দশদিক মাসিক

হোম জাপান কমিউনিটিটোকিওতেনিজস্বএক খণ্ড বাংলাদেশ

টোকিওতেনিজস্বএক খণ্ড বাংলাদেশ

-মোহাম্মাদ নাহিদ:
জাপানে বাংলাদেশের নতুন স্থায়ী দূতাবাস প্রকল্পের (গ্রীন বর্ষা )কাজ শেষ হয়েছে। মার্চ মাসের ২৫ তারিখ থেকে দূতাবাসের নতুন ঠিকানায় নিজস্ব ভূমিতে, নিজস্ব ভবনে দূতাবাসের দৈনন্দিন কাজ কর্ম নতুন উদ্দমে শুরু করেছেন।জাপানের গুরুত্ব পূর্ণ এলাকা ( পার্লামেন্ট ভবন, বিভিন্ন মন্ত্রনালয়,প্রধান মন্ত্রীর কারযালয়,জাপান সম্রাটের আবাস স্থল) এর কাছাকাছি বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব অর্থে জাপান সরকারের কাছ থেকে পাঁচ বছর মেয়াদি কম কিস্থিতে কেনা ৭১৪ বর্গ মিটার জমিতে ১১১ কোটি ইয়েন দামে ক্রয় করতে সক্ষম হয় বাংলাদেশ সরকার। জাপানে বাংলাদেশের মর্যাদার প্রতিক,জাপানের বুকে আমরা পেয়েছি লাল সবুজের ছোট্ট বাংলাদেশ।শ্রদ্ধার সাথে আজ স্মরণ করছি সেই শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের যাদের রক্ত ঋণে , অর্জিত এই পতাকা । উড়াচ্ছে জাপান, উড়াচ্ছে বিশ্ব ।জাপান প্রবাসীরা খুঁজে পেয়েছেন নকশী কাঁথার ঢংএ
বাংলার ঐতিহ্য দু –চালা ঘরের আবেশে , সাকুরা ফুলের সৌরভ মাখা এক অপলক সৃষ্টি। যা দেখলে মণ জুড়িয়ে যায় মন ছুঁয়ে যায়।
\
মাননীয় প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১০ সালের নভেম্বরের ২৮ তারিখে জাপানের রাষ্ট্রীয় সফরের সময় এর ভিত্তি প্রস্থর স্থাপন করেন। সেই সাথে আশা প্রকাশ করেন যত দ্রুত সম্ভব এর নির্মাণ কাজ সমাপ্ত করতে। প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের জন্য অর্থমন্ত্রীকে জোর তাগিদ দেন। দূতাবাস নির্মাণের উদ্যোগ বাংলাদেশ সরকার গ্রহণ করেন জাপান প্রবাসী বাঙ্গালীদের জোর দাবীর ফলে। প্রথমে দুদেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে অত্যন্ত স্বল্প সুদে জাপান সরকারের কাজ থেকে বাংলাদেশ এই জায়গাটি লাভ করেন। জমিটা টোকিওর চিইয়দা কু, কিওই চো ৩-২৯ এ অত্যন্ত গুরুত্ত পূর্ণ একটি এলাকায় অবস্থিত।এর মূল্য অনেক দিক থেকে বিচার্য ।জমির পরিমান ৭১৪ বর্গমিটার। নির্মাণ কাজটি ২০১১ সালের মাঝামাঝিতে শুরু হয়ে ২০১২ সালে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা বিভিন্ন জটিলতার কারণে থমকে গিয়েছিল। প্রকৃত সমাপ্তি মার্চ ২০১৬। ২০১২ সাল থেকে ২০১৬ দীর্ঘ চার বছর বিভিন্ন জটিলতায় থমকে গিয়েছিল নির্মাণ কাজ।অন্যান্য দেশের দূতাবাস জাপানে নির্মাণ করেছেন তাদের দূতাবাস নির্মাণ করতে এতটা সময় ক্ষেপণ করা হয়নি। যা বিরল ঘটনা।তৎকালীন রাষ্ট্রদূত আশরাফ উদ-দৌলার সময়ে দূতাবাস কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় জমি কেনা ও ভবন নির্মাণ এর প্রচেষ্টা শুরু হয়। একাধিক কিস্থি পরিশোধ করা হয়। দূতাবাস ভবন নির্মাণ এর জন্য কনসালটেন্ট নিয়োগ করা হয়। রাষ্ট্রদূত মজিবর রহমান ভুইয়া এর সময় মাননীয় প্রথান মন্ত্রী শেখ হাসিনা এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। পরবর্তী কার্যক্রম স্থবির হয়ে পরে।মজিবর রাহমান ভুইয়া চলে যাবার পর তৎকালীন দূতাবাসের চার্জ দ্যা এফেয়ারস ডঃ জীবন রঞ্জন মজুমদার এর সময় কালে এর অগ্রগতি বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়। পরবর্তীতে রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মমেন এর সময়কালে দূতাবাস ভবনটি দ্রুততার সাথে সম্পূর্ণ হয় । সদ্য নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত রাবাব ফাতিমার সময় প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে।চার জন রাষ্ট্রদূতের নিকট জাপান প্রবাসীরা কৃতজ্ঞ।
