দশদিক মাসিক

হোম প্রচ্ছদ রচনাজীবনের পরিবর্তনে চাই ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি

জীবনের পরিবর্তনে চাই ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি

এইচ এম দুলাল::

তরুণ প্রজন্মের বড় একটা অংশকে আমারা হতাশায় ভুগতে দেখি । তারা অনেক ডিপ্রেসড, জীবন নিয়ে মহা চিন্তিত তারা। মনে প্রশ্ন জাগে, এই হতাশা আসছে কোত্থেকে? উত্তর মেলে, এই হতাশার মূলে আছে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি। এই এক দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনতে পারলে কিন্তু জীবনটা অনেক সহজ হয়ে যায়, জীবনের অংক মেলাতে আর হতাশ হতে হয় না। মানুষ জীবন বদলাতে কত প্রচেষ্টাই না করে। জীবনকে সাফল্যের কাংখিত মঞ্জিলে পৌঁছানোর লক্ষ্যে চলে মানুষের অবিরাম সংগ্রাম। কিন্তু সংগ্রাম অবিরাম চললেও কাঙখিত সাফল্য মানুষ পায় না। এই কাঙখিত সাফল্যে পৌঁছতে না পারার কারণ বিশ্লেষণ করলে যে কয়টি মূল বিষয় সামনে উঠে আসে তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো সুসম্পন্ন দৃষ্টিভঙ্গির অভাব। একটি সুসম্পন্ন দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে দিতে পারে মানুষের জীবন। যারা দিনের পর দিন, মাসের পর মাস অবিরত প্রচেষ্টা চালিয়েও কাক্সিক্ষত সাফল্যে পৌঁছাতে পারেন না তারা যদি সত্যিকারার্থে কাজের শুরুতেই সুসম্পন্ন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ শুরু করতে পারেন তাহলে নিশ্চিতভাবেই বলা যায় সাফল্য তাদের পদতলে আশ্রয় নেবে। ইংরেজি ভাষায় দৃষ্টিভঙ্গি শব্দ একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থ বহন করে। ইংরেজিতে একে বলে ‘Attitude’, ব্যক্তিজীবনে সফলতার নিশ্চয়তা এই Attitude। আর সুসম্পন্ন দৃষ্টিভঙ্গির অর্থ হলো কাজের উপযোগী, কর্মস্থলের উপযোগী, জীবিকার উপযোগী চমৎকার দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করা। যিনি একজন ছাত্র তার অ্যাকাডেমিক ক্যারিয়ারে দৃষ্টিভঙ্গি যদি ছাত্রসুলভ না হয় তাহলে তার ক্যারিয়ার কখনো সমৃদ্ধ হতে পারে না। একজন ছাত্রের সুসম্পন্ন দৃষ্টিভঙ্গির অর্থ হবে পড়া পড়া আর পড়া। পড়াশোনা করে হতাশা কাটিয়ে ব্যর্থতা ছাড়িয়ে জ্ঞানের রাজ্যে বিচরণ করে কাক্সিক্ষত সাফল্য ছোঁয়া। তেমনিভাবে একজন শিক্ষকের দৃষ্টিভঙ্গি হবে উত্তম পাঠদানে সুশিক্ষিত জাতি গড়ে তোলা। সে ক্ষেত্রে শিক্ষাদানের পরিবেশ যদি ছাত্রদের প্রতি শিক্ষাসুলভ, সুলভ এবং প্রয়োজনে শাসনমূলক না হয়, তাহলে তিনি প্রকৃত পাঠদানে ব্যর্থ হবেন। ছাত্ররা বঞ্চিত হবে উপযুক্ত প্রশিক্ষণ থেকে। উন্নত জাতি গঠনের কর্মসূচি চরমভাবে ব্যর্থ হবে। ঠিক এমনিভাবেই কোনো প্রশাসক ভালো প্রশাসক হতে পারেন না যতক্ষণ না তার দৃষ্টিভঙ্গি সুসম্পন্ন না হয়। মায়ের দৃষ্টিভঙ্গি