দশদিক মাসিক

হোম ভ্রমনবেড়িয়ে এলাম 'নাখিল ভিলেজ'

বেড়িয়ে এলাম 'নাখিল ভিলেজ'

নূর আয়েশা সিদ্দিকা জেদ্দা

০১.
লোহিত সাগরের পূর্ব ধার ছুঁয়ে 'নাখিল ভিলেজ' এর অবস্থান। সাগরের এই পাশটিতে এ ধরণের আরো অনেক অনেক রিসর্ট চোখে পড়ে। ছবির মত সাজানো গোছানো পরিপাটি এই রিসর্টটিতে ঢুকতেই প্রবেশ পথের পরে রিসিপশন ও মূল ডাইনিং ভবনটি। এরপর ভেতরে ঢুকলেই হাতের ডান পাশে সুইমিং পুল, সুরম্য উদ্যান, পানির ফোয়ারা, ডানে বামে অনেক গুলো ডুপেক্স ভিলা। এছাড়া ও রয়েছে মেয়েদের জন্য স্বতন্ত্র সুইমিং পুল। যেতে যেতে সাগরের তীর ঘেঁষে আরো একটি সুইমিং পুল, মূল লোহিত সাগরের নির্দিষ্ট কিছু জায়গা নিয়ে বোট স্কেটিং এরিয়া সব মিলিয়ে বেশ দৃষ্টি নন্দন পরিবেশ।

গত বেশ কয়েক বছর আগে একবার গিয়েছিলাম 'নাখিল ভিলেজ। 'এবার আমার হ্যজব্যন্ডের অফিসের পিকনিকে আবার যাওয়া হল। যেহেতু অফিস হতে পিকনিকে অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যা ছিলো সীমিত, মাত্র ৪০০ ফ্যামিলি। তাই দেখা গেল অন্য ন্যশানালিটির মানুষের ভিড়ে আমরা বাংলাদেশী মাত্র ৫টি পরিবার যাবার সুযোগ পেলাম। যেহেতু অফারটি ছিলো 'আগে আসলে আগে পারে'র মত। তাই বাকীরা অলসতার আড়মোড়া ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে 'নো ভেকেনসি' সাইন পড়ে গেল। থাক, ভাবলাম বাকীদের জন্য মন খারাপ করে লাভ নেই। বাঙ্গালী একাই একশ।

নাখিল ভিলেজে ঢোকার রাস্তাটি ভিলেজের বুক চিরে ঠিক মাথার সিথির মত মাঝ বরাবর করে এগিয়ে গিয়ে যেন একবুক তৃষ্ণা নিয়ে আছড়ে পড়েছে সাগর সৈকতে। আর পথের দু'পাশ জুড়ে সবুজ ঘাসের কার্পেট ফুঁড়ে কোথাও বাগান বিলাস, কোথাও কাঠ গোলাপ এধরণের রকমারি ফুলের গাছ। মরু ভূমির রুক্ষ বুকে সবুজের এই মেলা কেবলি মনে করিয়ে দিচ্ছিল সবুজ বাংলার স্নিগ্ধ শ্যমল মায়াময় রুপটিকেই। স্রষ্টার অকরুণ দানে আমাদের দেশে ঘাস যেখানে বিনা যতেœ, বড় অবহেলাতেই বেড়ে উঠে। সেখানে এই দেশে এই ঘাস শিশুকে পরিচর্যা করার জন্য রীতিমত আমাদের মত গরীব দেশগুলো হতে দল বেঁধে কর্মচারী নিয়োগ করা হয়। এই ঘাস শিশুদের পরিচর্যায় এই সব শ্রমিকরা কর্তব্যের খাতিরে পরম মমতায় যেভাবে নিজকে নিঃশেষ করে শ্রম ঢেলে দেন। তার অর্ধেক মমতাও এই পরবাসী মানুষ গুলো গোটা জীবন মিলিয়ে ও নিজের সন্তানকে দেবার মত সুযোগ পান বলে আমার মনে হয়না।

মাঝে মাঝে এখানে ওখানে তৈরী করা কৃত্রিম পানির ফোয়ারা গুলো দুষ্ট ছেলের মত বিরামহীম ভাবে পানি ছিটিয়ে চলছে। সুশৃংখল ভাবে সারি করে লাগানো গাছ গুলো কোনটি করিম ঘটকের ছাতার আকৃতি,আবার কোনটি সর্পিল ভঙ্গিতে এঁকে বেঁকে গেছে।

