দশদিক মাসিক

হোম প্রবাস সংবাদ লন্ডন টুকিটাকি

লন্ডন টুকিটাকি

আহসান সাদী
১. প্রথম যেদিন লন্ডন এসে পৌঁছাই সেদিনই বছরের প্রথম তুষারপাতটা শুরু হয়েছে। পৌঁছার আগে আমি এরকম একটা সম্ভাবনার কথা জানতাম। তুষারপাত দেখার শখটা আমার সেই শৈশব থেকেই। লন্ডন পৌঁছার পর তুষারপাত দেখতে পাবো এরকম মৃদু সম্ভাবনায় আলাদা একটা ঘোর আচ্ছন্ন করে রেখেছিলো আমাকে। প্রতিকূল আবহাওয়ার জন্যে দোহা থেকে লন্ডনের ফ্লাইট বেশ আগেই রওনা হয়ে যায়। নির্ধারিত সময়ের কয়েকঘন্টা আগেই আমাকে তাই লন্ডন এয়ারপোর্টে এসে বসে থাকতে হলো। টার্মিনালের গেটের বাইরে বসার জায়গা আছে। আমি বসে আছি। একটু দুরেই মূল দরজা। মানুষজন ঢুকছে আর বের হচ্ছে, অটোমেটিক দরজাটাও তাই একটু পরপর খুলে যাচ্ছে। বাইরে থেকে তীব্র ঠান্ডা বাতাসের ঝাপটা আসছে। ঠান্ডার মাত্রাটা তবু বুঝে উঠতে পারছিলাম না। খুব ইচ্ছে হচ্ছিলো দরজাটা পার হয়ে একটু বাইরে যাই, দেখি কেমন ঠান্ডা এই দেশে। সাথে থাকা বিশাল আকৃতির ব্যাগটা ফেলে যেতে সাহস হচ্ছে না। ঠান্ডার তীব্রতা কত হতে পারে তার একটা অনুমান করার চেষ্টা চালাতে থাকলাম। আমার জীবনে এর আগে আমি তীব্র ঠান্ডা অনুভব করেছি দার্জিলিং এ। সে কী ঠান্ডা! মনে পড়ে আমিও বন্ধুরা হাত ও পায়ে মোজা, মাথায় উলের টুপি এবং গায়ে কয়েকধাপ ভারী কাপড় জড়িয়ে তারপর লেপের নিচে ঘুমোতে গিয়েছিলাম। খুব ভারী একটা জ্যাকেট ছিলো আমার। দার্জিলিং এ শীতের ঝাপটাটা সামলাতে সেই জ্যকেট খুব কাজে এসেছিলো। আজও আমার পরনে সেই ভারি জ্যাকেটটা। খানিকটা রং জ্বলে গেছে, কিন্তু ঠান্ডা আটকানোর কাজে এখনও ভরসা করা যায়। দার্জিলিং এ তবু তো বরফ পড়েনি, এখানে বরফ পড়া ঠান্ডা তবে কত হবে কে জানে! বেশীক্ষণ আর বসে থাকতে পারলাম না। ভাবলাম, ব্যাগের চিন্তা বাদ দিয়ে একটু বাইরে ঘুরেই আসি। ব্যাগ হারালে আর কী হবে, দরকারী কগজপত্র সব গলায় ঝুলানো ছোট ব্যাগটাতে তো আছেই, বড় ব্যাগে কিছু কাপড়চোপড় আর এর ওর জন্যে টুকটাক জিনিসপাতি। আমার আর তর সইলো না। এর মধ্যে কয়েকজনের সাথে আলাপ করে জানতে পারলাম বাইরে নাকি তুষারপাত চলছে। গলায় ঝুলানো ব্যাগটা নিয়ে ঝট করে তাই বেরিয়ে পড়লাম। সেখানে প্রথম ঝাপটাটা গায়ে এসে লাগলো, তবে খুব বেশী কিছু বুঝতে পারিনি। আমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছি সাদা তুষারের ছন্দময় পতনের দিকে। কয়েকমিনিট ঠান্ডার তীব্রতা অনুভব আর শুভ্র তুষারের মৃদুমন্দ পতনে বিমোহিত হয়ে রইলাম। হঠাৎ খেয়াল করলাম আমার হাত নাড়াতে পারছি না। সাথে সাথেই খেয়াল করলাম মুখে কেউ সুঁইয়ের