দশদিক মাসিক

হোম ভ্রমনঘুরে এলাম নিউ ইয়র্ক

ঘুরে এলাম নিউ ইয়র্ক

রেহনুমা বিনত আনিস

০১.
হাফিজ সাহেবের এক অত্যন্ত প্রিয় খালার বিয়ে হয় অ্যামেরিকা প্রবাসী পাত্রের সাথে। খালার বাড়ী, গাড়ী, ব্যাবসা সবই আছে কিন্তু কাগজপত্র সংক্রান্ত জটিলতার জন্য আর দেশে যাওয়া হয়ে ওঠেনি। তাই বিশ বছর খালার সাথে দেখা হয়নি ওনার। ক্যানাডা আসার পর থেকে খালার সাথে প্রায়ই কথা হয়। এবার সুযোগ করে খালার সাথে দেখা করতে গেলাম।

১৩ই সেপ্টেম্বর

বেলি আপা, যার কাছ থেকে আমাদের গাড়ী কেনা, আমাদের এয়ারপোর্টে নামিয়ে দিয়ে গাড়ী নিয়ে চলে গিয়েছেন। এয়ারপোর্টে ঢোকার পর থেকে মেজাজটা ক্রমাগত খারাপ হতে রয়েছে। প্রথমেই নামে মুহাম্মাদ দেখে হাফিজ সাহেবকে আলাদা রুমে নিয়ে আটকে রাখা হোল আধাঘন্টা যেন সন্ত্রাসীরা প্লেন উড়িয়ে দেয়ার জন্য সন্তানসন্ততি নিয়ে প্লেনে ওঠে কিংবা নাম থেকে মুহাম্মাদ বাদ দেয়ার মত বুদ্ধি তাদের নেই। ওখান থেকে নিষ্কৃতি পেয়ে সামনে এগিয়ে যেতে ওরা আমাদের পানির বোতল, জুস সব ফেলে দিল যেন এগুলো মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্র। আমাদের পরনের সেফটি পিন, ব্রুচগুলোও ওদের ভীতির সঞ্চার করে। এরা টাকা ছাড়া একটা লাগেজও নিতে দেয়না আর ওদের দৃষ্টিতে পাসপোর্ট বহনকারী কোমরের বেল্টটিও একটি স্বতন্ত্র ব্যাগ হিসেবে পরিগণিত হয়। জীবনে শতাধিকবার প্লেনে চড়েছি কিন্তু এমন সংকীর্ণ, বে-আরাম, বালিশ কম্বলবিহীন, অকেজো এসিওয়ালা প্লেন আর দেখিনি। প্লেনে কোন খাবার দেয়া হয়না, তবে কেউ চাইলে কিনে খেতে পারে, পানীয়ও বিক্রয়যোগ্য তবে সাদা পানি এবং কোকজাতীয় পানীয় চাইলে পাওয়া যায়।

পথে ট্রানজিট ছিল হিউস্টনে, এক ঘন্টারও কম, এক টার্মিনাল থেকে অন্য টার্মিনালে যেতেই শেষ। নইলে হিউস্টনে বসবাসরত আমার এক বান্ধবীকে আসতে বলতাম যার সাথে বিশ বছর দেখা হয়নি। এই অ্যামেরিকান মুসলিমা বাংলাদেশী বিয়ে করায় এক সময় চট্টগ্রামে থাকতেন, বিধবা হয়ে ফিরে এসে আবার বাংলাদেশী বিয়ে করেন। তিনি এত সুন্দর করে ইসলামকে বুঝেন এবং বোঝান যাতে জন্মগত মুসলিমরা নিজেদের মূর্খতায় লজ্জা পাবে।

প্লেন নিউ ইয়র্ক এসে নামতেই ঝাঁ করে একটা দুর্গন্ধ নাকে এসে ঢুকল। বুঝলাম ঘটনা খারাপ। আমি এমনিতেই পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতাপ্রিয়, তার ওপর টানা পাঁচ বছর পৃথিবীর পরিচ্ছন্নতম নগরীতে বসবাস আমাকে শুচিবায়ুগ্রস্ততার দ্বারপ্রান্তে এনে দিয়েছে নিজের অজান্তেই। সমস্ত পুরোনো শহরগুলোর মতই এই শহরটিও ঘিঞ্জি, সংকীর্ণ রাস্তাঘাটযুক্ত, লোকে লোকারণ্য, আবর্জনা, শব্দদূষণ এবং অপরাধপ্রবনতার শিকার। দেশে থাকতে আমরা প্রায়ই কলকাতা বেড়াতে যেতাম। হাফিজ সাহেব বেশ কিছুদিন ধরেই কলকাতাকে মিস করছিলেন। ওনাকে বললাম, 'ওয়েলকাম টু কলকাতা'। নিউ ইয়র্ক আর কলকাতা কাছাকাছি সময়ে একই ঔপনিবেশিক প্রভুদের হাতে গঙা। আদতেই এই দুই শহরের মাঝে অনেক মিল। উভয় স্থানে একই স্থাপত্যকলার দেখা মেলে, একই লাল ইটের ব্যাবহার, একই সাইজের বাঙীঘর, একই ধরনের দোকানপাট আর রাস্তায় একইরকম ট্রাফিক।

