দশদিক মাসিক

হোম বিশেষ রচনা জঙ্গিবাদ দমনে প্রয়োজন সামাজিক প্রতিরোধ

জঙ্গিবাদ দমনে প্রয়োজন সামাজিক প্রতিরোধ

ড. মীজানুর রহমান

বর্তমানে আমরা যাকে জঙ্গিবাদ বলছি, মূলত তা হলো ধর্মীয় উগ্রপন্থা। এই জঙ্গিবাদের পেছনে বিভিন্ন কারণ রয়েছে। ধর্মীয় গ্রন্থে যেভাবে বলা হয়েছে, ঠিক সেভাবে না বলে অর্থাৎ ধর্মের অপব্যাখ্যাবিষয়ক বিভিন্ন বই বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। আর এই বইগুলোই জঙ্গিবাদকে অনুপ্রাণিত করছে। কেবল তাই নয়, এই জঙ্গিবাদ উত্থানের বড় কারণ হচ্ছে অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা। সমাজে অর্থনৈতিকসহ নানা কারণে একটি বঞ্চিত ও অবহেলিত শ্রেণি রয়েছে। এই বঞ্চিত শ্রেণিকে খুব সহজে ভয় এবং প্রলোভন দেখিয়ে বশ করা যায়। এ জন্য জঙ্গিবাদ দমনে সামাজিক প্রতিরোধ অনিবার্য হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন দেশে বিশেষ করে পাক-ভারত উপমহাদেশে শিক্ষাব্যবস্থায় যথেষ্ট ত্রুটি রয়েছে। শিক্ষার বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা বিদ্যমান। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমল থেকেই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মধ্যে মাদ্রাসা শিক্ষারও কয়েকটি ভাগ দেখা যায়। আলিয়া মাদ্রাসাসহ কওমি মাদ্রাসার বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। সেখানে কী পড়ানো হয় এবং অর্থায়ন কীভাবে হচ্ছে ইত্যাদি বিষয়ে তেমন তদারকি দেখা যায় না। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে যারা বের হয় তারা খুব ভালো চাকরি পায় না। সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ তেমন নেই। এতে তাদের মাঝে হতাশা কাজ করে। এক সময় মনে করা হতো, নানা দিক থেকে অধিকারবঞ্চিতরা কওমি মাদ্রাসার শিক্ষা গ্রহণ করছে আর তারাই জঙ্গিবাদের প্রধান একটি উৎস। কিন্তু এখন এর বিপরীত অবস্থা দেখা যাচ্ছে। কেবল সামাজিকভাবে বঞ্চিতরাই নয়, অনেক ধনী পরিবারের সন্তান, যাদের পিতামাতা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং ভালো প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করছে তারাও জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ছে। এর পেছনেও কারণ হলো সামাজিক ব্যভিচার, অত্যাচার এবং যথাযথ সামাজিকীকরণের অভাব। যখন কেউ বিরূপ পরিবেশের মধ্যে বড় হয়, তখন তার মাঝে এক ধরনের হতাশা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। অনেক সময় উচ্চ সমাজের শিশুদের অধিকার এবং বাবা-মার আদর-যতœ থেকে বঞ্চিত হতে দেখা যায়। মাদ্রাসায় পড়ার কারণে অনেকে ভালো চাকরি না পেয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। মাদ্রাসাসহ ভুল শিক্ষায় শিক্ষিত লোকজনের এ বিষয়টি বেশি লক্ষণীয়। সর্বোপরি উচ্চ ও নিম্নবিত্ত সমাজে নানা কারণে হতাশা এবং ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। মূলত এই ক্ষোভ, হতাশা এবং সামাজিকভাবে বঞ্চিত একটি শ্রেণি থেকেই সুসংগঠিত জঙ্গিগোষ্ঠী তৈরি হয়।
