দশদিক মাসিক

হোম প্রচ্ছদ রচনারক্তে রাঙানো ২১

রক্তে রাঙানো ২১

এইচ এম দুলাল::

“আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি।
ছেলেহারা শত মায়ের অশ্রু গড়ায়ে ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি
আমার সোনার দেশের রক্তে জাগালো ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি।
আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি।
জাগো নাগিনীরা জাগো নাগিনীরা জাগো কালবোশেখীরা
শিশু হত্যার বিক্ষোভে আজ কাঁপুক বসুন্ধরা,

দেশের সোনার ছেলে খুন করে রোখে মানুষের দাবী
দিন বদলের ক্রান্তিলগ্নে তবু তোরা পার পাবি?
না, না, না, না খুন রাঙা ইতিহাসে শেষ রায় দেওয়া তারই
একুশে ফেব্রুয়ারি একুশে ফেব্রুয়ারি।।

সেদিনও এমনি নীল গগনের বসনে শীতের শেষে
রাত জাগা চাঁদ চুমো খেয়েছিল হেসে;

পথে পথে ফোটে রজনীগন্ধা অলকনন্দা যেন,
এমন সময় ঝড় এলো এক ঝড় এলো খ্যাপা বুনো।।
সেই আঁধারের পশুদের মুখ চেনা,

তাহাদের তরে মায়ের, বোনের, ভায়ের চরম ঘৃণা
ওরা গুলি ছোঁড়ে এদেশের প্রাণে দেশের দাবীকে রোখে
ওদের ঘৃণ্য পদাঘাত এই সারা বাংলার বুকে

ওরা এদেশের নয়,
দেশের ভাগ্য ওরা করে বিক্রয়
ওরা মানুষের অন্ন, বস্ত্র, শান্তি নিয়েছে কাড়ি
একুশে ফেব্রুয়ারি একুশে ফেব্রুয়ারি।।
তুমি আজ জাগো তুমি আজ জাগো একুশে ফেব্রুয়ারি
আজো জালিমের কারাগারে মরে বীর ছেলে বীর নারী
আমার শহীদ ভায়ের আত্মা ডাকে
জাগো মানুষের সুপ্ত শক্তি হাটে মাঠে ঘাটে বাটে
দারুণ ক্রোধের আগুনে আবার জ্বালবো ফেব্রুয়ারি
একুশে ফেব্রুয়ারি একুশে ফেব্রুয়ারি।।”

-আব্দুল গাফফার চৌধুরী

আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি। ২১ ফেব্রুয়ারি আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। বাঙালি জাতির ইতিহাসে এ দিনটি যোজনা করেছে অগ্নিফলকের অধ্যায়। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কোর সিদ্ধান্তে ২১ ফেব্রুয়ারি 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস' হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। ২১ ফেব্রুয়ারি আজ পৃথিবীবাসীর চেতনার অক্ষরেখা স্পর্শ করেছে। 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস' হিসেবে এই স্বীকৃতি প্রদান বাংলার ভাষা এবং বাঙালি জাতির অনন্যপূর্ব বিজয়। এই বিজয় বাঙালি জাতির, বাঙালি সংস্কৃতির এবং বাংলা ভাষা ও সভ্যতার। এ বিজয়ের কোনো প্রতিতুলনা নেই।
বাংলা ভাষা আজ আমাদের রাষ্ট্রভাষা। পৃথিবীবাসী বাংলাকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশ। বাংলা ভাষা এখন সারা পৃথিবীতে বিশেষ সম্মান এবং মর্যাদার আসন অর্জন করেছে।

