইত্যাদি যেখানে করিগুরু রবীন্দ্রনাথের সফল পদচারনা পরিলক্ষিত হয় না। গুনগত ও পরিমানগত উভয়দিকে তিনি অপ্রতিদ্বন্ধী ও অনতিক্রম্য। বাংলা সাহিত্যের সূচনা লগ্ন হতে আজ পর্যন্ত কেহই তাঁর কর্ম পরিধিকে স্পর্শ করতে পারেনি। রবীন্দ্রনাত্তের কবি সাহিত্যিকবৃন্দ কমবেশি সকলেই রবীন্দ্রনাথের আলোকচ্ছটায় প্রভাবিত। বাংলা সাহিত্যকে তিনি বিশ্ব সাহিত্যের মর্যাদা এনে দিয়েছেন।
বৈশ্বিক সমাজে বাংলা ভাষাকে স্বকীয় প্রভায় উচ্চাসনে আসীন করেছেন ‘গীতাঞ্জলি’ এর নোবেল প্রপ্তির মাধ্যমে। এর পূর্বে বাংলা ভাষার রচনা-সেই চর্যাপদ হতে রবীন্দ্র-পূর্ব সাহিত্য, বাংলা ভাষার চিন্তা-চেতনার প্রকাশ যতই বলিষ্ঠ ও সমৃদ্ধশালী হোক না কেনো, বিশ্ব সাহিত্যাঙ্গনে বাংলা ভাষা ও বাঙালীদের স্বকীয় মর্যাদায় পরিচিত পায় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্য কর্মে, চিন্তা-চেতনায়, নিজস্বতায় বৈশ্বিক পরিমন্ডলে অনন্য হয়ে। পরবর্তীতে বাংলা ও বাংলা সাহিত্য আরও বিশ্বজনীন হয়ে উঠে। বিশেষ করে যাকে মাতৃভাষা রূপে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য রক্ত বিনিময় মূল্য দিতে কার্পণ্য করেননি এ ভাষাভাষীর যুবাপ্রাণ। তাই বর্তমানে বাংলা ভাষাকেই কেন্দ্র করে উদ্যাপিত হয় – ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’। গীতাঞ্জলি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি অনন্য রচনা। যার প্রকাশ রবীন্দ্রনাথকে এনে দিয়েছে ১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির সম্মান ও মর্যাদা। বাংলা সাহ্যিত্যকে এনে দিয়েছে বিশ্ব সমাজে আলাদা ভাবে পরিচিতি। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে যে একটি সম্বৃদ্ধি ও বলিষ্ঠ তা প্রতিভাত করে তুলেছে বিশ্ব সাহিত্য সংস্কৃতি পরিমন্ডলে। এই গীতাঞ্জলি কাব্যেও অন্তর্গত অধিকাংশ রচনাই গান। এই সকল গান বা গীতগুলোর সাথে অনেকটা সাযুস্য খুঁজে পাই বাংলার বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ এর রচনার সাথে। খুব গভীর ভাবে পর্যবেক্ষন করলে মনে হয় গ্রাম্য শব্দ বিন্যাসের ভাবধারা ও চেতনাগুলো পরিশীলিত ভাষায় পরিমার্জিত রূপে প্রকাশিত হয়েছে গীতাঞ্জলিতে।
