দশদিক মাসিক

হোম ভ্রমনএক পলক মালয়েশিয়া

এক পলক মালয়েশিয়া

-মুহাম্মদ সাজিদুল হক
পাম গাছের সারিগুলো দ্রুত আমার কাছে চলে আসছে। একরাশ ঘন গাঢ় সবুজ বৃক্ষরাজি, ঢেউ খেলানো উঁচু নীচু টিলাগুলোতে কাপড়ের মত জড়িয়ে আছে। দুই পাহাড়ের মাঝ দিয়ে এঁকেবেঁকে বয়ে চলা নদীর রেখাটি আরও স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠছে। ঘন মেঘের জট খুলে পাতলা ছেঁড়া মেঘের ফাঁক গলে আমার দৃষ্টিতে আসা এই দৃশ্যগুলো ক্রমেই বদলে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে কাগজের ক্যানভাসে কোন চিত্রশিল্পীর নিপুণ হাতে আঁকা জলরঙের ছবিটি ক্রমেই বাস্তবে রূপ নিচ্ছে।
এভাবেই মোহাবিষ্ট হয়ে পরিপূর্ণ তৃপ্তি নিয়ে আমি মালয়েশিয়ার কে, এল এয়ারপোর্টের রানওয়ে স্পর্শ করলাম। তখন এয়ারলাইন্সের ঘড়িতে মালয়েশিয়ার স্থানীয় সময় ঠিক ৬.৩৯ টা। এয়ারলাইন্সের অডিও সিস্টেমে ঘোষণা আসছিল- সময় ৬ টা ৩৯ মিনিট; বাইরের তাপমাত্রা ৩৯ ডিগ্রী সেলসিয়াস; আমাদের এয়ারলাইন্সটি রানওয়ে স্পর্শ করছে; মালয়েশিয়ায় আপনাদের স্বাগতম; মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সে ভ্রমণের জন্য এয়ারলাইন্সের পক্ষ থেকে আপনাদের শুভেচ্ছা... ইত্যাদি। এয়ারলাইন্স থেকে নেমেই বিশাল এয়ারপোর্টের ভেতরে আমরা কিছুক্ষণের জন্য গোলকধাঁধাঁয় আটকে গেলাম। ততক্ষণে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। ভেতরে তীব্র আলোর সুসজ্জিত সমারোহ। এয়ারপোর্টের ঝকঝকে টাইলসে নিজের প্রতিবিম্বের ওপর পা ফেলতে ফেলতে যাত্রীদের সাথে সামনে এগুতে থাকলাম। কিছুদূর এগিয়ে ওয়াশরুমের নির্দেশনা দেখতেই থেমে গেলাম। আমার স্ত্রীকে মহিলা টয়লেটের পথ দেখিয়ে আমি লাগেজের পাহারায় থাকলাম। সে ফিরে এলে তাকে সিকিউরিটির দায়িত্ব দিয়ে আমি কাজ সারলাম। হাঁটা শুরু করতেই সামনে কয়েনবক্স টেলিফোন পেলাম। কয়েন ঢুকিয়েই যাচ্ছি কিন্তু কোন ডায়াল টোন পাচ্ছি না। বেশ কয়েকটা কয়েন ঢোকানোর পর উপরে চোখ পড়তেই দেখি ইংরেজীতে লেখা “আউট অফ অর্ডার”। একটু বিরক্ত হলাম নিজের ওপর, আর কর্তৃপক্ষের উপর তো বটেই। শেষে কয়েন থাকল সবে দু’টি। একটি ১ রিঙ্গিত আর অন্যটি ৫০ সেন। কোনভাবে জানানো গেল আমরা পৌঁছেছি।
আমাদের গন্তব্য ওয়ানসামাজো, বড় আপার বাসা। জায়গার নামটাই শুধু জানি। গাড়ি নিয়ে দুলাভাইয়ের এয়ারপোর্ট আসার কথা ছিল কিন্তু ব্যবসায়িক কাজে উনি জাপান আছেন। আপা ড্রাইভ জানেন না। অগত্যা আমাদেরই রাস্তা বের করতে হবে। দু-তিনজন সুন্দরী চটপটে এয়ারপোর্ট অফিসার আর সিকিউরিটি অফিসারের কাছ থেকে নির্দেশনা নিয়ে কে, এল, এক্সপ্রেসে উঠলাম। ট্রেনটি ১৫ মিনিটেই এয়ারপোর্ট থেকে বোর্ডিং পাসে