২১ শে ফেব্রুয়ারি আজ শুধু আমাদের শহীদ দিবস না বরং পৃথিবীর সব দেশের, সব জাতির, সব মানুষের, “ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস” এ ভাষার দাবিতে কত সংগ্রাম করতে হয়েছে দেশবাসীকে। শুধু কি সংগ্রাম? না । এ ভাষার মর্যাদা রক্ষার্থে রাজপথে রক্ত ঢেলে দিতে হয়েছে। জেল জুলুমের শিকার হতে হয়েছে দেশবাসীকে। পৃথিবীর আর কোন জাতিকে ভাষার জন্য জীবন উৎসর্গ করতে হয়নি। একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির প্রথম দাবি ওঠে ১৯৯৭ সালে, ভাষাশহীদ আবদুল জব্বারের জন্মস্থান ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলায়। স্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠন গফরগাঁও থিয়েটার ওই দাবির পক্ষে শোভাযাত্রা করে দেয়াল ও বাস-ট্রেনে পোস্টার সেঁটে দেয়। দুই বছর পর তাদের একুশের সংকলনেও সেøাগান ছাপে-'বিশ্ব মাতৃভাষা দিবস চাই! একুশের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি চাই!' ১৯৯৮ সালের ৯ জানুয়ারি কানাডা প্রবাসী বাঙালি রফিকুল ইসলাম জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব কফি আনানকে একটি চিঠি লেখেন। চিঠিতে ১৯৫২ সালে ভাষাশহীদদের অবদানের কথা উল্লেখ করে একুশে ফেব্রুয়ারিকে 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস' হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাব করেন। সে সময় জাতিসংঘ মহাসচিবের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত হাসান ফেরদৌসের নজরে আসে চিঠিটি। তিনি ১৯৯৮ সালের ২০ জানুয়ারি রফিককে অনুরোধ করেন জাতিসংঘের অন্য কোনো সদস্য রাষ্ট্রের কারো কাছ থেকে একই ধরনের প্রস্তাব আনার ব্যবস্থা করতে। এরপর আরেক কানাডা প্রবাসী আবদুস সালামকে সঙ্গে নিলেন রফিক। তাঁরা 'অ্যা গ্রুপ অব মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ অব দ্য ওয়ার্ল্ভ্র' নামে একটি সংগঠন দাঁড় করান। ১৯৯৮ সালের ২৯ মার্চ কফি আনানকে এ সংগঠনের পক্ষ থেকে লেখা একটি চিঠিতে প্রস্তাব করেন, যার উল্লেখযোগ্য অংশ হচ্ছে, ঞযব ইবহমধষর যধাব ঢ়ষধুবফ ধ াবৎু রসঢ়ড়ৎঃধহঃ ৎড়ষব রহ ঢ়ৎড়ঃবপঃরহম ঃযবরৎ গড়ঃযবৎ খধহমঁধমব ভৎড়স ংবৎরড়ঁং পৎরংরং ৎবষধঃবফ ঃড় রঃং বীরংঃবহপব. ওহ ঃড়ফধু'ং ড়িৎষফ ঃযবৎব ধৎব সধহু হধঃরড়হং ধহফ/ড়ৎ পড়সসঁহরঃরবং ংঃরষষ ভধপরহম ংবৎরড়ঁং পৎরংরং ধহফ ঃযৎবধঃ ধমধরহংঃ ঃযবরৎ গড়ঃযবৎ খধহমঁধমবং.