বর্তমানে বাংলাদেশে সক্রিয় জঙ্গিগোষ্ঠীর সঙ্গে আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠীর সম্পর্কের ইতিহাস অনেক পুরনো। যদিও বলা হয়ে থাকে, আমাদের দেশ ধর্মীয়ভাবে সহনশীল এবং আমরা কট্টর ধর্মীয় পন্থা গ্রহণ করি না। অর্থাৎ আমরা ধর্মভীরু কিন্তু ধর্মান্ধতায় বিশ্বাসী নই। তারপরও রাজনৈতিক কারণে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের শেষদিকে ধর্মের ভিত্তিতে জাতিকে বিভক্ত করা হয়। হিন্দু এবং মুসলমান দুটি পৃথক জাতি। এই দ্বিজাতিতত্ত্ব ভিত্তি করেই উপমহাদেশ বিভক্ত করা হয়। পাকিস্তান ও ভারত নামে দুটি পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হলো। পরে ভ্রান্ত পাকিস্তানকে সংশোধন করেই আমরা বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা করেছি। কিন্তু যারা পাকিস্তানি ভাবধারার ছিল, এখনো তাদের সে মানসিক একাত্মবোধ শেষ হয়নি। পাকিস্তানবাদ, পাকিস্তান রাষ্ট্রের ইসলাম এবং সে চিন্তার সঙ্গে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিপরীত অবস্থা রয়েছে। আর এই বিপরীত অবস্থাকে ধারণ করে এমন লোক এখনো বাংলাদেশে আছে। সমগ্র জাতি মুক্তিযুুদ্ধের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলÑ এটা আসলে সঠিক বলা হয় না। মুক্তিযুদ্ধের সময় অনেকে আমাদের বিরোধিতা করেছিল। বিরোধিতা তখনো ছিল, এখনো আছে। এই বিরোধীগোষ্ঠীই পরবর্তী পর্যায়ে ধর্মীয় মৌলবাদী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়।
ইসলামকেন্দ্রিক ভাবাদর্শ ও ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিভিন্ন দেশে নানা আন্দোলনে বাংলাদেশের মানুষ অংশগ্রহণ করেছে। এ দেশ থেকে প্রচুর লোক আফগানিস্তান, ফিলিস্তিন এবং কাশ্মির যুদ্ধে অংশ নেয়। পরে তারা ফিরেও আসে। এসব দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, বাংলাদেশের মৌলবাদীগোষ্ঠীর সঙ্গে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটি নেটওয়ার্ক অবশ্যই আছে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করার পর বাংলাদেশকে আবার পাকিস্তানি কায়দায় ফিরে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। অর্থাৎ স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান কায়েম করা হয়েছিল। এর মূল হোতারা হচ্ছে সামরিক বাহিনীর ভক্ত ও অনুসারীরা। সামরিক ক্ষমতা থেকে যারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসেছিল তারাই এদের আশ্রয় দেওয়ার ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ পৃষ্ঠপোষকতা করে। যেমন লিবিয়া এদের মূল আখড়ায় পরিণত হয়েছিল। লিবিয়াই পৃথিবীর এসব বিচ্ছিন্নতাবাদী ও সন্ত্রাসীগোষ্ঠীকে আশ্রয়-প্রশ্রয় এবং অস্ত্র দেওয়ার কাজটি করে। কাজেই এসব মৌলবাদী গোষ্ঠীর সঙ্গে আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ইতিহাস অনেক পুরনো। সব ধর্মে মৌলবাদী আছে। ইসলামি মৌলবাদীদের সঙ্গে ইসলামি বিশ্ব তথা আরব তথা মধ্যপ্রাচ্যের যোগাযোগ আছে। কিন্তু ইতিহাসে দেখা যায়, প্রত্যেক মৌলবাদী গোষ্ঠীর একটি উগ্র চর্চার