যদি মাতৃসুলভ, বাবার দৃষ্টিভঙ্গি যদি পিতৃসুলভ না হয় তাহলে বাবা-মা কাক্সিক্ষত ইচ্ছা অনুযায়ী সন্তান গড়ে তুলতে পারেন না। মালিক যদি কর্মচারীদের প্রতি উপযুক্ত দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ না করেন আর কর্মচারীরাও যদি কাজের ক্ষেত্রে সুদৃষ্টি না দেন তাহলে শ্রমিক-মালিকের মাঝে বৈরী সম্পর্ক তৈরি হয়। আর সম্পর্কের ক্ষেত্রে এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গিই সার্বিক উৎপাদন, উপার্জন এবং সাফল্য ধ্বংস করে দিতে বাধ্য। সাংগঠনিক জীবনে একজন সংগঠকের সুসম্পন্ন ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির ওপরই সংগঠনের কাক্সিক্ষত সফলতা নির্ভর করে। সমান যোগ্যতা, আন্তরিকতা এবং পরিশ্রম ঢেলে দেয়ার পরও দু’জন দু’রকম সাফল্য পান। এর কারণ হলো কাজের শুরুতে একজন সুসম্পন্ন ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি লালন করেন, আর আরেকজন দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়টি আমলেই নিতে চান না। ব্যক্তিজীবনে প্রত্যেক ব্যক্তিই নিজ নিজ ক্ষেত্রে উপযোগী দৃষ্টিভঙ্গি লালন না করলে কাক্সিক্ষত সাফল্যে পৌঁছাতে পারেন না। কারণ সাফল্যের মূল ভিত্তি হচ্ছে সুসম্পন্ন দৃষ্টিভঙ্গি। বিশ্ববিখ্যাত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, শতকরা ৮৫ ভাগ ক্ষেত্রে ব্যক্তি সফলতা পায় তার সুসম্পন্ন দৃষ্টিভঙ্গির কারণে।

সর্বক্ষেত্রেই ইতিবাচক থাকুন
ইতিবাচকতা সম্ভাবনার কথা বলে,বিশ্বাসের কথা বলে। জীবনে জয়ী হতে হলে সর্বক্ষেত্রে ইতিবাচক হতে হবে। আমাদের চারপাশে প্রতিনিয়ত যা ঘটছে তা অনেকসময়ই আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। একই সাথে আমাদের দুঃখ দুর্দশার কারণও হলো ঘটনার প্রেক্ষিতে আমাদের প্রতিক্রিয়া। এজন্যে আমাদের জীবন, জয়ের আনন্দে উদ্ভাসিত হবে না পরাজয়ের গ্লানিতে পূর্ণ তা নির্ভর করবে আমাদের ইতবাচক বা নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির প্রাবল্যের উপর। যখন দৃষ্টিভঙ্গিটা সঠিক হয় তখন জীবন আসলে অনেক সহজ, উপভোগ্য এবং সাফল্যমন্ডিত মনে হয়। দৈনন্দিন জীবনের অনেক ছোটখাটো বিষয় থেকে শুরু করে যেকোনো বড় সমস্যার মোড় আমরা ঘুরিয়ে দিতে পারি যদি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ইতিবাচক হয়। সুখী হতে হলে অপ্রয়োজনীয় অনেক কিছু ভুলে থাকতে হয়। আমি অপ্রয়োজনীয় সবকিছু ভুলে থাকবো। যেমন-মাছি গায়ে বসতে নিলে আমরা তাড়িয়ে দেই সেভাবে তাড়িয়ে দেয়া। যতবার বসবে ততবার তাড়িয়ে দেয়া। মনে মনেও যদি চিন্ত করি- বাহ্! কী সুন্দর একঝাঁক পাখি। মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকি। আর যখনই এই ঘটনাটা মুগ্ধকর মনে হয় তখন আমাদের মধ্যে একটা সুখ সুখ অনুভূতি আসে। কিন্তু এর বিপরীত