ফকির লালন শাহ স্বয়ং মহা ভাব সমুদ্র। তিনি মাতৃযোনি সম্ভূত সাধারণ মানব সন্তান হলেও একটি আদর্শিক ভাবধারা নিয়ে দার্শনিকতার জগতে আতœমুক্তির একটি পন্থায় জীবন পরিচালনার মহামন্ত্র প্রচার করে গিয়েছেন। তখনকার ধর্ম ভিত্তিক খন্ড-বিখন্ড সমাজ ব্যবস্থাকে ঐক্যসূত্রে বাঁধার পরিকল্পনার মহা প্রয়াস নিয়ে লালন শাহ সমাজে তৈরী করেছেন একটি ভাবদর্শন। যাকে লালন দর্শন বা বাউল-দর্শন অভিধায় আক্ষায়িত করা হয়ে থাকে। লালন শাহের বাণী বা কালামের (লালন শাহের গানের কলিকে লালন ভাবাদর্শে আদর্শিত বা লালন ভক্তগন ‘কালাম’ বলে অভিহিত করে থাকেন। তাই আমিও এ লেখার অনেক স্থানে সেইভাবে উল্লেখ করেছি।) লালন গীতির কোন লিখিত রূপ লালন সাঁইয়ের স্বহস্তে না থাকার কারণে তাঁর ভাব শিষ্যদের কন্ঠে বা খাতায় মূল ভাবাদর্শেও রূপখানি অনেকাংশে বিকৃত হয়ে গিয়েছে। এমনকি তাঁর দেহান্তরের পরে বহু সংগ্রাহক সংকলকগনও সংশোধনের নামে যথেচ্ছা বিকৃত ঘটিয়েছে। তথাপি লালন প্রেমিক বা লালান ভাবাদর্শে বিশ্বাসীগণ লালনের কালামকে অর্থাৎ লালন সঙ্গীতকে- তাঁর দর্শনকে বা লালনের স্বকীয় প্রভাময় ভাবাদর্শকে বাংলা সাহিত্য ভান্ডারে ধরে রাখার অনেক চেষ্টা ও কষ্ট করেছেন। বহু ত্যাগ-তিতীক্ষা ও শ্রম ও সময় ব্যয় বরেছেন। তাঁরা সংখ্যায় অনেক। সেই ফকির লালন শাহের জীবনকাল থেকে শুরু করে আজ অবধি সেই সকল জ্ঞানী অনুসন্ধিৎসু ব্যক্তিগণ কর্ম প্রয়াস চালিয়ে আসছেন। ঐ সকল জ্ঞানী অনুসন্ধিৎসু সংগ্রাহক ও সংকলকদের মধ্যে আমরা পরম শ্রদ্ধাসাথে একজনকে বিশেষভাবে স্মরণ করতে পারি। তিনি হলেন মহৎ প্রাণ করিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। যিনি মহারাজ ফকির লালন শাহের প্রতি প্রচন্ড ভালোবাসা আর গুরু ভাবজ্ঞানে লালন সঙ্গীতের সংগ্রহক ও সংকলক রূপে নিঃসন্দেহে এর গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেছেন।
ফকির লালন শাহের জন্ম, সম্প্রদায় পরিচয় নিয়ে লালন গবেষকদের মাঝে ব্যাপক মতবিরোধী বিতর্ক, এমনকি পরস্পর বিরোধী অমীমাংসিত এক জটিলতর বিবিধ এখনো চলে আসছে। কিন্তু লালন শাহের জন্ম বা জাতের কোন পদবী যোগ করেননি। তাঁর নামের আগে বা পিছে। মানুষ ও মানুষের আতœা পরমাতœার কাছে জাত-পরিচয় তাঁর কাছে ছিল অতীব গৌণ। তাঁর ভাষা,-
‘সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে।
লালন কয় জাতের কী রূপ,
দেখলাম না এই নজরে।’
অথবা
‘সবে বলে লালন ফকির হিন্দু কি যবন।
লালন বলে আমার আমি
না জানি সন্ধান।’
লালন সাঁই সব সময় বিলীন থাকতেন পরমাতœার মাঝে। আর সেই অসীম পরম আতœার মাঝেই খুঁজে বেরিয়েছেন মানবসত্ত্বার মানুষকে। মানবতাই তাঁর নিকট ছিল বিশেষ গুরুত্ববহ। তাই তিনি সহজেই বলতে পারতেন প্রচলিত ধর্ম মানুষের মাঝে বিরোধের সৃষ্ঠি করে। পরমাতœার সাথে মানুষের একাতœ হওয়ার ধর্মই মানবতা ধর্ম। যা মানবাতœার দিব্যজ্ঞানের পরিচায়ক। তাঁর ভাষায়-
‘ডানে বেদ, বামে কোরান,
মাঝখানে ফকিরের বয়ান,
