দশদিক মাসিক

হোম প্রবাস সংবাদ আমেরিকার যাযাবর জীবন

আমেরিকার যাযাবর জীবন

ফয়সল আবদুল্লাহ

স্বপ্নের দেশ আমেরিকা। কারো কাছে দুঃস্বপ্নেরও। কায়ক্লেশে দিন কাটছে এমন মানুষও আছে ভূরি ভূরি। গরিবির চালচিত্রটা বুঝতে আর কিছু না হোক, হাতের কাছে আছে ট্রেইলার পার্ক। চাকার ওপর ঘরবাড়ি গড়ে উঠেছে যেখানে। আস্ত বাড়িটাকে নিয়ে এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করে দিন গুজরান করছে এমন মার্কিনির সংখ্যা নেহায়েত কম নয়— পাক্কা দুই কোটি!

জনসংখ্যা যেখানে ৩০ কোটির কাছাকাছি, সেখানে দুই কোটি মানেই একটা বড় পরিসংখ্যান। এত মার্কিনির বাড়ি নেই? আসলে বাড়ির সংজ্ঞাটাই তাদের কাছে আলাদা। সাউথ ক্যারোলিনা রাজ্যে গেলে দেখা যাবে প্রতি পাঁচটি বাড়ির মধ্যে একটিই ভ্রাম্যমাণ। মানে চার চাকায় ভর করে ঘুরে বেড়াচ্ছে ওই পরিবারগুলো। দক্ষিণের আরো সাতটি রাজ্যের চিত্রটাও কমবেশি একই রকম। কারণটা কী? কদিন আগে উত্তরের সন্ধানে নেমেছিল বিবিসি। উঠে এলো আমেরিকানদের ভ্রাম্যমাণ জীবনের অন্যরকম সব ছবি। ভ্রাম্যমাণ কিছু জীবন হূদয়কে করে তুলবে আর্দ্র আবার কিছু ভ্রাম্যমাণ জীবন দেখে হতে পারে ভয়ানক ঈর্ষাকাতরও!

ইমেজ সঙ্কট

মোবাইল বাড়ি নিয়ে সরকারেরও আছে মাথাব্যথা। কারণটা পরিষ্কার। বাইরের লোকজন এত এত যাযাবর বাড়ি দেখে ভাববে আমেরিকানরা না জানি কত গরিব। গাড়িতেই ঘর সংসার পেতে বসেছে। ঘটনা পুরোপুরি সত্য না হলেও সিংহভাগ মানুষই কিন্তু বাড়ির খরচ মেটাতে না পেরে এ তরিকা বেছে নিয়েছে। সাউথ ক্যারোলিনা থেকে শুরু করে নিউ মেক্সিকো, ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া, মিসিসিপি, অ্যালাবামা, নর্থ ক্যারোলিনা, লুইসিয়ানা, আরকানসাস, ইয়োমিং, কেন্টাকি; এ রাজ্যগুলোতে সবচেয়ে বেশি ভ্রাম্যমাণ বাড়ি দেখা যায়। অর্থাত্ এটা যদি সমস্যা হয়ে থাকে তবে এর সঙ্গে খানিকটা ভূগোলেরও সম্পর্ক আছে। এ তালিকার আটটি রাজ্যই দক্ষিণের, যেখানকার লোকের গড়পরতা আয় বেশ কম। যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে কম আয়ের রাজ্যের তালিকাতেও আছে এখানকার আটটি রাজ্য। তবে আশার কথা হলো, সবচেয়ে বেশি ভ্রাম্যমাণ বাড়ি থাকলেও নর্থ ক্যারোলিনা কিন্তু গরিব রাজ্যের তালিকায় নেই। অর্থাত্ ভ্রাম্যমাণ বাড়িতে থাকার আরও কিছু কারণ আছে বটে। আর সেই কারণগুলোকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারলেই রক্ষা পাবে ভাবমূর্তি।

কাঁচা ঘর খাসা

মার্কিনিরা ঐতিহ্যগতভাবেই খেয়ালি। যাযাবরও বলা যায়। অনেক আগ থেকেই দেশটির আবাসন খাতের একটা বড় ভাগ দখল করে আছে ভ্রাম্যমাণ বাড়িঘর। গত বছরের জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে মোট ভ্রাম্যমাণ বাড়ি আছে ৮৫ লাখ। আর গড় হিসেবে সেই বাড়ির বাসিন্দা ২ কোটির কম নয়। জরিপ এও জানাচ্ছে, এসব বাড়ির ৫৭ শতাংশ মালিকই কোনো না কোনো চাকরিতে নিয়োজিত আছে। ২৩ শতাংশ গেছে অবসরে। অর্থাত্ এদের কেউই ঠিক দারিদ্র্যতার কারণে এমন বাড়িতে থাকছেন না।