নিয়ে এল। ট্রেন থেকে নেমেই একটি মালয়েশিয়ান মোবাইল কোম্পানীর বুথ পেলাম। ২৫ রিঙ্গিত দিয়ে একটি সিম নিলাম। নাম মাই ম্যাক্সিস, সঙ্গে পেলাম ২০ রিঙ্গিতের ফ্রি টকটাইম। ওরা ব্যালেন্স চেকিং আর বাংলাদেশে কল করার কোড লিখে দিল। ভিসার মেয়াদ দেখে আর পাসপোর্ট নম্বর দিয়ে সিম রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করল। এর আগের স্টলে একই সিমের মূল্য চেয়েছিল ২৬ রিঙ্গিত, বিক্রেতা ছিল এক তামিল। আমার স্ত্রী রুনু মালয়েশিয়াতে তামিলদের থেকে যতটা পারা যায়, দূরত্ব বজায় রাখতে বলল। ও জানালো এখানে এরা পর্যটকদের অনেক হয়রানি করে। তাই আমরা আরও সতর্ক হলাম।
লাগেজ সংগ্রহ করতে সামনে অগ্রসর হলাম। ইয়েলো মার্কিং জোনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছি। সামনের জনের ফর্মালিটিস শেষ হলে আমরা এগিয়ে গেলাম। অফিসার আমার পাসপোর্ট দেখে বললেন- অফিসিয়াল পাসপোর্ট? হুম... ছুটি কাটাতে এসেছ? কতদিন থাকবে? কোথায় থাকবে? সঙ্গে কি স্ত্রী? ইত্যাদি কিছু বিষয়ে ক্রস চেকিং করলেন। সন্তুষ্ট হয়ে আমাদের সুন্দর ভ্রমণ কামনা করলেন। গ্লাসডোর পেরিয়ে বের হয়ে ইলেকট্রনিক বোর্ডে ল্যান্ডিং করা বিমানগুলোর লিস্ট অনুসারে নির্দিষ্ট লাগেজ বেল্টে পৌঁছালাম। আমাদের পৌঁছাতে বেশ দেরি হয়েছিল। ততক্ষণে লাগেজ বেল্ট বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। রুনু বেশ তৎপরতার সাথে সহযাত্রী বাঙালী এক ভাইয়ের কাছে অসংগৃহীত লাগেজগুলোর সন্ধান চাইল। হাসিমুখে সে অনতিদূরে স্তুপাকৃত কিছু লাগেজের প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ করল। তাকে ধন্যবাদ দিয়ে আমরা আমাদের লাগেজ সংগ্রহ করলাম।
লাগেজ নিয়ে স্ক্যানিং এরিয়া পার হয়ে ট্যাক্সিক্যাব কাউন্টার। কাউন্টারে আমাদের গন্তব্য বলার পর আমাদের যাত্রী ও লাগেজ সংখ্যা জেনে নিয়ে ৯২ রিঙ্গিতের বিনিময়ে একটি টোকেন ধরিয়ে দিল। আমরা টোকেন নিয়ে ৪ নং গেইট পার হয়ে বাইরে আসলাম। অনতিবিলম্বে আমাদের হাতের টোকেন দেখে দু’জন ড্রাইভার এগিয়ে এলো। তারা সিরিয়ালে ট্যাক্সি রেখে অপেক্ষামান ছিল। একজন দরজা খুলে আমাদের বসাল আর অপর একজন গাড়ীর ড্যাশবোর্ড খুলে লাগেজ ক্যারিয়ার থেকে মালামাল গাড়ীতে উঠাল। তারপর অতি ভদ্রতার সাথে সহজ সরল গুছানো ইংরেজীতে আমাদের গন্তব্য ঠিকঠাক জেনে লিখে নিল। আমাদের এটাই প্রথম মালয়েশিয়া ভ্রমণ জেনে সে তাদের ক্যাব ইনফরমেশন জোনে ফ্রি কল করে আমাদের বাসার ঠিকানা ও লোকেশান নিশ্চিত করল। তারপর আমাদের বলল আপনারা নিঃশ্চিন্ত থাকেন, আমরা ১.৫ ঘন্টায় পৌঁছে যাব।
