দশদিক মাসিক

হোম ইতিহাসযেভাবে আমরা বই পেলাম এবং আমাদের ঐতিহ্য

যেভাবে আমরা বই পেলাম এবং আমাদের ঐতিহ্য

মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন

বইয়ের যাত্রা কবে শুরু তা নির্দিষ্ট দিনক্ষণ উল্লেখ করে কেউ বলতে পরেনি বা পারা সম্ভব কিনা তা জানা নেই। তবে তা বলতে না পারলেও বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন খ্রীষ্টপূর্ব সপ্তম থেকে চতুর্থ সহ¯্রাব্দের মাঝে কোন এক সময় বইয়ের যাত্রা শুরু হয়। তার চেয়েও খাঁটি কথা মানুষ যখন থেকে মুখের ভাষাকে বিভিন্ন প্রতীকের মাধ্যমে ব্যক্ত করার চেষ্টা করেছে তখন থেকে বইয়ের যাত্রা শুরু। এক্ষেত্রেও প্রশ্ন উঠতে পারে বইতো কতগুলো নির্দিষ্ট বর্ণমালায় সজ্জিত রূপ, যা অলঙ্কারপূর্ণ ও নান্দনিকতার বিকাশের ফল। তাই বলে প্রতীকের প্রকাশকে কি বই বলা যাবে বা আদৌ যৌক্তিক হবে? জবাবে বলতে হবে, এর চেয়ে নিগূঢ় বাস্তবতা আর নেই। কারণ বর্তমান সময়ের দৃষ্টিনান্দিক ও শৃঙ্খলিত বর্ণমালা নানা প্রয়োজন ও দাবীর প্রেক্ষাপটেই বিবর্তিত হয়ে আজকে এই রূপ ধারণ করেছে।

মানুষ শুরুতে কিসের উপর লেখা শুরু করেছে তা নিয়েও বিতর্ক আছে, যা থেকে যাবে; কারণ এর নির্দিষ্ট ইতিহাস উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি এবং সম্ভব হবেও না। তবে থাকলেও সবার একথা মেনে নেয়া ভাল প্রতীকগুলো কাঠে, পাথরে বা নরম কাদা মাটিতে, গাছের বাকলে ও পাতায় লিপিবদ্ধ করেছিল। এদের মধ্যে কাঠে লেখার প্রবণতা ছিল বেশি কেননা কাঠে লেখার উপায় ছিল কিছুটা সহজ ও স্থায়ী। এছাড়া নানা বিবর্তনের ধারা পর্যবেক্ষণ করলে এটা সহজেই প্রতীয়মান হয় যে প্রতীকের পর মানুষ নানা চিত্রায়নের মাধ্যমে নিজেদের মনোভাব প্রকাশ করত, যা ধীরে ধীরে বর্ণ তৈরী করে এবং সেগুলিকে আধুনিক রূপ দিয়ে আজকের এই নান্দনিককতা আমাদের কাছে এসেছে।

আরো মজার বিষয় হলো বর্তমান সময়ে বিভিন্ন জায়গায় আমরা যে চিকা মারা দেখি তা সত্যিকার অর্থে লিখন পদ্ধতিগুলোর প্রাচীনতম উপায়গুলোর একটি। যেমন খ্রস্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দীতে অসুর রাজাদের প্রচীনতম সংগ্রহশালা রাখা আবিষ্কৃত লাইব্রেরীগুলোর মধ্যে প্রাচীনতম। এই সংগ্রহশালা থেকে জানা যায় মানুষ সে সময়ে ভিজা কাদায় ছাপ দেয়ার জন্য ক্যালমাস নামক একধরনের ত্রিভুজ ব্যবহার করত। এধরণের বাইশহাজার নিদর্শন সেখানে আরো উজ্জ্বল প্রতীক হিসাবে এই আদি সত্য সবাইকে বলে যাচ্ছে।

তবে পাশাপাশি আমাদের মনে রাখতে হবে বর্ণমালার বিকাশই কেবল বইয়ের আধুনিক রূপ দিতে হয়নি, বর্ণমালার পাশাপাশি সেগুলিকে লিপিবদ্ধ করার স্থানগুলোকেও উন্নত করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছিল। তবে কাগজ আবিষ্কারের প্রাচীন স্থান চীন হলেও খ্রিস্টপূর্ব ২৪০০ সালে মিশরে প্যাপিরাস তৈরী করে রাজতন্ত্রের সকল নথিপত্র লিপিবদ্ধ করা হতো। তাই কাঠ, পাতা বা পাথর ছেড়ে প্যাপিরাসে লিখন পদ্ধতিই হচ্ছে লিখন পদ্ধতির আধুনিকতম রূপ।

বিভিন্ন দেশে সভ্যতার বিকাশের অন্যতম কারণ হচ্ছে কাগজ আবিষ্কারের মাধ্যমে বই বানানো বা লিখন। এক সময়ের বর্বর বা জলদস্যু আমেরিকায় ‘আমাতে’ নামের যে কাগজ তৈরী করত তাতে বিভিন্ন বই লিখতে সে দেশীয় পন্ডিতেরা। আর এভাবেই সেখানে মায়া সভ্যতার গোড়া পত্তন ঘটে। এই বই লিখন যাত্রার মধ্য দিয়েই আমেরিকার সভ্যতার যাত্র শুরু হয়। কিন্তু এতেও বাধা হয়ে দাঁড়ায় স্পেনিশরা। স্পেনিশরা আমেরিকা দখল করে অখ্রিস্টিয় বই বলে অধিকাংশ বই ধ্বংস করে। তবে যে ক’টি বই বেঁচে ছিল তা পৃথিবীর সভ্যতার বিকাশের ধারা ও বিবর্তনকে মনে করিয়ে দেয় সবাইকে।