যদি হয়? যদি কেউ বিরক্ত হয়? তখন মুখে কিছু না বলে শুধু যদি মুখভঙ্গি বিকৃত করে ফেলে বা ছোট্টখাট্ট বিরক্তিবোধক শব্দ উচ্চারণ করে যেমন-ই্স!, উহফ!, আহ্হা রে! তখন আবার আমাদের ভেতরে কম ভালো লাগার একটা অনুভূতি সৃষ্টি হয়। এই শব্দগুলো আরেকজনের মুখে শুনলে যেমন আমাদের কম ভালো লাগে, তেমনি নিজে বললে ভালো লাগার কথা নয়। ইতিবাচক হওয়ার জন্যে কথার একটা প্রভাব আছে। যে কারণে, আমাদের কথাবার্তায় বিরক্তি প্রকাশ করে এমন শব্দ-ই্স!, উহফ!, আহ্হা রে! আবার অনেক সময় দীর্ঘশ্বাস ছাড়া, আরে বাপুরে!, ধ্যাত, ধুত্তুরি, যত্তোসব, অসহ্য ইত্যাদির ব্যাপারে আমাদের সচেতন হতে হবে। আসলে অসহ্য বলাটা সহজ, সহ্য বলাটা কঠিন। তবে একবার অভ্যস্ত হতে শুরু করলে সহ্য বলাটা সহজ, সহ্য করাটা সহজ। শর্ত শুধু একটাই মন থেকে চাওয়া। লোক দেখানোর জন্যে না, বা ভান করার জন্যেও না।

বিব্রতকর পরিস্থিতে মাথা ঠান্ড রাখুন
সকালে ঘুম থেকে উঠে, ঘুমের ঘোরে দাঁত ব্রাশ করার পর বুঝতে পারলেন সেটা অন্য আরেকজনের ব্রাশ, তখন কী অনুভূতি হবে-গা গুলিয়ে উঠা/ প্রচন্ড রাগ করা/ নিজের ব্রাশ দিয়ে আরেকবার ব্রাশ করা। এই ঘটনার ইতিবাচকতাস্বরূপ যে, নিজের ব্রাশ দিয়ে আরেকবার ব্রাশ করা। যার ব্রাশ ভুল করে ব্যবহার করা হয়েছে তাকে তা জানানো। খাওয়ার সময় বুঝলেন খাবারে অতিরিক্ত লবণ দেয়া হয়েছে ফলে মুখেই দেয়া যাচ্ছে না। অথবা খাবার খেতে খেতে খাবারে চুল পেলেন, নয়তো সবজির পোকা পেলেন। তখন কী করবেন?- প্রো-একটিকভাবে শুকরিয়ার সাথে খেয়ে নেয়া/ ওয়াক থু বলে ফেলে প্লেট ছুঁড়ে দিয়ে টেবিল ছেড়ে চলে যাবেন? প্রো-একটিকভাবে শুকরিয়ার সাথে খেয়ে নেয়া। হতে পারে আপনি কোনো কাজ করছেন হঠাৎ কোনো টিকটিকি/ তেলাপোকা মাথায় লাফিয়ে পড়লো, কী করবেন? চুল ফেলে দেবেন/ নাকি তক্ষুণি শ্যাম্পু করতে বাথরুমে ঢুকবেন/ নাকি একটা ঝাড়া দিয়ে টিকটিকি ফেলে দিয়ে যা করছিলেন তা করবেন।একটা ঝাড়া দিয়ে টিকটিকি ফেলে দিয়ে যা করছিলো তা করবে। এমন হতে পারে কাঁদায় পা পিছলে পড়ে গিয়ে আপনার জামা নষ্ট হয়ে গেছে আর অপর দিকে যারা দেখছেন তারা হাসছেন। তখন কী করবেন- কাঁদবেন/ তাদের সাথে হাসিতে যোগ দেবেন/ মাথা নিচু করে সেখান থেকে দ্রুত চলে আসবেন? ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে তাদের সাথেও হাসিতে যোগ দিয়ে পরিস্থিতিটা স্বাভাবিক মনে করা, সুযোগ থাকলে বাসায় গিয়ে পোশাক পাল্টে আবার নিজের কাজে যাওয়া। আসলে এ ধরনের অসংখ্য বিব্রতকর ঘটনা আমাদের জীবনে অহরহ ঘটে চলেছে। এসব ক্ষেত্রে সচেতন থাকলে ভালো কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে সচেতন হওয়ার সুযোগও থাকে না। যেমন গাছের নিচ দিয়ে হেঁটে যাচেছন হঠাৎ অনুভব করলেন মাথায় তরল জাতীয় কী যেন পড়লো। হাত দিয়ে বুঝলেন পাখি টয়লেট করেছে। এখন