ট্যাক্সি এয়ারপোর্ট চত্বর পেরিয়ে বড় রাস্তায় এসে পড়ল। রাস্তায় মৃদু সোডিয়াম লাইটের আলো জ্বলছে। হালকা আলোতে রাস্তার দু’পাশে মাঝে মাঝে ছোট ছোট টিলা আর পাম বাগান চোখে পড়ছে। পাহাড় কেটে বানানো হয়েছে হাইওয়ে। যেগুলো আধুনিক মালয়েশিয়ার রূপকার মাহাথির বিন মুহাম্মদের মহান কীর্তির কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিল। যিনি দেশটির ভৌগলিক স্বাধীনতাকে অর্থনৈতিক স্বাধীনতার স্বাদ দিয়েছিলেন। কৃষিনির্ভর অর্থনীতিকে করেছিলেন শিল্পকারখানা নির্ভর। প্রইভেটাইজেশন ও নিউ ডেভেলপমেন্ট পলিসি (ঘউচ) বাস্তবায়নে জোড় দিয়েছিলেন। তার শাসনামল ছিল ১৯৮১ থেকে ২০০৩। এই দীর্ঘ সময়ে গণতন্ত্রকে করেছিলেন নিয়ন্ত্রিত। রাজনৈতিক অবস্থা তার আমলেই স্থিতিশীলতা পায়। নিয়ন্ত্রিত গণতান্ত্রিক চর্চা, শিল্পনির্ভর অর্থনীতি ও তার সুদক্ষ রাষ্ট্রপরিচালনাই সমসাময়িক অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশ হতে মালয়েশিয়ার পার্থক্য তৈরী করে দিয়েছিল। আজও তার স্বাক্ষর বহন করে চলেছে কে, এল ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট, নর্থ-সাউথ এক্সপ্রেসওয়ে, পেট্রোনাস টুইন টাওয়ার, সেপাং ইন্টারন্যাশনাল সার্কিট, পুত্রাযায়া। আমরা এখন শহরের মধ্যে পৌঁছে গেছি। আধুনিক মালয়েশিয়ার রাতের রূপ যেন স্বপ্নরাজ্য। আশে পাশে আলোর ফোয়ারা নেমেছে। এরই মাঝে টুইন টাওয়ার দেখে মনে হচ্ছে পুরো শরীরে হীরের অলংকারে সজ্জিত হয়ে মাথা উঁচু করে সবাইকে স্বাগত জানাচ্ছে।
রাত ৯.৩০ এ আমরা ওয়ানসামাজো পৌঁছালাম। আমরা ওয়ানসা ওয়াকওয়ে পর্যন্ত আসতেই আপা, দুই ভাগ্নে আর দুই ভাগ্নীকে দেখা গেল। ট্যাক্সিটি পার্কিং এরিয়াতে রেখে আমি গাড়ী থেকে নেমে গেলাম। সবাইকে দেখে আমাদের প্রায় ৭ ঘন্টার ভ্রমণক্লান্তি, অনিশ্চয়তা নিমেশেই যেন উধাও হয়ে গেল। আপাও পরম তৃপ্তিতে তার মুখ প্রশস্ত করলেন নিয়ন্ত্রিত হাসিতে। বাচ্চারাতো তাদের আন্টিকে পেয়ে বাধভাঙা আনন্দে আত্মহারা। সবচেয়ে ছোটটি সামিউল বসল আমার সাথে সামনের আসনে, আর বাকিরা পেছনের আসনে। আমরা পার্কিং এরিয়া থেকে আপার এ্যাপার্টমেন্টের দিকে রওনা হলাম। পাহাড়ের ঢাল বরাবর উঁচু রাস্তা আমাদের পথ দেখাল। একেবারে রাস্তার মাথায় রিয়ানা গ্রীন ইস্ট, লাক্্রারিয়াস এ্যাপার্টমেন্ট। রাস্তার বাঁকে পাহাড়ি গাছগুলোর ফাঁকে যেন ঝকঝক করছে। আমরা সিকিউরিটি ফটকে ইনফরমেশন দিয়ে, ট্যাক্সি টোকেন নিয়ে বিল্ডিংটির নিচে পার্কিং স্পেসে এসে থামলাম। আমাদের স্মার্ট ড্রাইভার সোলাইমান তড়িৎ বেগে নেমে গাড়ীর দরজা খুলে দিলেন। লাগেজগুলো পাশাপাশি নামিয়ে রাখলেন, আমাকে হাত দিতে দিলেন না। আমাদের খুব সুন্দর গুছানো ইংরেজীতে শুভকামনা করলেন এবং উনার একটি কার্ড ধরিয়ে দিয়ে বিদায় নিলেন।
