দশদিক মাসিক

হোম প্রচ্ছদ রচনাসুন্দর, সমৃদ্ধ ও সুখী জীবনে আপনার আগামী..

সুন্দর, সমৃদ্ধ ও সুখী জীবনে আপনার আগামী..

এইচ এম দুলাল::
একজন সুখী ও আশাবাদী মানুষ যেকোনো পরিস্থিতিতে সাহস ধরে রেখে নিজেকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবার যোগ্যতা রাখেন। যেকোনো ক্ষেত্রেই পজেটিভ দিকটায় মনোনিবেশ করা সাফল্যের পথে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে অনেক বড় একটি ভূমিকা রাখে। তবে সবসময় নিজের ভেতর সুখ ধরে রাখাটাও বড় ধরণের একটা চ্যালেঞ্জ। আসুন জেনে নেই, জীবনে সুখী হতে গেলে যে অভ্যাস গুলো রপ্ত করতে হবে আপনাকে। ব্যক্তিগত সম্পর্ক, বন্ধুমহল, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ইত্যাদি নিয়ে কমবেশি আক্ষেপ সবার জীবনেই আছে। তবে অতীতের কথা চিন্তা করে ভবিষ্যতে হাল ছেড়ে দেওয়াটা বোকামি। জীবনযাপন-বিষয়ক একটি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক জরীপে দেখা গেছে, ত্রিশের পরে এসে অনেকেই আক্ষেপ করেন বিশেষ কিছু না করা নিয়ে। তবে মনে রাখতে হবে, যা হবার তা হয়ে গেছে। তাই পুরানো কাসুন্দি না ঘেটে জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনতে হবে।
কৃতজ্ঞ থাকুন: জীবনে যা পেয়েছেন, তার জন্য কৃতজ্ঞ থাকুন। জীবনের যা কিছু অর্জন, তা শুধুই আপনার কারণে। আপনি যদি আপনার অবস্থানের প্রতি সন্তুষ্ট না থাকেন, তাহলে আপনার কাজই বাধাগ্রস্ত হবে। ফলে ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়বেন আপনি। কাজেই নিজ অবস্থানকে ভালোবাসুন, কৃতজ্ঞ থাকার চেষ্টা করুন নিজের প্রতি।
আপনার গল্প শেয়ার করুন: নিজের সফলতা, বিফলতা তথা জীবনের গল্প অন্যকে জানান, অন্যেরটা জানুন। অনেকেই আছেন যারা শুধু শুনেই যান, অনেকে আছেন যারা শুধু বলেই যান, আবার অনেকে আছেন যারা কিছু জানতেও চান না, শুনতেও চান না। কিন্তু এগুলোর কোনোটাই আপনার জীবনে প্রভাব রাখতে পারবে না, যতক্ষণ না দান-প্রতিদান সমান না হবে। এভাবে গল্প শেয়ারের মাধ্যমে আপনি যেমন নিজেকে মেলে ধরতে পারবেন, অন্যের কাছ থেকেও শিখতে পারবেন। ফলে নিখুঁত হয়ে উঠবে আপনার কাজ।
ক্ষমা করুন: আমাদের সমাজে অনেকেই আছেন, যারা ক্ষমা করার মানসিকতা ধারণ করেন না। তাদের কাছে ক্ষুদ্র অপরাধ বা ভুলও ক্ষমার অযোগ্য। ফলে ধীরে ধীরে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন অন্যের থেকে, নিজ জীবনে একা হয়ে পড়েন। একইভাবে অধীনস্তদেরও কিছু শেখাতে পারেন না। ফলাফল, জীবনে নেমে আসে একাকীত্ব। সুখ পালিয়ে যায় চোখের নিমিষে।
ভালো শ্রোতা হোন: একজন ভালো শ্রোতাই পারেন সময়মত অন্যের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে। শুধু তাই নয়, ভালো শ্রোতা হওয়ার সবচেয়ে বড় সুবিধা হল দ্রুত জ্ঞানার্জন করা যায়। অন্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করাও হয় এতে। এতে করে আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়। আত্মবিশ্বাস এবং জ্ঞান আপনার কাজে নিরাপত্তা এবং ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