জাপানী স্থাপত্য উপদেষ্টা ফার্ম কেপিএএবং বাংলাদেশের স্থাপত্য উপদেষ্টা ফার্ম ভার্নাকুলার আর্কিটেক্টস যৌথ ভাবে এই দূতাবাস কমপ্লেক্সটির নকশা প্রনয়ন করেছেন। নির্মাণ প্রতিষ্ঠান ছিলেন মুরামত কর্পোরেশন । জাপানী স্থপতিদের মধ্যে রয়েছেন স্থপতি ইউশি কিতাগাওয়া এবং স্থপতি মাশাহিরো ওনো ,বাংলাদেশের স্থপতি ছিলেন ভার্নাকুলার আর্কিটেক্টস এর প্রেসিডেন্ট ও প্রধান স্থপতি ডঃ মাসুম ইকবাল । জাপানে বাঙালী কমিউনিটিতে সামাজিক, সাহিত্যিক, রাজনৈতিক কারণে বেশ পরিচিত ।বিশেষ করে টোকিওস্থ ইকেবুকুরো নিশিগুচি পার্কে স্থাপিত শহীদ মিনার নির্মাণের প্রস্তাব তিনিই প্রথম ২০০৪ সালে জাপানের বাংলা কাগজ পরবাস আয়োজিত ভাষা শহীদ দিবসের একটি অনুষ্ঠানে উপস্থাপন করেছিলেন। যার প্রেক্ষিতে প্রবাসী বাঙ্গালিরা , বাংলাদেশ দূতাবাস,বাংলাদেশ সরকার ও তশিমা কু এর যৌথ উদ্যোগে আমরা প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি স্থায়ী শহীদ মিনার। ২০১০ সালের প্রথম দিকে ডঃ মাসুম ইকবাল জাপানের চিবা ইউনিভার্সিটি থেকে উচ্চ শিক্ষা শেষে দেশে ফিরে আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনি ভার্সিটি বাংলাদেশের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন।২০০০ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ব বিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রী অর্জনের পর .২০০৩ সালে তিনি জাপান সরকারের বৃত্তি নিয়ে উচ্চ শিক্ষার জন্য জাপানে আসেন।জাপানে অবস্থান কালে তিনি এন এইচ কে বাংলা বিভাগে সংবাদ পাঠক হিসেবে জড়িত ছিলেন। ডঃ মাসুম ইকবালআওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় রাজনীতির সাথে জড়িত। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপ কমিটির সহ- সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন। ডঃ মাসুম ইকবাল এর কথা এতো বলার কারণ, নির্মাণাধীন দূতাবাসের মুল ডিজাইন করেছেন সেখানে যোগ করেছেন বাঙ্গালীর ঐতিহ্য দু চালা ঘর এর আকৃতি , নকশী কাথা, বাংলার কৃষ্টি , সংস্কৃতি ও মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের কথা মাথায় রেখেই । মুল প্রোগ্রামে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিসৌধ অন্তর্ভুক্ত না থাকলেও তার শহিদ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি ভালবাসায় এটিকে যোগ করেছিলেন।সেখানে ভবন তৈরি হবার পর কোন স্মৃতি সৌধ দেখতে পাইনি। শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে অনেক ধন্যবাদ । শহীদ মুক্তিযোদ্ধারা কিছুটা হলেও আত্মা শান্তি পাবে। যদিও মূল নকশা অনুযায়ী ত্রিমাত্রিক না হলেও একটি দ্বিমাত্রিক স্মৃতি সৌধ যুক্ত করা হয়।