আমরা লাগেজগুলো ভাগাভাগি করে তুলে নিয়ে লিফটের সামনে আসলাম। বাচ্চারাও বাকি থাকল না, বরং অভ্যস্ত ভঙ্গিতে আগে আগে পথ দেখাল। লিফটের দরজা খুলতেই আমরা ভেতরে ঢ়–কলাম। আপার ফ্লাটটি ৩৪ তলায়। ছোট্ট সামিউল লাফ দিয়ে ঠিক ঠিক ৩৪ বাটনটি টিপে দিল। খুব অল্প সময়েই আমরা পৌঁছে গেলাম। নতুন পরিবেশের নতুনত্ব টের পেলাম যখন অপরিচিত গন্ধ নাকে আসল। সাদিয়া একে একে গেইট ও দরজা খুলে দিলে আমরা ভেতরে ঢুকলাম। ঢুকেই অবাক বিষ্ময়ে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে রইলাম। সুন্দর করে সাজানো ছিমছাম বিশাল ড্রয়িং রুমের কাঁচের জানালার ভেতর দিয়ে দেখলাম পুরো শহরটির অনেকটা অংশ তার রূপ সৌন্দর্য মেলে ধরেছে। ড্রয়িং রুম থেকেই দেখা যাচ্ছে আলো ঝলমলে শহরের শেষ প্রান্তে অনেকটা উচ্চতায় পাহাড় সাজিয়ে গড়ে তোলা গ্যঙ্কটিং হাইল্যান্ডকে। বিষ্ময়ের রেশ না কাটতেই সালমান আর সানজিদা নিয়ে গেল ড্রয়িং রুম বরাবর উল্টো পাশের বারান্দায়। ছাদ থেকে ঝুলে থাকা দুই প্রস্থ পর্দা সরাতেই সামনে তাকিয়ে আবার যেন জমে গেলাম মুগ্ধতায়। প্রায় সামনেই মালয়েশিয়া পরিচিতির অন্যতম নিদর্শন যেন তাকে মেলে ধরেছে আপন মহিমায়। এতো টুইন টাওয়ার, পাশেই কুয়ালামপুর টাওয়ার, আরও ছোট বড় অনেক সুউচ্চ দালান কোঠা যেন উন্মত্ত প্রতিযোগিতায় রাজকীয় সাজে সজ্জিত।
এরপর বাসার সবাই মিলে অনেক গল্প আর ঘটনার ডালি নিয়ে বসলাম। ডালি খালি না হতেই ক্লান্ত হয়ে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম জানি না। সকাল ৬.৩০ টায় উঠে পড়লাম। সূর্য তখনও ওঠেনি অথচ বাংলাদেশে একদিন আগেও ৪.৪৫ টায় ফজর পড়েছি। নামাজ পড়ে হেঁটে যেয়ে আবার ড্রয়িং রুমের জানালায় দাঁড়ালাম সকালের শহর দেখব বলে। রাতের কৃত্রিম আলো নিভে সবে সকালের আলো ফুটতে শুরু করেছে। দেখলাম শহরের দিগন্ত রেখায় পাহাড়গুলো প্রায় তিন দিককেই ঘিরে রেখেছে। বরাবর সামনে দুটি পাহাড় এসে মিলেছে। মিলনস্থলটা একটু ফাঁকা আর নীচু। ঐ মিলনস্থলে সাদা মেঘেরা এসে ভীড় করছে। যেন অনেক ঘোরাঘুরির পর কিছুক্ষণ করে বিশ্রাম নিচ্ছে। দেখতে দেখতেই ডানদিকের পাহাড়গুলোর পেছনদিকটা হঠাৎ আলোতে ভরে উঠল। একটু পর হাসতে হাসতে বেরিয়ে এলো সূর্য মহাশয়। কোমল আলোর বিচ্ছুরণে বর্ণালী তৈরী হলো পাহাড়ের ধারগুলোতে। পাহাড়ের চিরহরিৎ বৃক্ষপল্লবের শাখাগুলোতে এক নতুন রূপের ঝলকানি খেলে যাচ্ছিল।