প্রস্তাবে স্বাক্ষর করেন সাতটি ভাষার ১০ জন প্রতিনিধি। তাঁরা হলেন অ্যালবার্ট ভিনজন ও কারমেন ক্রিস্টোবাল (ফিলিপিনো), জ্যাসন মোরিন ও সুসান হজিন্স (ইংরেজ), ড. কেলভিন চাও (ক্যান্টনিজ), নাজনীন ইসলাম (কাচ্চি), রেনাটে মার্টিনস (জার্মান), করুণা জোসি (হিন্দি) এবং রফিকুল ইসলাম ও আবদুস সালাম (বাংলা)। এর জবাবে জাতিসংঘ জানায়, এসব সাংস্কৃতিক বিষয় দেখভাল করে ইউনেসকো। সুতরাং দাবিটা ওখানে পাঠাতে হবে। ১৯৯৯ সালের মাঝামাঝি সময় হাসান ফেরদৌস রফিক ও সালামকে উপদেশ দেন ইউনেসকোর ভাষা বিভাগের জোসেফ পডের সঙ্গে দেখা করতে। জোসেফের সঙ্গে দেখা করার পর তিনি বলেন, ইউনেসকোর আনা মারিয়ার সঙ্গে দেখা করতে। এই আনা মারিয়া নামের ভদ্রমহিলা রফিক-সালামের কথা মন দিয়ে শুনে বলেন, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের চিন্তাটা বেশ যুক্তিযুক্ত, তবে কোনো সংগঠনের দাবি তারা আমলে আনতে পারেন না। জাতিসংঘের কোনো সদস্য রাষ্ট্র প্রস্তাব পাঠালে তবেই একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেওয়া যেতে পারে।
এবার রফিকুল ইসলাম চিঠি লিখলেন আমাদের দেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে। মন্ত্রণালয় ব্যাপারটার গুরুত্ব বুঝে তাড়াতাড়ি একটি প্রস্তাব বানিয়ে পাঠিয়ে দিল প্রধানমন্ত্রীর কাছে। তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও শিক্ষামন্ত্রী এ এস এইচ কে সাদেক দ্রুত পদক্ষেপ নিলেন। শিক্ষাসচিব কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ, অধ্যাপক কফিলউদ্দিন আহমেদ, মসিউর রহমান (প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ের তৎকালীন পরিচালক), সৈয়দ মোজাম্মেল আলী (ফ্রান্সে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত), ইকতিয়ার চৌধুরী (কাউন্সেলর), তোজাম্মেল হকসহ (ইউনেসকোর সেক্রেটারি জেনারেলের শীর্ষস্থানীয় উপদেষ্টা) অন্য অনেকেই এতে জড়িত হন। তাঁরা দিনরাত পরিশ্রম করে আরো ২৯টি দেশকে প্রস্তাবটির পক্ষে নিয়ে আসেন। ১৭ নভেম্বর ১৯৯৯ সভার শুরুতেই প্রস্তাবটি উত্থাপন করল বাংলাদেশ ও সৌদি আরব। অন্য ২৫টি দেশের সদস্যরা সেটিকে অনুমোদন করেন। এমনকি ১৯৫২ সালে বাংলা ভাষার মূলোৎপাটনের ষড়যন্ত্রে যারা লিপ্ত হয়েছিল, সেই পাকিস্তানও একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে সমর্থন জানায়। ২০০০ সালে ইউনেস্কো বাংলা ভাষা আন্দোলন, মানুষের ভাষা এবং কৃষ্টির অধিকারের প্রতি সম্মান জানিয়ে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে।
২০০০ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি প্রথমবারের মতো পালিত হয় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। ইউনেসকোর পর জাতিসংঘও একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস' হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ২০০৮ সালের ৫ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এখন কিন্তু দিনটি আর শুধু আমাদের নয়, সমগ্র বিশ্বের। বিশ্বের সব জাতির মাতৃভাষার অধিকার রক্ষার দিন- আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। ইংরেজ-ফরাসি-চাকমা-সাঁওতাল- সবাই যাতে তাদের মাতৃভাষায় কথা বলতে পারে, গর্ব করতে পারে, সে লক্ষ্যেই জাতিসংঘ এ দিবসটি করেছে। পাশাপাশি সবাই জানতে পারবে- এই দিনেই বীর বাঙালিরা প্রাণ দিয়ে দাম দিয়েছিল মাতৃভাষার।