দীর্ঘকাল টিকে থাকা প্যাপিরাস কাগজ খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীতে পার্চমেন্ট নামক কাগজ গরু, ভেড়া বা গাধার চামড়া থেকে তৈরী হতো বলে স্থায়ীত্ব বেশি ছিল। তাই পারগ্যামন রাজা দ্বিতীয় এউমেনেস পার্চমেন্ট কাগজে বই লেখার প্রচলন চালু করেন। ফলে প্যাপিরাসে বই লেখার প্রচলন বন্ধ হয়ে যায়।

গ্রিক সভ্যতার কথা সবার জানা আছে। গ্রিক সভ্যতার জয়জয়কার সবার মুখে মুখে। তাই অনেক সভ্যতার অবদান ঢাকা পড়ে গেছে এই গ্রিক সভ্যতার অতিরিক্ত বর্ণনায়। আবার অনেক পৌরনিক কাহিনী আমাদের হৃদয়ে স্থায়ীত্ব লাভ করে নিয়েছে সত্য হিসাবে। যেমন, টলেমি সোটার লাইব্রেরী গড়েছিলেন খিস্ট্রপূর্ব বহুপূর্বে। যেখানে বই বা ভলিউম ছিল ৫০০৯০০। কিন্তু খিস্ট্রপূর্ব ৪৭ সালে তা ধ্বংস হয়ে যায়। অন্যদিকে প্যারাগ্যামন লাইব্রেরী গড়ে উঠেছিল খিস্ট্রপূর্ব বহুপূর্বেই। যেখানে বই ছিল ২০০০০০। কিন্তু ৬৪২ সালের দিকে আরব বিজয়ে এই লাইব্রেরী ধ্বংস বা নষ্ট হয়ে যায় বলে পশ্চিমারা দাবী করেছেন এবং আমরা তা বিশ্বাস করেছি। মজার বিষয় হচ্ছে এর পক্ষে কোন যুক্তি কেন নেই? কোন প্রমাণ নেই? সভ্যতার বিকাশমানতাকে দীর্ঘায়িত করার জন্য এরকম পৌরণিক ও আজগুবি কাহিনী তৈরীর প্রয়োজনীয়তা কী? কেন আমরা অন্যের ইতিহাস ও ঐতিহ্যে আত্মতুষ্টি লাভ করি?

এদেশের বহুপূর্বেই হাতের লেখা বইয়ের প্রচলন ছিল। যার সবচেয়ে বড় উদাহরণ ‘চর্যাপদ’। কিন্তু সেগুলোকে রাজনৈতিক ও পশ্চিমা বিশ্বের প্রতি আনুগত্য প্রকাশের জন্য পুঁথি হিসাবে আখ্যাদিয়ে প্রাচীন বইয়ের মর্যাদা দিতে আমাদের অনীহা বেশ জোরালো। তাছাড়া বাংলা ভাষায় বইয়ের আদি ও ইতি সম্পর্কে বলতে গিয়ে মাহবুব রশিদ বলেন, “ভূর্জপত্র থেকে শুরু করে তালপাতা, এমনকি তুলট কাগজ দিয়ে পুঁথি ভুতোর সাথে ভাতের মাড় আঠার লেই মিশিয়ে তৈরী করা হতো কালি, আঁকা হতো রঙ্গীন ছবি।” কী দূর্ভাগ্য এ জাতির! তালপাতায় লেখা হতো বলে এই লেখাগুলি বইয়ের মর্যাদা পায়নি। কিন্তু গ্রিক বা জার্মানিরা যা দিয়েই লিখতো তাকে সম্মান করার প্রবণতা দেখে জাতির মাথা উঁচু করে থাকতে পারে না।

তবে মুদ্রণ যন্ত্র আবিস্কার হবার পরও দীর্ঘ সময় লেগেছে বাংলাভাষায় প্রথম মুদ্রিত বই ছাপতে। ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী কর্মচারী বাংলা ভাষাবিদ নাথানিয়েল ব্রাসি হালেদ ব্রিটিশ কর্মচারীদের বাংলাভাষা শিখানোর জন্য যে ব্যাকরণ বই প্রকাশ করেন তাই তাই প্রথম মুদ্রিত বাংলা বই। এভাবেই আমরা ধীরে ধীরে বই পেয়েছি। সবার আগে নিজের ইতিহাস জেনে নিজের ঐতিহ্যকে শ্রদ্ধা করা শিখতে হবে এবং নিজের অজানাকে জেনে অন্যদের ঐতিহ্যকেও শ্রদ্ধা করতে হবে । তবে নিজের অংহকারে বস্তু হিসাবে অন্যদের ঐতিহ্যকে চর্চা না করাই বুদ্ধিমানে কাজ।



লেখক: মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন
প্রভাষক, নর্দান বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ
ও সেক্রেটারি, চারুতা ফাউন্ডেশন
jashimnub@yahoo.com


পাতাটি ৩৭৭১ বার প্রদর্শিত হয়েছে।