হিংসা-বিদ্বেষ পরিহার করুন: আমরা যখন কাউকে হিংসা করি, তখন আমরা মূলত নিজেকেই আঘাত করি। ফলে নিজ কাজটা হয়ে যায় দূর্বল। নিজ কাজকে নিখুঁত করতে হলে সেখানে সম্পূর্ণ মনোনিবেশ জরুরি। কিন্তু আপনি যখন অন্য একজনকে প্রতিদ্বন্দ্বি মনে করে তার প্রতি মনে হিংসা-বিদ্বেষ পোষণ করবেন, তখন আপনি সম্পূর্ণ মনোনিবেশ করতে পারবেন না। ফলে ধীরে ধীরে মনের সুখ হারানর পাশাপাশি কাজের মানও নিন্ম হয়ে যাবে।
হাসুন বেশি: আমরা যখন হাসি, তখন পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে আসে। হাসলে সেরোটোনিন নামে এক ধরণের হরমোন নিঃসরন করে যা মানুষকে সুখী সুখী ভাব এনে দেয়। এধরণের অনুভূতি অনেক কঠিন কাজকেও সহজ করে দেয়।
ব্যয়াম এবং খাবারে নিয়ম মেনে চলা: নিয়মিত ব্যয়াম এবং খাবারে নিয়ম মেনে চললে শরীর থাকে ঝরঝরে। আর ঝরঝরে শরীর মনকে রাখে তরতাজা। ফলে কাজে আসে স্পৃহা। দিনে অন্তত পনের মিনিটের জন্য হলেও ব্যয়াম করা উচিত। যদি ব্যস্ততার কারণে ব্যয়াম সম্ভব না হয়, এবং শরীরে সূর্যালোক লাগানর ব্যবস্থা না থাকে সকালে, তাহলে ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে ভিটামিন-ডি উৎপাদক ওষুধ সেবনের ব্যবস্থা নিন।
ইতিবাচক চিন্তার অনুশীলন করুন: ইতিবাচক চিন্তা আপনার কাজকে যতখানি সামনে নিয়ে যেতে পারবে, আর কিছুই এতোখানি পারবে না। যদি আজ কোনো ব্যর্থতা আসে, তাহলে ভাববেন না, আপনি সবসময়ই ব্যর্থ। কাল সাফল্য অবশ্যই আসবে। কাজেই নিজের প্রতি ইতিবাচক চিন্তা ধরে রাখুন এবং সকল ক্ষেত্রে বাধার কথা মাথায় না রেখে সাফল্যের কথা ভাবুন। সে উদ্দেশ্যেই কাজ করুন।
আপনার সমস্যার জন্য অন্যকে দোষারোপ বন্ধ করুন: বাঙালির তিন হাত। ডান হাত, বাম হাত আর অযুহাত। এই অযুহাতের ভাড়া করতে গিয়ে আমরা অনেক ক্ষেত্রেই নিজ ব্যর্থতার দায় অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে বসি। আবার নিজের অবস্থার জন্য জনগণ দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা, রাজনীতিবিদ, নিজ কর্মস্থলর উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ওপর দোষারোপ করে। অথচ নিজ সমস্যাকে নিজেই যদি মোকাবেলা করা হয়, তাহলে এমন অযুহাত কাড়া করার কোনো অবকাশই থাকে না, উপরন্তু নিজের উন্নতিও সম্ভব হয়। ফলে জীবনে বেইতে শুরু করে সুখের হাওয়া।
অতীতকে কখনোই ভবিষ্যত হিসেবে নেবেন না: অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হয়, তাকে বুকে ধারণ করে ভবিষ্যতকে নষ্ট করতে নেই। সেই ব্যক্তিই জীবনে সুখী হতে পারে, যে অতীত থেকে নিজ ভুলের শিক্ষা নিয়ে তা আবার দ্বিতীয়বার না করে এবং ভবিষ্যতকে এই শিক্ষার আলোকে উজ্জ্বল করে তোলে।