দূতাবাসের পুরো প্রক্রিয়ায় কিছু কিছু দুর্নীতির আভাস পাওয়া যাচ্ছে যথা-১,স্থপতিদের মুল নকশার পরিবর্তন করে আমন্ত্রিত অতিথিদের জন্য বেজমেন্ট এ কার পারকিং বাতিল করা হয়েছে।২,বাংলাদেশের স্থপতির নাম এবং প্রতিষ্ঠান এর নাম বাদ দেয়ার কথা শুনা যাচ্ছে ।
বা-দিক থেকে স্থপতি মাসাহিরো ওনো, মূল্যায়ন কমিটির প্রধান আব্দুল হাই,সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মিজারুল কায়েস,স্থপতি ইউশি কিতাগাওা,মাকোতো হারাদা,এবং স্থপতি ডঃ মাসুম ইকবাল পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ে বৈঠক শেষে।
বেজমেন্ট কার পার্কিং
স্থপতিদের মূল ডিজাইনে আমন্ত্রিত অতিথিদের জন্য বি-১ এগাড়ী রাখার ব্যবস্থা থাকা সত্তেও তা বাতিল করেন তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক। এই ব্যবস্থাটি না থাকার কারণে দূতাবাসে আমন্ত্রিত অতিথি, প্রবাসী বাংলাদেশী বৃন্দ, বিভিন্ন দেশের ভিসা গ্রহীতা গন সহ সকলের জন্য অসুবিধার সম্মুখীন হতে হবে।অধিকাংশ লোকজন গাড়ী নিয়ে দূতাবাসে আসবেন পারকিং না থাকার দরুন দূতাবাসের সামনেই গাড়ী রেখে ভিতরে প্রবেশ করবেন।এরকম চলতে থাকলে অতিষ্ঠ হয়ে উঠতে পারে আসেপাশের অধিবাসীরা। কয়েকদিন পূর্বে দূতাবাস দেখতে আসা এক পর্যটকের ধুম পান করার অভিযোগ শুনতে হয় দূতাবাসের কর্মকর্তাদেরকে।এখানে উল্লেখ্য যে জাপান সম্রাটের অতি নিকট আত্মীয় স্বজনদের আবাস স্থল এর আশেপাশে।জাপান প্রবাসীদের বাংলাদেশের জাতীয় অনুষ্ঠানে গুলিতে হট্টগোল বলাই বাহুল্য। এ থেকে উপলব্ধি করা যায় বঙ্গবন্ধুর সময় কাল থেকে জাপান বাংলাদেশের যে বন্ধুত্বপূর্ণ ছিল তা হুমকির সম্মুখীন হতে পারে। তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক এটাকে বাতিল করার ফলে জাপান বাংলাদেশের বন্ধুত্ব পূর্ণ সম্পর্কের ফাটল ধরবে বলে অনেকেই ধারনাকরছেন।বিষয়টিতে প্রবাসীরা ক্ষোভ জানাচ্ছেন।এখানে দুর্নীতির আভাস পাচ্ছেন অনেকে।