খালু যখন আমাদের এয়ারপোর্ট থেকে নিতে এলেন তখন রাত বারোটা। হাফিজ সাহেবের সাথে খালুর এই প্রথম সাক্ষাত। কিন্তু প্রথমে দেখাতেই ওনার খালুকে ভাল লেগে গেল। খালা একটু পর পর ফোন করছেন আমরা কত দূর, কতক্ষণে পৌঁছাব। খালার বাসা নিউ ইয়র্কের বাইরে, লং আইল্যান্ডে। ওখান থেকে যেকোন জায়গাই ন্যূনতম এক ঘণ্টার দুরত্ব। আমরা যতক্ষনে গিয়ে পৌঁছলাম ততক্ষণে খালা অস্থির হয়ে ঘরের বাইরে চলে এসেছেন। খালা, খালু আর দুই বোন রুশা ও হৃদিতার সাথে এই আমাদের প্রথম দেখা হলেও কোন জঙতা ছিলোনা। আর ছিলেন খালার বৃদ্ধা শাশুডড় যিনি ছিলেন 'আরজালিল উমুর' শব্দের বাস্তব প্রতিচ্ছবি, 'তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ মৃত্যুমুখে পতিত হয় এবং তোমাদের মধ্যে কাউকে নিষ্কর্মা বয়স পর্যন্ত পৌছানো হয়, যাতে সে জানার পর জ্ঞাত বিষয় সম্পর্কে সজ্ঞান থাকে না' (সূরাহ হাজ্জ্বঃ আয়াত ৫)। তিনি এককালে দুর্দন্ড প্রতাপশালী মহিলা ছিলেন, যেভাবে স্বামীর সহায় সম্পত্তি সামলেছেন, একইভাবে বৌদের ওপর ছডড় ঘুরিয়েছেন অথচ এখন সামান্য ব্যাপারেও শিশুদের মত আচরন করেন। খুব আশ্চর্য লাগে যখন দেখি কেউ ক্ষমতা পেলে ভবিষ্যতের কথা ভাবেনা। অনেক শাশুড় বোঝেন না বৌয়ের প্রতি তাঁর আদর করার দায়ীত্ব না থাকলে শাসন করার অধিকার জন্মায় কি করে? তিনি একটি মেয়েকে স্নেহ দিয়ে বৃদ্ধ বয়সে তার সেবাযতেœর অধিকার অর্জন করতে পারেন অথবা সাময়ীক ক্ষমতার লোভে মত্ত হয়ে বৃদ্ধবয়সে তার দয়ার পাত্রী হতে পারেন। খালা তাঁর মাস্টার বেডরুম শাশুড়ীকে ছেড়ে দিয়ে নীচতলায় থাকেন, শাশুড়ীর তদারকে সদা যতœবান, অনেক সময় শিশুদের মত আচরন করলে খাইয়েও দেন। রুশা আমাদের ওর রুম ছেড়ে দিয়ে দাদুর রুমে চলে গেল। রাদিয়া আর হৃদিতা সমবয়সী, ওরা দু'জন একসাথে থাকার সংকল্প করল।

খাবার ইচ্ছা না থাকলেও খালার অনুরোধে খেতে বসলাম। খাবার টেবিল দেখে আমি নিশ্চিত হলাম খালা পাগল হয়ে গিয়েছেন। বিশাল টেবিলের কোথাও এক ইঞ্চি জায়গা খালি নেই। আমরা খেয়ে দেয়ে কিছুক্ষণ গল্পগুজব করলাম। বহুদিন পর দেখা হলে যা হয়, অনেকের কথা মনে পড়ে, অনেকের খোঁজখবর করা হয়। দেখতে দেখতে অনেক রাত হয়ে গেল।

১৪ই সেপ্টেম্বর

রাতে অন্ধকারে ভালভাবে দেখা হয়নি। সকালে উঠে দেখলাম খালার বিশাল বাগান। এই এলাকায় সরকারের নিয়ম অনুযায়ী প্রতি লটের ২০% জায়গা বাঙীর, ৮০% জায়গা বাগানের। সামনের বাগানে পথের দু'পাশে গাছগুলো খালু সুন্দর শেপ করে কেটে রেখেছেন, খালা ফুলের বাগান করেছেন, ঝর্ণা, ইট দিয়ে ছোট্ট ঘের বানিয়ে জলজ উদ্ভিদ লাগিয়েছেন, ডানপাশে বিরাট বিরাট গাছ, একটা গাছের কান্ডের পুরোটাই লতায় ঢাকা। পেছনের বাগানে লাউ, কুমঙা, সীম, বরবটি, করলা, টমেটো, বেগুন, ক্যাপ্সিকাম, কাঁচামরিচ, ফলফলাদি। নিউ ইয়র্কের আবহাওয়া ক্যাল্গেরীর মত শীতল নয়, তাই ফলনে প্রাচুর্য দেখা যায়। তার ওপর খালাখালুর যতেœ বাগানটি এত সুন্দরভাবে বেড়ে উঠেছে যে পথচারীরা বাঙী বয়ে প্রশংসা করে যায়।

হাফিজ সাহেব শখ করেছিলেন খালার হাতে মোগলাই পরোটা খাবেন। খালা দেখি সাত সকাল উঠে মোগলাই বানাচ্ছেন। দেশে থাকতে রান্নার সময় শাশুডড় আম্মার সাথে বসে বসে গল্প করতাম। বহুদিন পর আবার রান্নাঘরে খালার সাথে বসে গল্প করলাম। খালা কথা বলেন খুব আদর করে। অন্যরা ঘুম থেক উঠার আগেই অনেক গল্প হোল খালার সাথে।

আমাদের কন্যারা ঘুম থেকে উঠেই জানাল ওরা কার্লোস বেকারী দেখতে যাবে। এখানে একটি জনপ্রিয় টিভি প্রোগ্রাম কেক বস। নিউ জার্সীর কার্লোস বেকারীর মালিক বাডি ভ্যালাস্ট্রো আর তাঁর পরিবার মিলে ছোট ছোট ফুলওয়ালা কেক থেকে ট্রেন, জাহাজ, চিডড়য়াখানার প্রতিকৃতি, এমনকি প্রমানসাইজের মটরসাইকেল, গাঙী পর্যন্ত বানায় কেক দিয়ে যা দেখতে একেবারেই আসলের মত। এই বেকারীর প্রতিষ্ঠাতা কার্লোস ছিলেন বাডির বাবা। কার্লোসের ঐতিহ্য যাতে পরিবারের বাইরে না যায় সেজন্য এই দোকানের সমস্ত কর্মচারীই হোল পরিবারের সদস্য। লং আইল্যান্ড থেকে নিউ জার্সী যেতেই লাগে দুই ঘণ্টা। তাই আমরা ভাল করে খেয়েদেয়ে রওয়ানা হলাম। লম্বা সময় পর দোকানের সামনে পৌঁছে দেখি মানুষের লাইন দোকানের সামনে ফুটপাথ পেরিয়ে রাস্তার অপর পাঙে ফুটপাথ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। দোকানে ঢোকা গেল প্রায় এক ঘন্টা পর। ছোট্ট দোকানটি মূলত সিটি হলের সামনে অবস্থিত হওয়ায় এবং টিভিতে প্রচার পাওয়ায় জনপ্রিয় হয়ে উঠে। বাচ্চারা কিনল যা কিনতে চায়, অবশ্যই ভালভাবে উপকরণাদি চেক করে নেয়ার পর।