লাজুক হাসি হাসা ছাড়া আপনার আর কিছু করারও নাই। কারণ আপনি যতই বিরক্ত হোন বা রেগে যান না কেন আপনার পক্ষে সেই পাখিটাকে ধরে বকা দেয়ার কোনো সুযোগ নাই। আর এরকম বিব্রতকর অবস্থায় অন্যরা হাসছে কিন্তু আপনার মাথায় পড়ার পরেও আপনি হাসতে পারছেন কি না-এটাই গুরুত্বপূর্ণ। হাসতে না পারলে আপনার কাছে পরিস্থিতি জটিল মনে হবে, আর হাসতে পারলে মনে হবে এটা খুব সহজ স্বাভাবিক ব্যাপার।

সমস্যাকে মোকাবেলা করুন
সমস্যাকে সম্ভাবনা বলে হাসিমুখে ঠান্ডা মাথায় বিশ্বাসের সাথে ফেস করতে হবে। যখন মনে করবেন এটা কোনো ব্যাপার না। এরচেয়েও খারাপ কিছু হতে পারতো। অর্থাৎ দুর্ঘটনাকে ফেনানোর দরকার নেই। না ফেনিয়ে এটাকে ফানে রূপান্তরিত করতে পারাই ইতিবাচকতা। যেমন, হয়তো শুনলেন, আপনার এক বন্ধু এক্সিডেন্ট করেছে। পায়ে চোট পেয়েছে, তাই পা দুটো বেডের সাথে বাঁধা। তাকে দেখতে গিয়ে যদি আহা, উহু করেন তাহলে তার ব্যথা কমবে না, বরং বাড়বে। সেসময় যদি তার রুমে ঢুকেই খুব উচ্ছ্বসিত হয়ে একটা সালাম দিয়ে বলেন, দোস্ত কেমন আছো। তোমাকে তো দেখতে লাগছে খুব ভালো। একটা ছবি তুলে রাখো। নাতি-নাতনিদের দেখাতে পারবে। যে দাদুকে একবার বিছানার সাথে এভাবে বেঁধে রাখা হয়েছিলো। বন্ধু তখন কী বলবে? অনেকদিন তো হাসে নাই। একটু দাঁত বের করবে। কিংবা কপট রাগ দেখিয়ে বলবে, এই কথা তুমি বলতে পারলে? আসলে এটা মুখের কথা, মনের কথা কী? অনেকদিন পর একটু ভালো লাগছে, তোমরা এসে কথা বলছো বলে। অর্থাৎ ঘটনা যত শোচনীয় হোক না কেন তার মধ্য থেকে ভালো দিককে খুঁজে বের করে আনতে হবে। যেমন স্বর্ণের খনি থেকে তো স্বর্ণ পাওয়া যাবেই। কিন্তু সার্থকতা হচ্ছে ছাইয়ের স্তুপ থেকে স্বর্ণ খুঁজে পাওয়া। অর্থাৎ একটি আপাত কষ্টের ঘটনারও ভালো দিককে যত গ্রহণ করতে পারবো তত আমাদের শান্তি, সুখ আসতে থাকবে, এই শান্তি-সুখের আবেশ নিয়ে অনেক কাজ করতে পারবো, আমাদের সাফল্য বাড়তে থাকবে। আসলে আপনি যখন অন্যের আচরণে প্রভাবিত হবেন তখন তাকে আর আপনার আচরণ দ্বারা প্রভাবিত করতে পারবেন না। তাই সবসময় অন্যের সাথে সে-ই আচরণ করুন যে আচরণ আপনি আগে থেকে ঠিক করে রেখেছিলেন। জীবনযুদ্ধে প্রতিপক্ষ সবসময় আপনাকে উত্তেজিত ও আবেগপ্রবণ করার চেষ্টা করবে, আপনার লক্ষ্য থাকবে ঠান্ডা মাথায় সমস্যাকে কীভাবে সমাধান করতে পারেন। মনের প্রশান্তির জন্যে নিজের ওপর নিজের এই নিয়ন্ত্রণ আনাটা হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অন্যের ভিত্তিহীন কথার পরিপ্রেক্ষিতে উত্তেজনা, ক্রোধ এবং জীবন নাশের একটা ভুল সিদ্ধান্ত মানুষকে জীবনে অনেক পিছিয়ে দেয়।


সহজভাবে চিন্তা করুন