যার হবে সেই দিব্যজ্ঞান
সেহি দেখতে পায়।
আর এই বাণীর দ্যোতনা খুঁজে পাই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখায়। তিনি সীমাবদ্ধতার ভেতর খুঁজেছেন অসীমের আলোক রশ্নি। অন্য এক ধরনের ভাব দর্শনে আলিঙ্গন করতে চেয়েছেন অসীমত্বের মাঝে অস্তিত্বের সন্ধান। বিশালতের মাঝে খুঁজে ফিরেছেন স্বীয় আতœার অস্তিত্ব। পরমের মাঝে বিলীন হওয়ার আনন্দ রাশি। তাই তিনি লেখনীর তুলিতে ছাপিয়ে তোলেন সেই আকাঙ্খার সুর ও ছন্দ
‘সীমার মাঝে, অসীম, তুমি
বাজাও আপন সুর।
আমার মধ্যে তোমার প্রকাশ
তাই এত মধুর।
কত বর্ণে কত গন্ধে
কত গানে কত ছন্দে,
অরূপ, তোমার রূপের লীলায়
জাগে হৃদয়পর।’
কালজয়ী মহা পুরুষ ক্ষণজন্মা বাউল ফকির লালন শাহকে স্থান-কাল সীমানায় আবব্দ করে তাঁর কর্মপ্রয়াসের চেতনার ভাবগাস্তীর্যের ও দার্শনিকতার রসবোধ আস্বাদন করার চেষ্টা চরম মূর্খতার সামীল। তিনি স্থান-কাল উর্ত্তীর্ণ মহা সত্যময় এক দর্শনের উদ্গতা। লালন শাহের প্রয়ান ১৮৯০ খ্রীস্টাব্দে হলেও তাঁর জন্ম ১৭৭৫-১৭৭৭ সালে। শতাধিক বছরের জীবন ধারার পথ পরিক্রমায় উখিত লালনাদর্শের ভাবধারায় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজে বিপুল ভাবে প্রভাবিত হয়েছেন।
অনন্ত কালচক্রের নানা পর্বে লোকাস্তরের মহাপুরুষগণ ধীর-স্থিরতা, ভারসাম্য ও শান্তি পূণঃ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে এ জগতে জন্ম গ্রহন করেন। সেই সকল মহা মানবগণ তাঁর চেয়ে অধিকতর শান্তিধর, গুণধর বা প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিত্বের কাছে নিজেকে সমর্পন করে থকেন। আর, এই আতœ সমর্পন নীচতা নয়; হীনতা নয়। এ হলো শক্তির উন্মষ। সেই শক্তি হলো ভক্তির শক্তি। শক্তিহীন অবস্থায় যেমন শক্তিমানকে স্পর্শ করা যায় না; ক্ষুদ্রতা দিয়ে যেমন বৃহৎকে বুঝা যায়না; পরম সত্যকে তেমনি খন্ডিত বিচারবুদ্ধি বা সংকীর্ণতা দিয়ে অনুধাবন করা যায় না। এমনটিই ঘটেছে ফকিররাজ লালান শাহের মূল্যায়ন প্রচেষ্টায়। তাই হয়তো বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্বয়ং লালন দর্শনের শক্তির মূল্যায়ন সর্বপ্রথম অগ্রনী ভূমিকা পালন করেছেন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যথাসাধ্য পরিমার্জনা করে ফকির লালন শাহের কুড়িটি গান সংগ্রহ বলে সর্বপ্রথম ‘প্রবাসী পত্রিকায় ১৯০৫ সালে (১৩১২ সালেরে আশ্বিন সংখ্যায়) “হারামনি” বিভাগে প্রকাশ করেছিল। অর্থাৎ কবিগুরুর চিন্তা- চেতনায় বাউল লালন শাহের সঙ্গীত সম্পদ ছিল অমূল্য সম্পদ। তাই “হারামনি” শিরোনামে স্থান পেয়েছিলো