দশদিক মাসিক

হোম অন্য দৃষ্টিবাংলার শিশু : ভাষা ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি

বাংলার শিশু : ভাষা ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি

ড. রুমি শাইলা শারমিন::
আজকের শিশুরা বিজয়ের লাল সবুজ পতাকার নিচে দাঁড়িয়ে জাতীয় সংঙ্গীত গায় । সুরে সুরে সোনার বাংলাকে ভালবাসার কথা জানায়। এ আনন্দ প্রাপ্তির, পেয়েছে তারা একটি মানচিত্র । মহান মুক্তিযুদ্ধে শতকোটি প্রান আতœদানের বিনিময়ে ফিরিয়ে দিয়ে গেছে স্বাধীন অস্তিত্ব , নিজের ঐতিহ্য, সংস্কৃতিকে আঁকড়ে বেঁচে থাকার বিরল সম্মান। বিশ্বে বাঙালী জাতি বিপুল আনন্দের সমারোহে প্রতিটি বসন্ত বরন করে। ফাগুনের আনন্দে মেতে ওঠে। বাহান্ন’র ফাগুেন আগুন লেগেছিল, এ দেশের শতকোটি প্রাণের রক্ত লালে লাল হয়েছিল ডালে ডালে কৃষ্ণচূড়া । বিশ্বের কোথাও কোনদিন একসাথে এতো প্রাণ ভাষা সংগ্রামে এমন করে আত্মত্যাগ করেনি। পেয়েছে একটি ভাষা ‘বাংলা’কে। এ আমাদের গর্ব, এই দেশ আমাদের ‘মা’। আজকের প্রজন্ম কতটুকু জানে বাহান্ন’র সেই রক্তিম ফাল্গুুনের ইতিহাস ! কতটুকু জানে মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস? যে জানলোনা প্রকৃত ইতিহাস, চিনলোনা দেশকে, কিভাবে সে দেশমাতাকে

আগলে রাখবে? কিভাবে মর্যাদা দেবে মাতৃভাষাকে, আর সেই সব বীর সন্তানকে যারা আমাদের মা’কে মা বলে ডাকতে শেখালো? আমাদের আজ দায়িত্ব এসেছে আজকের শিশুদের কাছে বাংলার মাটি, মা, ভাষার সঠিক ইতিহাস জানানোর। সময় এসেছে আবহমান বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে তুলে ধরার ।
শুধুমাত্র এই দিনগুলোকে সামাজিক অনুষ্ঠান, সভা সেমিনার আর মিডিয়ার মাধ্যমে আলোচনায় সীমাবদ্ধ না রেখে আসুন বাংলার ইতিহাস জানি এবং জানাই আপনার আমার সন্তানকে। যেন প্রতিটি দিন, মাস, বছর সে বাংলা মাকে ভালবেসে বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে লালন করে বেড়ে উঠে, ধারন করতে পারে হৃদয়তন্ত্রীতে আজীবনের জন্য স্বদেশপ্রেম, গড়ে ওঠে আত্মমর্যাদাবোধ। মনে রাখতে হবে আত্মবিস্মৃত জাতি কখনো সম্মানের আসনে পৌঁছাতে পারেনা। সচেতন হই সেই সব শিশুদের প্রতি যারা তথাকথিত নামীদামী ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের পড়াশুনা আর গাদাগাদা স্কুলের বই বোঝাই করা ব্যাগের ভার সইতে সইতে ক্লান্ত। ক্লাসের পড়া, প্রাইভেট, কোচিং, স্কুলে দুই তিনদিন পর পর মূল্যায়ন পরীক্ষা, সাপ্তাহিক পরীক্ষা তারপর ক্লান্তি শেষে চারদেয়ালের মাঝে কম্পিউটার গেমকে সঙ্গী করে নিতে বাধ্য হচ্ছে সে কেমন করে দেখবে ফসল ভরা মাঠে কৃষকের স্বপ্ন পূরনের হাসিমাখা মুখ, জোৎ¯œা রাত,