ভাষা আন্দোলন আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক অনন্য চেতনাদ্বীপ্ত অধ্যায়। এ আন্দোলন কেবল বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেনি বরং সামনে এগিয়ে যাবার প্রেরণা সৃষ্টি করেছে। সে প্রেরণাতেই দেশবাসী পরবর্তীতে স্বাধীকার আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট ভারতবর্ষ নামক উপমহাদেশটি বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান নামে যে নতুন রাষ্ট্রটি বিশ্বের মানচিত্রে আত্মপ্রকাশ করে বাংলাদেশ তারই অংশ বিশেষ পূর্বাঞ্চলীয় হিসেবে পূর্ববাংলা নামে পরিচিত হয়। পশ্চিম পাকিস্তানে উর্দু ও পূর্ব পাকিস্তানে বাংলা ভাষা ব্যবহৃত হতো। তবে বেশি সংখ্যক-ই-বাংলা ভাষায় কথা বলতো।
১৯৪৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর “পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু” নামে একটি পুস্তিকার মাধ্যমেই সর্বপ্রথম রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সূচনা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞানের তরুণ অধ্যাপক আবুল কাসেমের প্রচেষ্টা ও সম্পাদনায়ই এ ঐতিহাসিক পুস্তকটি প্রকাশিত হয়। তৎকালীন একটি নব গঠিত সাংস্কৃতিক সংগঠন এ বই প্রকাশের দায়িত্ব পালন করে। তখনই সকলের চিন্তা কে নাড়া দেয় আসলে ভাষা কোনটি হবে। সে সময় থেকে ভাষা আন্দোলনের সুত্রপাত হয়। বাংলা ভাষাকে ঘিরে সৃষ্ট এ আন্দোলনের মাধ্যমে তৎকালীন পাকিস্তনের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গণ দাবীর বহিঃপ্রকাশ ঘটে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তে এ আন্দোলন চূড়াস্ত রূপ ধারণ করলেও বস্তুত এর বীজ বপিত হয়েছিল বহু আগে, অন্যদিকে এর প্রতিক্রিয়া এবং ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী।
১৯৪৭ সালে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ব্রিটিশ ভারত ভাগ হয়ে পাকিস্তানের উদ্ভব হয়। কিন্তু পাকিস্তানের দু’টি অংশ - পূর্ব পাকিস্তান এবং পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে সাংস্কৃতিক, ভৌগোলিক ও ভাষাগত দিক থেকে অনেক মৌলিক পার্থক্য বিরাজ করছিল। অধ্যাপক গোলাম আযম ১৯৪৮ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় খেলার মাঠে ছাত্র জনতার ঐতিহাসিক সমাবেশে তৎকালীন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানকে ঢাকসুর এর পক্ষ থেকে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি সংবলিত মেমোরেন্ডাম পাঠ ও প্রদান করেন। তখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের নির্বাচিত জি এস ছিলেন। ১৯৪৮ সালে এবং ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন করার অপরাধে তাকে কারাগারে পাঠনো হয় । ১৯৪৮ সালে পাকিস্তান সরকার ঘোষণা করে যে, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। এ ঘোষণার প্রেক্ষাপটে পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থানকারী বাংলাভাষী সাধারণ জনগণের মধ্যে গভীর ক্ষোভের জন্ম হয় ও বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। কার্যতঃ পূর্ব পাকিস্তান অংশের বাংলাভাষী মানুষ আকস্মিক ও অন্যায্য এ সিদ্ধান্তকে মেনে নিতে পারেনি এবং মানসিকভাবে মোটেও প্রস্তুত ছিল না। ফলস্বরূপ বাংলাভাষার সম-মর্যাদার দাবিতে পূর্ব পাকিস্তানে আন্দোলন দ্রুত দানা বেধে ওঠে। আন্দোলন দমনে পুলিশ ১৪৪ ধারা জারি করে ঢাকা শহরে সমাবেশ-মিছিল ইত্যাদি বে-আইনী ও নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি (৮ ফাল্গুন ১৩৫৮) এ আদেশ অমান্য করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু সংখ্যক ছাত্র ও প্রগতিশীল কিছু রাজনৈতিক কর্মী মিলে মিছিল শুরু করেন। মিছিলটি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের কাছাকাছি এলে পুলিশ ১৪৪ ধারা অবমাননার অজুহাতে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলিবর্ষণ করে। গুলিতে নিহত হন রফিক, সালাম, বরকত-সহ আরও অনেকে। শহীদদের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়ে ওঠে। শোকাবহ এ ঘটনার অভিঘাতে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ক্রমবর্ধমান গণআন্দোলনের মুখে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার শেষাবধি নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয় এবং ১৯৫৬ সালে বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি প্রদান করে।
যদি কবি নজরুল ইসলামের মত বিরাট প্রতিভা ধুমকেতুর মত সাহিত্যাকাশে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য নিয়ে আবির্ভূত না হতো, তাহলে সাহিত্যে মুসলিম জনগণের মুখের ভাষার পূণর্বাসন সম্ভব হতো না, নজরুলের প্রভাবে মুসলিম কবি সাহিত্যিদের অনেকেই বাংলা ভাষাকে সংস্কৃত ভাষার আগ্রাসন থেকে বাঁচিয়ে রাখার প্রচেষ্টায় নিয়োজিত রয়েছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় যে, এদেশের একশ্রেণীর কবি সাহিত্যিক কখনও কলকাতাকেই বাংলাভাষার রাজধানী মনে করে পশ্চিম বঙ্গের অনুকরণে এরা সদা সচেষ্ট। আদর্শগতভাবে এরা শুধু বাঙালী, মুসলিম পরিচয়কে তারা সাম্প্রদায়িকতা মনে করে। স্বাধীন দেশের মাটিতে ভাষা আন্দোলনের আসল উদ্দেশ্য আজও সফল হয়নি। মনের সকল কথা ব্যক্ত করার অধিকার প্রতিষিষ্ঠিত হয়নি আজ অবধি । প্রকৃত গণতন্ত্র আর মতপ্রকাশের অধিকার দিতে হবে দেশের প্রতিটি মানুষকে, ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থ চিন্তা বাদ দিয়ে দেশের গণমানুষের মুখের ভাষাকে সত্যিকারের মর্যাদা দেবার চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।
দেশের প্রতিটি শিশু প্রথম যে কথা বলে তা বাংলায়। যে ভাষায় কথা বলে তা বাংলাভাষা। শিশুটি তার সবচেয়ে আপনজন তার মাকে ডাকে বাংলায়। মা তার কলিজার টুকরো সন্তানকে কাছে ডাকে বাংলায়। সেই বাংলা ভাষার সাথে রয়েছে এ দেশ, দেশের মানুষ তথা জাতির নাড়ির টান। এ বাংলা ভাষাকে দেশবাসী মায়ের মতই ভালবাসে। আর তাই ভাষার নামেই তারা দেশটির নাম রেখেছেন বাংলাদেশ। মহান একুশ আমাদের সবার মধ্যে ঐক্য ও সম্প্রীতির সেতুবন্ধন রচনা করে। একুশের সবচেয়ে বড় দান হলো গোটা জাতিকে সে একত্রিত করতে সফল হয়েছে। জাতির ওপর যতো বড়ই আঘাত আসুক না কেন, জাতি আত্মকলহে যতই নিমজ্জিত থাকুক না কেন, একুশকে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করতে সবাইকে একত্রেই আসতে হয়। এভাবে একুশ সকলের মধ্যে ঐক্য ও সম্প্রীতি সৃষ্টি করে।