ভূমি হচ্ছে ইউরোপ। এসব সংগঠনের আন্তর্জাতিক যোগাযোগের কেন্দ্রবিন্দু লন্ডন। লন্ডনে হিজবুত তাহরির থেকে শুরু করে বিভিন্ন দেশের নিষিদ্ধ মৌলবাদী সংগঠনের শাখা-প্রশাখা রয়েছে। পোশাক-পরিচ্ছদ, চলাফেরা এবং দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে বাংলাদেশে মুক্তমনা লোকজন ছিলেন। কিন্তু তারা লন্ডন ও বার্মিংহামসহ বিদেশে পড়াশোনা করে দেশে ফিরে এসে কট্টরপন্থি এবং মৌলবাদী ভাবধারায় জীবনযাপন শুরু করে। তাদের সবকিছুতেই ভয়াবহ পরিণতি লক্ষ করা যায়।
মানুষকে ভালো না বেসে, শান্তির বাণী না শুনিয়ে উগ্রপন্থা অবলম্বন করে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব হাজির করা যায় না। কিন্তু সমস্যা হলো, কিছু লোক তার নিজস্ব মতাদর্শকে শ্রেষ্ঠ মতাদর্শ বলে মনে করে। কিন্তু সাময়িকভাবে শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করা যেতে পারে, দীর্ঘ সময়ের জন্য নয়। ইতিহাসের বিচারে কোনো সত্যই চিরন্তন নয়। এ ক্ষেত্রে অনেক ঘটনাই ঘটতে পারে। মানুষের মধ্যে এই উপলব্ধিবোধ থাকতে হবে। জোর করে মতাদর্শ চাপিয়ে দেওয়ার সব প্রচেষ্টা ইতিহাসে ব্যর্থ হয়েছে। কাজেই এ ক্ষেত্রে অন্য কোনো পন্থা অবলম্বন করা যায় কিনা তা দেখতে হবে। আমাদের দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জঙ্গিবাদ দমনে কাজ করে যাচ্ছে। বাংলাদেশের মানুষ এখনো পুলিশের ওপর আস্থা হারায়নি। কিন্তু সমস্যা হলো জনবহুল দেশের পুলিশ জনসংখ্যা অনুপাতের তুলনায় অনেক কম। আমাদের পুলিশের সংখ্যা এবং সক্ষমতা বাড়াতে হবে। পুরনো সব ব্যবস্থার পরিবর্তন করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাঝে আধুনিক জ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ, পরিবহন ব্যবস্থার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। পুলিশের বেতন-ভাতাসহ নানা সুবিধাদি বাড়ানো দরকার। অর্থাৎ আধুনিক বাহিনী গঠন করার জন্য যা যা দরকার তার সব ব্যবস্থা করতে হবে। দেশে আতঙ্ক সৃষ্টির জন্যই বিদেশিদের হত্যা করা হয়েছে। তাদের টার্গেট করে হত্যা করা হয়নি। হত্যাকারীদের বলা হয়েছিল, সাদা চামড়ার লোক হলেই হলো। তারা ইতালি, জাপানি আর ইউরোপের হোক তাতে কোনো যায় আসে না। এই বিদেশিরা হলেন নিষ্পাপ ভুক্তভোগী। বিদেশি হত্যার উদ্দেশ্য হলো বিশ্বের কাছে বাংলাদেশকে হেয়প্রতিপন্ন করা। কিন্তু হঠাৎ করে একটি ঘটনা ঘটিয়ে কেবল তাৎক্ষণিক প্রচারণা পাওয়া যায়, দীর্ঘস্থায়ী কোনো সমাধান হয় না। তবে এসব ঘটনাও থেমে যাবে। কারণ বিদেশি হত্যার সঙ্গে জড়িতদের ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এ কথা ঠিক যে, মতাদর্শগত কারণেই জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটছে। কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষে এই জঙ্গিবাদ দমন করা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে শক্তিশালী সামাজিক প্রতিরোধ দরকার। এ ধরনের ঘটনা যাতে না ঘটে সে জন্য প্রতিরোধ শক্তির কোনো বিকল্প নেই। বুলগেরিয়ায় একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে আমার বক্তব্য ছিল, সন্ত্রাসীদের উৎস কোথায়? তারা কোথা থেকে আসে? আত্মঘাতী বোমা নিক্ষেপ করার লোকটিই বা কে? তাকে খুঁজে বের করতে হবে। এ ক্ষেত্রে দেখা গেছে, আত্মঘাতী বোমা নিক্ষেপকারীদের অধিকাংশ গরিব এবং ছিন্নমূল। এরা এতিমখানায় লালিত-পালিত। এদের সঙ্গে পরিবার তথা মা-বাবার কোনো সম্পর্ক নেই। মগজ ধোলাই করে তাদের এমন কাজে অনুপ্রাণিত করা হয়। তাদের বলা হয়, আত্মঘাতী বোমা নিক্ষেপের মাধ্যমে সে সহজে বেহেশতে যাবে। আর বেহেশতে গেলেই সুখের শেষ নেই। এসব অনুপ্রেরণায় তারা বোমা নিক্ষেপের প্রস্তাবে রাজি হয়। কিন্তু তাদের পরিবার, বাবা-মা থাকলে বশ করা যেত না। এই কাজ করার আগে তাদের মাথায় পরিবারের চিন্তা আসত। এ কাজের জন্য তার মা-বাবার কী হবে। কাজেই এ ক্ষেত্রে শিশুদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের দেশে পথশিশুদের সংখ্যা বাড়ছে। বাবা-মা হারানোসহ নানা কারণে শিশুরা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে। এসব শিশুর অধিকাংশেরই এতিমখানায় স্থান হয়। পাক-ভারত উপমহাদেশে এতিমখানাগুলো ঐতিহাসিকভাবে ধর্মীয় সংগঠনগুলোর দখলে। এতিমখানায় আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা নেই। এতিমখানা মানেই হচ্ছে হাফেজিয়া অথবা কওমি মাদ্রাসার শিক্ষা। এতিম শিশুদের রাষ্ট্র কর্তৃক আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করা হলে জঙ্গিবাদ তথা মৌলবাদী সমস্যার একটি সমাধান হতে পারে। মানুষ সুস্থ স্বাভাবিক জীবনযাপন এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ পেলে বঞ্চনাবোধ কমে আসবে। এ ছাড়া একজন মানুষ যদি আর্থিকভাবে সচ্ছল হয় তাহলে তাকে কোনোভাবেই জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত করা যাবে না। কাজেই পরিপূর্ণ বিকাশের জন্য শিশুর শারীরিক, মানসিক, আত্মিক, নৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের জন্য পর্যাপ্ত মানসম্মত জীবনযাপনের অধিকার সংরক্ষণ করা উচিত।
সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হলো মসজিদ। ইসলামি ফাউন্ডেশন দীর্ঘদিন যাবৎ ইমাম প্রশিক্ষণ নামে একটি কর্মসূচি চালাচ্ছে। কিন্তু তার পরও নানা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে মাইকে বিভিন্ন ওয়াজ নসিয়ত শোনা যায়। যেগুলো অনেকটাই এ জঙ্গিবাদকে উসকে দেয়। এখানে প্রায়ই শোনা যায় ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের কথা। অনুভূতি হলো বিশ্বাসের একটি প্রাথমিক পর্যায়। কতকগুলো ধাপ অতিক্রম করে সর্বশেষ হলো মানুষের বিশ্বাস। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, অনুভূতি হলো সেন্সেশন। এ ক্ষেত্রে একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে যেমনÑ আল্লাহর কোনো আকার নেই, এটি আমার দৃঢ়বিশ্বাস। যদি কেউ বলে আল্লাহর আকার আছে, তাকে দেখা যায়। এ অবস্থায় যেহেতু আমি বিশ্বাস করি আল্লাহ নিরাকার, তাকে দেখার কোনো সুযোগ নেই। কাজেই এ কথা আমার অনুভূতিতে লাগার কোনো কারণ নেই। আমি মনে করি, যাদের বিশ্বাস দুর্বল