দশদিক মাসিক

হোম ভ্রমনঘুরে এলাম দুবাই, দেখে এলাম আকাশছোঁয়া বুর্জ খলিফা

ঘুরে এলাম দুবাই, দেখে এলাম আকাশছোঁয়া বুর্জ খলিফা

সুফিয়া বেগম

গত ৪ জুলাই, ২০১৩ তারিখে আমি যখন আমিরাত এয়ারলাইনসের ফ্লাইটে করে স্থানীয় সময় দুপুর একটায় যখন দুবাই আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে পোছুই তখন আমার কাছে মনে হচ্ছিল যেন ইতিহাসের কোন এক মহেন্দ্র ক্ষণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি আমি। যে ইতিহাসের সাক্ষী হবার জন্য মনের অজান্তেই বোধহয় এতদিন অপেক্ষা করে ছিলাম আমি। বলাই বাহুল্য এর মূল কারণ বুর্জ খলিফা। কিন্তু শুধু সখের বশে দুবাই এসে বুর্জ খলিফার মুখোমুখি হওয়াটা ছিল আমার জন্য নিতান্তই বিলাসিতা। তাই ডান এন্ড ব্র্যাডস্ট্রীটের এর কাছ থেকে অফিসিয়ালি আমন্ত্রণ পাওয়ামাত্র সম্ভব-অসম্ভবের দোলায় দুলতে থাকি আমি। দুবাই এ বেড়ানোর মুল খরচটা অর্থাৎ ফাইভ স্টার হোটেলে তিনরাত-তিনদিন থাকা-খাওয়াসহ সিটিট্রিপ এর সমস্ত খরচ ওরাই বহন করবে। এমন সুবর্ণ সুযোগ মানুষের জীবনে কমই আসে। তাই উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করছিলাম অফিস থেকে নমিনেশন পাবার জন্য। অবশেষে যখন নমিনেশন জুটে গেলে রীতিমতো উৎফুল্ল হয়ে ছিলাম আমি। ডান এন্ড ব্র্যাডস্ট্রীটের সিডিউল অনুযায়ী নির্দিষ্ট দিনে দুবাই পৌঁছুলাম আমরা বাংলাদেশের বিভিন্ন ব্যাংকের ৩৪ জন কর্মকর্তা। এয়ারপোর্টে ডান এন্ড ব্র্যাডস্ট্রীটের দু’জন প্রতিনিধি আমাদেরকে রিসিভ করলেন। এখানে অনেকক্ষণ সময় লাগল ৩৪ জন কর্মকর্তাকে তাদের ব্যাংকের নামের সাথে মিলিয়ে রিসিভ করতে। অবশেষে যখন আমরা বার দুবাই এ অবস্থিত পার্ক রেজিস ক্রীস কীন (চধৎশ জবমরং কৎরং করহ ঐড়ঃবষ) নামের পাঁচ তারকা হোটেলে পৌঁছুলাম তখন প্রায় তিনটা বাজে। যার যার রুমে যাওয়ার আগে এখানেও সময় লাগল এক ঘন্টার বেশী। রুমের চাবি প্রদানসহ
আরও কিছু আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে রুমে পৌছুঁলাম তখন ঘড়ির কাঁটা চারটার ঘর অতিক্রম করে গেছে। আমাদের মূল প্রগ্রাম সেমিনার এক দিনের, ৫ তারিখে। কাজেই প্রথম দিন বিকেলে কোন কাজ ছিলনা আমাদের। ফ্রেশ হয়ে বেশ কিছুক্ষণ রেষ্ট নিয়ে আসরের নামাজ পড়ে বিকেল বেলাটা আশেপাশের কয়েকটি শপিংমলে ঢু মারলাম আমি।
