শেষ গোঁ-টা ত্যাগ করুন, দেশের জন্য ভাল নিজের জন্যও ভাল

সাঈদ তারেক
নির্বাচন হবে কিনা হলে কি ধরনের হবে না হলে কি হবে এসব নিয়ে সারা দেশের মানুষ সন্দেহের দোলাচলে দুলে চললেও অন্তত: একজন মনে প্রাণে বিশ্বাষ করেন নির্বাচন যথা সময়েই হবে এবং তা সংশোধিত সংবিধান অনুযায়ী অর্থাৎ মতাসীনদের অধীনেই-, তিনি হচ্ছেন আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মহোদয়া। বিরোধীরা যেখানে আন্দোলনের দামামা পেটাচ্ছে প্রধানমন্ত্রী সেখানে নৌকায় ভোট দিয়ে আবার তাকে মতায় পাঠানোর জন্য আকুল আবেদন করে ফিরছেন।
এটা একদিকে ভাল। প্রধানমন্ত্রী মহোদয়া দেশে একটা নির্বাচনী আবহ তৈরীর চেষ্টা করছেন। মানুষ তো নির্বাচনই চায়। হানাহানি মারামারি রক্তারক্তির পরিবর্তে রাজনীতি নিয়মতান্ত্রিক পথে পরিচালিত হোক এটাই তো সবার কাম্য। দেশে ভোট হোক, সবাই অবাধে ভোট দেয়ার সুযোগ পাক সে ভোটের ফলাফল ঠিকমত প্রকাশ হোক। কিন্তু সন্দেহ দেখা দিয়েছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অধীনে নির্বাচন হলে তেমনটি হবে কিনা। সব দল নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে কিনা, সবাই নির্ভয়ে ভোট দিতে পারবে কিনা মতার জন্য নিজেদের পছন্দের দলকে বেছে নিতে পারবে কিনা।

এই সন্দেহ থেকেই মূলত: তত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবী। গত আটান্ন মাসে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীর মনে এমন ধারনা দিতে পারেন নাই যে তার অধীনে নির্বাচনে গনরায় ঠিকমত প্রতিফলিত হতে পারবে। মানুষ এটাও মনে করেনা মৌলিক গনতান্ত্রিক সংবিধানিক বা মানবাধিকারের প্রতি তিনি শ্রদ্ধাশীল বা দেশে আইনের শাষনে বিন্দুমাত্র আন্তরিক। উল্টো তার সম্পর্কে ধারনা- কায়েম করেছেন একব্যক্তির শাষন খেয়ালখুশীর শাষন যাকে বলা হয় স্বৈর শাষন। আইন আদালত পকেটে প্রশাসনে দলীয় ক্যাডার র‌্যাব পুলিশ ঠ্যাঙারে বাহিনী। এক ব্যক্তির আঙুলে হেলনে যেখানে সবাই ওঠে আর বসে সেখানে আর যাই হোক গনতন্ত্র থাকেনা। মিডিয়াগুলো পর্যন্ত আজ্ঞাবহ। কোন একটা মিডিয়া বা অনুগ্রহভোগী সুশীলদের কাউকে আজ পর্যন্ত বলতে শোনা যায় নাই যে এই সরকার একটি স্বৈরাচারি সরকার, শেখ হাসিনা ‘স্বৈরাচার’। আমরা স্বাধীনতার পর বাকশালী স্বৈরাচার দেখেছি সামরিক স্বৈরাচার দেখেছি ’৯১-এর পর সংসদীয় স্বৈরাচার দেখেছি কিন্তু শেখ হাসিনা বর্তমানে যে ইচ্ছামর্জিতন্ত্র কায়েম করেছেন তা তূলনাহীন। আমাদের দেশে এরশাদ সাহেব স্বৈরাচার নামে ব্রান্ডেড। কেউ কেউ বলেন শেখ হাসিনা সেই এরশাদ স্বৈরাচারের চাইতেও নিকৃষ্ট স্বৈরাচার। এরশাদ সাহেব এ দেশের সংখ্যাগুরু ধর্মবিশ্বাষীদের মনে আঘাত দেয়ার সাহস পান নাই শেখ হাসিনা অবলীলায় তেমন কাজ করে গেছেন, সংবিধান থেকে ‘আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাষ’ তুলে দিয়েছেন। এরশাদ স্বৈরাচার অতীত খুঁচিয়ে পরিবেশ দূর্গন্ধময় করেন নাই শেখ হাসিনা তথাকথিত যুদ্ধাপরাধি বিচারের জজবা তুলে মানুষের মনে হিংসা ক্রোধ উষ্কে দিয়েছেন, সমাজে রক্তারক্তি হানাহনির পরিবেশ তৈরী করেছেন। এরশাদ সাহেব আইন আদালতকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করেন নাই শেখ হাসিনা পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকেই পদানত করে রেখেছেন। এরশাদ স্বৈরাচার মানী লোকদের মান রেখে চলেছেন শেখ হাসিনা পদে পদে দেশের তাবৎ জ্ঞানীগুনী শিতি ভদ্র সজ্জন বা সম্মানী লোকদেরকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছেন অকারন বকাবাজি করেছেন ঢোলকবাহিনী সমবিভ্যারে তাদের চরিত্রহনন করে গেছেন। ভিন্নমত দমন করেছেন যাকে পছন্দ হয় নাই জেলে নিয়ে তুলেছেন।