তাদের অনুভূতি বেশি সূক্ষ্ম থাকে। যাদের বিশ্বাস যত বেশি দৃঢ় তাদের অনুভূতিও ততটা কার্যকর থাকে না। যারা অনুভূতিতে আঘাতের নামে মানুষকে মারতে আসে তাদের বিশ্বাসে সমস্যা রয়েছে। বেহেশত পাওয়ার জন্য আত্মঘাতী বোমা মারা সম্পূর্ণরূপে কোরআনে নিষিদ্ধ। এসব কাজের মাধ্যমে বেহেশত পাওয়া তো দূরের কথা উল্টো সে দোজখে যাবে। একজন মানুষ হত্যা করা মানে পুরো মানবজাতিকে হত্যা করা। মদিনা সনদ এবং বিদায় হজের ভাষণে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, সব ধরনের সন্ত্রাসবিরোধী কার্যকলাপ থেকে বিরত এবং নানাধর্মের মানুষদের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ইসলামি জীবনবিধান সব ধরনের সন্ত্রাসকে হারাম ঘোষণা করেছে। এসব কথা যদি মসজিদের ইমামরা খুতবার সময় বলেন তাহলে মানুষ সচেতন হবে। এ ক্ষেত্রে মসজিদের ইমামদের সঠিকভাবে প্রশিক্ষিত করার ব্যাপারে গুরুত্ব আরোপ করতে হবে। যাতে তারা সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ প্রতিরোধের মতো জাতীয় কর্মকা-ে ভূমিকা রাখতে পারেন। এর বিপরীতে ইসলামের অপব্যাখ্যা দিয়ে ইমামরা যাতে উগ্রবাদী কথাবার্তা তথা সন্ত্রাসী কর্মকা- উসকে না দেন সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মসজিদ কমিটির নজর রাখতে হবে। সমাজে অন্যায়, অত্যাচার, ব্যভিচার, রাহাজানি, সন্ত্রাসী এবং জঙ্গিবাদসহ সব অপকর্ম দূর করার লক্ষ্যে ইমামদের উচিত মানুষকে ভালো কথা বলা, সুপথে পরিচালিত করা। নতুন প্রজন্ম সচেতন, তারা মৌলভীদের অপব্যাখায় কান দেবে না। কিন্তু তৃণমূল পর্যায়ের বয়স্ক শিক্ষাহীন ব্যক্তিরা মৌলভীদের কথায় বেশি বিশ্বাস করে। এমনটি না করে মৌলভীরা যদি জামায়াতে ইসলাম কায়েম করতে চানÑ তাহলে তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিরোধ করতে হবে। সামাজিক প্রতিরোধের ক্ষেত্রে প্রতিটি মসজিদে কমিটি গঠন করতে হবে। রাজনৈতিক ব্যক্তিদের কেবল বাইরে রাজনীতি করলেই হবে না বরং মসজিদে গিয়ে শোনা উচিত মৌলভী সাহেব সঠিক কথা বলেন কিনা। মৌলভীরা যাতে ধর্মভীরু লোকদের বিভ্রান্ত করতে না পারেনÑ সেদিকে নজর রাখতে হবে। মসজিদের মাইক ব্যবহারে নির্দেশনা থাকা উচিত। কেবল আজান দেওয়া ছাড়া মসজিদের মাইক আর কোনো কাজে লাগানো যাবে না। কেননা আমরা দেখেছি, চাঁদে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে দেখা যাচ্ছে, এমন ঘোষণা প্রথমে মসজিদের মাইক থেকে দেওয়া হয়েছিল। আর এর মাধ্যমে সমাজের গরিব, নিরীহ মানুষের ক্ষতি করা হয়েছে। অর্থাৎ আমাদের সমাজের প্রত্যেক প্রতিষ্ঠান থেকে জঙ্গিবাদ দমনে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। মানব সভ্যতার ইতিহাস বলে, সভ্যতা কখনো পেছনের দিকে যাবে না, শত বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে সভ্যতা সামনের দিকে অগ্রসর হবে। জঙ্গিদের যাবতীয় কর্মকা-ের মূল লক্ষ্য হলো দেশকে পেছনে নিয়ে যাওয়া, তা কখনোই সম্ভবপর হবে না।
লেখক : উপাচার্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়


পাতাটি ১৫৩৭ বার প্রদর্শিত হয়েছে।