তবে সেদিনের প্রধান চমক, যার জন্য আমরা নিউ ইয়র্ক যাবার আগে থেকেই উদগ্রীব হয়ে বসে ছিলাম সবাই, তা ছিল নিউ ইয়র্কের বাইতুল মা'মুর মসজিদে একটি অনুষ্ঠান যেখানে প্রধান বক্তা ছিলেন শাইখ ইউসুফ এস্তেস। রাদিয়া বার বার বলছিল, 'আমি আবু আমিনাহ বিলাল ফিলিপসকে সামনাসামনি দেখেছি, এবার ইউসুফ এস্তেসকে দেখব, এর পর ডঃ জাকির নায়েককে দেখতে পারলে আমার জীবনের একটা বঙ শখ পূরন হবে'। অনেক ট্রাফিক পেরিয়ে, অনেক উৎকন্ঠা নিয়ে মাগরিবের সময় বাইতুল মা'মুর মসজিদে পৌঁছলাম। কিন্তু তারপর মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। কিছু কিছু মহিলার আচরন দেখে এই আয়াতটি মনে পঙে যাচ্ছিল, 'আর কাফেররা বলে, তোমরা এ কোরআন শ্রবণ করো না এবং এর আবৃত্তিতে হট্টগোল সৃষ্টি কর, যাতে তোমরা জয়ী হও' (সূরাহ ফুসসিলাতঃ আয়াত ২৬)। এঁরা উচ্চকন্ঠে কথা বলছিলেন, হাসাহাসি করছিলেন। ফলে না মসজিদের আদব রক্ষা হচ্ছিল, না তারা নিজেরা শুনছিলেন না কাউকে শোনার সুযোগ দিচ্ছিলেন। বাঙ্গালী স্বর্গে গেলেও মানুষ হবেনা! একটি প্রশ্নের জবাবে শাইখ এস্তেস বললেন, কিয়ামতের অনেকগুলো নিদর্শনের মাঝে বর্তমানে সবচেয়ে প্রকট দু'টি উদাহরণ হোল, পিতামাতা সন্তানদের দাসদাসীতে পরিণত হবে এবং যারা এক সময় রাখাল ছিল তারা অট্টালিকা নির্মানে পরস্পরের প্রতিযোগিতা করবে। কথার সত্যতায় শিউঙে উঠলাম। শাইখ এস্তেসকে দেখলাম অনেক নরম হয়ে পড়েছেন তবু কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন পুরোদমে যেন মৃত্যুর পর তিনি এর ফায়দা লাভ করতে পারেন। বয়স আমাদের সবাইকে গ্রাস করছে কিন্তু আমরা কয়জন আখিরাতের ব্যাপারে এতটা সচেতন?

মসজিদ থেকে বের হয়ে দেখা হোল ব্লগার আবুসামীহা সিরাজুল ইসলাম ভাইয়ের সাথে। আর ছিলেন হাফিজ সাহেবের বাল্যবন্ধু আলী হাসান ভাই। ঠিক হোল আমরা পরদিন আলী হাসান ভাইয়ের সাথে নিউ ইয়র্কের শহর এলাকা দেখতে বের হব।

০২.
১৫ই সেপ্টেম্বর

পরদিন সকাল সকাল বেরিয়ে পড়লাম আমরা চারজন। ট্রেনে করে ম্যানহাটনের ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেন স্টেশনে এসে নামলাম। কলকাতায় পাতাল রেলে চঙার অভিজ্ঞতা থাকায় মাটির নীচে পথঘাট খুঁজে পেতে অসুবিধা হোলনা। নিউ ইয়র্কের সাবওয়ে সিস্টেম প্রতিষ্ঠার দিক থেকে লন্ডনের আন্ডারগ্রাউন্ড রেলওয়ের পরে হলেও আকারের দিক থেকে পৃথিবীর বৃহত্তম, দীর্ঘতম এবং সবচেয়ে জটিল। কোন কোন জায়গায় তিনতলায় ট্রেন চলে। এই ব্যাবস্থা নিউ ইয়র্কের পাঁচটি বৃহৎ কাউন্টি ব্রঙ্কস, নিউ ইয়র্ক (ম্যানহাটন), কুইনস, কিংস (ব্রুকলিন) এবং রিচমন্ড (স্টেটেন আইল্যান্ড) এর মধ্যে প্রথম চারটিকে সংযুক্ত করেছে।

আমরা বের হবার অল্পক্ষণের মধ্যে আলী হাসান ভাই আমাদের সাথে একত্রিত হলেন। দুই বন্ধু চট্টগ্রামের ভাষায় গল্প করতে করতে এগোচ্ছেন। নাগরিক সভ্যতা আমাকে আকর্ষন করেনা, তাছাড়া আমি কিছুতেই নিউ ইয়র্কের আবর্জনাময় পরিবেশ আর দুর্গন্ধে অভ্যস্ত হতে পারছিলামনা, তাই রাদিয়া রিহাম আর আমি চলছি ধীরেসুস্থে। কিছুক্ষণ পর একটি দোকানের সামনে দিয়ে যাবার সময় খেয়াল করলাম এক ভদ্রলোক উৎসুক দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছেন সামনের দুই ভদ্রলোকের দিকে। একটু পর তিনি হাঁক ছাড়লেন, 'অবা, আঁইও চাঁটগাঁইয়া' (ভাই, আমিও চট্টগ্রামের)। কথা বলতে বলতে দেখা গেল এঁদের তিনজনই একই পরিমন্ডলে একই লোকজনের সাহচর্যে জীবন কাটিয়েছেন যদিও তাঁদের নিজেদের মাঝে দেখা হয়নি কখনো। তাঁর কাছে কিছু পরিচিত লোকজনের ফোন নাম্বারও পাওয়া গেল। ভদ্রলোক বিদেশ ছিলেন বহুবছর, বিয়েও করেছেন এক মিশরীয় ভদ্রমহিলাকে, ফলে নিজের ভাষায় কথা বলার লোক পেয়ে আপ্লুত বোধ করছিলেন। আমরা চা খাবনা, তিনি খাওয়াবেনই, পরে হাল ছেড়ে দিয়ে আমাদের একটি চায়ের মগ উপহার দিলেন। মাঝে মাঝে মনে হয় পৃথিবীটা খুব ছোট, একটু তলিয়ে দেখলেই বুঝি মিলে যাবে কোন শেকড় যা আমাদের মানবতার বন্ধনে আবদ্ধ করবে। কতই না সহজ মানুষে মানুষে আন্তরিকতা! তবু মানুষ অমানুষে রূপান্তরিত হতে রয়েছে।

কিশোরী বয়সে একটা মুভি দেখেছিলাম 'ওয়াল স্ট্রিট', এটা অ্যামেরিকার ব্যাবসায়ীক প্রাণকেন্দ্র, মুভির উপসংহারটা খুব ভাল লেগেছিল। টুইন টাওয়ারের ধ্বংসাবশেষের ওপর নির্মিত ফ্রিডম টাওয়ার হয়ে গেলাম ওয়াল স্ট্রিট দেখতে। পুরোনো শহরগুলোর রাস্তা তৈরী হত ঘোড়ার গাড়ী চলার জন্য, রাস্তার দুধারে স্থাপত্য নির্মান হয়ে গেলে আর শহরের চেহারা পরিবর্তন করা যায়না, ওয়াল স্ট্রিটে গাড়ী ঢোকানো মুশকিল। তবে অধিকাংশ শহরের কেন্দ্রস্থল হয় খুব ছোট, ফলে হেঁটেই দেখা যায় বা হেঁটে না দেখলে এর স্বাদ পাওয়া যায়না। ওয়াল স্ট্রিটের ফেডারেল হলটি ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যকলার উদাহরণ। এটি সামান্য আগ্রহ উদ্যেক করল।