এখানে একটি কথা বলি পাঠক। তরুণী বধুর পার্লারের কল্যাণে খুঁত ঢাকা নিপূণ প্রসাধন চর্চিত মুখটি আমার চোখে যেমন অতি মাত্রায় কৃত্রিমতার সাইন বোর্ড ঝুলিয়ে রাখে। তার তুলনায় তরুনী বধুর সদ্য ঘুম ভাঙ্গা ফোলা মুখ আর কপাল জুড়ে কিছু বিচুর্ণ চুলের অস্তিস্ব কিংবা স্নান শেষে সারা চোখে মুখে পানির আদ্রতা ভরা প্রলেপ অনেক বেশী মনলোভা আর প্রাকৃতিক মনে হয়। তাই নাখিল ভিলেজের প্রকৃতি জুড়ে সবুজের এই সমারোহের মাঝে ও মনটা খুঁত খুঁত করছিলো। মনে হচ্ছে যেন বড় বেশী কৃত্রিমতার ছড়াছড়ি সর্বত্র। প্রকৃতির নিজস্ব ভঙ্গিতে চলার গতিকে যেন এক করুণ নিষ্ঠুরতায় মানুষের রুচি আর মর্জির কাছে হার মানতে হয়েছে। তাই কি প্রকৃতি সুযোগ পেলে তার বন্য আক্রোশে মাঝে মাঝে প্রতিশোধ নেয় জনারণ্যে? কখনো মাতাল ঝড় আর কখনো দু'কুল প্লাবিত ধ্বংসাতœক বন্যা হয়ে।

আমার ছোট মেয়েটি ছুটে এসে বললো- আম্মু, দেখ গাছটিতে কি সুন্দর সাদা ফুল ফুটেছে। আমিও অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখলাম অনেকটা বেলী ফুলের মত দেখতে। এরই মাঝে আমার মেয়েটি হঠাৎ আর্তনাদ করে বলল-আম্মু, গাছটি খুবই পচা। দেখ আমাকে কাঁটা ফুটিয়ে দিলো। আল্লাহ কাঁটা গাছ বানানোর কি দরকার ছিলো? আমার ক্লাস ওয়ানে পড়ুয়া এই মেয়েটির হাজারো প্রশ্ন থাকে প্রতিদিন। আর যেটাই তার অপছন্দ সেটা র ব্যাপারে প্রশ্ন থাকে- কেন আল্লাহ এটি বানালেন? আমি ওকে সান্তনা দিয়ে বললাম- কেন তুমিই তো সেদিন বললে তোমার সাইন্স টিচার বলেছেন কাঁটা গাছের আতœরক্ষার কাজে লাগে। তাছাড়া গাছ বেচারা তো নিজ হতে তোমাকে গিয়ে ব্যথা দেয়নি। তু্মইি ওকে ধরতে গিয়ে ব্যথা পেলে। আর দেখ গাছেরা কত ভালো। কত রকম গাছ মিলেমিশে এক জায়গায় আছে। কেউ কাউকে মারছেনা, চিমটি কাটছেনা কিংবা গালাগালি দিচ্ছেনা। অথচ দেখ আমরা সৃষ্টি সেরা জীব হয়ে ও আমরা মানুষরা কিন্তু তাই করি।

আমার মেয়েটা মাশাআল্লাহ বেশ মন দিয়ে শুনে। ও বিজ্ঞের মত মুখ ভঙ্গি করে গাছের উপর আলতো করে হাত রেখে বললো- গাছ বন্ধু, সরি।

আমার বড় মেয়েটির জন্য আজকের দিনটি বেশ আনন্দের। ভাগ্যক্রমে ওর একজন সাউথ আফ্রিকান আর একজন মালেশিয়ান ক্লাস মেটকে পেয়ে গেল পিকনিকে। এদিকে ছোটটাকে নিয়ে আমি গেলাম মেয়েদের সুইমিং এরিয়ায়। সেখানে বাহুল্য কাপড়ের অপচয় রোধের আন্দোলনে নামা প্রায় নগ্ন পোষাকের মুসলিম নারীদের দেখে কষ্টে মনটা ভরে গেল। কত অভাগা আজ মুসলিম জাতি! পোষাকি নামটাই শুধু মুসলিম পরিচিতি প্রকাশের একমাত্র প্রতীক। কিন্তু চিন্তা- চেতনায়, মন-মননে আজ ও পূর্ণ ভাবে আমরা ইসলামে দাখিল হতে পারছিনা। বিজাতীয় সংস্কৃতিই আজ আমাদের একমাত্র অনুকরণরীয় আদর্শ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আমার পিচ্চিটা তো চোখ বড় বড় করে বার বার প্রশ্ন করল- আম্মু, ওরা সবাই এমন শেমলেস কেন? শিক্ষা আর প্রযুক্তিগত উন্নয়নের জোয়ারে ভেসে যখন আমাদের মানব সভ্যতার অবস্থান ক্রমাগত উর্ধ্বমুখী। সেখানে পোষাক আর আচরণগত দিক দিয়ে কেন যে এখনো আমাদের মনের দৌড় সেই গুহা মানবদের পর্যায়েই কেবলি ধেয়ে যেতে চায় তা আমার বোধগম্য হয় না। মাশাআল্লাহ আমার ছোট মেয়েটির জানার আগ্রহ খুব বেশী। তাই ওকে আমি পাল্টা প্রশ্ন করলাম- সেদিন তুমি বলেছিলে রাস্তার বিল্লি (বিড়াল) গুলো খুব শেম লেস। যেখানে সেখানে টয়লেট করে। আল্লাহ ওদের কেন বানিয়েছেন? এখন তুমিই বল আমরা এত বড় মানুষরা বেশী সেমলেস? নাকি লিখাপড়া না শেখা বিল্লি গুলো? আমার মেয়েটি লজ্জা লজ্জা মুখ করে বলল- আমরা মানুষরা।