৫ জুলাই, ২০১৩ তারিখে সকাল আটটা থেকে শুরু হলো সেমিনার। চলল লাঞ্চ আওয়ার পর্যন্ত। সকালেই ঘোষণা করে দেয়া হয়েছিল সেমিনারশেষে বিকেলে আমাদেরকে নিয়ে যাওয়া হবে বুর্জ খলিফা দেখার জন্য। তাই সেমিনারের পুরো সময়টা ভিতরে ভিতরে এক ধরনের উত্তেজনা বোধ করছিলাম আমি। অবশেষে সেই সুবর্ণ সময় এলো। আসরের নামাজের পর আমরা যখন বুর্জ খলিফার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। বাইরে তখন ঘনঘনে রোদ। প্রায় দুই কিলোমিটারের মতো হেঁটে আমরা গিয়ে পৌঁছুলাম মেট্রো রেল স্টেশনে। আমাদের সবার টিকেট আগেই কেটে রেখেছিল ডান এন্ড ব্র্যাডস্ট্রীট কর্তৃপক্ষ। আধা ঘন্টাও লাগেনি মেট্রো ট্রেনে করে আমরা গিয়ে নামলাম বুর্জ খলিফা রেল স্টেশনে। স্টেশন থেকে অনেকটুকু হেঁটে যেতে হয় বুর্জ খলিফার গ্রাউন্ড ফ্লোরে দুবাই মলে। স্টেশনের প্ল্যাটফরম পার হতেই দেখলাম বুর্জ খলিফা ক্রমেই তার গর্বিত অস্তিত্ব ঘোষণা করছে। হাজার হাজার পর্যটকের পদভারে তখন মুখর চারপাশ। সবার মুখ থেকে বিস্ময়সূচক নানা ধ্বনি বের হচ্ছে নিজের অজান্তেই। আমি সবার সাথে সাথে হাঁটছি আর ছবি তুলছি। কারণ, যত দূর থেকে ছবি
তোলা যাবে ততই বুর্জ খলিফাকে পূর্ণ অবয়বে ক্যামেরায় ধরা যাবে। আমি হাঁটছি আর বুকের ভিতর অদ্ভূত ধরনের উত্তেজনা টের পাচ্ছি।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই এ অবস্থিত বুর্জ খলিফা হচ্ছে বর্তমানে পৃথিবীর সবচেয়ে উচ্চতম স্থাপনা। এর উচ্চতা ৮২৯.৮০ মিটার কিংবা ২,৭২২ ফুট। ২০১০ সালের ৪ জানুয়ারী আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের আগে এটি বুর্জ দুবাই নামে পরিচিত ছিল। অর্থাৎ ২১ সেপ্টেম্বর ২০০৪ সালে এর নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিল এই নামে। আরবিতে এটাকে বলা হয় খলিফা টাওয়ার। সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট খলিফা বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের প্রতি সম্মান দেখিয়ে বুর্জ দুবাই এর নাম পরিবর্তন করে বুর্জ খলিফা রাখা হয়। ২০১০ সালে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করলেও বুর্জ খলিফার বাহ্যিক কাঠামোর কাজ শেষ হয় আরও অনেক আগে, ১ অক্টোবর, ২০০৯ সালে। অনিন্দ্য সুন্দর এই স্থাপনাটি যার মস্তিস্কপ্রসূত চিন্তার ফসল অর্থাৎ এটির মূল স্থপতি হচ্ছেন আমেরিকার শিকাগো শহরের এ্যাডরিয়ান স্মিথ (অফৎরধহ ঝসরঃয)। আর প্রধান প্রকৌশলী বিল বেকার (ইরষষ ইধশবৎ), তার বাড়িও একই শহরে। দুবাই এর প্রধান ব্যবসা কেন্দ্র শেখ জায়েদ রোডে পৃথিবী বিখ্যাত এই স্থাপনাটির ঠিকানা। এটি নির্মাণ করতে মোট ব্যয় হয়েছে ১.