এখান থেকে চলে গেলাম স্টেটেন আইল্যান্ডগামী ফেরীতে। চট্টগ্রামে জন্ম আমার, তারপর পৃথিবীর যেখানেই গেছি সমুদ্রের কাছাকাছি ছিলাম, কিন্তু ক্যাল্গেরী এসে রকি মাউন্টেনের কোলে ভূমিপরিবেষ্টিত হয়ে পড়েছি। বহুদিন পর হাডসন বে'র মুক্ত হাওয়ায় প্রাণ ভরে নিশ্বাস নিলাম। ফেরীর প্রোপেলারের ধাক্কায় পানির ফেনাগুলো মনে হচ্ছিল যেন ঠাকুরমা'র ঝুলির গল্পের দুধসাগর। ফেরীর পেছনে ঘেরা দেয়া অংশের বাইরে একটা গাংচিল এসে বসল, খুব আগ্রহ নিয়ে আমাদের পর্যবেক্ষন করতে লাগল, মনে হচ্ছিল যেন দ্য এনশিয়েন্ট ম্যারিনারের অ্যালবাট্রস। ফেরী একটু দূরে চলে এলে বামদিকে দেখা গেল হাডসন বে'র প্রবেশ পথের দু'পাশে কামান লাগানো দূর্গ আর দাঁডড়য়ে আছে স্ট্যাচু অফ লিবার্টি। সামনে একইসাথে নিউ জার্সী, নিউ ইয়র্ক আর কুইন্সের ইট কাঠ লোহা পাথরের আকাশচুম্বী স্তুপ, কিন্তু দূর থেকে দেখে আর এত অসহ্য লাগছেনা। ডানদিকে দোতলা ব্রুকলিন ব্রিজ। এই সফরটুকু খারাপ লাগলনা। স্টেটেন আইল্যান্ডে নামাজ পড়েই আমরা ফিরে এলাম ম্যানহাটন। এবার গন্তব্য স্ট্যাচু অফ লিবার্টি।

হাঁটতে হাঁটতে সবার ক্ষিদে পেয়ে গিয়েছিল। এখানে মোড়ে মোড়ে খাবার দোকানের পাশাপাশি কলকাতার মতই ঠেলাগাডড়তে খাবার বিক্রি হয় যার অন্তত অর্ধেক হালাল। এগুলোতে সব ধরনের লোকজনের ভিড় লেগে থাকে। ক্যাল্গেরীতে শীতল আবহাওয়ার জন্য এমনটা করা সম্ভব হয়না। তবে ইদানিং উষ্ণ দিনগুলোতে কিছু কিছু ভ্যানগাড়ীর পেছনে ভ্রাম্যমান কিচেন করে খাবার বিক্রি করতে দেখা যায়। স্ট্যাচু অফ লিবার্টির ফেরীর জন্য অপেক্ষা করতে করতে ভাবছিলাম স্বাধীনতার এই মূর্তি বৃটেনের কাছ থেকে অ্যামেরিকার মুক্তি উপলক্ষ্যে ফ্রান্সের উপহার হলেও এর পেছনে রয়েছে মূলত চিরশত্রু বৃটেনের প্রতি ফ্রান্সের সুক্ষ্ণ রাজনৈতিক ঠেস। এই বিশাল মূর্তি ওরা ভগ্নাংশ আকারে জাহাজে করে এনে জোড়া দিয়ে গেলেও এর ভিত্তিটা অ্যামেরিকাকে নিজ খরচে তৈরী করে নিতে বলে। এত খরচ কে করে? অ্যামেরিকানরা একটা দূর্গের মাটিরঙ্গা ইটের ভিত্তির ওপর তুলে দেয় স্বাধীনতার দেবীকে যেন তালপাতার টুকরীতে ডায়মন্ডের আংটি! আবার এই উপহার লোকজনকে দেখিয়ে আরো পয়সা উপার্জনের উপায় হয় তাদের- এক্কেবারে ডাবল লাভ! তবে ওদের এত সাধের মূর্তিটি আর দেখা হয়নি কাছে থেকে, ফেরীর সময় শেষ হয়ে গেছিল আমরা যেতে যেতে।

এরপর আমাদের গন্তব্য ছিল রকফেলার সেন্টার আর টাইমস স্কোয়ার। এগুলো রাতের বেলাই দেখতে বেশি ভাল লাগে। তাই সময় ক্ষেপনের জন্য আমরা একটি আদিবাসী মিউজিয়ামে ঢুকলাম। আবার উপলব্ধি করলাম মিডিয়া আসলে কত বড় অস্ত্র। আমাদের ছোটবেলা থেকে শেখানো হয়েছে অ্যামেরিকা আবিষ্কার করেন কলম্বাস আর আমরাও তা বিশ্বাস করেছি। অথচ এই মহাদেশ এর শত শত বছর আগে থেকে আবিষ্কৃত এবং অধ্যূষিত ছিল- ওরা কি তাহলে মানুষ ছিলোনা? আরব ব্যাবসায়ীরা কলম্বাসের আগমনের প্রায় সাড়ে ছয়শ বছর আগে মানচিত্রে এই মহাদেশ সুচারুরূপে এঁকে রাখে- ওরাও কি মানুষ ছিলোনা? মিউজিয়ামে হাতেগোণা যে কয়টি বস্তুসামগ্রী দেখলাম তাও এত উচ্চমানের যে এই আদিবাসীদের আদিম বা অসভ্য বলার কোন উপায় নেই। তাহলে বাকি থাকে একটিই অস্ত্র যা শ্বেতাঙ্গরা সর্বত্রই প্রয়োগ করে থাকে। আদিবাসীদের অস্তিত্বের লড়াই চিহ্নিত হয় সন্ত্রাসবাদ হিসেবে। প্রকৃতপক্ষে আদিবাসীরা প্রাকৃতিক পরিবেশের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি জীবনধারায় অভ্যস্ত ছিল। ফলে তাদের সেই কূটবুদ্ধি, নৃশংসতা এবং মানববিধ্বংসী অস্ত্র ছিলোনা যা দিয়ে তারা শ্বেতাঙ্গদের মোকাবিলা করতে পারে। এখন যে আদিবাসীরা অবশিষ্ট আছে তাদের সম্মান দেখানোর নামে বসিয়ে বসিয়ে খাওয়ানো হয় কিন্তু তাদের দেশ পরিচালনার ব্যাপারে কোন অধিকার নেই, কার্যত এঁদের অধিকাংশই সহজলভ্য আয়ের দ্বারা অকর্মন্য এবং আত্মবিধ্বংসী জীবনযাপন করে নিজেদের তিলে তিলে শেষ করে দিচ্ছে।