আমাদের সবারই কিন্তু এ ধরনের বন্ধু আছে যারা সবসময় বলতে থাকে “দোস্ত আমার কী হবে, আমি পড়া কিচ্ছু পারি না!” আর রেজাল্ট বের হলে দেখা যায় ফাটাফাটি একটা নম্বর পেয়ে যায় তারা! আবার আরেক রকম বন্ধু আছে যারা বেশি পড়ালেখা করে না, আর সেটি নিয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই। একশোতে পাশ নম্বর চল্লিশ তুলতে পারলেও তারা খুশি। প্রথম ধরণের বন্ধুদের মনে সবসময় চলতে থাকে যে, বেশি করে ভালোমত পড়াশোনা না করলে রেজাল্ট খারাপ হবে, তার চাকরি-বাকরি হবে না, বিয়ে হবে না, কিচ্ছু হবে না! তার জীবনে নেমে আসবে মহা অন্ধকার। দ্বিতীয় ধরণের বন্ধুদের মাথায় খেলা করে অন্য বিষয়। পরীক্ষা তাদের কাছে স্রেফ একটা পরীক্ষাই। এটায় খারাপ করলে পরের টায় ভালো করবে, সুযোগের তো আর অভাব নেই- এমনই চিন্তাধারা তাদের। তাহলে যেটা দেখা যাচ্ছে, স্রেফ দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা বলে দুজন বন্ধুর পরীক্ষা নিয়ে ধারণা বেমালুম আলাদা হয়ে যাচ্ছে! আমাদের জীবনটাও কিন্তু ঠিক এরকমই। চারপাশে তাকালে দেখা যাবে প্রচুর মানুষ আছে যারা অনেক কিছু করেও সুখী না, তাদের কাছে জীবনটাই একটা হতাশার নাম, সবকিছুই কঠিন তাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে। ভালো কিছু করলেও সেটিকে তাদের কাছে অনেক কম মনে হয়! কিছু মানুষ আবার জীবনটাকে খুব সহজভাবে নেয়। তাদের কাছে সম্ভাবনা এলে তারা তা হাসিমুখে গ্রহণ করে, সাফল্য পায়। আবার ব্যর্থতায় ভেঙ্গে না পড়ে তারা নতুন কিছুর পথে এগিয়ে যায়। সবকিছুকে সহজভাবে নেয়ার বিরল প্রতিভা তাদের! আমরা আমাদের জীবনকে কীভাবে গড়ব, সেই সিদ্ধান্ত কিন্তু আমাদেরই নিতে হবে। জীবনকে আমরা প্রথম শ্রেণীর সেই বন্ধুদের মত বড্ড কঠিন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে চালাতে পারি, আবার দ্বিতীয় শ্রেণীর এই মানুষগুলোর মত সহজ দৃষ্টিভঙ্গিতেও রাখতে পারি। Choice কিন্তু আমাদের হাতেই!

নিজের জীবন থেকেই সুখ খুঁজে নিন
একটা গল্প আমরা অনেকেই জানি। একজন থাকে মস্ত একটা আলিশান বাড়ির আঠারো তলায়। আঠারো তলার জানালা থেকে সে দেখে, ছেঁড়া একটা হাফপ্যান্ট পরে আরেকটা বাচ্চা বৃষ্টির মধ্যে ফুটবল খেলছে। আলিশান বাড়ির বাচ্চাটাকে তার মা নামতে দেয় নি, বৃষ্টিতে খেললে যদি তার অসুখ করে! আলিশান বাড়ির বাচ্চার মনে বড় কষ্ট। তার মনে হয়, সে যদি এই ছেলেটা হতো, তাহলে বুঝি কতোই না মজা করে বৃষ্টির মধ্যে ফুটবল খেলতে পারতো! মজার ব্যাপার হলো, ঠিক ঐ সময় নিচের বাচ্চাটার মনে চলছে আরেক কথা। তার বাসায় অভাব, অনাহার। তার মনে হয়, সে যদি ওই আলিশান বাড়ির ছেলেটা হতো, তাহলে না জানি কী সুখে থাকতে পারতো সে! বড় বাসা, ভালো জামা-কাপড়, ভালো খাবার- সবই পেতো সে! নিজের চিন্তা-ভাবনাকে একটু পাল্টিয়ে দেখি আমরা পৃথিবীর বেশির ভাগ মানুষের মধ্যেও এই সমস্যাটা বিদ্যমান। অন্য মানুষ কী করে, তারা কেমন সুখে আছে এটি নিয়েই তারা প্রতিনিয়ত চিন্তিত। হতাশা তাদের শেষ হতেই চায় না! অথচ অন্যের জীবন নিয়ে না গবেষণা করে নিজের জীবনের খুঁটিনাটি একটু দেখলে, দুঃখভরা জায়গাগুলো একটু ভালো করার চেষ্টা করলে কিন্তু খুব ভালো থাকা যায়। অন্যের কথা না ভেবে, অন্যের পথে না চলে, নিজেই নিজের জীবন গড়ে তুলতে পারলে আর কিছু লাগেই না। দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টালে তাই জীবনটাও হয়ে যাবে অনেক সুখের।