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে আপন গরিমায় অস্ত যেতে ব্যস্ত। সারিবদ্ধভাবে লিফট এ উঠে মাত্র পাঁচ মিনিটের ব্যবধানে ১২৪ তলার পর্যবেক্ষণ ডেকে উঠে গেলাম আমরা। এটি পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্যবেক্ষণ ডেক। সময়ের এই সন্ধিক্ষণ যেন আমাদেরকে বরণ করার জন্য অপেক্ষায় ছিল এতদিন। বিকেলের স্নিগ্ধ আলোয় চারপাশে তাকিয়ে আমার সেই মুহূর্তে তাই মনে হয়েছিল। পুরো দুবাই শহর যেন আমাদের দৃষ্টির ফ্রেমে বন্দী এই মুহূর্তে। সন্ধ্যার আলো-আঁধারির পর্দা ছিঁড়ে তখন দুবাই নগরীতে একে একে জ্বলে উঠছে রং বেরং এর আলো, সাথে সাথে জেগে উঠছে দুবাই নগরী। সময়েল
এমন সন্ধিক্ষণে পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্যবেক্ষণ ডেকে দাঁড়িয়ে দুবাই নগরীর যে সৌন্দর্য আমি দেখেছি তা প্রকাশ করার মতো ভাষার দক্ষতা আমার নেই। যেটুকু বলতে পারি তা হলো ক্ষণিকের জন্য আমি বোধহয় বাকহারা হয়ে গিয়েছিলাম। ক্ষণিকের মোহাচ্ছন্নতা কেটে যাওয়ার সাথে সাথে আমার মনে হলো বুর্জ খলিফার ১২৪ তলায় নিজের পদরেখা এঁকে দিতে পেরে আমি মহাকালের পাতায় আমার গর্বিত অস্তিত্ব জুড়ে দিতে পেরেছি। অসংখ্য পর্যটকের কলতানে মুখরিত তখন বুর্জ খলিফার ১২৪ তলার পর্যবেক্ষণ ডেকটি। সেই সাথে যোগ হয়েছে অনবরত ছবি তোলা আর সবার মুখ থেকে বেরিয়ে আসা আনন্দ বিস্ময়ের নানারকম ধ্বনি। সেখানেই আমি মাগরিবের নামাজ আদায় করলাম। আরও দুই জন ভদ্রমহিলাও নামাজ আদায় করলেন আমার পাশে দাঁড়িয়ে।
জানা যায়, এই টাওয়ারে ৯০০টি এপার্টমেন্ট রয়েছে। একসাথে ৩৫,০০০ লোকের ধারণ ক্ষমতা রয়েছে এতে। ৫৭টি লিফট ও ৮টি এসকেলেটর সব সময় ব্যস্ত রয়েছে এই বিপুল সংখ্যক দর্শককে উঠানামা করার জন্য। গ্রাউন্ড ফ্লোর দুবাই মল থেকে ১৬০ তলা পর্যন্ত উঠার জন্য এতে রয়েছে ২,৯০৯ টি সিঁড়ি। উল্লে¬খ্য যে, বুর্জ খলিফার পর্যবেক্ষণ ডেকটি পৃথিবীর তৃতীয় সর্বোচ্চ পর্যবেক্ষণ ডেক, যার উচ্চতা ৪৫২ মিটার কিংবা ১,৪৮৩ ফুট। তাছাড়া বুর্জ খলিফার ভূমিতল ২৭ একর জায়গা নিয়ে তৈরী একটি পার্ক দ্বারা পরিবেষ্টিত। এই পার্কে রয়েছে ছয়টি স্বচ্ছ জলাধার, বাগান, পাম লাইন ওয়াকওয়ে এবং পুষ্পশোভিত গাছ। আর মূল কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছে মরু পুষ্পের আদলে তৈরী বুর্জ খলিফা, সংযুক্ত আরব আমিরাতের গর্ব। কাজেই
পৃথিবী বিখ্যাত এমন একটি চোখ জুড়ানো স্থাপনা স্বচক্ষে অবলোকন করা যে কোন মানুষের জীবনে এক দুর্লভ সুযোগ বলে আমি মনে করি। তাই তো বুর্জ খলিফার ১২৪ তলার পর্যবেক্ষণ ডেকে দাঁড়িয়ে সন্ধ্যার আলো-আঁধারে আমি যখন দুবাই শহরের মায়াবী সৌন্দর্য দেখছিলাম তখন কেবলই মনে হচ্ছিল এই সময়টা যেন থেমে থাকে অনাদিকাল ধরে। কিন্তু সময় তো আর আমার ইচ্ছেমতো চলবে না। আমাদের চোখের সামনেই সন্ধ্যার অন্ধকার ক্রমে ঘনীভূত হয়ে এলো। আমরাও নেমে এলাম বুর্জ খলিফার ১২৪ তলার পর্যবেক্ষণ ডেক থেকে। রেলস্টেশনে এসে ট্রেনে চড়ে ফিরে এলাম হোটেলে।