এবার রকফেলার সেন্টার- ২২ একর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত রকফেলার পরিবারের ১৯ টি বাণিজ্যিক ভবন। মধ্যবর্তী স্থানগুলোতে নানা প্রকার বিনোদনের ব্যাবস্থা। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে, বাচ্চাদের চার্জ শেষের দিকে। আমিও টের পাচ্ছিলাম, আল্লাহ আমাকে নিউ ইয়র্কের দুর্গন্ধ থেকে মাফ করতে চলেছেন, পাঁচ বছর পর আমার সর্দি হতে চলেছে। আমার সর্দি যে কি ভয়াবহ বস্তু তা যে দেখেনি সে কল্পনাও করতে পারবেনা। আমাদের অবস্থা দেখে হাফিজ সাহেব সিদ্ধান্ত নিলেন টাইমস স্কোয়ার আরেকদিন হবে। তখন আমরা চারপাশে সামান্য ঘুরাঘুরি করে রকফেলার স্কোয়ারের জি ই বিল্ডিংয়ের ছাদে গেলাম যেখান থেকে নিউ ইয়র্কের স্কাইলাইন দেখা যায়। আবার সেই ইট কাঠ লোহা পাথরের স্তুপ দেখলাম, এবার ওপর থেকে যেহেতু এই বিল্ডিং নিজেই নিউ ইয়র্কের দশম উচ্চতম ভবন। ছাদে থাকা অবস্থাতেই সূর্যাস্তের সময় হয়ে গেল। নেমে এলাম নামাজ পড়ার জন্য। এবার একটি বিশেষ দাওয়াতে যাব।

ক্যাল্গেরী থেকে আসার আগে দৃঢ়সংকল্প ছিলাম ঘুরাঘুরি করব, দাওয়াত নেবনা। কিন্তু আবুসামীহা ভাইয়ের সাথে পারিবারিকভাবে পরিচিত হবার লোভ সামলাতে পারলাম না। আমরা তাঁর বাসার কাছাকাছি ট্রেন স্টেশনে পৌঁছতেই তিনি গাড়ী নিয়ে হাজির হলেন আমাদের নিয়ে যেতে। বাসায় ভাবী এবং বাচ্চাদের পাশাপাশি অপেক্ষমান ছিল তাঁর প্রতিবেশিনী, আমার প্রিয় ছাত্রী বর্ষা। মূহূর্তেই গল্প জমে উঠল আমাদের এবং আমাদের সন্তানদের, যেন কতদিনের পরিচয়! ভাবী অনেক আগে থেকেই আমার ফেসবুকে বন্ধু হয়ে আছেন অথচ একবারও জানাননি যে তিনিই আমাদের গুণবতী ভাবী। বার বার মানা করা সত্ত্বেও তিনি টেবিল ভরে ফেললেন। সারাদিন হাঁটাহাঁটি করে ক্ষুধার্ত থাকায় খেলামও খুব মজা করে। অন্যদিকে বর্ষার সাথে দেখা পাঁচবছর পর। আমার একটি ইশারায় সে দশ দিনের ভেতর স্বামীর সাথে অ্যামেরিকা চলে আসে যদিও এর আগে কেউ ওকে রাজী করতে পারেনি। এই বিশ্বাস আর ভালোবাসা কি কিছু দিয়ে পরিমাপ করা যায়? সে ওর ফুটফুটে সন্তান দু'টিকে দেখাল, ওর বর্তমান জীবনের কথা বর্ণনা করল এবং জানালো আমার সেদিনের সেই উপদেশ ওর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। আমার আট বছরের সহকর্মী সালমা আপা, যিনি ছিলেন আমার রুমমেট এবং আমার সকল কথা ও কাজের সাক্ষী, প্রায়ই আমাকে বলতেন, 'রেহনুমা, তুমি দুঃসাহসী। কৃতঘ্নতার এই যুগে মানুষ কাছের মানুষদেরও পরামর্শ দিতে ভয় পায়, আর তুমি কিনা ফ্রি ফ্রি উপদেশ বিলি কর!' ইচ্ছে হচ্ছিল সালমা আপাকে জানাই, পাঁচ বছর পর একজন আমাকে জানালো একটি পরামর্শ ওর জীবনের মোড় ঘুরে গিয়েছে, সে সুখি হয়েছে, এই আনন্দটুকুর জন্যই তো মানুষ বেঁচে থাকে! কিছুক্ষণের মধ্যে অ্যাডভোকেট আব্দুল আজিজ ভাইও এসে উপস্থিত। তিনি খবর পেয়েছেন আমরা এই বাসায় দাওয়াত নিয়েছি সুতরাং আর ছাড়াছাড়া নেই, তাঁর বাসায় যেতেই হবে। পরদিন আবুসামীহা ভাইয়ের কাজ, তবু তিনি আমাদের খালার বাসায় পৌঁছে দিয়ে আসতে বদ্ধপরিকর। এদিকে বাচ্চারা কিছুতেই এই বাসা থেকে যেতে রাজী না। পাশাপাশি ঠিক বেরোবার সময় ভাবী কোথা থেকে 'এক গুচ্ছ গোলাপ' বইটি এনে বললেন, 'কিছু লিখে দিন'। ভীষণ লজ্জা পেলাম। আমি কি একটা মানুষ হলাম! তবু তাড়াহুড়া করে কিছু লিখলাম, জানিনা ভাবীর মন ভরাতে পারলাম কিনা। ভাবীকে 'বিয়ে' বইটির একটি কপি উপহার দিলাম। ভাবী পালটা এক বিশাল প্যাকেট ধরিয়ে দিলেন, কিছুতেই না শুনবেন না! এঁরা ভারী ডেঞ্জারাস মানুষ, খাইয়ে দাইয়ে, উপহার দিয়ে আবার বাড়ী পৌঁছে দেন! আমাদের দিয়ে এসে বাড়ী ফিরতে আবুসামীহা ভাইয়ের প্রায় রাত বারোটা বেজে গেছিল। তবে একটি কথা না বললেই নয়। সৃষ্টিশীল উপহার দেয়া শিখতে চাইলে আবুসামীহা ভাই এবং ভাবীর কাছে ট্রেনিং নিতে হবে- তাঁদের প্রতিটি উপহার নির্বাচনে ছিল রুচি, চিন্তাশীলতা এবং বুদ্ধিমত্তার ছোঁয়া; প্রতিটি উপহারই ছিল যার জন্য দেয়া তার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত। তবে সবচেয়ে হৃদয়ছোঁয়া ছিল তাঁদের আন্তরিকতা যার জন্য অবশ্যই আমরা সোনার বাংলাদেশ ব্লগের কাছে কৃতজ্ঞ।