ঐদিন ছিল শনিবার। বাচ্চাদের সবার স্কুলের ডে-অফ। নাস্তা করার পর আপা বাইরে বেরুনোর ঘোষণা দিতেই বাড়ি সরগরম হয়ে উঠল, ভাগ্নে-ভাগ্নীদের প্রস্তুতির প্রাক পর্বে। সকাল ১০ টায় বাসা থেকে বের হলাম। বাসা থেকে বের হয়েই ঝকঝকে তকতকে প্রশস্ত রাস্তা পাহাড়ের ঢাল বেয়ে প্রায় ৫০/৬০ ফুট নিচে নেমে গেছে। সকালের আলোতে খেয়াল করলাম, পুরো বাড়িটাই একদম পাহাড়ের উপরে বিশেষভাবে তৈরী করা। পাশের দু’টি পাহাড়েও একইভাবে এ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণ চলছে। প্রথমেই পুরো পাহাড়টিকে অনেক পুরু ও মজবুত পাথর আর সিমেন্ট দিয়ে বেশ নিচ থেকে নিরাপদ উচ্চতা পর্যন্ত শাসন করা হয়েছে। পর্যাপ্ত পরিমাণ পরিকল্পিত রাস্তা হয়েছে, পার্ক, উপাসনালয়, সংলগ্ন মার্কেটের জায়গা নির্দিষ্ট করা হয়েছে। এরপর এ্যাপার্টমেন্ট তৈরী হচ্ছে মাঝামাঝি স্থানে। সমতলে নেমে আমাদের বাসার দিকে তাকালে মনে হচ্ছিল যেন আকাশ থেকে ঝুলে আছে। বেশ দূর থেকেও চোখে পড়ছে। আপা ওটার নাম দিয়েছেন “চকলেট বাড়ি”। কারণ দূর থেকে দেখলে অনেকটা কিটকেট চকলেট/ওয়েফারের মত মনে হয়। আমরা স্রিরামপাই এল,আর,টি থেকে কে,এল,সি,সি যাওয়ার টিকিট কাটলাম। অটোমেটিক ট্রেনটি চলতে শুরু করতেই বিশাল বিশাল সব এক্সপ্রেসওয়ে, টানেল, মসজিদ, মার্কেট, পার্ক, পাহাড়ে ঘেরা বিশাল বাড়ি, দু’চারটি আম, কলা, কাঁঠাল গাছও নজরে আসতে থাকল। মিনিট ২৫ পর আমরা গন্তব্যে পৌঁছলাম। যা দেখছি তাই যেহেতু আমার কাছে নতুন তাই আমি বিরক্ত বা ক্লান্ত হচ্ছিলাম না। টুকটাক কেনাকাটা আর ঘোরাঘুরির পর বাচ্চারা ক্ষুধার্ত হলো। আপা খেতে নিয়ে গেল ভাইয়ার পছন্দের থাই রেস্টুরেন্টে। সব মেনুই সিলেক্ট করল বাচ্চারা, আপা শুধু যোগ করে দিল ভাইয়ার পছন্দের থাই কোকোনাটে। ডাব ও নারিকেলের মাঝামাঝি পরিপক্কতায় পেড়ে এনে, খোসা ছাড়িয়ে, কেবলমাত্র তৈরী হতে থাকা কাষ্ঠল আবরণের উপরের দিকের মালার অংশটি বিশেষ কায়দায় গোল করে কেটে, কাটা মালার অংশটি ঢাকনা হিসেবে রেখে স্ট্র দিয়ে সরবরাহ করা হয় থাই কোকোনাট। শুধুমাত্র পরিবেশনের বিশেষত্বের জন্য নয়, অসাধারণ মিষ্টি মধুর সুপেয় পানি আর নরম সুস্বাদু শাঁস, না খেলে সত্যিই আক্ষেপ থেকে যেত। এর পর ভাগ্নে-ভাগ্নীদের চাহিদার মূল্য দিতে হলো। দেখলাম এ্যানিমেটেড ছবি “ডিসপিকেবল এম,ই-২”। এ্যানিমেটেড চরিত্রগুলো এত বাস্তব, যে ঘটনার প্রেক্ষাপটে সেগুলো মনে দাগ কেটে গেল।
“সাদিয়া” আমার বড় ভাগ্নিটির নাম। সে খুব বুদ্ধিমতী, ধীরস্থির আর সপ্রতিভ। ওর স্কুল তখন বন্ধ চলছিল। ও প্রস্তাব করল সানওয়ে পিরামিড দেখতে যাবে। সাদিয়া স্কুলের বন্ধুদের কাছে পিরামিডের অনেক প্রশংসা শুনেছে কিন্তু যাওয়া হয়নি তার। লোকেশন জেনে নিয়ে আমরা রওনা করলাম। প্রথমে ট্রেনে করে গেলাম শহরতলি শুভাংজায়া, তারপর ট্যাক্্ির করে একেবারে পিরামিডের পেটের ভেতর ঢুকে গেলাম। পুরো পিরামিডটি মিশরের পিরামিডের আদলে তৈরি, আধুনিক সুসজ্জিত অভিজাত বিনোদনপার্ক ও মার্কেট। গেইটে বিশাল বড় স্ফিংস অর্থাৎ সিংহমূর্তি পায়ের থাবা ছড়িয়ে বসে আছে রাজকীয় ভঙ্গিতে। তার পেছনেই বিশাল পিরামিডের সরু মাথাটি দেখা যাচ্ছে। আর মূর্তির থাবার ভেতর দিয়ে ঢুকলেই সকল বিনোদনের পসরা বসেছে পিরামিডের পেটে। ভেতরে মমির আদলে তৈরী মূর্তি, বড় বড় পিলারগুলোতে সমসাময়িক মিশরের ঐতিহ্যপূর্ণ নকশা আঁকা। সাদিয়ার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে স্কেটিং। ওর আগ্রহের প্রবলতা শেষ পর্যন্ত আমার সমর্থন আদায় করল। অতঃপর টিকিট কেটে হাতে উলের গ্লোভস আর পায়ের মাপ অনুযায়ী স্টিলের পাত লাগানো বিশেষ ধরনের স্কেটিং উপযোগী জুতা পরে দাঁড়িয়ে গেলাম পুরু বরফ স্তরের উপর। দাঁড়াতে আর পারলাম কই, দুই পা ক্রমাগত পিছলে যাচ্ছিল। বরফের উপর দাঁড়ানো শিখতেই চলে গেল দুই ঘন্টা তার উপর সাদিয়া বার সাতেক আছাড় খেল। কিন্তু সে অপ্রতিরোধ্য, ওকে শিখতেই হবে। ওর দৃঢ় মনোবল আমার মনেও শক্তি জোগাল। তাই রোজা রেখেও আরও দুই ঘন্টা সময় দিয়ে, প্রফেশনালদের সাজেশন নিয়ে আমরা হাঁটা ও থেমে যাওয়া শিখলাম। শেষের দিকে অবশ্য আমরা স্লিপ করে অল্প সময়ের জন্য বরফের উপর স্কেটিং করতে শিখেছিলাম। ততক্ষণে আমাদের শক্তি নিঃশেষ। শক্ত জুতার মধ্যে থেকে পা টনটন করছিল। দুজনে মিলে আরও বিশ/বাইশ বার পড়ে হাত ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে ব্যাথাও হচ্ছিল। তবুও অনেক চেষ্টার কিছুটা প্রাপ্তি নিয়ে মিশন শেষ করেছিলাম। আমাদের মত অনেক শিক্ষানবিশও ছিল বলে তাদের তাদের দাড়ানো, হাটা শেখার চেষ্টা আর উল্টে পড়ে যাওয়া সব মিলে উপভোগ্য ছিল বিষয়টা।
এবার মিশন মেঘের দেশ গ্যাঙ্কটিং হাইল্যান্ড। পাহাড় বেয়ে রাস্তা উপরে উঠে গেছে। দুপাশে অতিকায় ফার্ণ গাছের ঝোপ। দেখতে মনে হয় আমাদের দেশের ঢেকি শাকের আম গাছের মত বড় আকাশের সংস্করণ। পাহাড়ের গায়ে জড়াজড়ি করে বেড়ে উঠেছে আরও অনেক শ্রেণীর চিরহরিৎ উদ্ভিদ। তাদের উপর কোথাও কোথাও শুয়ে আছে সাদা ছেঁড়া মেঘদল। রাস্তার দুপাশে ওদের জাতীয় ফুল হেবিসকাস (আমাদের দেশের জবা ফুল) আর লবঙ্গ গাছের ঝার। লবঙ্গ গাছের কচি পাতা ডগার দিকে ফুলের মত বিকশিত হয়ে শোভা ছড়াচ্ছে। পাহাড়ের চূড়ার প্রায় ৫,৫০০ ফিট উপরে পৌছে আমাদের গাড়ী যাত্রা সমাপ্ত হলো। এবার গ্যাঙ্কটিং-এ পৌছাতে হলে আরও ১০০০ ফিট উপড়ে যেতে হবে। মাধ্যম ক্যাবল কার। টিকিট কেটে কারে চড়ে, দুই পাহাড়ের মাঝে শূণ্যস্থানে দুলতে দুলতে আর দুচোখ ভরে পাহাড়ের মোহনীয় সৌন্দর্য দেখতে দেখতে পৌছে গেলাম প্রায় ২০ মিনিট পর। তখন ছিল কড়া রোদ। শীতের কাপড় হাতেই থাকল। দুপুর হয়ে আসাতে ভোজন পর্বের কথা ভাবতে হলো আগে। হোটেলে পরিপূর্ণ স্থানটিতেও সবার পছন্দের খাবার একই হোটেলে