রাত তখন আটটার ঘর পার হয়ে গেছে। রাতের খাবার খেতে খেতে সাড়ে ন’টা বেজে গেল। তবু আমি আর আমার কলিগ রাব্বি গেলাম কাছের একটি মার্কেটে। মার্কেটটির নাম আলা-কারামা সেন্টার। ক্রীস কীন হোটেল থেকে খুব বেশী দূরে নয়, হেঁটে যেতে সময় লাগল ২০-২৫ মিনিটের মতো। আমাদের হাতে সময় খুব কম। আমার অফিসের কলিগরা কিছু সোনার গয়না কিনে নেয়ার জন্য অনুরোধ করেছে। তাছাড়া আমাদের নিজেদেরও কিছু কেনাকাটা আছে। এখানে একটা সুবিধা এই যে, দুবাই এর মার্কেটগুলো রাত ১১টা ১২টা পর্যন্ত খোলা থাকে। আজকের পর আর কালকের দিনটি মাত্র হাতে আছে আমাদের। তাই শরীরের ক্লান্তিকে একপাশে ঠেলে রেখে গেলাম মার্কেটে। কেনাকাটা করে যখন হোটেলে ফেরার পথ ধরলাম আমরা তখন রাত সোয়া এগারটা বাজে। রুমে এসে এশার নামাজ পড়ে বিছানায় যাওয়ার সাথে সাথে দুবাইয়ের দ্বিতীয় দিনটির অবসান ঘটল আমাদের দিনলিপি থেকে।
কিং জায়েদ গ্র্যান্ড মসজিদ- সংযুক্ত আরব আমিরাতে ইসলামের মাহাত্ম ও গর্ব।
পরের দিন ৬ জুলাই, ২০১৩ তারিখটা শুধুই ঘুরে বেড়াবার জন্য। প্রথমেই সকাল দশটায় আমাদেরকে নিয়ে যাওয়া হলো সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবীতে। উদ্দেশ্যে বিখ্যাত শেখ জায়েদ গ্র্যান্ড মসজিদ পরিদর্শন করা। এটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের সবচেয়ে বড় মসজিদ এবং পৃথিবীর মধ্যে অষ্টম বৃহত্তম মসজিদ। এর আয়তন আনুমানিক পাঁচটি ফুটবল খেলার মাঠের সমান। সাধারণ ধারণ ক্ষমতা অনুযায়ী মসজিদটিতে একসাথে ৪০ হাজার মুসুল্লী নামাজ পড়তে পারে। মসজিদটির প্রাথমিক নির্মাণ কাজ শুরু করেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রয়াত বাদশা শেখ জায়েদ বিল সুলতান আল নাহিয়ান। তিনি অত্যাধুনিক স্থাপত্য কীর্তির মাধ্যমে তিনি এই
মসজিদে ইসলামী বিশ্বের সাংস্কৃতিক ইতিহাস ও আধুনিক মূল্যবোধের সমন্বয় ঘটাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি এর সম্পূর্ণ কাজ শেষ করে যেতে পারেন নি। ১৯৯৬ সালে শুরু হওয়া এই মসজিদটির নির্মাণ কাজ আজও অব্যাহত আছে। বাদশা শেখ জায়েদ বিল সুলতান আল নাহিয়ান এর চির শয়ান হয়েছে এই মসজিদটির পাশেই।