০৩.
১৬ই সেপ্টেম্বর

ব্যাক্তিগত অভ্যাস এবং ডাউনটাউনে কাজ করার সুবাদে আমি প্রচুর হাঁটতে পারি কিন্তু বাকি তিনজনের অবস্থা ছিল বিধ্বস্ত। সকালে উঠে আলী হাসান ভাইয়ের সাথে দু'টো মিউজিয়াম দেখতে যাবার কথা থাকলেও কার্যত রাদিয়া উঠল এগারোটায়, হাফিজ সাহেবকে বেলা বারোটায় খালার বকা খাইয়ে ঘুম থেকে তুললাম, রিহাম উঠল একটায়। খালু হাফিজ সাহেবকে ভারী সুন্দর একটা টি-শার্ট উপহার দিয়ে বকা খেয়ে ঘুম ভাঙ্গার দুঃখ ভুলিয়ে দিলেন। নাস্তা খাবার পর খালা বললেন, 'আজকের দিনটা তো কোন কাজে লাগলনা। তুমি বললে অনেকদিন সমুদ্র দেখনা। চল, তোমাকে সমুদ্র দেখিয়ে আনি'।

সৈকত খালার বাসার অদূরেই। সাগর দেখতে গিয়ে বুঝলাম এ তো সাগর নয়, একেবারে মহাসাগর, অ্যাটলান্টিক মহাসাগর! ইচ্ছে ছিল বালির ওপর হাঁটব, পানিতে নামব, কিন্তু এমন দিনেই কিনা শরীর সায় দিচ্ছিলোনা। সুতরাং চললাম বাতিঘরের দিকে। এই স্থাপনাটির প্রতি আমার এক দুর্বার আকর্ষন কাজ করে। কন্যাকুমারী বেড়াতে গিয়ে সারারাত জেগে বসে কয়শ বার যে সেই একই আলোর আবর্তন দেখেছিলাম! আমার জীবনের লক্ষ্য বাতিঘর হওয়া যেন কোন একদিন কোন এক পথহারা নাবিককে পথ দেখাতে পারি। যোগ্যতা সীমিত হলেই কি আর আশা সীমিত হয়? তবু মাঝে মাঝে সীমাবদ্ধতা মেনে নিতেই হয়। বাতিঘর দেখলাম কিন্তু অসুস্থ অবস্থায় সেই আড়াইশ সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার সাহস করতে পারলাম না। খালু একটা ঘেরা দেয়া জায়গা দেখালেন যেখানে পায়ে হেঁটে যেতে হয়। শুধু তারাই গাড়ী নিয়ে যেতে পারে যাদের ওখানে বাড়ী আছে। সাগরের একটা সম্মোহনী শক্তি আছে। আবুধাবিতে আমার শোবার ঘরের জানালা দিয়ে সমুদ্র দেখা যেত। সেই উচ্ছ্বল তরঙ্গ কখনো নীল কখনো সবুজ রঙ ধারণ করত, নেচেগেয়ে হাতছানি দিত। সারাদিন তাকে দেখার পর আবার সন্ধ্যায় তার সাথে দেখা করতে যেতাম, ঘন্টার পর ঘণ্টা কেটে যেত কিন্তু তার গর্জন শুনে মন ভরতনা, তার গ্রোতের আসা যাওয়া দেখে প্রান ভরতনা। কোন কোনদিন ভোরে উঠে বাবার সাথে মাছ ধরতে যেতাম, রূপালী ঝলকে উছলে উঠত সমুদ্রের প্রান। বাজারে এত মাছ তবু নিজ হাতে মাছ ধরার সে কি আনন্দ! এঁরা কতইনা ভাগ্যবান যারা প্রতিদিন সাগরের এই হাতছানিতে সাড়া দিতে পারে!

বাসায় ফিরে খালুর সাথে তাঁদের দোকান দেখতে চললাম। খালাদের দোকান অ্যাস্টোরিয়ায়, বাসা থেকে এক দেড়ঘন্টার দুরত্বে। দোকানের নাম খালার নামে, দীপা মিনি মার্কেট। দোকানটি বেশ বড়, জিনিসপত্র প্রচুর, সারাক্ষনই লোকজনের আসা যাওয়া। এর মধ্যেই খালু আমাদের জন্য চা বানালেন, রিহামকে শেখালেন কিভাবে টাকা নিতে হয়, কোথায় রাখতে হয়, কিভাবে ভাংতি পয়সা গুছিয়ে রাখতে হয়, আবার কয়েকবার প্র্যাকটিস করিয়ে ওকে চকলেট আর আইসক্রীম পারিশ্রমিক দিলেন! আমরাও নিলাম যার যা প্রয়োজন। এই প্রথম কোন দোকান থেকে কিছু নিয়ে পয়সা দিতে হোলনা! দোকানের সাজ সরঞ্জামাদি সব খালুর হাতে করা। এক সময় খালারা পাশের বিল্ডিংয়েই থাকতেন, স্বামী স্ত্রী মিলে যখন যে ফ্রি থাকত তখন সে দোকানে বসত। বাসাটা দেখতে গেলাম। তারপর আমরা রওয়ানা হলাম টাইমস স্কোয়ারে।

টাইমস স্কোয়ারের নামকরন নিউ ইয়র্ক টাইমসের হেড কোয়ার্টারের নামে হলেও এটি মূলত একটি ব্যাবসাকেন্দ্র। এখানে অবস্থিত নানান ব্যাবসার মাঝে প্রধান একটি হোল বিনোদন ব্যাবসা। ব্রডওয়ে থিয়েটার, ম্যাডাম তুসোঁর মিউজিয়াম, রিপ্লির বিলিভ ইট অর নট মিউজিয়ামসহ প্রচুর অফিস, হোটেল ইত্যাদি থাকার কারণে এই পথ দিয়ে প্রতি তিন দিনে এক মিলিয়ন মানুষ হেঁটে যায় যার একটি বিশাল অংশ পর্যটক। এখানে খুব ধুমধাম করে নববর্ষ উদযাপিত হয়। রাতের বেলা সবচেয়ে দর্শনীয় হোল এখানকার বিলবোর্ডগুলো যেগুলো নিয়ন বাতি কিংবা আস্ত বিল্ডিং সাইজের টিভিস্ক্রীণের মাধ্যমে বিজ্ঞাপন প্রচার করে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এত আলোর ঝলকানি দেখেও গাইতে পারলাম না, নিউ ইয়র্ক 'শহর আইসা আমার আশা পুরাইল, লাল নীল বাত্তি দেইখা নয়ন জুড়াইল'। আমি বড় বেরসিক টাইপের মানুষ। কৃত্রিম বস্তুনিচয় আমাকে আকর্ষন করেনা, আলোর ঝলকানি আমার বিরক্তির উদ্রেক করে।