০২.
দুপুরে লাঞ্চ করতে গিয়ে দেখলাম রীতিমত খাবারের পাহাড় চারদিকে। প্রতিটি ডিশ হতে এক টেবিল চামুচ করে খাবার নিলে ও মোটামুটি ২/৪ দিন না খেয়ে থাকা যাবে। শুধু মাত্র চোখের ক্ষুধা মেটাতে বাহুল্য খাবারের এই ধরণের আয়োজনে আমার কেবলি সোমালিয়াসহ বিশ্বের অনাহারী মানুষ গুলোর অভুক্ত মুখটা ভেসে উঠে।

ভোজন পর্ব সেরে অনেকেই দেখলাম দুই পাশে রক্ষিত ভিলা গুলোয় আশ্রয় নিয়েছে খানিকটা অলস আবেশে বিশ্রামের আশায়। আমি কথা বলার জন্য সঙ্গী হিসেবে যদিও বেশ নিরস। কিন্তু আমার সঙ্গীনিকে মনে হল বেশ উপভোগ করছেন আমার সঙ্গ। অথচ ভর দুপুরে পাতার ঝিরঝিরে হাওয়ার ভেতর হতে কোথাও যেন হারিয়ে যাবার ডাক শুনতে পাচ্ছিলাম।

মনের যাযাবরী অংশটা লুফে নিলো সেই ডাক। নয় ছয় বুঝিয়ে ভাবীটিকে খসিয়ে ফেলে আমি বেরিয়ে এলাম প্রকৃতির আহবানে। চারপাশে বেশ সুনসান নিরবতা। আমি একটি চেয়ার টেনে বড় একটি পাম গাছের নীচে এসে বসলাম। অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখলাম পাম গাছের বিঘত খানেক কাটা শুকনো পাতার গোড়ায় ছানা পোনা নিয়ে রীতিমত সংসার পেতেছে অসংখ্য পাখি। আমি তো বিস্ময়ে হা। আসলেই জীবন অপ্রতিরোধ্য। আমি খুঁতখুঁতে পান্তা বুড়ির মত মনে মনে বললাম- দেহ কারবার। এই বেকুব পক্ষীগুলানের কামডা দেখছো? কোন হানে থাকতাচে। আমরার দেশে বাবুই পাখি কত সুন্দর কইরা গর বান্ধে। দেখলে তোমরা টাসকি খাইতা। হ।

হঠাৎ দেখি গাছের মাথায় বেশ কিচির মিচির প্রতিবাদ। বুঝলাম আমরা মানুষরাই যেখানে নিজের সমালোচনা শুনতে অভ্যস্ত নই সেখানে এই পাখি বেচারাদের তো দোষ দিয়ে লাভ নেই। আর তাছাড়া অসময়ের অনধিকার অবস্থানকারীর এই উপস্থিতি বোধহয় তারা মেনে নিতে পারছেনা। আমি দ্রুত চেয়ার সরিয়ে নিলাম। সাবধানের মার নেই। যদি প্রতিশোধ হিসেবে ওরা আমার মাথায় ইয়ে ..করে দেয়। আমার হাতের কাছেই ঝোপের ভেতর একটি পাখির ডিম পড়ে আছে দেখলাম।

মধ্যাহ্নের সূর্যটা তখনো দু'হাতে তার উত্তাপ ছড়াচ্ছে। মাথার উপর নির্মেঘ আকাশটা যেন সাদা বকের পালকে ছেয়ে আছে। পায়ের নীচে সবুজের কার্পেট। আমি ভাবনার পাহাড়ে হেলান দিয়ে ডুবে গেলাম অন্যলোকে। শব্দহীন মনটা যে তখন হাজারো আলাপনে সবর হয়ে উঠেছে নিজেরই সাথে।

বেশ অনেকক্ষণ পর বুকের ভেতর সাগরের আহবান শুনতে পেলাম। আমি জুতো জোড়া হাতে নিয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মত হেঁটে চললাম সবুজ ঘাসের বুক চিরে ঝরা পাতার গা মাড়িয়ে সৈকতের পানে। ঝরা পাতার মর্মর ধ্বনি মনে করিয়ে দিল সেই গানটি- জীবনের সোনা ঝরা দিন গুলো আজ শীতের পাতার মত ঝরে যায়।....