প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে প্রায় ৩০ মিনিট কাটিয়ে দিলাম। অবশেষে মিলল সেই প্রত্যাশিত হোটেল, দুএকজনের পছন্দ সামান্য কাটছাট করে। মাংস ভুনা, মাংস ঝোল, ফ্রাই, মাছের ঝোল, মাছের ফ্রাই, সবজি, সুপ সব আইটেমই ৫/৬ ধরনের করে কাচের গ্লাস দেয়া কেসের মধ্যে রেখে দেয়া আছে। আমাদের কাজ শুধু নিজের পছন্দ মতো নিয়ে নেয়া। সবাই নিজেদের মত করে যার যার ট্রে পরিপূর্ণ করল। বের হওয়ার সময় আইসক্রীম নিয়ে টেবিলে বসল। আমি শুধু দর্শক আর অভিবাবক হয়েই রইলাম। কারণ আমি রোজা। খুব কষ্ট হলো রসনা সংবরণ করতে কিন্তু এ যাত্রায় নিজকে নিয়ন্ত্রণ করতে সমর্থ হলাম। খাওয়া শেষে এবার টিকিট কাটলাম, উদ্দেশ্য আউটডোর থিম পার্ক। ভেতরে হরেকমের রাইড এর সমারোহ যার সবকটি উপভোগ করার ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু অপশন বেশী হওয়াতে সবার সিদ্ধান্ত মিলছিলনা। তাই আমাদের দল ভেঙে গেল। সবাই সবার পছন্দ অনুযায়ী রাইড উপভোগ করার পর ক্লান্ত হয়ে এক যায়গায় মিলিত হলাম। অমি হঠাৎ আকাশের দিকে তাকিয়ে সানজিদাকে বললাম, একটু পরই বৃষ্টি হবে। এত রোদ যে তার কোন সম্ভাবনাই নাই দেখে ও আমার কথা হেসেই উড়িয়ে দিল। পাশেই ছিল আইসক্রীম পার্লার। সবাই সিদ্ধান্ত নিল আইসক্রীম খাবে। দেয়া হলো তাদের পছন্দেরটি। পার্লারের বারান্দায় বসে সবাই আইসক্রিম খাচ্ছিল। এই ফাঁকে আমি, আপা আর রুনু মিলে একটা ফটো সেশান সেরে নিলাম। মিনিট বিশেক পার হয়েছে হঠাৎ কোথা থেকে যেন ঘন কালো বিশাল এক মেঘ এসে পুরো পার্কের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল। ঠান্ডায় আমরা যেন জমে যাচ্ছিলাম। এক হাত দূরেও কেউ কাউকে দেখছিলামনা। তাই সবাই হাত ধরে ধরে পার্কের ইনডোরে ঢুকে গেলাম। কে, এফ, সি রেস্তোরার বাইরের বারান্দায় বসলাম আমরা। অর্ডার দেয়া হলো ফ্রাইড চিকেন এবং ১০০ আপস্। সানজিদা খেতে খেতে জিজ্ঞেস করল আঙ্কেল আপনি কিভাবে বুঝেছিলেন যে বৃষ্টি হবে? আমি বললাম ঐ কালো মেঘটিকে আমি বেশ দূরে দেখতে পেয়েছিলাম। আর পাহাড়ের উপর এত উচ্চতায় বাতাসের গতিবেগ বুঝে অনুমান করেছিলাম ও এদিকটায় আসবে। ততক্ষণে বিকেল গড়িয়ে গিয়েছিল তাই বৃষ্টি থামলে দেরী না করে শীতের কাপড় জড়িয়ে, তাড়াতাড়ি বাসার পথে রওনা দিয়ে দিলাম।
মালয়েশিয়াতে একটি বিষয় বেশ লক্ষণীয় ছিল যা আমার খুব ভাল লেগেছে। সেখানকার বিভিন্ন ধর্ম বিশ্বাসীরা অথবা একই ধর্মের বিভিন্ন মাত্রার বিশ্বাসীরা পাশাপাশি সহাবস্থানে নির্বিঘেœ তাদের দৈনন্দিন কাজ করছে। কেউ কাউকে অন্তত ধর্মীয়ভাবে আহত করছেনা। সেখানকার যানবাহন, বিপনীবিতান অথবা রাস্তঘাটগুলোতে তাদের নিরাপদ সহাবস্থান। কেউ পড়ে আছে পাশ্চাত্য রীতির উগ্র