বেড়ানো: কর্মজীবনে এসে আমরা এতটাই ব্যস্ত হয়ে যাই যে, ছুটি কাটাতেই ভুলে যাই। আর এই ছুটি কাটানো মানে সাপ্তাহিক ছুটি নয়, লম্বা ছুটি নিয়ে সব কাজের চিন্তা ঝেড়ে ফেলে কোথাও থেকে ঘুরে আসা। বিশেষজ্ঞদের মতে, একা হোক কিংবা বন্ধুবান্ধব বা পরিবারের সঙ্গে, বছরে একবার এরকম একটি ছুটি কাটানো কাজের স্পৃহা ধরে রাখতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নিজের প্রতি যত্নবান হওয়া: বর্তমান যুগে চিকিৎসা বিজ্ঞানের যেমন ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে, তেমনি এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে মানসিক চাপ ও জীবনযাত্রার নানান বদভ্যাস-জনিত রোগবালাই। জীবিকা অর্জন যতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেই জীবিকা উপভোগ করার জন্য শরীরের প্রতি যত্ন নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। তাই জীবনে আনতে হবে শৃঙ্খলা, চাই নিয়মিত শরীরচর্চা, খেতে হবে স্বাস্থ্যকর খাবার, নিজের যত্ন নিতে হবে নিজেকেই।
শখ পূরণ: জীবনে এতটা ব্যস্ত কখনও হওয়া উচিত নয় যে, নিজের শখগুলোকে বিসর্জন দিতে হয়। শখ যাই হোক, এর জন্য সময় বের করতে হবে। নিজের পছন্দের কাজ করে কাটানো সময়টুকু জীবনে আনতে পারে লক্ষ্যণীয় পরিবর্তন।
সঞ্চয়: কর্মজীবনে এসে অর্থ জমানো ভালো অভ্যাস। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান অনিশ্চয়তার যুগে বিপদের সময় জরুরি ভাবে খরচ করার মতো কিছু অর্থ আলাদা করে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ।
ইন্সুরেন্স বা বীমা: ভবিষ্যত জীবনের নিশ্চয়তার পেতে জীবনবীমা করে রাখাটা জরুরি। তবে এই কাজের দায়ভার পরিবারের উপর ছেড়ে দিলে চলবে না, নিজেই তথ্য সংগ্রহ করে কাজটি করতে হবে।
সম্পর্ক সামলে রাখা: আশপাশের মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখা জরুরি। সম্পর্কগুলো সামলে রাখতে হবে, তাদের পেছনে সময় দিতে হবে
দাম্পত্যজীবনের সুখ জীবনকে করবে অনেক আনন্দময়
টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে ‘সম্পর্ক’ বিশেষজ্ঞ টি তাশিরো বলেছেন, আপনি যদি অসাধারণ কাউকে পেতে চান, তাহলে আপনার জীবনসঙ্গী খুঁজে পাওয়া সত্যিই কঠিন হয়ে পড়বে। তাশিরো তাঁর এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, যদি একটি ঘরের মধ্যে মধ্যম মান, আয়, চেহারা ও উচ্চতার ১০০ জন পুরুষ থাকেন, তাহলে সেখানে মাত্র ১৩ জন বিবাহযোগ্য পুরুষ পাওয়া যাবে। আর যদি কেউ ওই ১০০ জনের মধ্য থেকে আকর্ষণীয়, ছয় ফুট লম্বা কিংবা ৮৭ হাজার ডলার আয় করা কোনো পুরুষকে খোঁজেন, তাহলে মাত্র একজন পুরুষের দেখা মিলবে। আর কৌতুকবোধসম্পন্ন, দয়ালু, এমনকি রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা আছে এমন পুরুষের সন্ধান করা হয়, তাহলে ১০০ জন পুরুষের মধ্যে একজনই পাওয়া অসম্ভব। ভড়কে গেলেন। ভাবছেন কাকে নিয়ে সংসার সাজাবেন? বিবাহিত জীবনে সুখে থাকবেন কীভাবে?