নদীর বুকে ভেসে থাকা পালতোলা নৌকা? এতো সময় কোথায় তাদের যে পাখির গান শুনবে? রবীন্দ্রনাথ,নজরুল অথবা জীবনান্দের কবিতা পড়বে? তারা বঞ্চিত হচ্ছে গাছের পাতা চুয়ে চুয়ে বৃষ্টি ফোঁটা পড়ার টুপ্ টুপ্ শব্দ শোনা থেকে। বার্ষিক পরীক্ষার শেষে ছুটিতে বিমানে চড়ে হাওয়ায় উড়ে চলে যাচ্ছে বিদেশের মাটিতে ঘুরতে । সে পেলনা স্বদেশের মাটিতে দিগন্ত জোড়া কাশবনের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে ছুটে বেড়ানোর অপার আনন্দ। যে শিশুটি ‘ওয়াটার লিলি’ মানে ‘শাপলা ফুল’ বানান করে শিখছে সে কি কখনো দেখার সুযোগ পেয়েছে গ্রাম বাংলার আনাচে কানাচে ফুটে থাকা দিঘীর জলে শাপলা ফুলের মেলা ? দেখেনি নক্সিকাঁথার সুঁইসুতোর প্রতিটি গাঁথুনীর মাঝে অপূর্ব কারুকার্য। আজকের শিশুরা নামিদামী রেষ্টুরেন্টের আর ফাষ্টফুডের নাম চট্পট্ বলে দিতে পারে কিন্তু কিভাবে বলবে খেজুরের রস আর গ্রাম বাংলার রকমারি পুলি পিঠার নাম যার স্বাদ সে কোনদিন পায়নি। জন্মদিনে দামী উপহার আর ক্যন্ডির ভীড়ে কখনও হাতে পায়নি একগোছা কদম অথবা শিশির ভেজা একটি বুনোফুল। আজকের বাবা মা কতটুকু সময় দেন তার সন্তানকে? একুশে ফেব্রুয়ারী , ষোলই ডিসেম্বর কিন্বা ছাব্বিশে মার্চের মতো সরকারী ছুটির দিনে ব্যস্ত কর্মজীবী বাবা মা চান অন্যদিনের চাইতে একটু দেরীতে ঘুম থেকে উঠতে, নিজেদের মত করে সময় কাটাতে। শিশুটি জানলোনা সেই-
প্রত্যুষে ঘুম থেকে উঠে কিভাবে শহীদ মিনারে যেতে হয়, ফুল দিতে হয়, প্রভাত ফেরীর গান গাইতে হয়? অথচ ছবি আঁকা প্রতিযোগিতার সে শহীদ মিনার আঁকছে যা বই থেকে অথবা টিভি দেখে শিখেছে। শুধুমাত্র পুঁথিগত শিক্ষায় শিক্ষিত সন্তান তৈরী করছি আমরা। তাই নতুন প্রজন্মের মাঝে অর্পূনতা থেকে যাচ্ছে। আজকে এ দেশের শিশুরা যখন উচ্ছ্বাসে অনর্গল হিন্দি ভাষায় আবেগ প্রকাশ করে (আকাশ সংস্কৃতির মাধ্যমে হিন্দি ভাষায় প্রচারিত কার্টুন ছবিগুলো দেখার প্রভাবে ) তখন ধিক্কার জানাই নিজেদেরকে। এজন্যই কি আমাদের পূর্ব পূরুষেরা মরনপণ লড়াই করে ছিনিয়ে এনেছিল মায়ের মুখের ভাষাকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার বিরল সম্মান ! আমাদের শিশুরা বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ভাষা শিখবে, সংস্কৃৃতি সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন করবে এতে দোষের কিছু তো নেই বরং নিজেদের সমৃদ্ধ করতে পারবে। যে নিজ মাকে ভালবাসে তার যেমন জগতের সকল মায়ের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থাকে