পোশাক, কেউবা পড়েছে সাদামাটা ভদ্রচিত মার্জিত পোশাক আবার অন্য একটি দল পড়েছে পুরোপুরি ইসলামী রীতির পোশাক পর্দপ্রথা মেনে। কিন্তু কেউ কাউকে লেবাস অনুসারে বা ধর্মীয় রীতি অনুসারে বিভক্ত করছেনা। যেমন কে, এফ, সি বা ম্যাকডোনাল্ডস-এ বা বিপণিবিতান বা মুভি কাউন্টারে- আটোসাটো খাটো পোশাক পড়া মেয়েরা ও পর্দা প্রথা অনুযায়ী পোশাক পড়া মেয়েরা পাশাপাশি হাসিমুখে একই যায়গায় কাজ করছে।
ইসলাম ধর্মানুসারীদের জন্য আরেকটি বিষয় আমার খুব সুবিধাজনক মনে হয়েছে। তা হচ্ছে ওখানকার স্কুলগুলোতে ছাত্রছাত্রীদের সাধারণ জ্ঞানার্জনের পাশাপাশি নির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্ত ইসলামী জ্ঞান অর্জনকেও বাধ্যতামূলক করা হয়। যেমন ইন্টরমিডিয়েট পাশ করার পর একজন শিক্ষার্থীকে জুমআ-র নামাজ বা ঈদের নামাজ পড়ানোর উপযোগী করে গড়ে তুলা হয়। কোরআন অর্থ সহ যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বিশ্লেষণ সহকারে পড়ানো হয়। ধর্মের অন্যান্য প্রাত্যহিক পালনীয় ফরজ যেমন নামাজ, রমজানের সময় রোজা পালনও বাধ্যতামূলক। ইতেকাফ্ এর মত বিষয়কে তাদের ধর্মীয় ব্যবহারিক শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আমার ভাগ্নে-ভাগ্নীরাও এভাবে শিক্ষিত হচ্ছে দেখে খুব ভাল লাগল।
ভাইয়া মালয়েশিয়া আসলেন আমরা বাংলাদেশে ফেরার ৭ দিন আগে। আমাকে নিয়ে উনার মালয়েশিয়ার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ঘুরে দেখালেন। ফেরার দুদিন আগে নিয়ে গেলেন ফাইভস্টার হোটেল ফেডারেল কোয়ালালামপুর। ওখানে উনার এবং উনার পরিবারবর্গের সম্মানে মিসেস লোরেইন একটি পার্টির আয়োজন করেছিলেন। মিসেস লোরেইন একজন প্রতিষ্ঠিত আইন ব্যবসায়ী। তিনি চাকুরিজিবী, ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন ইস্যু অথবা মালয়েশিয়াতে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে ইচ্ছুকদের বিভিন্ন আইনী সহায়তা দিয়ে থাকেন। এ পর্যন্ত তিনি বিভিন্ন দেশের প্রায় তিন হাজার নাগরিককে মালয়েশিয়ার এম,এম,টুএইচ (গগ২ঐ) আর্থাৎ মালয়েশিয়ান সেকেন্ড হোম অফারের আওতায় সফলভাবে স্থায়ী ভিসার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। একজন মাঝবয়সী, সদা হাস্যোজ্জল, সদালাপী সফল মহিলার বিনয়ে আমি অভিভূত হলাম। উনি তার চেম্বার কাম রেসিডেন্স ঘুরিয়ে দেখালেন, ওটা ছিল সুইস গার্ডেন। অনেকক্ষণ সবাই মিলে গল্প করলাম। তারপর রাত ১২.৩০ এ বাসায় পথে রওনা হলাম। তার একদিন পর অনেক স্মৃতি আর তৃপ্তি নিয়ে মালয়েশিয়া থেকেও বিদায় নিলাম বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে।


পাতাটি ১৯৩১ বার প্রদর্শিত হয়েছে।