বিগত কয়েক ঘন্টায় দেখেছি ঘাস গুলোর সজীবতা ধরে রাখতে একাধিক বার পানি দেয়া হয়েছে। তাই এর সবুজ চাদরে হাঁটার লোভ সামলাতে পারলাম না। নিজ দেশের নীল আকাশের সামিয়ানা আর সবুজ ঘাসের গালিচাটা ছেড়ে আসার কষ্টটা যে লেপ্টে থাকে আমার প্রবাসী মনে প্রতিদিন, প্রতিক্ষণ।

কিন্তু হাঁটতে গিয়ে ঘাসের কদম চাঁট চুলগুলো পায়ের তলায় হালকা সুঁইয়ের মত বিঁধছিলো। আগে ও বলেছি এখানে ও মানুষ প্রকৃতির গায়ে হাত দিয়েছে। কোথায় নরম ঘাসের ডগা গুলোকে নিজস্ব স্বকীয়তায় মাটির কাছে ঝুঁকে নিরিবিলি একটু আলাপ সারতে দেবে তাই নয়। বরং সেগুলোকে যেন রুলার দিয়ে মেপে কাচি চালানো হয়েছে সমানে। মনে মনে ভাবলাম- কেন অন্যের উপর আধিপত্য বিস্তারে আমাদের এই আগ্রাসী মনোভাব? নিজের মতে নিজের পথেই অন্যকে চলতে বাধ্য করা। না হয় অত্যাচারের এমনি খড়গ তুলে অন্যের জীবন বিপন্ন করা।

এক সময় পৌঁছে গেলাম সৈকতের বালুকা বেলায়। তাকিয়ে দেখলাম দিগন্তে, যেখানে নীল আকাশটা যেন মিশে গেছে সাগরের নীল জলে। দু'চোখে এক অদ্ভুত তন্ময়তা নিয়ে কেবল তাকিয়েই রইলাম। আমি সাগর পাড়ের মানুষ। সাগর আমার চেতনায়, আমার আতœবিশ্লেষনে আমার ভাবনায় সব সময় এক অন্যরকম ছায়া ফেলে। কতটা দীর্ঘ সময় আমি তন্ময় হয়েছিলাম জানি না। হঠাৎ দু'পায়ে নোনা জলের সিক্ততায় ঘোর কাটলো। সেই সাথে দু'চোখের আদ্রতায় ও চমকালাম নুতন করে। -একি আমি কাঁদছি!

পাঠক, আজ সত্যিই আমার খুব খুব মন খারাপ। চারপাশে এত উপচে পড়া সৌন্দর্যের মাঝে ও তা উপভোগের অনুভূতি যে লুঠ হয়ে গেছে। এই নিয়ে আজ কতবার যে চোখের পানি চোখের রোদ্দুরেই শুকিয়েছি। শুধু মাত্র একটি সুন্দর পরিবেশের সাথে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দিতেই বেদনাহত মনটাকে আড়াল করে শব্দের পর শব্দের জাল বুনে গেলাম।

১৯৭১ আমি দেখিনি। কিন্তু সেদিন আমি সাগরের নীল জলের তীরে দাঁড়িয়ে আমার হাজারো স্বজাতির কান্নার নোনা জলের স্বাদ পেয়েছিলাম।

গাছে পানি দিতে থাকা স্বল্প আয়ের আমার দেশের মানুষ গুলোর এই ছন্ন ছাড়া জীবন আমাকে ভীষণ প্রভাবিত করে প্রতিনিয়ত। কিন্তু জীবনে এই প্রথমবার মনে মনে বললাম- থাক, নিজ দেশে পাখির মত গুলি খেয়ে স্বজনদের চোখের সামনে মরে পড়ে থাকার চেয়ে পর দেশে কুকুর বিড়ালের কোনমতে দু'মুঠো জঠর জ্বালা মিটিয়ে তবু বেঁচে থাক মানুষ গুলো। বুঝলাম বদলে যাওয়া সময়ের সোপানে এসে বদলে যাচ্ছে আমার অনুভবের পথচলাও।

# নূর আয়েশা সিদ্দিকা জেদ্দা : সৌদী প্রবাসী, গল্পকার ও প্রাবন্ধিক


পাতাটি ১৬৮১ বার প্রদর্শিত হয়েছে।