এ পর্যন্ত মসজিদটির নির্মাণ কাজে ব্যয় হয়েছে ২ বিলিয়ন দিরহাম বা ৫৪৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এতে বিভিন্ন আকারের ৮২টি গম্বুজ এবং ৪টি মিনার রয়েছে। প্রতিটি গম্বুজের উচ্চতা ৮৫ মিটার বা ২৭৯ ফুট। প্রতিটি মিনারের উচ্চতা ১০৭ মিটার বা ৩৫১ ফুট। মসজিদটির মোট আয়তন ১,৮০,০০০ বর্গফুট। এতে ৪০,০০০ মুসুল্লী একসাথে নামাজ পড়তে পারে। এরমধ্যে মসজিদের প্রধান নামাজ কক্ষের ধারণ ক্ষমতা ৭,০০০। এর পাশেই রয়েছে দু’টি নামাজকক্ষ, যার প্রত্যেকটিতে ১,৫০০ জন করে মুসুল্লী নামাজ পড়তে পারে। পৃথিবীতে যতটি মার্বেল পাথরে মোজাইক মসজিদ আছে তার মধ্যে এটি সর্ববৃহৎ।
এই মসজিদটি নির্মাণশৈলীতে কিছু ব্যতিক্রমী বৈশিষ্টের প্রতিফলন ঘটানো হয়েছে। মসজিদের একজন ষ্টাফ, যিনি আমাদেরকে মসজিদটি ঘুরে দেখালেন তার কাছ থেকে গেছে এসব বৈশিষ্ট্যের বিষয়ে। মসজিদের সামনের বিশাল একটি চত্বর পার করে উনি আমাদেরকে নিয়ে গেলেন প্রধান নামাজকক্ষে। এই চত্বর পার হতে গিয়েই মুখোমুখি হলাম মসজিদের বিশেষ একটি দিকের সাথে। দেখলাম চত্বরের মেজেটি দুই ধরনের টাইলস দ্বারা বানানো। একটি সাদা রং এর এবং অন্যটি সাদার উপর গ্রে কালারের লতাপাতার নকশা আঁকা। তখন প্রচন্ড সূর্যতাপ আমাদের মাথার উপরে। আমরা যখন মসজিদের প্রধান দরজার অদূরে জুতা খোলে রেখে হেঁটে যাচ্ছিলাম মূল কক্ষের দিকে তখনই টের পেলাম আশ্চর্য রকম একটি বিষয়ের। সাদা রং এর টাইলসে প্রচন্ড গরমের কারণে ঠিকমতো পা ফেলা যাচ্ছিল না। অথচ এর সাথে লাগানো সাদার উপর গ্রে কালারের লতাপাতার নকশা আঁকা টাইলস একেবারে ঠান্ডা। এমন আশ্চর্যরকম টাইলস এর সন্নিবেশ কি করে হলো তা আমার মাথায় আজও জট পাকিয়ে আছে।
যাই হোক, আমরা গিয়ে প্রবেশ করলাম মূল নামাজকক্ষে। যে দরজাটি পার হয়ে ঢুকলাম সেটিও দৃষ্টিনন্দন কারুকাজে সমৃদ্ধ। তারচেয়েও বহু দৃষ্টিনন্দন ও আশ্চর্যকর বিষয় অপেক্ষা করছিল আমাদের জন্য মুল নামাজকক্ষে। আরবী এবং ইংরেজীতে সমানভাবে পারদর্শী ভদ্রলোক আমাদেরকে জানালেন যে, মেঝেতে যে কার্পেটটি বিছানো আছে সেটি ইরানে তৈরী পৃথিবীর বৃহত্তম কার্পেট। কর্পেটটির নকশা করেছেন ইরানের শিল্পী মোহাম্মদ আলী খালেক। ১২০০ থেকে ১৩০০ খন্ডে তৈরী কার্পেটটির মোট আয়তন ৫৬২৭ বর্গফুট। এর ওজন ৩৫ টন। নিউজিল্যান্ড ও ইরান থেকে থেকে আনা উল দ্বারা এটি মূলত তৈরী করা হয়েছে। কার্পেটটি তৈরী করতে সময় লেগেছে দুই বছর।