তাশিরোর যুক্তি হলো—টাকা-পয়সা, সৌন্দর্য বিবাহিত জীবনকে সুখী করতে পারে না। অন্তত একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত। তাঁর মতে, একটি ভালোবাসাময় সুখী বৈবাহিক সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য সবার মধ্যে যে গুণটি থাকা প্রয়োজন, তা হলো—আন্তরিকতা। আন্তরিক বলতে তিনি এমন কাউকে বুঝিয়েছেন, যিনি হবেন বিনীত, নমনীয়, বিশ্বাসযোগ্য, ভালো স্বভাব, সহযোগী মনোভাবাপন্ন, ক্ষমাশীল, উদার ও ধৈর্যশীল। অন্য আরেক দল গবেষক মনে করে, ভালোবাসাই একজন নারী ও একজন পুরুষের মাঝে হূদয়ের অটুট বন্ধন তৈরি করে দেয়। তৈরি করে সাংসারিক বন্ধন। ভালোবাসা ব্যতীত কোনো সাংসারিক কিংবা দাম্পত্য জীবন সুখের হয় না। স্বামী ও স্ত্রী একে অন্যের পরিপূরক। একজনকে বাদ দিয়ে অন্যজন শূন্য, ফাঁকা। একজন সুন্দর মনের ও সুন্দর গুণের স্ত্রী সংসারকে তাঁর নিজের আলোয় আলোকিত করে তুলতে পারেন। সাজিয়ে তুলতে পারেন সংসার জীবনকে সুখের স্বর্গীয় বাগানের মতো করে। তবে এই কাজের জন্য দরকার প্রেমিক স্বামীর স্ত্রীর প্রতি ঐকান্তিক মায়া-মমতা ও সুগভীর ভালোবাসা। এই ভালোবাসা থাকলে দেখবেন, বিবাহিত জীবনে সুখ কাকে বলে! তাই নিম্ন কাজ গুলোতে মনো যোগ দিন…

১. বাস্তববাদী হোন
আপনার দাম্পত্যজীবন নিয়ে আপনার ভাবনা কী? সেটা কি রূপকথার গল্পের মতো অত:পর তাহারা সুখে-শান্তিতে বসবাস করিতে লাগিল ধরনের, নাকি বাংলা সিনেমার মতো সারাক্ষণ প্রেম-ভালবাসা-ভালবাসি র মতো অলীক কল্পনাবিলাস? আপনি কি নাটক-উপন্যাস-সিনেমার নায়ক-নায়িকার মতো সর্বগুণ-রূপধারী জীবনসঙ্গী/ জীবনসঙ্গিনীর স্বপ্ন দেখেন? অথবা আপনি কি বিয়ের পরও আশা করেন আপনার স্ত্রী/স্বামী সেই আচরণ করবে যা সে করতো বিয়ের আগে প্রেমিক/প্রেমিকা হিসেবে? দাম্পত্যজীবনে অশান্তির একটা বড় কারণ এই অবাস্তব, অলীক প্রত্যাশা। কারণ বাস্তবজীবনে অলীক প্রত্যাশাগুলো যখন বাস্তবায়িত না হয় তখন তা আশাভঙ্গ ও মর্মপীড়ার কারণ হয়। আবার বৈজ্ঞানিকভাবেই এটা এখন প্রমাণিত যে, প্রেমের প্রাথমিক উন্মাদনা ক্ষণস্থায়ী। আপনি যাকেই বিয়ে করেন না কেন, সে কখনোই ১০০% নিখুঁত হবে না। সারাক্ষণ শুধু আপনার চিন্তা করবে না। সুখী হতে হলে আপনাকে তাই বাস্তববাদী হতে হবে। সফল দম্পতিরা দৈনন্দিন জীবনযাপনেই রোমান্টিকতা খুঁজে নেন, প্রেমের প্রাথমিক উন্মাদনাকে দীর্ঘস্থায়ী প্রেমানুভূতিতে রূপান্তরিত করেন।
২. কাকে বিয়ে করবেন
শুধু বাইরের চাকচিক্য দেখে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিলে আপনি ভুল করবেন। যেমন, পাশ্চাত্যের একজন তরুণী হয়তো একজন পুরুষ কতটা সুদর্শন, লম্বা বা তার মধ্যে পুরুষালি বৈশিষ্ট্য আছে কিনা বা তার ধনসম্পদের পরিমাণ কেমন ইত্যাদি বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেবে। আবার আমাদের প্রাচ্যের কোনো অভিভাবক হয়তো পাত্রের ডিগ্রী, টাকা-পয়সা কিংবা পাত্র বিদেশে থাকে ইত্যাদি বৈশিষ্ট্য দিয়ে প্রভাবিত হতে পারে। আপাত অনেক কিছু দেখে, অনেকভাবেই একজন প্রভাবিত হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে বিয়ে সুখের হবে কিনা তা এসবের ওপর নির্ভর করে না। হয়তো দেখা গেল এসবকিছু দেখে যে পাত্র বা পাত্রীকে বাছাই করা হলো, বাস্তবে সে একজন স্বার্থপর মানুষ অথবা পাত্র-পাত্রীর মধ্যকার সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক ব্যবধান এত বেশি যে মানিয়ে চলা অসম্ভব।
আবার আমরা মনে করি প্রেমের বিয়ে হয়তো সুখের হয়। কিন্তু বিয়ের আগে প্রেম থাকলেই যে তা সুখের বিয়ে হবে তেমন কোনো কথা নেই। কারণ প্রেম আসলে নারী-পুরুষের শারীরিক আকর্ষণেরই এক পোশাকী নাম।
সুখী দাম্পত্যের জন্যে যা প্রয়োজন তাহলো আপনার জীবনসঙ্গী/ সঙ্গিনী ভালো মানুষ কিনা, সৎ বিশ্বস্ত এবং উদারমনা কিনা। আদর্শ দাম্পত্য সম্পর্ক তখনই সৃষ্টি হয় যখন স্বামী এবং স্ত্রী দুজনই একই মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী হন।
তাই বিয়ের আগে যে মানুষটিকে আপনি জীবনসঙ্গী করতে চাচ্ছেন, তার সম্পর্কে সম্ভাব্য সবকিছু জেনে নিন। পাত্র-পাত্রীর ব্যাপারে নিরপেক্ষ এবং বস্তুনিষ্ঠ তথ্য দিতে পারে এমনদের সাথে যোগাযোগ করুন। আর যদি তথ্যের নিরপেক্ষতা নিয়ে সন্দেহ থাকে তাহলে একাধিক সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যগুলো মিলিয়ে নিজে সিদ্ধান্ত নিন। সবসময় মনে রাখবেন যা রটে তা কিছুটা বটে। কাজেই কোনো নেতিবাচক তথ্য পেলে তা যাচাই না করে হেলায় উড়িয়ে দিলে জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি সিদ্ধান্তে আপনি বড় ধরনের ভুলও করে ফেলতে পারেন। আর অবশ্যই নিজের সম্পর্কে এমনকিছু গোপন করবেন না যা পরে জানলে ভুল বোঝাবুঝি হবে।
৩. শুধু দুজনে মিলে সুখী হতে পারবেন না