লালনগীতি। আর তখন থেকেই কোলকাতা কেন্দ্রিক শহরে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর একাংশ ‘গ্রাম্য’ ‘অশিক্ষিত’ এ বাংলাদেশে-বাংলা ভাষার লালন দর্শন নামে অদ্বিতীয় অবিসরনীয় একটি দর্শন আছে, যা সাধারন মানুষের চেতনায় মননে আলোড়ন সৃষ্টি করে চলছে, তা অবগতি হলেন। লালন সঙ্গীতের দার্শনিক ও নান্দনিক প্রভাব যেমন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে প্রচন্ডভাবে আলোড়িত করে তুলেছিলো-তেমনি শহওে শিক্ষিত সমাজকে নাড়া নিয়ে গেলো। শুধুমাত্র কোলকাতা কেন্দ্রিক শিক্ষিত সমাজ নয়; লালন দর্শনের আধ্যাতিœকতা, ভাবগাম্ভীর্য ও মাহাত্তের গুঢ়তায় বিমোহত হয়েছিল সকল শিক্ষিত ও জ্ঞানী সমাজ। ক্রমে ক্রমে তা বিশ্বজনীনতায় বিস্তৃতি লাভ করেছে। লালন দর্শন ভারত-বাংলাদেশের গন্ডি ছেড়ে জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জার্মানী, স্পেন, সুইডেন, সুইজারল্যান্ডসহ বিশ্বের অনেক দেশেই লালন দর্শনের গঠন পাঠন ও চর্চা চলতে শুরু হরে।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের নিজের ভাষায়- ‘আমার লেখা যারা পড়েছেন, তাঁরা জানেন বাউল পদাবলীর প্রতি আমার অনুরাগ আমি অনেক লেখায় প্রকাশ করেছি। শিলাইদহে যখন ছিলাম, বাউল দলের সঙ্গে আমার সর্বদাই লেখা সাক্ষাৎ ও আলাপ-আলোচনা হতো। আমার অনেক গনে আমি বহু সুর গ্রহন করেছি এবং অনেক গানে অণ্য রাগরগিনীর সাথে আমার জ্ঞান বা অজ্ঞাতসারে বাউল সুরের মিল ঘটেছে। এর থেকে বোঝা যাবে, বাউলের সুর ও বাণী কোন এক সময় আমার মনের মধ্যে সহজ হয়ে মিশে গেছে। আমার মনে আছে, তখন আমার নবীন বয়স-শিলাইদ (কুষ্টিয়া) অঞ্চলের এক বাউল একতারা হাতে বাজিয়ে গেয়েছিল-
‘কোথায় পাবো তাঁরে-আমার মনের মানুষ যেঁরে।
হারায়ে সেই মানুষে-তাঁর উদ্দেশ্যে
দেশ-বিদেশে বেড়াই ঘুরে॥’
(এই গানটি গেয়েছিল-ফকির লালন শাহের ভাবশিষ্য গগন হরকরা। যার আসল নাম বাউল গগনচন্দ্র দাস। বাউলগণ পরমেশ্বরকে নারী-জ্ঞানে ভালোবেসে, শ্রদ্ধায়, ভক্তি-প্রেমে অন্তরে তাঁর সান্যিধ্য প্রাপ্তির লাভের আশায় হৃদয়ের সমস্ত চেতনা, আবেগ মস্থিত সুরাশ্রয়ে বিমোহিত হয়ে আকুলিত প্রাণে সুর তুলে থাকেন।)
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিজের ভাষায় ঐ বাউলের গানের কথা ও সুরের মাধুর্য আমাকে এতোই বিমোহিত করেছিলো যে, আমি সেই সুর ও ছন্দে বাংলাদেশকে মাতৃরূপ জ্ঞানে লিখেছি-
‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি,
চিরদিন তোমার আকাশ, তোমার বাতাস
আমার প্রাণে বাঁজায় বাঁশি॥;