মসজিদটিতে সাতটি ঝাড়বাতি রয়েছে। এগুলো জার্মানী থেকে আনা। এগুলো তৈরী করতে এক লাখ ক্রিষ্টাল পাথর ব্যভহার করা হয়েছে। এই সাতটি ঝাড়বাতির মধ্যে যেটি সবচেয়ে বড় সেটি পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম ঝাড়বাতি, এটির ব্যাসার্ধ ৩৩ ফুট এবং উচ্চতা ৪৯ ফুট। প্রধান নামাজকক্ষে রয়েছে সবচেয়ে বড় ঝাড়বাতিটি। এর অপরূপ কারুকোজের দিকে একবার তাকালে আর দৃষ্টি অন্যদিকে ফেলাতে ইচ্ছে করেনা। তা সত্ত্বেও আমি চারপাশে বার বার উৎসুক দৃষ্টি নিয়ে তাকাচ্ছিলাম। কারণ, ভিতরের ডেকোরেশনে সর্বত্র নজরকাড়া সৌন্দর্য। এসবকিছুকে ছাপিয়ে কেবলার দেওয়ালের গায়ে আবারও দৃষ্টি আটকে যায় আমার। দামী মার্বেল পাথরে মোজাইক দেওয়ালের উপর সাদা ঝকঝকে ছড়ানো ছিটানো আরবী লেখা। আমি বর্ণনাকারী ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করলাম আরবীতে ওগুলো কি খোদাই করা দেওয়ালে? ভদ্রলোক জানালেন, এখানে খোদাই করা রয়েছে মহান আল্লাহ তায়ালার ৯৯টি নাম। এগুলোর সাদা ঔজ্জ্বল্য আমাকে আবারও অনুসন্ধানী করে তুলল। তাই আমি জিজ্ঞেস করলাম, কি মেটাল দিয়ে ওগুলো লেখা হয়েছে। ভদ্রলোক জানালেন, ওগুলো হোয়াইট গোল্ড বা সাদা সোনা দ্বারা লেখা হয়েছে। আমি রীতিমতো অভিভূত হয়ে গেলাম। আরও জানা গেল যে এই নকশাটি দুবাই এর ঐতিহ্যবাহী কুফিক (কঁভরপ) ক্যালিওগ্রাফী নামে পরিচিত। এর নকশা করেছেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিখ্যাত ক্যালিওগ্রাফার মুহাম্মদ মানদি আল তামিমি। এছাড়া সম্পূর্ণ মসজিদটিতে আরও দুই ধরনের ক্যালিওগ্রাফী ব্যবহার করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে নাশকি (ঘধংযশর) ও থুলুথ (ঞযঁষঁঃয)। এই দুটো ক্যালিওগ্রাফীর নকশা করেছেন সিরিয়ার ফারুক হাদ্দাদ ও জর্দানের মুহাম্মদ আল্লম নামে দুই জন ক্যালিওগ্রাফার।
কিন্তু আমার অবাক হবার আরও অনেক কিছু বাকী ছিল। বিরাট
সিংহ দরজার ন্যায় কারুকাজ করা দরজা দিয়ে বেরিয়ে এলাম আমরা। সেই সাদা ও লাতাপাতার নকশা আঁকা টাইলস। সবাই জুতা রেখে গিয়েছেলাম দরজার বাইরে রাখা একটি র‌্যাকে। যার যার জুতা পায়ে দিয়ে আবারও হাঁটতে লাগলাম আমরা। বামপাশে দেখলাম অসংখ্য বড় বড় মেশিনের মতো সারিবদ্ধভাবে রাখা। এগুলোর বিষয়ে জিজ্ঞেস করতেই ভদ্রলোক জানালেন, এগুলো সব এসি। রমজান মাস এসে গেছে। এখন প্রতি নামাজ ওয়াক্তে বাইরের আঙিনাও লোকে লোকারণ্য হয়ে যাবে। তাদেরকে একটুখানি প্রশান্তি দেয়ার জন্য অগ্রিম ব্যবস্থার একটি অংশ এটি।
হাঁটতে হাঁটতে আমার দৃষ্টি আটকে গেল মসজিদের মিনার ও গম্বুজগুলোর একদম চূড়ায় সোনালী রং এর ডিজাইন এর উপর। সূর্যের প্রখর আলোয় সেগুলো যেন ঝলসে উঠছে। মসজিদটির প্রতিটি পিলার, যেখানে ছাদের সাথে মিশেছে সেখানেও সোনালী রং এর খেজুর পাতার নকশা দৃষ্টি কেড়ে নিয়েছে আমাদের। কিন্তু এই সোনালী রং যেন সবকিছুকে আকীর্ণ করে যাচ্ছে। আমি