কিছুক্ষণ পর অ্যাডভোকেট আব্দুল আজিজ ভাই এলেন। হাফিজ সাহেবের দুলাভাইয়ের বিশেষ বন্ধু থেকে তিনি একসময় আমাদের পারিবারিক বন্ধুতে রূপান্তরিত হন। রাদিয়ার নামের আরেকটি অংশ তানজিলা রাখতে চেয়েছিলাম, কিন্তু আজিজ ভাইয়ের মেয়ের নাম তানজিলা হওয়ায় হাফিজ সাহেব রাজী হননি, 'এত কাছের সম্পর্কে দু'জনের একই নাম হলে গুলিয়ে যাবে'। আজিজ ভাইয়ের সাথে ট্রেনে করে তাঁর বাসায় চললাম। তিনি ব্রুকলিনের ইহুদী অধ্যূষিত একটি এলাকায় থাকেন। তিনি দেখালেন ওরা কিভাবে পাশাপাশি সমস্ত বাড়ীগুলো কিনে নিয়ে একটি পাড়ার মত করে নিয়েছে। ইহুদীরা ধর্মীয় ব্যাপারে অসম্ভব গোঁড়া, আর এঁরা ছিল ধার্মিক ইহুদী। পুরুষদের সবার দেখলাম লম্বা ঢোলাঢালা পোষাক আর মুখভর্তি লম্বা দাঁড়ি। ওদের বিবাহিতা মহিলারা পর্দার একটা বিকল্প সমাধান বের করেছে- মাথা ন্যাড়া করে পরচুলা পরা! তবে আমার সবচেয়ে যেটা জানার আগ্রহ তা হোল পুরুষরা, মাথাভর্তি চুল থাক কি টাকমাথা, মাথার তালুর ঠিক মধ্যখানে মিনি সাইজের একটা টুপি পরে, এটা কিভাবে আটকে থাকে। ওদের এই টুপি পরে সারাদিন ঘুরতে, এমনকি দৌড়াতে দেখেছি কিন্তু টুপি নড়েনা, টাকমাথা হলেও না!

বাসায় পৌঁছনোর আগেই দেখি ভাবী ছোট মেয়েটিকে নিয়ে বাতাসের ভেতর রাস্তায় এসে দাঁড়িয়ে আছেন আমাদের এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য! রাস্তার মধ্যেই গল্প শুরু! বাসায় পৌঁছে তানজিলাকে পেয়ে রাদিয়ার গল্প শুরু। তবে আমাদের পুত্রদ্বয়ের বয়সের অনুপাতে গড়মিল, ওরা বসে রইল যার যার মত। ভাবীর সেদিন কাজ ছিল তবু রান্না করে ভর্তি করে ফেলেছেন। আমি বললাম, 'এতকিছু না করে শুধু শুটকি ভর্তা করলেই তো হত!' ভাবীর উত্তরে অবাক হলাম, উনি ভেবেছিলেন হাফিজ সাহেব চট্টগ্রামের আর আমি চট্টগ্রামের বাইরের! ভেবে দেখলাম কথা সত্য। হাফিজ সাহেব চমৎকার চাঁটগাঁইয়া বলেন, আমার নাকি অ্যাক্সেন্ট ঠিক হয়না! হতদ্যোম হয়ে মুখ হাত ধুতে গেলাম। এসে দেখি ভাবী এর মধ্যেই চমৎকার শুটকী ভর্তা তৈরী করে ফেলেছেন! লজ্জা পাচ্ছিলাম যে কথাটা বলে ভাবীকে কষ্টে ফেলে দিলাম। কিন্তু উনি বললেন, 'ভাবী, বাপের বাড়ীর মানুষ দেখলেও শান্তি লাগে!' আমার যা চেহারা তাতে যেকোন ছুতাতেই চেহারা দেখে কেউ শান্তি পান শুনে যারপরনাই আনন্দিত হলাম। গল্প করতে করতে অনেক রাত হয়ে গেল কিন্তু মনে হোল কোন কথাই হয়নি। এর মধ্যে হাফিজ সাহেবের এক বন্ধু কামরুল সাহেব এসে ঘুরে গেলেন। অবশেষে আজিজ ভাই বললেন, 'চলেন, আপনাদের পৌঁছে দিয়ে আসি'। ভাবীও রওয়ানা হলেন আমাদের সাথে, পথে যেতে যেতে বাকি গল্পটুকু করা যাবে। খালার বাসায় আসার পথে রাতের নিউ ইয়র্ক দেখলাম, বিশাল চাঁদের নীচে স্ট্যাচু অফ লিবার্টি টিমটিমে আলো জ্বেলে দাঁড়িয়ে আছে। বাচ্চারা পথেই ঘুমিয়ে পড়ল। খালার বাসায় নেমে, ভাই ভাবীর কাছে বিদায় নিয়ে, ঘরে ঢুকে বাচ্চাদের শুইয়ে দিয়ে এসে দেখি খালু ভাত খাচ্ছেন আর 'বাবাগো, মাগো' করে কাতরাচ্ছেন। বেচারার সায়াটিকার ব্যাথার সমস্যা আছে। কিন্তু খালু কাউকে দিয়ে কাজ করানো পছন্দ করেন না, আবার কাজ না করেও বসে থাকতে পারেন না। খালার বকার ভয়ে স্বীকার না করলেও সম্ভবত উনি দোকানে কোন ভারী মালপত্র তোলার চেষ্টা করতে গিয়ে ব্যাথায় আক্রান্ত হয়ে পড়েছেন। ভয়ানক অবস্থা। কোনক্রমে কিছু খেয়ে, ব্যাথার ওষুধ খেয়ে, গরম পানির ব্যাগ নিয়ে শুতে যাবেন খালু। এর মধ্যেও তিনি তরকারী ঢেকে তুলে রাখতে, প্লেট ধুতে অস্থির হয়ে পড়লেন। শেষে খালা থ্রেট দিলেন এমন অনিয়ম করলে অপারেশন করাবেন। তখন খালু বাধ্য ছেলের মত চুপচাপ গিয়ে শুয়ে পড়লেন!