স্বপ্নগুলোকে উড়তে দিন
প্রবাদ আছে, আমাদের মধ্যে বেশিরভাগ মানুষই ২৫ বছর বয়সে মরে যায়, আর পঞ্চাশ বছর পর তার দেহটা কবর দেয়া হয়। শুনতে অদ্ভুত লাগলেও কথাটা সত্যি। ২৫ বছরে গ্র্যাজুয়েশনের আগে আমাদের মনে কতই না স্বপ্ন থাকে, এটা করবো সেটা করবো। একের পর এক আইডিয়া আসতে থাকে মাথায়, দিতে ইচ্ছে করে ইউরোপ ট্যুর, আরো কতো কি! কিন্তু গ্র্যাজুয়েশনের পর পরিবার থেকে চাপ আসে- বিয়ে করতে হবে, চাকরি নিতে হবে। চাকরিগুলো বেশিরভাগ সময়েই মনমতো হয় না, হতাশা বাড়তে থাকে। সাথে থাকে সংসার চালানোর চাপ, আর জীবন হয় কষ্টের। সেই যে স্বপ্নগুলোর মৃত্যু হলো মনের ইচ্ছার বিরুদ্ধের চাকুরি করে আর সংসারের ঘানি টেনে, সেখানেই আমাদেরও আসলে মৃত্যু হয়। থাকে শুধু নিরস দেহটাই।কিন্তু এমনটা হবার তো কোন দরকার নেই! নিজের চিন্তা-ভাবনাকে একটু পাল্টিয়ে দেখি আমরা। চিন্তা করে দেখি, নিজের জন্যে, দেশের জন্যে বলার মত কী করছি আমরা? যদি কিছু না করেই থাকি, তাহলে করা শুরু করতে দোষ কী? বয়সটা হোক পঞ্চাশ কিংবা আরো বেশি, কাজের কাজ করলে সেটি কোন বাধাই নয়! নিজে কিছু করা শুরু করলেই দেখবে নিজেরও ভালো লাগছে, ইচ্ছে করছে আরো ভালো কাজ করতে!


সুসম্পন্ন দৃষ্টিভঙ্গি জন্মলব্ধ কোনো বিষয় নয়, এটি মনোভাবের পরিবর্তনের মাধ্যমে ধারণ করে লালনের বিষয়। কেউ কেউ ভাবতে পারেন অমুক বিরাট পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছে তার দৃষ্টিভঙ্গি তো সুসম্পন্ন হবেই এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই। বরং মানুষ যখন জন্মগ্রহণ করে তখন সমন মনোভাবের (ফিতরাতের) ওপরই জন্মগ্রহণ করে। সবাই হাত, পা, কান ও মাথা নিয়ে মানুষ হিসেবেই জন্মগ্রহণ করে। রাসূল সা. এ প্রসঙ্গে বলেন, সকল মানুষ একই ফিতরাত বা স্বভাবের ওপরই জন্মগ্রহণ করে, এর পর তার পিতা-মাতা এবং তার পরিবেশ তাকে সে অনুযায়ী পরিচালিত করে। আবার বাহ্যিকভাবে মনে হতে পারে মানুষ মানেই শুধুমাত্র দুটো হাত, দুটো পা কিংবা একটি শরীর গঠনের নাম। বরং হাত পাসহ সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, মেধা-মনন মিলিয়েই একজন সম্পূর্ণ মানুষ। এই সব কিছুর সম্মিলিত দৃষ্টিভঙ্গিই একটি সুসম্পন্ন দৃষ্টিভঙ্গি। সত্যিকারার্থেই কোনো মানুষ সুসম্পন্ন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে জন্মায় না বরং তার দেহ, মন চিন্তা চেতনার সম্মিলিত ইতিবাচক যোগফলই সুসম্পন্ন দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম দেয়।