এসব কারনেই ভয় নিজ সরকারের অধীনে নির্বাচনে যেখানে শেখ হাসিনা নিজেই প্লেয়ার নিজেই রেফারি- কতটুকু সাধুসন্তু হতে পারবেন। কথায় কথায় বলেন অন্যান্ন গনতান্ত্রিক দেশে যেভাবে নির্বাচন হয় আমাদের দেশেও সেভাবেই নির্বাচন হবে। অবশ্যই তাই হওয়া উচিত। কিন্তু আমাদের দেশটা কি গনতান্ত্রিক? কোন গনতান্ত্রিক দেশে কি নির্বাচন কমিশন সরকারের অজ্ঞাবহ থাকে? বিচারকরা কি সরকারের চাহিদামাফিক রায় প্রদান করে? প্রশাসন কি আগে দেশের স্বার্থ দেখে না ব্যক্তির স্বার্থ দেখে! আইনশৃংখলা রাকারি বাহিনীগুলো কি সরকারের সেবক না জনগনের সেবক? হ্যাঁ মাননীয় শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনই সবাই মেনে নিতো যদি আটান্ন মাস ধরে তিনি দেশে স্বৈরাচার কায়েম না করতেন, যদি তিনি আওয়ামী শাসন চালু না করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতেন, দেশের মানুষকে ‘আমাদের প’ আর ‘শত্র“প’ ভাগে ভাগ না করে সবাইকে আপন ভাবতে পারতেন। দেশে যদি আইনের শাসন থাকতো, আদালতগুলো স্বাধীন থাকতো প্রশাসন নিরুপে থাকতো র‌্যাব পুলিশ দলীয় ঠ্যাঙারে বাহিনী না হয়ে জনগনের সেবক বাহিনী হতো- দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচন হতো। শেখ হাসিনা যদি মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারতেন তার অধীনে নির্বাচন হলে অসুবিধা কি। শুধু তাই নয় মানুষ যদি এমনটাও মনে করতে পারতো এই ভদ্রমহিলা দেশের জন্য কিছু করতে পারুন নাই পারুন অন্তত: চেষ্টা করেছেন, এঁর হাতেই দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব নিরাপদ, ইনি মতায় থাকলে ভারতীয়রা এখানে এসে দাদাগীরি ফলাতে পারবেনা বা সংখ্যাগুরু ধর্মবিশ্বাষীর আবেগ অনুভূতির প্রতি ইনি ন্যুনতম শ্রদ্ধাশীল তাহলে পরের পাঁচ বছর কেন আজীবনের জন্য তাকে মতায় রেখে দিলেই বা তি কি! চুরি লুটপাট তো বিএনপি মতায় এলেও করবে, এরাও করছে। রাজনীতিকদের চুরি বাটপারি আঙুল ফুলে রাতারাতি কলাগাছ বনে যাওয়া এগুলো তো আমরা মেনেই নিয়েছি। আমাদের কাছে এদের খাওয়া যা ওদের খাওয়াও তা। কথা হচ্ছে দেশটা কোথায় থাকবে!