যা বর্তমানে রক্তস্নাত স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় জাতীয় সঙ্গীত। রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশকে মাতৃ-জ্ঞানে ভালোবেসে, শ্রদ্ধায় ভক্তি-প্রেমে, অন্তরে সমস্ত চেতনায় লালন শাহের সুর ও ছন্দে রচনা করেছিলেন ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি’। অর্থাৎ, আমাদের রক্তের ঝর্ণাধারার বিনিময় অর্জিত জাতীয় সঙ্গীত ভাষা ও শব্দ বিন্যাসে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ দৃশ্যমান হলেও; সুর ও ছন্দে এবং প্রেরণার উৎস হিসেবে বাউল সম্রাট লালন শাহের অবদানকে ছোট করে দেখার অবকাশ নেই।
কুষ্টিয়ার বিশেষভাবে শিলাইদহে কবিগুরু বাউলের সাথে সাধুসঙ্গ করেছিলেন বলে তিনি যে উল্লেখ করেছেন তা মূলতঃ ফকির লালন এবং তাঁর ভাবদর্শনের অনুসারীদেরকেই বুঝিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হৃদয় থেকে ফকির লালন শাহকে গুরুরূপে গ্রহণ করেছিলেন। যা তাঁর সাহিত্য দর্শনে স্পষ্ট। বিপুল এ বিশ্বে ঈশ্বরের অবস্থানই মানুষের অস্তিত্ব। পরমেশ্বরই মানুষকে কৃষ্ণগহ্বর হতে দেখিয়েছেন আলোকের পথ। অদৃশ্য শক্তির প্রতি বিশ্বাসের মূলমন্ত্রই ফকির লালন শাহের ধর্ম দর্শন। আর তাঁ ধর্ম দর্শন অভিব্যক্ত হয়েছে অবিনাশী পদাবলীর সঙ্গীতের ফল্গুধারায়, স্বর্গীয় ব্যঞ্জনায়। লালন সাধক। তিনি একজন তত্ত্বজ্ঞা মহাকবি। আর তত্ত্ব সাহিত্যের সবচেয়ে বড় কথা আতœতত্ত্ব। এ দর্শনই লালন সাহিত্যের প্রাণ। সঙ্গীতের জন্ম বা উদ্ভব হয়েছে ধ্যান সাধনা থেকে। আতœদ্রষ্টা মহাপুরুষগণই সঙ্গীতের আদি জনক। ভারতীয় দর্শন, ঈশ্বরের চেতনা রবীন্দ্রনাথ তুলে এনেছিলেন শ্রীমদভগবদগীতা হতে। যা বিস্তৃত হয়েছে গানের সুর ও ছন্দে ‘গীতাঞ্জলি’তে। আর এ গীতাঞ্জলির প্রতি ছন্দে ছন্দে খঁজে পাওয়া যায় ফকির লালন শাহের সঙ্গীতের বা লালন দর্শনের মূল ভাবাদর্শের পরশ। রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলির গীতধারায় যদি আমারা আধ্যাতিœকতার চেতনায় নিবিষ্টতায় রসাস্বাদন করি ত’হলে আমরা দেখবো যে লালনের দর্শনের বা লালন কালামের পরিশীলিত রচনার ধারাবাহিকতা।
লালনের কালামে বিনয় ও মানবীয় আমিত্ব শূন্যতার এক কৌশল মাত্র। গুরুর চরণে নিজেকে অধম ও গুরুত্বহীনভাবে তুলে ধরে গুরুকে সর্বোত্তমরূপে প্রকাশ করার এক কৌশল সাঁইজী তুলে ধরেছেন তাঁর সুরে ও কালামে। পরম আতœাকে কল্পনা করেছেন গুরুর ভনিতায়। সেই কথাই যেন আমরা শুনতে পাই কবিগুরু রবী ঠাকুরের কন্ঠে-
‘তুমি কেমন করে গান কর যে, গুণী,
অবাক হয়ে শুনি কেবল শুনি।
সুরের আলো ভূবন ফেলে ছেয়ে,