১৭ই সেপ্টেম্বর

সকালে উঠে খালা বললেন, 'তোমাদের যেহেতু নিউ ইয়র্ক ভালো লাগছেনা, তোমরা রুশার গাড়ী নিয়ে ওয়াশিংটন, ভার্জিনিয়া আর পেনসিলভেনিয়া ঘুরে এসো'।

আসলেই শুধু মানুষগুলো ছাড়া নিউ ইয়র্কের আর কিছু ভাল লাগছিলোনা। এই ইট কাঠ লোহা পাথরের মাঝে ওরা কিভাবে নিজেদের সুকোমল রেখেছেন, ঢাকাবাসীদের মত কঠোর হৃদয় হয়ে যাননি তাই ভাবি। এর জন্য এঁদের সম্বর্ধনা দেয়া উচিত! কিন্তু রুশা এক বছর চাকরী করে টাকা জমিয়ে এই গাড়ীটা কিনেছে। মানুষের শখের জিনিসে হাত দেয়া উচিত না। তাই দ্বিধা বোধ করছিলাম।

খালু কঁকাতে কঁকাতে বললেন, 'ওরা ছোটমানুষ, একা একা যেতে পারবেনা, আমি ওদের নিয়ে যাব'।

হাসব না কাঁদব? ব্যাথায় খালুর অবস্থা শেষ আর উনি আমাদের চিন্তায় অস্থির! খালারও মন চাইছে যেতে কিন্তু বৃদ্ধা শাশুড়িকে দেখবে কে? রুশার ইউনিভার্সিটি আর হৃদিতার ক্লাস চলছে পুরোদমে। তাছাড়া আমাদের জন্য ওঁদের ব্যাবসার ক্ষতি হবে এটাও আমাদের ভাল লাগবেনা। খালার সাথে বসে রুট ঠিক করে প্রোগ্রাম ঠিক করা হোল। গাড়ী চেষ্টা করব রুশারটা না নিয়ে ভাড়া করতে। ব্লগার নূসরাত রহমানকে ফোন করলাম। আমাদের নিউ ইয়র্ক যাবার কথা শুনেই বেচারী যোগাযোগ করতে শুরু করেছিল এসে আমাদের নিয়ে যাবে। জানালাম আমরা বাল্টিমোর হয়ে ওয়াশিংটন যাব। বহুদিন পর দেখা হবে এই খুশিতে আমরা ডগমগ।

দুপুরের দিকে আমরা বের হলাম ম্যানহাটনের উদ্দেশ্যে। সেন্ট্রাল পার্কের দু'পাশে দু'টো মিউজিয়াম, এই দু'টোই দেখার সংকল্প করে এসেছিলাম ক্যাল্গেরী থেকে। সেদিন উদ্দেশ্য ছিল অ্যামেরিকান মিউজিয়াম অফ ন্যাচারাল হিস্টরি দেখব। রাদিয়ার পছন্দের জায়গায় যাওয়া হয়েছে প্রথম দিনই, এটা রিহামের পছন্দের স্থান। এখানে চারতলায় বিষয় অনুযায়ী জীবনের ইতিহাস বিন্যস্ত হয়েছে। একতলায় রয়েছে পৃথিবীর নানান প্রান্তে প্রাপ্ত বিভিন্ন পশুপাখির ট্যাক্সিডার্মি। যারা ট্যাক্সিডার্মির বিষয়ে আগ্রহ বোধ করেননা তাদের জানার জন্য বলছি জিনিসটা আমারও পছন্দ না, কিন্তু এর মাধ্যমে বাচ্চারা অনেককিছু দেখার বা জানার সুযোগ পায়। এই পদ্ধতিতে বিভিন্ন প্রাণীর চামড়া, পালক, আঁশ ইত্যাদি নিয়ে প্রাণীটিকে জীবিত অবস্থার মত করেই মমি বানানো হয়। দেয়ালে তাদের প্রাকৃতিক পরিবেশের ছবি এঁকে, প্রাকৃতিক পরিবেশের কিছু উপাদান ফ্লোরে ছড়িয়ে দিয়ে এর ওপর প্রাণীটিকে দাঁড় করিয়ে কাঁচ দিয়ে ঘিরে দেয়া হয় যেন এটি ক্ষয়ে না যায়। তো ধরুন দেয়ালে একটি বনের দৃশ্য এঁকে, ফ্লোরে কিছু ঘাসের প্রতিকৃতি দিয়ে, সামনে একটি বহতা গ্রোতের প্রতিকৃতি বানিয়ে ঘাসের ওপর একটি হরিন শিশুসহ কয়েকটি পুরুষ ও মা হরিণ দাঁড় করিয়ে দেয়া হোল। কাঁচের সামনে বর্ননা লিখে দেয়া থাকে এই প্রাণীর নাম কি, কোথায় পাওয়া যায়, কি ধরণের পরিবেশে থাকে, কি খায়, কত বছর বাঁচে ইত্যাদি। এ'রকম কয়েক হাজার ট্যাক্সিডার্মি স্থান পেয়েছে এই মিউজিয়ামে। ধারণা করুন তো একটি শিশু কয়েক মূহূর্তের ভেতর কতগুলি জিনিস শিখতে পারবে এরকম একটি উদাহরণ সামনাসামনি দেখতে পেলে! আমাদের সময় ছিল কম, পাঁচটায় মিউজিয়াম বন্ধ হয়ে যাবে। রিহাম আমাকে হাত ধরে টানতে টানতে বলল, 'আম্মু চল, আমাদের তাড়াতাড়ি করতে হবে নাহলে আমরা সব দেখতে পারবনা'। আমিও সমান উৎসাহী।

পরের ফ্লোরে ছিল নানান মহাদেশের আদি সভ্যতার কিছু কিছু নিদর্শন। দেখলাম দুরত্বের কারণে এখানে অন্যান্য মহাদেশের তুলনায় দক্ষিণ অ্যামেরিকার নিদর্শনাদি স্থান পেয়েছে বেশি। হয়ত এগুলো সংগ্রহ করা এবং আনা সহজতর ছিল। সকল আদি সভ্যতার মাঝে কয়েকটি জিনিসে মিল খুঁজে পেলাম। এরা পোশাক পরতনা বা যৎসামান্য পরত, এরা নানান দেবদেবীর পুজা করত এবং কুসংস্কারাচ্ছন্ন ভীত বিহ্বল জীবন কাটাত, এরা গানবাজনা


পাতাটি ১৯৯৭ বার প্রদর্শিত হয়েছে।