অভিভাবকের দোয়া ছাড়া আপনার দাম্পত্যজীবন কখনোই সুখী হতে পারে না। বাবা-মায়ের সংসারের সাথে যতই আপনি বাহ্যিক সম্পর্ক ছেদ করুন না কেন এর প্রভাব আপনার ওপর থেকেই যায়। পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়ে যারা বিয়ে করেন তাদের দাম্পত্যজীবনে একটা শূন্যতা থেকেই যায় যা কখনো পূরণ হয় না। এর মানে এই নয় যে, জীবনসঙ্গী নির্বাচনে আপনার কোনো ভূমিকা থাকবে না বা আপনার ওপর যেকোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়া হবে। বিয়েতে আপনার পছন্দকে যেমন অগ্রাধিকার পেতে হবে তেমনি থাকতে হবে দু'পরিবারের সর্বসম্মত অনুমোদন এবং সমর্থন।
৪. বিয়ের অনুষ্ঠান অনাড়াম্বর রাখুন
ইদানিং বিয়েতে আনুষ্ঠানিকতা এবং খরচের বাহুল্য একটি নৈমিত্তিক ব্যাপার। আর এর কারণ ছোটবেলা থেকে আমরা এক রূপকথাময় বিয়ের কল্পনা করে বড় হই। কিন্তু বিয়ের অনুষ্ঠানে যতই জাঁকজমক হোক তার স্থায়িত্ব মাত্র একদিন। প্রাচ্যের কোনো কোনো সংস্কৃতিতে বড়জোর এক সপ্তাহ। অথচ এই ক্ষণস্থায়ী আয়োজনে লোকদেখানো খরচের প্রতিযোগিতায় মাততে গিয়ে দুপরিবারকে হয়তো ঋণের জালে জর্জরিত হতে হয়। আর পরিণাম হয় আর্থিক-মানসিক এবং আত্মিক অশান্তি। শান্তিপূর্ণ দাম্পত্যজীবনের জন্যে তাই বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা যথাসম্ভব অনাড়াম্বর রাখুন।
৫. আপনার সঙ্গী আপনাকে বুঝবে নয়, আপনি আগে তাকে বোঝার চেষ্টা করুন
দাম্পত্যজীবনে সমস্যার একটা অন্যতম কারণ হলো আমরা নিজেরাই যে সমস্যার জন্যে দায়ী - এটা আমরা মেনে নিতে পারি না। আমরা সবসময় মনে করি: আমি ঠিক, আমার স্বামী/ স্ত্রী ভুল। অথবা মনে করি ও আমার প্রতি অন্যায় করছে কিংবা মনে করি যে ও আমাকে বোঝে না। কিন্তু আমরা এটা বুঝি না যে, আরেকজনকে বোঝার জন্যে আমিই আগে উদ্যোগ নিতে পারি।
দাম্পত্যজীবনে ভুল বোঝাবুঝি দূর করার অন্যতম উপায় হলো, নিজের ভুলগুলো নিজেই খুঁজে বের করা এবং অপরপক্ষের অবস্থান থেকে দেখার চেষ্টা করা। আমরা এটা কখনোই আশা করতে পারি না যে, আমি যা করি না, আমার স্বামী/ স্ত্রী সেটা করবে। আমরা যখন ধরে নিই যে, সমস্ত ভুল আরেকজনের, তখন ভুল বোঝাবুঝি দূর করার দায়ও আমরা তার ওপরই চাপিয়ে দিই। যদি আমরা শুধু এটা মনে করতাম যে, বোঝাবুঝির অভাব হলেই ভুল বোঝাবুঝি হয়, তখন আমরাই উদ্যোগ নিতাম। কোন সমস্যাই আর সমস্যা থাকত না।
৬. আপনার জীবনসঙ্গী/ জীবনসঙ্গিনীর দূর্বলতা এবং সীমাবদ্ধতাগুলোর ক্ষেত্রে প্রো-একটিভ হোন
প্রতিটি মানুষের মতো আপনার স্ত্রী বা স্বামীরও কিছু দোষ-ত্রুটি বা সীমাবদ্ধতা থাকবেই। তার চরিত্রের এমন কিছু দিক থাকবে যা আপনার মনপছন্দ না-ও হতে পারে। এই দিকগুলো আপনি কীভাবে সামলাবেন তার উপরই নির্ভর করবে আপনার দাম্পত্যজীবন কতটা সুখের হবে। খেয়াল রাখুন নিচের টিপসগুলো:
• জীবনসঙ্গী/ জীবনসঙ্গিনীকে পুরোপুরি গ্রহণ করুন - তার দুর্বলতা এবং সীমাবদ্ধতাসহ। মনে রাখবেন সমমর্মিতা/ প্রেম আরেকজনকে বিচার করে না, বরং তাকে বোঝার চেষ্টা করে।
• ব্যক্তিকে তার আচরণ থেকে আলাদা করে দেখুন। আজকের আচরণের চাইতে তার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার দিকে মনোযোগ দিলে তার বর্তমান সীমাবদ্ধতাগুলো মেনে নেওয়া সহজ হবে।
• পরস্পরের প্রতি ভালো ধারণাগুলোকেই লালন করুন। স্বামী/স্ত্রীর ভালো গুণগুলো খুঁজে দেখুন এবং সেগুলোর প্রশংসা করুন। এটা তাকে তার সীমাবদ্ধতাগুলো কাটিয়ে উঠতে উৎসাহিত করবে।
• অতীত ভুলে যান। স্বামী/স্ত্রীর অতীত ভুলকে মনে রাখবেন না। বর্তমানকে নিয়ে বাঁচুন।
• স্বামী/ স্ত্রীকে কখনো অন্যের সাথে তুলনা করবেন না। বরং অতীতের সাথে তার বর্তমানের অবস্থানকে তুলনা করে দেখুন তার কতটুকু অগ্রগতি হয়েছে।
৭. আর্থিক বিষয় পরিচালনার ক্ষেত্রে দক্ষ হোন
দাম্পত্যজীবনে সমস্যার অন্যতম একটি কারণ। সমস্যাটি আরও প্রকট হয় যখন স্বামী হয় পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী এবং স্ত্রী থাকে আর্থিক ব্যাপারে পুরোপুরি স্বামীর ওপর নির্ভরশীল। এসব ক্ষেত্রে স্বামীর উপার্জন এবং স্ত্রীর প্রত্যাশার মধ্যে ভারসাম্য না থাকলেই সমস্যা দেখা দেয়। অর্থনৈতিক বিষয়ে ঝামেলা এড়াতে নিচের বিষয়গুলো লক্ষ্য রাখুন।
• প্রথম থেকেই স্বামী/ স্ত্রীকে নিজের উপার্জন সম্পর্কে বাস্তব ধারণা দিন। ফলে অবাস্তব প্রত্যাশা সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়।
• পরস্পরের জন্যে ছোটখাটো হলেও উপহার কিনুন।
• স্বামী/ স্ত্রী তার পরিবারকে আর্থিকভাবে সাহায্য করতে চাইলে বা কোন উপহার দিলে অযৌক্তিকভাবে বাধা দেবেন না।
• ঝোঁকের বশে কেনাকাটা করে অপচয় করবেন না। অপচয় আপনার জীবনে দুর্ভাগ্য নিয়ে আসবে।
• পরিবারে আপনি (স্বামী হিসেবে) একা উপার্জনক্ষম হলে জীবনসঙ্গিনীর আর্থিক চাহিদার উত্তরে যত বেশীবার সম্ভব হ্যাঁ বলুন। আপনার স্ত্রীকে হাতখরচ হিসেবে টাকা দিন এবং সেই টাকা তিনি কীভাবে খরচ করেন সে ব্যাপারে কোন খোঁজ-খবর নেবেন না।
• পরিবারে আপনার স্বামী একা উপার্জনক্ষম হলে আপনার প্রত্যাশাকে যৌক্তিক সীমার মধ্যে রাখুন। তার সামর্থ্যের বাইরে কিছু চাইবেন না।
৮. পরিবারে সময় দিন, সম্পর্ক লালন করুন
জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো পরিবারিক জীবনেও আপনি যদি সাফল্য চান, আপনাকে পরিবারের প্রতি মনোযোগী হতে হবে। বন্ধুদের সাথে আড্ডা কিংবা ক্লাবে তাস বা পুল খেলে সময় কাটানোর চাইতে পরিবারে সময় দিলে সেটা আপনার ভবিষ্যৎ জীবনের জন্যে ভালো হবে। মনে রাখবেন, বাসায় থাকা আর পরিবারের সাথে সময় কাটানো - দুটি সম্পূর্ণ আলাদা ব্যাপার। বাসায় থাকলে টিভি না দেখে পরস্পরের সাথে কথা বলুন, অনুভূতি-মতামত-পরামর্শ বিনিময় করুন। অফিসের চাপ, ঝামেলা বা টেনশনকে অফিসে রেখে শুধুমাত্র পরিবারকেই সময় দিন। সুযোগ থাকলে ঘরের কাজে স্ত্রীর সাথে অংশ নিন।
৯. পরিবারিক সম্পর্কে আত্মিকতা বজায় রাখুন
শুধুমাত্র জৈবিক বা বাহ্যিক আকর্ষণের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সম্পর্কের ভিত খুব দুর্বল হয়। পারস্পরিক সম্পর্কে যখন সমমর্মিতা এবং ধর্মীয় বন্ধন থাকে তখনই সেই সম্পর্ক হয় সুখপ্রদ এবং দীর্ঘস্থায়ী।
জৈবিক সত্তা আমাদেরকে ভাবায় আমি কী পাবো ? আর আত্মিক সত্তা ভাবতে শেখায় আমি কী দিতে পারি? দাম্পত্য জীবন সম্পর্কে সাধারণ ধারণা হলো আমি কী পাবো। কিন্তু মৌলিক সত্য হচ্ছে: যতই আমরা দিতে থাকব, প্রাকৃতিক প্রতিদানের নিয়ম অনুযায়ী আমরা ততই পেতে থাকব। আমাদের বিবাহিত জীবনে সবসময় আমরা শুধু যদি এটা ভাবতে পারি যে: আমি আমার সঙ্গীকে কি দিতে পারি, এর ফলাফল আমাদের বিস্মিত করবে। আমরা তখন আমাদের সঙ্গীর সেইসব দিকে তাকাতে পারব, যেগুলোর দিকে আমরা আগে নজরই দেইনি। আমরা আরও উপলব্ধি করতে পারব যে, স্বামী/ স্ত্রীর কাছ থেকে কিছু চাওয়ার পরিবর্তে তাকে কোনো কিছু দিতে পারার আনন্দ অনেক বেশী। নিঃশর্ত ভালবাসা যে সম্পর্ক তৈরী করে, কোন চাহিদা-চুক্তি-কর্তৃত্ব সেরকম সম্পর্ক তৈরী করতে পারে না। কাজেই কোনোরকম প্রাপ্তির প্রত্যাশা না করে শুধু দিয়ে যান।
১০. কখন হাল ছাড়তে হবে, এটা বুঝুন
যতই চেষ্টা করা হোক, কিছু বিয়ে হয়তো টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয় না। স্বামী বা স্ত্রী যদি অত্যাচারী হয়, তার এমন কোনো চারিত্রিক দোষ থাকে যা সে শোধরাতে রাজী নয়, সে যদি সবসময় অমর্যাদাকর ব্যবহার করে বা আপনার প্রতি বিশ্বস্ত না হয়ে থাকে, তবে এ ধরনের দাম্পত্য সম্পর্কের ইতি ঘটানোই ভাল। এসব ক্ষেত্রে তিনি নিজের স্বভাব পরিবর্তন করে ভালো হয়ে যাবেন এমন আশা না করে বাচ্চা আসার আগেই দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিন। আসলে কেউ কেউ আছে কখনো বদলাতে চায় না। এও মনে রাখা দরকার, দাম্পত্যজীবনে আমি কী দিতে পারি এটা ভাবা আর দুর্বল বা নির্ভরশীল হওয়া এক কথা নয়। তবে আপনার যদি সন্তান থাকে, আইনানুগ বিবাহবিচ্ছেদের আগে সময় নিয়ে, গভীরভাবে সবদিক ভেবে নেবেন।


পাতাটি ১২৮৭ বার প্রদর্শিত হয়েছে।