টোকিও শহীদ মিনার,
বহির্বিশ্বে প্রথম স্থায়ী শহীদ মিনার
আকারঃ ২.৬ মিটার (উচ্চতা), ২.৫ মিটার (প্রস্থ)। নক্সাঃ ঢাকাস্থ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের মাপের সাথে মিলিয়ে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রস্তুতকৃত। কাঠামোঃ ষ্টীল ফ্রেম। (পার্ক প্রাঙ্গনে, জাপানে সংস্কৃতি চর্চার প্রাণকেন্দ্র,টোকিও মেট্রোপোলিটন আর্ট স্পেস অবস্থিত, যা মূলত ষ্টীল ফ্রেমে নির্মিত)। স্থানঃ ইকেবুকুরো নিশিগুচি (ওয়েস্ট গেট) পার্ক। টোকিওর প্রাণকেন্দ্রইকেবুকুরোতে অবস্থিত এই পার্কটি ট্যুরিস্ট স্পট হিসেবে বিখ্যাত। প্রস্তাবনাঃ তোশিমা সিটি কর্তৃপক্ষের কাছে শহীদ মিনার নির্মাণের প্রস্তাবক ডঃ শেখ আলীমুজ্জামান, যা সমর্থন করেন ডঃ ওসামু ওতসুবো। পরবর্তীতে ২০০৫ সালের বৈশাখী মেলা কমিটি আনুষ্ঠানিক ভাবে প্রস্তাবটি উত্থাপন করে, যার সমর্থনে এগিয়ে আসে বাংলাদেশ সরকার। বৈশিষ্ট্যঃ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক নির্মিত, বহির্বিশ্বে এটাই প্রথম শহীদ মিনার। ভিত্তি প্রস্তরঃ ১২ই জুলাই, ২০০৫ উদ্বোধনঃ ১৬ই জুলাই, ২০০৬, সপ্তম টোকিও বৈশাখী মেলা।


পাতাটি ১১২৬ বার প্রদর্শিত হয়েছে।