খোঁচা দিচ্ছে যেনো। ঠান্ডায় একদম বরফ হয়ে যাচ্ছি! ভিতরে চলে যাবার জন্যে ঘুরতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম, পা-দুটো যেনো জমে গেছে একদম। ভয়ে শিউরে উঠলাম। ঠান্ডাকে এমন হালকাভাবে নেয়াটা উচিত হয়নি। কোনোরকম ভিতরে এসে বসে পড়লাম, আমার ফেলে যাওয়া বড় ব্যাগটার পাশে। ঠান্ডার তীব্রতা একপলকেই অনুভব করা যায় না। তিন-চার মিনিট বাইরে দাঁড়াতেই নিজে আস্ত বরফ হয়ে যাবার প্রায় কাছাকাছি চলে যাবার অভিজ্ঞতা লাভ করে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম, ঠান্ডা নিয়ে আর বাড়াবাড়ি করা চলবে না।
সেইদিন থেকে পরবর্তী দুইদিন চললো আমার বরফ উৎসব। হাত দিয়ে একদলা বরফ নিয়ে বল বানিয়ে বাচ্চাদের মতো এর ওর দিকে ছুঁড়ে মারার খেলাটা আমার খুব প্রিয় হয়ে উঠলো। বরফঢাকা রাস্তায় আলাদা একটা হাঁটার স্টাইল রপ্ত করে ফেললাম। পায়ের গোড়ালী ফেলে নয়, প্রতিটা পদক্ষেপে ভর করতে হবে পায়ের আঙুলের দিকে, পায়ের পাতার সামনের দিকে। অন্যথায় পা পিছলে পড়াটা শতভাগ নিশ্চিত। লন্ডন নগরীটা আমার কাছে দেখা দিলো শুভ্র চাদর গায়ে। বাড়ীঘর, গাছপালা, রাস্তাঘাট সবকিছুই সাদা, শুভ্র। আমার কাছে অপরিচিত মনে হয়নি মোটেও। গল্প-উপন্যাস আর টেলিভিশনে তুষারঢাকা গাছপালা, ঘরবাড়ী দেখে এরকমই একটা কিছু আমার কল্পনায় আঁকা হয়ে ছিলো! এখন শুধু তা বস্তবে দেখছি। কল্পনায় সবকিছু খানিকটা অস্পষ্ট থাকে, বাস্তবে একদম স্পষ্ট, এই যা! সেই ছোটবেলা থেকে লালন করা তুষারপাত দেখার স্বপ্নটা যখন বাস্তবে ধরা দিয়েই ফেলেছে, তখন আর কী করা, মন ভরে উপভোগ করতে থাকলাম সেই অদ্ভুত শুভ্র সৌন্দর্য। আল্লাহর সৃষ্টি কত সুন্দর।
২. বিদেশ বলতে আমার কাছে মনে হতো উঁচু উঁচু বিল্ডিং আর বিশাল বিশাল রাস্তায় সাজানো আলো ঝলমলে নগরী। লন্ডনের ক্ষেত্রেও আমার কল্পনা এমনটাই ছিলো। এখানে আসার পর বড় নির্মভাবে আমার ভুলটা ভেঙে গেলো। কোথায় কী! লন্ডন মানেই তো দেখছি দুই-তিনতলা বাড়ী আর ছোট ছোট রাস্তাঘাটে মোড়ানো একটা নগরী। বাড়ীগুলো সব হয় লাল রঙ না হয় হলুদ রঙের। সবচাইতে হতাশাজনক ব্যপার হলো এই সব বাড়ীগুলোর কোনোটা পন্চাশ-একশ এমনকি দেড়শো বছর পুরনো (অনেকগুলো আবার দুইশো বছরেরও বেশী!)। কোথায় আমি ভাবলাম এখানে খুব আধুনিক নির্মানশৈলীর প্রদর্শনী দেখতে পাবো, বাড়ীগুলো হবে ঝকঝকে তকতকে, রকমারী গ্লাস আর এ্যলুমিনিয়ামে সাজানো থাকবে সবগুলো বিল্ডিং, এসে দেখি সেই ভিক্টোরিয়ান যুগের স্টাইলে সবগুলো বাড়ীঘর দাঁড়িয়ে আছে। দেখেই মন খারাপ হয়ে যায়।


পাতাটি ২৬০৯ বার প্রদর্শিত হয়েছে।