দশদিক মাসিক

হোম প্রচ্ছদ রচনা মিয়ানমারের মুসলিম হত্যাযজ্ঞ: অসহায় মজলুমের আর্তনাদ !

মিয়ানমারের মুসলিম হত্যাযজ্ঞ: অসহায় মজলুমের আর্তনাদ !

এইচ এম দুলাল::
সম্প্রতি প্রকাশিত ওয়াশিংটন পোস্টের সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে মাত্র তিন সপ্তাহে মিয়ানমারের নিপীড়িত সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাগোষ্ঠী পরিণত হয়েছে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পুরো বিশ্বে ঘটা সবচেয়ে বড় ও নিষ্ঠুর জাতিগত নিধনযজ্ঞের ঘটনায়। ২৫ আগস্ট চালানো রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের হামলাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী পদ্ধতিগতভাবে পুড়িয়ে দিয়েছে বহু গ্রাম। আতঙ্কিত হয়ে লাখ লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে এসেছে বাংলাদেশে। জাতিসংঘ কর্মকর্তাদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা ৩ লাখ ৮০ হাজার (বর্তমানে ৪ লাখ ৯ হাজার) ছাড়িয়েছে। ইউনিসেফের তথ্য অনুসারে, এদের মধ্যে আনুমানিক ২ লাখ ৪০ হাজারই হচ্ছে শিশু। মিয়ানমার সরকার ও সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধ ধর্মালম্বীরা রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর যে নির্যাতন চালাচ্ছে, সেটিকে জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তনিও গুতেরেস জাতিগত নিধনযজ্ঞের একটি স্পষ্ট উদাহরণ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে মিয়ানমারে কয়েক প্রজন্ম ধরে বাস করা সত্তে¦ও রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব বাতিল করে দেয়া হয়। ২৫ আগস্টের পর স্কর্চড-আর্থ অভিযান হচ্ছে। সামরিক বাহিনীর এমন এক অভিযানে যেটিতে শত্রুপক্ষের কাজে আসতে পারে এমন যেকোনো কিছুকে টার্গেট করা হয়। এই স্কর্চড-আর্থ অভিযানে এখন পর্যন্ত রাখাইনের ৪৭১টি রোহিঙ্গা গ্রামের মধ্যে ১৭৬টি গ্রাম পুরোপুরি শূণ্য হয়ে গেছে। স্যাটেলাইট-ছবিসহ মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সংগ্রহ করা প্রমাণে দেখা যায়, বহু গ্রাম একেবারে পুড়ে ছারখার হয়ে গেছে। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সংস্থাটি ৬২টি গ্রামে আগুন লাগিয়ে দেয়ার প্রমাণ পেয়েছে। এছাড়া আরও ৩৫টি গ্রাম এরকম হামলায় ব্যাপক ক্ষতির শিকার হয়েছে। বাংলাদেশ সীমান্তে কার্মরত সাংবাদিকরা মিয়ানমার অঞ্চল থেকে ধোঁয়া উড়তে দেখার খবর নিশ্চিত করেছেন বহুবার। রাখাইনে সাংবাদিক, ত্রাণকর্মী ও কূটনীতিকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে রেখেছে মিয়ানমার সরকার। এ কারণে আরও অঞ্চলটির ভেতরে কী ঘটছে তার বিস্তারিত বর্ণনা সম্বলিত প্রতিবেদন প্রকাশ হচ্ছে না।
রাখাইনে সংগঠিত এই অপরাধ, ২০০০ সালের শুরুর দিকে সুদানের দারফুর ও ১৯৯০ সালে ঘাটে কসোভোতে ঘটা নিধনযজ্ঞের চেয়ে কোন অংশে কম নয়। তবে রোহিঙ্গা নিধন নিয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া বিস্ময়করভাবে দুর্বল। ইতোমধ্যে রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ এক রুদ্ধদ্বার বৈঠক করে। বৈঠক শেষে পরিষদের সর্বনিম্ন পর্যায়ের বিবৃতি প্রকাশ করে যেটিতে এই নির্যাতনের প্রতি নিন্দা জানানো হয়। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ও একই রকম সতর্কতা অবলম্বন করেছে। অন্যদিকে, মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চির ওপর দেয়া হয়েছে ব্যাপক নজর। এই সহিংসতা নিয়ে তিনি টেলিভিশন ভাষণে তিনি বলেন, " বেশ কিছু মুসলিম বাংলাদেশে পালিয়ে গেছে- এ ধরনের খবর শুনে আমরা উদ্বিগ্ন। তিনি বলেছেন সামরিক বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাও তার হাতে নেই। যেটা এখন দরকার তা হচ্ছে- মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করা।