অবশ্য সব ভ্রাম্যমাণ বাড়িরই যে চাকা থাকবে এমনটা নয়। এমন কিছু বাড়িও আছে যেগুলো দেখে বড়জোর দুয়েকদিন অবসর কাটানোর কটেজ মনে হতে পারে। এগুলোও এক ধরনের মোবাইল হোম। ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ায় এ ধরনের বাড়ি নিয়ে রীতিমতো একটা পাড়া আছে। পাড়ার নাম ওক হ্যাভেন। ছোটখাটো অস্থায়ী বাড়িগুলো ওক কাঠের বানানো কিনা তা জানা না গেলেও দেখতে ভূস্বর্গের মতোই। পাহাড় ও বনাঞ্চল ঘেঁষা বাড়িগুলোও মোবাইল হোম হিসেবে স্বীকৃত। কোনোটিই এক থেকে দেড়শ ফুটের বেশি নয়। কোনোরকম দুটো বেডরুম আর একটা টয়লেটই ভরসা। এসব বাড়ির বাসিন্দারা শখ করেই রান্নার কাজটা বাইরে সারেন। আবার একটু অবস্থাসম্পন্ন মোবাইল বাড়িগুলোতে দুটো বাথরুমও থাকে। কিচেনের পাশেই পাওয়া যাবে নাস্তার টেবিল। ২৭ বছর বয়সী মাইকেল ব্রিডেন এক বছর ধরে বাস করছেন এমন এক বাড়িতে। তার কাছে এ ধরনের ভ্রাম্যমাণ বাড়ি স্বাধীনতারই নামান্তর। বললেন, ‘আমি চাইলে শহরে অনেক ভালো বাড়িই কিনতে পারতাম। কিন্তু তখন দেখা যেত কোথাও নড়তে গেলেই পা আটকে যাচ্ছে।’ এখন মাইকেল তার স্ত্রী সন্তানকে নিয়ে ওক হ্যাভেনের ছোট্ট কুঠুরিতে পড়ে আছেন বেশ সানন্দেই। ঠিক করেছেন বছর পাঁচেক পর সন্তান একটু বড় হলেই চলে যাবেন অন্য কোথাও। ওক হ্যাভেনের আড়াই হাজার ডলারে তিনি শুধু একটি দৃষ্টিনন্দন কাঠের বাড়িই কিনেননি, পেয়েছেন নীরবতা, চোখের দূরত্বে দারুণ সব নৈসর্গিক দৃশ্য আর সমমনা বেশ কজন প্রতিবেশী। শহুরে জীবনে এসবের কটা পাওয়া যায়!

মন্দার কারণে

এখন ওক হ্যাভেনের বাসিন্দাদের তাই দরিদ্র বলা যাবে না কিছুতেই। পার্ক মালিককেই মাসে ভাড়া দিতে হয় ৩২৫ ডলার। বিদ্যুত্ বিল দেড়শ আর ট্যাক্স ৬০ ডলার। তবে এ ধরনের মোবাইল বাড়িতে আমেরিকানরা শখ করে থাকা শুরু করেনি। ১৯৩০ সালের মহামন্দার সময়টাতে অনেকে বাধ্য হয়েছিল ঘরবাড়ি ছাড়তে। তখনই পরিত্যক্ত ও খালি পড়ে থাকা এলাকাগুলোতে গড়ে উঠতে থাকে ট্রেইলার পার্ক। ফেলে দেয়া গাড়িতে সংসার পাততে শুরু করে মানুষ। ৪০ থেকে ৫০’র দশক পর্যন্ত এমন মোবাইল পরিবারের সংখ্যা হু হু করে বাড়তে থাকে। পরের দশকেই আমেরিকাজুড়ে গজিয়ে ওঠে অজস্র আবাসন কোম্পানি। তাদের গড়ে তোলা কমিউনিটির প্রভাবে বিশাল এক জনগোষ্ঠী যাযাবর জীবন ছেড়ে চলে আসে বড় ছাদের তলায়। আবার সরকারের কিছু বৈষম্যপূর্ণ নীতিও অনেক আমেরিকানকে ‘স্থায়ী ঠিকানায়’ আসতে বাধ্য করেছে। বন্ধকি ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে ভ্রাম্যমাণ বাড়িকে কখনই গোনায় ধরেনি প্রশাসন।

নতুন করে কয়েক বছর আগেও বিশাল এক মন্দার যাঁতাকলে পড়ে যায় মার্কিন মধ্য ও নিম্নবিত্তরা। নতুন করে বাড়ি তৈরি না হওয়া ও চাকরি চলে যাওয়ার কারণে অনেকেই আশ্রয় নিতে বাধ্য হয় কম দামের ট্রেইলার পার্কগুলোতে। এদের নিয়েই হয়তো ইমেজ সঙ্কটে পড়ে সরকার। তবে এভাবে থাকতে থাকতে যারা একবার ভবঘুরে জীবনের স্বাদ পেয়ে যায়, নাগরিক কোনো সুবিধার সাধ্য নেই তাদের চার দেয়ালের মাঝে আটকে রাখে!-সূত্র:দৈনিক বর্তমান


পাতাটি ২০৯০ বার প্রদর্শিত হয়েছে।