সুরের হাওয়া চলে গগন বেয়ে,
পাষাণ টুটে ব্যাকুল বেগে ধেয়ে
বহিয়া যায় সুরের সুরধুনী।’
রবিন্দ্রনাথ অরূপের (নিরাকার) অপরূপ রূপে অবগাহনের নিমিত্তে অতল রূপ সাগরে ডুব দিয়েছেন অরূপ রতন (অমূল্য রতন) আশা করি, তাঁর ভাষায়-
‘রূপসাগরে ডুব দিয়েছি
অরূপ রতন আশা করি;
ঘাটে ঘাটে ঘুরব না আর
তাসিয়ে আমার জীর্ণ তরী।
সময় যেন হয় রে এবার
ঢেউ-খাওয়া সব চুকিয়ে দেবার
সুাধায় এবার তলিয়ে গিয়ে
অমর হয়ে রব মরি।’
আর লালনের দার্শনিকতায় প্রবাহমান গুনরাজির অসীমান্তিক মহা ভাব-সাগরে সাঁতার কেটে জানিনা কতুটুকু ছুতে পারবে অমূল্য সেই নিধি। তিনি দয়াল, এই ভরসায় বাঞ্ছা করি তাঁর মহানাম কীর্তনের এ মহাসত্যই লালন দর্শনের আদিপাঠ। লালনের কালামে ফুটে উঠেছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রূপ সাগরে ডুব দিয়ে অরূপ রতন পাওয়ার আকাঙ্খার অনেক পূর্বেই। লালন তাঁর একতারার তারে সুরে ও ছন্দে গেয়ে গেছেন।
‘রূপের তুলনা রূপে।
ফণি মণি সৌদামিনী
কী আর তাঁর কাছে শোভে॥
যে দেখেছে সেই অটল রূপ
বাক্ নাহি তার, মেরেছে চুপ।
পার হলো সে এ ভবকুপ
রূপের মালা হৃদয়ে জপে॥
এই রূপের তুলনা মানবসত্ত্বায় নিহিত বস্তমোহমুক্ত নিষ্কামী মহা মানবের স্বরূপ। যে মহা মানব সম্যক গুরুদেবের কাছে সম্পূর্ণ আতœ-সমর্পিত চিত্তে কঠিন ধ্যানব্রত অবস্থায় শিক্ষা গ্রহন করেন। যেখানে অরূপে (অস্তিত্বহীনতায়) খুঁজে ফেরে রূপের সন্ধান। যেখানে নিজেকে জানা এর জন্য পরিপূর্ন আতœদর্শনে ব্যাপক থাকে। লালন তাঁর তত্ত্ব সহিত্য নতুন কিছুই বলেননি। যুগে যুগে মহা পুরুষ, অবতার, পয়গম্বর বা ঈশ্বরের প্রিয় ব্যক্তিগণ যা বলেছেন, সেই সকল বাণীই তার সুরধ্বনীতে মুখরিত হয়ে উঠেছে। আমিত্বের উৎসর্গ সাধন করা- এ ধারায় আপন মনের জাগতিক লোভ লালসাময় কঠিন আসক্তির বন্ধন ছিন্ন পরিশুদ্ধ স্বাত্ত্বিকতা অর্জনের নিমিত্তে আতœ দর্শনের শিক্ষাদান করাই লালন দর্শনের সারকথা। অর্থাৎ, সক্রেটিসের দর্শনে- কহড়ি ঞযুংবষভ নিজেকে জান। সিদ্ধার্থ গৌতমের বার্ণ- ‘আতœনং বিদ্ধি’- আপনাকে জ্ঞানী করে তোল। সনাতন ধর্মালম্বীদের (হিন্দু ধর্মমতে) চেতনায় যাকে বলে, ‘নিঃশ্রেয়স’- আতœার বিশুদ্ধ উন্নতির মাধশ্যে মোক্ষ লাভ করন। আর ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম- তাঁহার উপর শান্তি বর্ষিত হউক) আর বাণী-‘মান আরাফা নাফসাহুম ফাকাদ আরাফা রাব্বাহু।’-যে নিজেকে চিনেছে বা নিজেকে ধ্যান করেছে, সে পরমাতœা বা ঈশ্বরকে চিনেছে। সেই কথাই ফকির লালন চেতনায় বেজে উঠেছে হাজার কথায়, বিবিধ সুরে। অর্থাৎ, পৃথিবীর সকল ধর্মের উৎস চেতনা পরিশুদ্ধ আতœার অনুসন্ধান করা। যার মাধ্যমে পরমাতœার সান্নিধ্য লাভের প্রচেষ্টায় ব্রতী হওয়া। তাই লালন ফকির দ্বিধাহীন চিত্তে প্রকাশ করেছেন-