ওবামা প্রশাসন দেশটিতে গণতান্ত্রিক ধারা প্রবর্তনের চেষ্টায়, সামরিক বাহিনীর জেনারেলদের ও তাদের নিয়ন্ত্রণকারী ব্যবসায়ীদের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নিয়েছে। কিন্তু এখন অর্থমন্ত্রণালয়ের উচিৎ তা পুনরায় আরোপ করা। কোন কোন কর্মকর্তা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে, সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিলে তারা অং সান সুচি ও তার বেসামরিক সরকারের বিরুদ্ধে চলে যেতে পারে। এমন উদ্বেগও প্রকাশ করা হয়েছে যে, সুচি চাইলে স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে তার বিরুদ্ধে করা আন্তর্জাতিক সমালচনাগুলোকে ব্যবহার করতেও পারেন। জাতিসংঘে মিয়ানমারকে আগলে রেখেছ চীন। মিয়ানমারে চলা অত্যাচার নিয়ে চীনের মাথাব্যথা নেই। বরঞ্চ, এই সুযোগে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে মিয়ানমারের সম্পর্ক খারাপ হওয়ার বিষয়টিকে স্বাগতই জানাচ্ছে চীন। তাই জাতিসংঘের কখনও উচিৎ হবে না জোর করে নিরাপত্তা পরিষদের কোনও সিদ্ধান্ত এই নিধনযজ্ঞ থামাতে চাপিয়ে দেয়া। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নির্যাতনের যত বেশি প্রমাণ মিলবে- নির্যাতনকারীদের তত বেশি মূল্য দিতে বাধ্য করা হোক (নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে)- তাহলে তত জ্বলদি এই নির্যাতন থামবে। জাতিসংঘ বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনের প্রেস উইং সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২১ সেপ্টেম্বর সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলায় ভাষণ দেবেন। প্রধানমন্ত্রী এ অধিবেশনে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে বাংলাদেশের প্রস্তাব বিশ্বনেতাদের সামনে তুলে ধরেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মধ্যে রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সেখানে ডোনাল্ড ট্রাম্প এই সঙ্কটে ‘বাংলাদেশের পাশে থাকার’ আশ্বাস দিয়েছেন বলে পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক সাংবাদিকদের জানিয়েছেন।
সবার সহযোগিতার আশ্বাস পেছেন তিনি। সারা বিশ্বে এ গণহত্যার প্রতিবাদে মিয়ান দূতাবাস ঘেরা, প্রতিবাদ সমাবেশ অব্যাহত রয়েছে। মানবিকতা দিয়ে এ দানবিকতাকে রুখতে আন্তর্জাতিক মহলকে এগিয়ে আসতে হবে। এমনটাই মনে করেন সচেতন মহল। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। মিয়ানমারের সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর জাতিগত নিধন চালিয়ে চার লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে পালিয়ে যেতে বাধ্য করার দায়ে দেশটির সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সোমবার এ নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানায় সংস্থাটি।
এদিকে এইচআরডব্লিউ এমন এক সময় এ আহ্বান জানিয়েছে, যখন নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন বসার প্রস্তুতি চলছে। খবর এএফপির। রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নির্মম নিপীড়নের কারণে শরণার্থীর ঢল বাংলাদেশে প্রবেশ করছে, তাতে জরুরি মানবিক সহায়তার বিষয়টি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। প্রতিদিনই নতুন নতুন শরণার্থীকে সহায়তা দিতে ত্রাণগ্রুপগুলো তাদের সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। কিন্তু প্রায় সব ধরনের ত্রাণের অপ্রতুলতায় অধিকাংশ রোহিঙ্গাকেই চরম দুর্দশার মধ্য দিয়ে সময় পার করতে হচ্ছে। এদিকে রবিবার মিয়ানমার সরকার আভাস দিয়েছে, সীমান্ত পাড়ি দিয়ে যেসব রোহিঙ্গা পালিয়ে গেছে তাদের ফেরত নেবে না। কারণ এসব রোহিঙ্গার সঙ্গে সন্ত্রাসীদের যোগসাজশ রয়েছে বলে দেশটির সরকার দাবি করছে। এসব সন্ত্রাসী গত আগস্টে রাখাইন রাজ্যের বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও পুলিশ ফাঁড়িতে হামলা চালিয়েছিল। এরই পরিপ্রেক্ষিতে দেশটির সেনাবাহিনী অভিযানে নামে।
তবে এইচআরডব্লিউ বাস্তুচ্যুত এসব রোহিঙ্গার নিরাপদ ও স্বেচ্ছায় ফিরে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটি বিশ্বনেতাদের প্রতি রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে চলমান নৃশংতা চালানোর দায়ে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানায়। সংস্থাটি এক বিবৃতিতে বলেছে, রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ‘জাতিগত নিধন’ অভিযান বন্ধ করতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর উচিত দেশটির সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অবরোধ ও অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা। সংস্থাটি রোহিঙ্গা সংকটকে অগ্রাধিকার দিতে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে মিয়ানমারের কর্মকর্তাদের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা, সম্পদ জব্দ এবং অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার পরিধি বাড়ানোরও আহ্বান জানিয়েছে।


পাতাটি ৭৬ বার প্রদর্শিত হয়েছে।