বাংলাদেশের স্থপতি ও প্রতিষ্ঠানের নাম বাদ দেয়ার কথা শুনা যাচ্ছে
বাংলাদেশ দূতাবাস ভবনের মূল নকশার সাথে জড়িত স্থপতি ডঃ মাসুম ইকবাল কে এবং তার প্রতিষ্ঠান ভার্নাকুলার আর্কিটেক্ট এর নাম বাদ দেয়া হয়েছে। এদিকে দূতাবাসে ভবন সম্পর্কিত কোন কাগজ পত্র খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।কাজটি আমাদের বাংলাদেশী স্থপতি অন্তর্ভুক্তির বিনিময়ে মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় নির্দিষ্ট নম্বর (১০) বরাদ্দ ছিল । যাকে ডোমেস্টিক প্রেফারেন্স বলা হয়। মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় বেনিফিট অব ডোমেস্টিক প্রেফারেন্স গ্রহণ করে পরবর্তীতে বাদ দেয়ার সুযোগ নেই। ভবন নির্মাণের শেষ পর্যায়ে যোগাযোগ করা হয় ডঃ মাসুম ইকবাল এর সাথে । তার নাম এবং প্রতিষ্ঠানের নাম বাদ দেয়া হয়েছে জানতে পারেন জাপান প্রবাসী সাংবাদিক কাজী ইনসানুল হক এর নিকট থেকে। স্থপতি ডঃ মাসুম ইকবাল বলেন, ( জাপানে বাংলাদেশের নতুন দূতাবাস ভবনের নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার খবর পেয়েছি এবং গত মাস থেকে কাজ শুরু হয়েছে , বিষয়টি খুবই আনন্দের নিঃসন্দেহে । জাপান প্রবাসী বাঙ্গালীরা এখন একটি নিজেদের জায়গায় মিলিত হতে পারবেন, দূতাবাসের কার্যক্রম খুব ভালভাবে সম্পাদিত হতে পারবে। এর ডিজাইন প্রনয়নে শুরু থেকে আমাদের প্রতিষ্ঠান ভার্নাকুলার আর্কিটেক্ট সহ- পরামর্শক হিসাবে ছিল, এবং ভার্নাকুলার এর পক্ষ থেকে আমি ও আরেকজন স্থপতি আশিক ভাস্কর মান্নান প্রস্তাবনায় অন্তর্ভুক্ত ছিলাম। যদিও তখন দেশে আমার সাথে প্রকল্পটিতে আরও দুজন স্থপতি শরিফুল ইসলাম ও স্থপতি সুব্রত বিশ্বাস বাপ্পি কাজ করেছেন।আমাদের কোম্পানির নাম বাদ দিয়েছেন, শুনতে পাচ্ছি। যা সম্পূর্ণ ভাবে বেআইনি । বিষয়টি বিস্তারিত ভাবে জানিয়ে আমাদের কোম্পানির পক্ষ থেকে মান্যবর রাষ্ট্রদূত (প্রকল্প পরিচালক) বরাবর অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে)।
আগামী ২৫ থেকে ২৮ মে জি-৭ দেশ সমূহের আউটরিচ মিটিং এ যোগ দেওয়ার জন্য জাপানের প্রধান মন্ত্রী শিনজো আবে বাংলাদেশর প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আনুষ্ঠানিক ভাবে আমন্ত্রন জানিয়েছেন।ঐ সময়ের মধ্যে মাননীয় প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা,বাংলাদেশ দূতাবাসের আনুষ্ঠানিক উদ্ভোধন করিবেন বলে আশা করা যাচ্ছে।

জাপানে বাংলাদেশের নিজস্ব দূতাবাস নির্মাণ করে পৃথিবীর বুকে নতুন ভাবে পরিচিতি লাভ করবে বলে আশা প্রকাশ করছি। মাননীয় প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনার একনিষ্ঠতায় দূতাবাস ভবনটি দ্রুততার সাথে শেষ করে বাংলাদেশকে সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয় আরও এক ধাপ বাড়িয়ে দিলেন। অভিনন্দন বাংলাদেশ সরকার কে । আমরা খুঁজে পেয়েছি একটি নিজস্ব ঠিকানা ।আপন আলোয় উদ্ভাসিত নতুন পরিসর।

nahid.tmr@gmail.com


পাতাটি ১৫৩০ বার প্রদর্শিত হয়েছে।