তেমনি যার নিজ ভাষার প্রতি ভালবাসা আছে তার অন্য ভাষার প্রতিও শ্রদ্ধাবোধ থাকাটাই স্বাভাবিক। তাই বলে নিজ শেকড়কে ভুলে নিজস্বতা জলাঞ্জলী দিয়ে বিজাতীয় সংস্কৃতি, ভাব ভাষা সংস্কৃতিকে অনুকরণ করে নয়। আজকাল তরুন প্রজন্মের কারো কারো মাঝে শুদ্ধ বাংলা ভাষার সাথে বিদেশি ভাব-
ভাষা মিলিয়ে মিশিয়ে মিশ্র কিছু একটা ভাষা হিসাবে ব্যবহার পোশাকে বা আচার অনুষ্ঠানেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তবে আজ আর শঙ্কিত নই। এই তরুন প্রজন্মেরই বিরাট অংশ দেশমাতাকে আগলে রাখতে প্রতিবাদি কন্ঠে ঝড় তুলেছে । একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, আজকের প্রজন্ম ভাষা আন্দোলন দেখেনি, মুক্তিযুদ্ধও দেখেনি। কিন্তু তারুন্যের উত্তাল জনসমূদ্র স্বরণ করিয়ে দেয় রক্তে তাদের বইছে পূর্বপুরুষ থেকে পাওয়া স্বাধিকারের চেতনা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে স্বত:স্ফূর্ত আন্দোলনের ধারা। প্রতিবাদের কত ভাষায়, কত রং এর ভালবাসায়, তপ্ত আগুন ঝরানো ফাগুন আসে ফিরে ফিরে
দেশকে, দেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে বিশ্বের দরবারে সঠিকভাবে তুলে ধরতে হলে ইংরেজি শিক্ষা যেমন অপরিহার্য্য তেমনি প্্রয়োজন আধুনিক প্্রযুক্তির ব্যবহারিক শিক্ষা সহ জীবনে চলার সকল অভিজ্ঞতা অর্জন। তাই বলে আবহমান বাংলার রূপ রস গন্ধে বেড়ে উঠা থেকে এবং বাঙ্গালী পারিবারিক

শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করে নয়, অন্যের সংস্কৃতির সাথে নিজের সংস্কৃতিকে মিশিয়ে বিকৃত করে নয়। আজকের শিশুরা যেন মাতৃভূমিকে চিনতে শিখে, বাংলা ভাষাকে শুদ্ধরুপে উচ্চারণের জন্য সাধনা, চর্চা করে, নিজ সংস্কৃতিকে সযতেœ লালন করতে পারে। ধারন করতে পারে স্বগর্বে । তাদের ভাষা জ্ঞানের পরিধিকে বাড়িয়ে তোলার জন্য সচেতন হতে হবে আমাদেরকেই। আসুন, তাদের মধ্যে গড়ে তুলি উদ্দাম উদ্দীপনা আর খুঁজে নিতে শেখাই জীবনকে অর্থবহ করে বেঁচে থাকার অপার প্রেরনা। এই শিক্ষা পেয়ে তবেইনা তারা অনুভব করবে দেশের প্রতি মমত্ববোধ, দেশের মানুষের প্রতি সংবেদনশীলতা, ভক্তি ও শ্রদ্ধা। তবেই না বিশৃঙ্খলা, অনিয়ম দুর হবে পরিবার, সমাজ তথা দেশ থেকে। স্বরন করি, মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রান দিয়ে যাঁরা বাঙালীর অস্তিত¦ বাঙালীর নিজস্বতাকে ছিনিয়ে এনেছিল । স্বরন করি, ভাষা আন্দোলনে যাঁরা বুকের রক্ত ঢেলে আমাদের মুখে বাংলা ভাষা ফোটালো, বিশ্বের দরবারে আšতর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের গৌরব ছিনিয়ে আনলো। প্রার্থনা করি, স্বর্গে যেন যান তারা সোনার রথে চড়ে।


পাতাটি ৩২৬৬ বার প্রদর্শিত হয়েছে।