‘যার আপন খবর আপনার হয় না।
একবার আপনারে চিনতে পারলেরে
যাবে অচেনারে চেনা ॥
আতœারূপে কর্তা হরি,
নিষ্ঠা হলে মিলবে তাঁরই ঠিকানা।
ঘুরে বেড়াও দিল্লি লাহোর
কোলের ঘোর তো যায় না ॥
ধর্ম তত্ত্বে পরমাতœা বা ঈশ্বরকে অনুসন্ধানের জন্য বৈরাগ্য সাধন প্রক্রিয়ার বনে-জঙ্গলে, পাহার-পর্বতে, অথবা মক্কা-মদিনাতে যাওয়ার তাগিত অনুভব করেনি লালন শাহ; তেমনি তাঁর ভাবশিষ্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও লালন দর্শনের মতোই ঈশ্বরের মহিমা খুঁজে ফিরেছেন মানুষের মাঝে। মানুষই ঈশ্বর, মানুষই দেবতা, মানুষের মাঝেই পরমাতœার অস্থিত্বলীন। তাই লালন শাহের কন্ঠে যেমন শুনি-
‘ভবে মানুষ গুরু নিষ্ঠা যার।
সর্বসাধন সিদ্ধি হয় তার ॥
নিরাকারে জ্যোতির্ময় যে
আকার সাকার হইল সে
যে জন দিব্যজ্ঞানী হয়, সেহি জানতে পায়
কলি যুগে হল মানুষ অবতার ॥
অপরদিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লালন শাহের ভাব দর্শনের দ্যোতনাকে আরও উচ্চমার্গ্মে তুলে ধরেছেন। মনে হয় লালনের চিন্তা-চেতনাকে শারীর ও সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন স্বয়ং কবিগুরু। মার্জিত ভাষায় পরিশীলিত সুরের মাধুর্য দিয়ে কবিগুরু একতারার সুরের স্থানে বীণার তালে ঝংকৃত করেছেন মানব ও মানবতার মাঝেই পরমাতœার অস্তিত্ব। সেই পরমাতœাকে পেতে হলে আমিত্বের অহংবোধ লীন করে দিতে হবে মানুষ-গুরু সাধনে; মানবতার পরাকাষ্ঠা দেদীপ্যমান করে। কবিগুরু ভাষায় তা হলো-
‘ভজন পূজন সাধন আরাধনা
সমস্ত থাক পড়ে
রুদ্ধদ্বারে দেবালয়ের কোণে
কেন আছিস ওরে।
তিনি গেছেন যেথায় মাটি ভেঙ্গে
করছে চাষা চাষ-
পাথর ভেঙে কাটছে যেথায় পথ,
খাটছে বারো মাস।
রৌদ্রে জলে আছেন সবার সাথে,
ধূলা তাঁহার লেগেছে দুই হাতে-
তাঁরই মতন শুচি বসন ছাড়ি
আয় রে ধুলার ‘পরে।’
অপরদিকে, ফকির লালন শাহ মানবদেহে নিহিত আলোকিত সত্তার উন্মেষের ইচ্ছার স্বীয় কন্ঠে উচ্চারণ করেন-
‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি।
মানুষ ছাড়া মনের আমার
দেখিরে সব শূন্যকার
লালন বলে মানুষ আকার
ভজলে পাবি ॥
লালন ফকির তাঁর পরমাতœার সাথে মিলনের প্রচন্ড আকাঙ্খা তাঁকে উন্মাতাল করে রাখতো, তাই সে প্রভুর সাথে মিলনের আকাঙ্খায় বেদন সুরে গেয়ে বেড়ায়-
‘মিলন হবে কতোদিনে।
আমার মনের মানুষের সনে ॥
ঐ রূপ যখন স্মরণ হয়
থাকে না লোক লজ্জার ভয়
লালন ফকির ভেবে বলে সদাই