শেখ হাসিনা এই জায়গাটায় এসে মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারেন নাই। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি রেকর্ড ফরেন কারেন্সি রিজার্ভ বা খাদ্যোৎপাদনে স্বয়ম্ভরতা- এসব অর্জনে হাসিনা সরকার কেন এ জাতীয় কোন সরকারেরই খুব একটা ভূমিকা থাকেনা। এরা শুধু রেকর্ডকিপারের ভূমিকা পালন করে। দেশটাকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে কোটীর ওপর প্রবাসী গ্রামীন ব্যাংকের মত কয়েকটা এনজিও পোশাক শিল্প এবং কৃষক জনগোষ্ঠীসহ সাধারন মানুষের সচেতনতা। সরকারগুলো এসে শুধু পরের ধনে পোদ্দারীর মত ফুটানী মাড়ায়, সরকারের লোকজন পাবলিকের ঘাড় মটকিয়ে বাড়ী গাড়ী ব্যাংক ব্যালেন্স ষ্ফীত করে। কাজেই এ দেশে মতায় হাসিনা থাকলেন না খালেদা থাকলেন এটা খুব একটা ম্যাটার করেনা। এজন্য আমরা একটা সিস্টেম মেনে নিয়েছি- এই পাঁচ বছর ইনি পরের পাঁচ বছর উনি। যতদিন আল্লাহতায়ালা হায়াত রেখেছেন উনারা চালিয়ে যাবেন তাতে কেউ বাধ তো সাধেন নাই! সে হিসাবে পরের টার্ম বেগম জিয়ার। কিন্তু শেখ হাসিনা গোঁ ধরেছেন, উনি ছাড়বেন না।
গোলটা বেঁধেছে এখানেই। বেগম জিয়ার দাবী জেনুইন, হিসাবের পাওনা কে ছাড়ে! আবার ওদিকে মাননীয় শেখ হাসিনার কেসটাও একেবারে ফেলে দেবার মত নয়। পাঁচ বছরে আকামের ঘড়া এতটাই পূর্ণ হয়েছে যে মতায় না থাকলে অনেকের দেশেই থাকা অসম্ভব হয়ে উঠবে। রামরাজত্ব চলে যাচ্ছে এটা আঁচ করতে পেরে সরকার এবং সরকারি দলের লোকজন নাকি এর মধ্যেই বিভিন্ন দূতাবাসে গিয়ে ভিসার লাইনে দাঁড়াচ্ছেন। কিন্তু সকলেই তো আর ইন্ডিয়ায় ফ্যাট বাড়ী কিনতে বা ভাড়া করে রাখতে পারেন নাই। তাছাড়া পাঁচ বছরে কত আর কামানো গেছে! তা দিয়ে ইউরোপ আমেরিকায় বাড়ী কেনা বা সেসব দেশে গিয়ে দুই চার বছর থাকার মত সঙ্গতিই বা ক’জন অর্জন করতে পেরেছেন! এরপর রয়েছে পরের সরকার এলে লুটের টাকার ভাগ তাদেরকে দেয়া, নইলে সম্পত্তি বাজেয়াফ্ত বা জেল মামলা রিমান্ড!
মোদ্দা কথা পিঠ বাঁচানো বা জান মাল রার জন্যই পরের পাঁচ বছরও আওয়ামী লীগের মতায় থাকা দরকার। একটা ব্যপার পরিষ্কার হয়ে গেছে শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচন মানে পরের পাঁচ বছরও তিনিই মতায়। সরকারপ্রধান হিসাবে সকল মেকানিজম থাকবে তার হাতে। যেহেতু ছলে বলে কৌশলে তাকেই মতায় থাকতে হবে, সকল মেকানিজমই তিনি এস্তেমাল করবেন এটা বলাই বাহল্য। ওদিকে দলনিরুপে ব্যবস্থাপনায় নির্বাচন হলে বেগম জিয়া বা বিরোধী জোট মতায়। কথা পরিষ্কার, যারা চাইছেন পরের পাঁচ বছরও শেখ হাসিনাই থাকুন তারা দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের প।ে যারা হাসিনা সরকারের বিদায় চান তারা তত্বাবধায়ক ব্যবস্থাপনার প।ে সে হিসাবে ব্যপারটা এসে দাঁড়িয়েছে পরের টার্মেও শেখ হাসিনা থাকবেন কি থাকবেন না।