আমাদের মনে রাখতে হবে পরিবেশ, শিক্ষা, অভিজ্ঞতা এবং নিজ প্রচেষ্টার পরিপ্রেক্ষিতেই একটি সুসম্পন্ন দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠতে পারে। উপরিউক্ত চারটি বিষয়ের প্রভাবে অনেক সময় নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গিয়ে সুসম্পন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে রূপান্তিরত হয়। বদলে যায় ব্যক্তির পুরো জীবন। পরিবেশ ব্যক্তির সুসম্পন্ন দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যিনি সুন্দর পরিবেশে বেড়ে ওঠেন তার দৃষ্টিভঙ্গি হয় সুসম্পন্ন আর যার পারিপার্শ্বিক পরিবেশ নেতিবাচক হয় তার দৃষ্টিভঙ্গি সুসম্পন্ন হয় না। এটি সাধারণ নিয়ম হলেও সমাজে ব্যতিক্রমও রয়েছে। যারা স্রোতের বিপরীতে চলতে জানেন, যাদের মাঝে অদম্য ইচ্ছা এবং সাহস থাকে তারা নেতিবাচক পরিবেশের মাঝে নিজের সার্বিক প্রচেষ্টায় সুসম্পন্ন দৃষ্টিভঙ্গি লালন করে পুরো জীবনটাকেই বদলে দিতে পারেন। একটি সুন্দর পরিবেশে একজন মানুষ যখন বেড়ে ওঠে তখন তার দৃষ্টিভঙ্গি সুসম্পন্ন হওয়াই বাঞ্ছনীয়। পরিবারের সুন্দর পরিবেশ সুসম্পন্ন দৃষ্টিভঙ্গির সহায়ক। সহপাঠীদের সুন্দর আচরণ একজন ছাত্রকে সুসম্পন্ন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে গড়ে উঠতে সহায়তা করে। কর্মক্ষেত্রে মালিক-শ্রমিকের সুসম্পর্কের পাশাপাশি সহযোগীদের সাথে সুসম্পর্ক এবং কর্মক্ষেত্রের সুন্দর পরিবেশ সুসম্পন্ন দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠতে সহায়তা করে। পরিবেশ যে কতখানি সুসম্পন্ন দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে সহায়তা করে তার প্রমাণ আপনাদের আমাদের আশপাশে অহরহই রয়েছে। পাশাপাশি দু’টি খাবার হোটেলের ক্ষেত্রে দেখা যাবে একটি হোটেলের মালিক কর্মচারী এবং এর কাস্টমারদের আচরণ, দৃষ্টিভঙ্গি অভদ্রজনিত। ঠিক পাশেই আরেকটি হোটেলে দেখা যাবে সেখানকার মালিক কর্মচারী যেমন রুচিশীল ও ভদ্র তাদের কাস্টমাররাও রুচিশীল এবং ভদ্র ধরনের। এটি শুধুমাত্র তাদের সুসম্পন্ন দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই হয়েছে আর এই সৌন্দর্য তৈরিতে পরিবেশই তাদের সহায়তা করেছে। একই দেশের দু’টি রাজনৈতিক দলের সাথে তুলনা করলে দেখা যাবে একটি তার প্রতিপক্ষকে নোংরা, হিংসাত্মক এবং নীচু ভাষায় বক্তব্য দিয়ে গায়েল করার চেষ্ট করে। এই নোংরা চর্চা দলের নিম্নস্তর থেকে শুরু করে মধ্যস্তরকে পেরিয়ে অনেক সময় দলের প্রধানেরও ভাষা হয়ে যায়! আর আরেকটি দলকে দেখা যায় একই বিষয়ে প্রতিপক্ষেকে রুচিশীল কিন্তু তির্যক ভাষায় বক্তব্য দিয়ে মোকাবেলা করতে। এটি সম্ভব হয় দলের প্রধান থেকে শুরু করে সর্বস্তরের