ও প্রেম যে করে সেই জানে ॥
প্রভুর সাথে মিলনের ইচ্ছা লালনকে যেমন চাতক প্রায় জোছনালোকের প্রত্যাশায় দিন গুনতে, তেমনি প্রভুর সান্নিধ্য পাবার আশায় রবীন্দ্রনাথ ব্যাকুল হৃদয়ে গাইতেন-
‘যদি তোমার দেখা না পাই প্রভু,
এবার এ জীবনে,
তবে তোমায় আমি পাইনি যেন,
সে কথা রয় মনে।
যেন ভুলে না যাই, বেদনা পাই
শয়নে স্বপনে।’
অথবা
‘আমার মিলন লাগি তুমি
আসছ কবে থেকে।
তোমার চন্দ্র সূর্য তোমায়
রাখবে কোথায় ঢেকে।
কত কালের সকাল-সাঁঝে
তোমার চরণধ্বনি বাজে
গোপনে দূত হৃদয়-মাঝে
গেছে আমায় ডেকে।’
বাউল সম্রাট লালন ফকির এবং কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এ দু’জন মহৎ-প্রাণ ও সাধুর কর্ম ও রচনার কিছু দিক নিয়ে আলোকপাত করেছি বটে। লালন শাহের প্রয়াণের সময়কালে রবীন্দ্রনাথের পূর্ণ যৌবনকাল। তখন তাঁর বয়স ২৮/২৯ বছর। যে ‘গীতাঞ্জলি’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে এবং বাংলা ভাষাকে অনে দিয়েছে সুনাম, সম্মৃদ্ধি ও বিশ্বজনীনতা। সেই ‘গীতাঞ্জলি’ প্রতিটি ‘গীত’ ধরে-স্থীরতার সাথে পাঠ করলে নিজের অজান্তে মনে হবে- এ কথাগুলো তাঁর পূর্ব-পুরুষ বাউল কবি ফকির লালন শাহ আগেই বলে গেছেন। অর্থাৎ, ‘গীতাঞ্জলি’র গানগুলো লেখার সময় কবিগুরু প্রচন্ডভাবে বাউল কবি লালনের রজনার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। আমার বলতে দ্বিধা নেই যে, রবীন্দ্রনাথের নোবেল এর মতো পুরস্কার ও সম্মানের পিছনে লালন দর্শনের প্রভুত অবদান বিদ্যমান। কিন্তু বড়ই পরিতাপের বিষয় এশিয়ার প্রথম নোবেল বিজয়ী কবিগুরু রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে যেভাবে দুই বাংলায় বাঙ্গালীগণ উচ্ছাসিত ও উদ্বেলিত হয়ে স্মরন; সেইরূপ হয়না বাউল সম্ম্রাট লালন শাহের ক্ষেত্রে।


আরাকান অধিবাসীদের প্রাথমিক ইতিহাস

ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ বাংলা ও আরাকান সীমান্তগত দিক থেকে শুধু প্রতিবেশীই নয় বরং বাংলাদেশের…


যেভাবে আমরা বই পেলাম এবং আমাদের ঐতিহ্য

মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বইয়ের যাত্রা কবে শুরু তা নির্দিষ্ট দিনক্ষণ উল্লেখ করে কেউ বলতে পরেনি…


মসনবীর কবি রুমী

মসনবীর কবি রুমী রাজু রফিক সাহিত্য মানুষের জীবনের নানা কথার বিচিত্র কথক। আর এক কথায়…


রবীর উপর বাউলের প্রভাব

রবীর উপর বাউলের প্রভাব কবীর হুমায়ুন বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বলতম জ্যোতিষ্ক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। একজন মানুষের…