নির্বাচন কবে হবে কেউ জানে না। নির্বাচন কার অধীনে হবে সে জটও এখনও খোলেনি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এখনও তার সংকল্পে অটল। নির্বাচন পরিচালনাকারি সরকারের প্রধান পদে তাকে থাকতেই হবে। অবশ্য এটাও ঠিক সম্রাজ্ঞীর মর্যাদায় সরকার প্রধান হিসাবে যে সিকিউরিটি এবং রাষ্ট্রিয় নিরাপত্তা তিনি এখন পেয়ে আসছেন মতা ছেড়ে দিলে সেসবের অনেক কিছুই থাকবে না। এতে ভোটের ক্যাম্পেইন তো দুরের কথা স্বাভাবিক চলাফেরাই অসুবিধা হয়ে যাবে। আবার এটাও ভাবতে পারেন মতা চলে গেলে দেশেই বা বসবাস করবেন কিভাবে। জনরোষ থেকে দলের লোকদেরকে বাঁচাবেন কিভাবে।

একথা বলার অপো রাখেনা জনমত আর এখন আগের মত শেখ হাসিনার পে নাই। দল নিরুপে ব্যবস্থাপনায় নির্বাচন হলে পরাজয়ের আশংকা শতভাগ। এ অবস্থায় জোরজবরদস্তি করে হয়তো আরও কিছুদিন মতায় থেকে যাওয়া যাবে কিন্তু তা কোনক্রমেই আজীবনের জন্য প্রলম্বিত করা যাবে না। এক দিন না একদিন শেখ হাসিনাকে মতা থেকে যেতেই হবে। এটাই সত্য এটাই বাস্তব। যদি তাই হয় বাস্তবতাকে মেনে নেয়াই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। শুণ্য কলশ বাজে বেশী বা ‘আবার মতায় আসার তথ্য আছে’ ‘আমরাই আবার মতায়’জাতীয় ঢক্কানিনাদ বাজিয়ে দলের লোকজনের মনোবল ধরে রাখা বা প্রশাসনকে পে রাখার ব্যপারটা ঠিক আছে কিন্তু ইতিহাসের আস্তাকুড়ে ঠাঁই নিতে না হলে ভবিতব্য মেনে নিতে হবে। সেফ এগজিট নিয়ে কথাবার্তা বলা শুরু করা যেতে পারে। যারা জট খুলতে দৌড়ঝাপ করছেন শেখ হাসিনাকে বোঝাতে পারেন বিরোধী দলে গেলেও তার নিরাপত্তা বা দেশে বসবাসের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। মতা চলে গেলেও তার কোন অসুবিধা হবেনা। অনেকে বলেন অতিমাত্রায় ভয় থেকে মানুষ প্রলাপ বকতে শুরু করে। মাননীয় শেখ হাসিনাকে এখন মতা হারানোর আতংক তাড়া করে ফিরছে। তিনি জানেন সরকারে না থাকলে কি পরিনতি হতে পারে। এ অবস্থায় তাকে আস্বস্ত করতে পারলে জেদ গোঁয়ার্ত্তুমি থেকে তিনি সড়ে আসতে পারেন বলে আমার ধারনা। তিনিও তো মানুষ। পাঁচ বছর অনেক গোঁয়ার্ত্তুমি তিনি করেছেন। এটা নিশ্চয়ই বুঝবেন এই শেষ গোয়ার্ত্তুমিটা ত্যাগ করলে দেশের জন্য ভাল তার জন্যও ভাল।


শেষ গোঁ-টা ত্যাগ করুন, দেশের জন্য ভাল নিজের জন্যও ভাল

সাঈদ তারেক নির্বাচন হবে কিনা হলে কি ধরনের হবে না হলে কি হবে এসব নিয়ে…


নজরুলের রাজনীতি এবং বিদ্রোহ

মোমিন মেহেদী মাগো! আমায় বলতে পারিস/ কোথায় ছিলাম আমি/ কোন-না জানা দেশ থেকে তোর কোলে…


দেশ বাঁচলে তবেই আপনারা বাঁচবেন

বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম দেখতে দেখতে ২১ দিন হয়ে গেল। কত মানুষের কত কথা, রাস্তায়…