নেতাকর্মীর মাঝে সুসম্পন্ন দৃষ্টিভঙ্গি লালনের কারণে। সুসম্পন্ন দৃষ্টিভঙ্গির জন্য শুধু মাত্র পরিবেশই যে সহায়ক তা কিন্তু নয় বরং এর সাথে শিক্ষার বিষয়টিও গভীরভাবে জড়িত। সুশিক্ষিত একটি পরিবারে সন্তানদের সাথে অশিক্ষিত পরিবারের দৃষ্টিভঙ্গির তুলনা করলে দেখা যায় স্বল্প শিক্ষিতরা যতই সম্পদশালী হোক না কেন তারা উচ্চশিক্ষিত পরিবারের সন্তানদের চেয়ে সুসম্পন্ন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বেড়ে ওঠেন না। তাদের মাঝে আচরণের পার্থক্য অনেক। তবে শিক্ষিতদের মাঝেও কিছু অথর্ব বা জ্ঞানপাপী থাকেন যারা শিক্ষার পুঁজিকে ঢাল বানিয়ে বড়াই করেন। তখন তাদের দৃষ্টিভঙ্গি স্বল্প শিক্ষিতের নীচুতাকেও হার মানায়। সত্যিকারার্থে তারা জীবনকে বদলাতে পারেন না। ব্যক্তি যখন পরিবেশ, শিক্ষা এবং অভিজ্ঞতা পুঁজি করে সুসম্পন্ন দৃষ্টিভঙ্গি লালন করেন তখন তার প্রয়োজন হয় আত্মপ্রচেষ্টা। কারণ যতই পরিবেশ সুন্দর হোক না কেন, যতই ব্যক্তির জ্ঞান-গরিমা থাকুক না কেন, অভিজ্ঞতার ঝুলি যত বেশিই থাকুক না কেন, ব্যক্তি যদি নিজকে পরিবর্তন করার মতো দৃষ্টিভঙ্গি লালন না করেন তাহলে এর মধ্যে কল্যাণ নিহিত নেই। এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি সুসম্পন্ন দৃষ্টিভঙ্গি হতে পাওে না। এ ধরনের প্রচেষ্টা জীবনকে বদলাতে পাওে না। জীবনকে বদলাতে প্রয়োজন আত্মপ্রচেষ্টামূলক দৃষ্টিভঙ্গি যা নিজেকে দিয়েই শুরু করতে হয়। মহাগ্রন্থ আল কুরআনের সূরা রায়াদের ১১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “আল্লাহ কোন জাতির ভাগ্যের (অবস্থার) পরিবর্তন করেন না যতক্ষণ পর্যন্ত জাতির লোকেরা নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের চেষ্টা না করে।” বদলে যাও বদলে দাও এটি নতুন কোনো শ্লোগান নয়। বরং সুসম্পন্ন দৃষ্টিভঙ্গির অভাবেই এটা ধামাচাপা পড়েছিল। যারা মনে করেন ইসলাম সেকেলে ধর্ম, ইসলামে কোন আধুনিকতা নেই এটি তাদেরই কারসাজি। অথচ ইসলাম যে কত আধুনিক তার প্রমাণ হচ্ছে বদলে যাওয়ার জন্য আগে নিজেকে দিয়ে বদলানোর অভিযান শুরু করার তাগিদ ইসলাম ১৪ শ’ বছর আগেই নবী মুহাম্মদ সা.-এর ওপর নাজিলকৃত মহাসত্য গ্রন্থ আল কুরআনের মাধ্যমে ঘোষণা দিয়েছিলেন। সুতরাং এই মহা সত্যকে ধারণ করে সুসম্পন্ন দৃষ্টিভঙ্গি লালন করতে পারলেই জীবনটাকে বদলে দেয়া সম্ভব। একজন মহা মনীষী বলেছেন, সুসম্পন্ন দৃষ্টিভঙ্গি, ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি মানুষের জীবনে পবিত্র অনুভূতি সৃষ্টি করে আর নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পূর্ণতার সুযোগকে নষ্ট করে দেয়। আমাদের প্রতিটি অনুভূতিই হোক পূর্ণতার, দৃষ্টিভঙ্গি হোক ইতিবাচক আর সুসম্পন্ন। বদলে যাক জীবন, পূরণ হোক লালিত স্বপ্নের।


পাতাটি ১৯৪ বার প্রদর্শিত হয়েছে।