তাই ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করলাম, গম্বুজ ও মিনারের চূড়ার ঐ নকশাগুলো সোনা দ্বারা তৈরী কি-না। আমার অনুমানকে সঠিক প্রমাণিত করে ভদ্রলোক জানালেন এগুলো ২৪ ক্যারেট খাঁটি সোনা দ্বারা তৈরী। এবার আর আমি অবাক হলাম না। কারণ মসজিদের যে বিশেষ বৈশিষ্টের কথা এতক্ষণ ধরে জেনেছি আমরা তার সাথে এই দিকটা একান্তভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ। যাই হোক, আমরা চত্বর পেরিয়ে করিডোড়ে এসে থামলাম। যাওয়ার সময় এখান থেকেই আমাদের সবাইকে একটা করে ছোট্ট যন্ত্র দেয়া হয়েছিল। আমরা সেটা কানে লাগিয়ে নিয়েছিলাম। এর সুবিধা ছিল এই যে, যে কেউ গাইড ভদ্রলোকের সাথে কোন কথা বললে বা উনি কোন কথা বললে সেটা দলের সকলেই একসাথে শুনতে পাবে। আমরা এখানে এসে যার যার যন্ত্র ফেরত দিলাম। তারপর ভদ্রলোক দেখিয়ে দিলেন ছেলেদের ও মেয়েদের আলাদা আলাদা ওয়াশরুমের দিক। লম্বা করিডোরের ঐ পাড়ে আমরা মেয়েরা গেলাম আন্ডর গ্রাউন্ড ওয়াশরুমে। কিন্তু সেখানে গিয়ে তো আমার চক্ষু ছানাবড়া। অনেকটা বড় জায়গা নিয়ে ওয়াশরুম। ওজুর স্থান, দেয়াল, বেসিন - সর্বত্র রং বেরং এর অপরূপ নকশা খোদাই করা। প্রথমে অবাক হলেও পরে আমার মনে হলো এই মসজিদের সাথে এমনটাই মানানসই।
যাই হোক, ওয়াশরুমের কাজ সেরে আমরা সবাই এসে জড়ো হলাম এক জায়গায়। তারপর বেরিয়ে যাবার পালা। করিডোর ছেড়ে সামনে নামতেই হালকা নীল রং এর স্বচ্ছ পানির একটি বড় জলাধার, যেখানে মসজিদটির এক অংশের ছবি প্রতিবিম্বিত হচ্ছে। জলাধারের অপর পাড়েই ঘন সবুজ ঘাসে ঢাকা প্রান্তর। তারপর রাস্তা, রাস্তার অপর পাড়ে সারি সারি খেঁজুর গাছে বড় বড় খেঁজুরের ছড়া ঝুলছে। তখন খেঁজুর পাখার সময়। আমি দেখলাম সবগুলো খেজুরের ছড়া নেট দিয়ে বাধা। পাকা খেজুর যাতে মাটিতে পড়ে না যায় সেজন্য এই ব্যবস্থা।
এবার ফিরে যাবার পালা। মসজিদের অদূরেই আমাদের বাসটি দাঁড়িয়ে ছিল। আমরা গিয়ে বাসে চড়ে বসলাম। বাস এগিয়ে যাচ্ছে। আমি জানলা দিয়ে বাইরে দৃষ্টি ছড়িয়ে দিলাম। আমাদের দেশের মতো সবুজ-শ্যামলের জড়াজড়ি অবস্থান নেই কোথাও। তাই সাধারণত আমরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বলতে যে দিকটাকে বুঝি তা এদেশে নেই বললেই চলে। এর বিপরীতে রুক্ষ প্রকৃতি আমাদের মতো প্রকৃতি প্রেমিক মানুষের দৃষ্টিকে যতটা হতাশ করার কথা ততটা হতাশ আমি হইনি। কারণ পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন প্রতিটি রাস্তার দুই পাশ এবং মধ্যকার আইল্যান্ড নানারকম ফুলগাছ ও সবুজ ঘাসে সাজানো, দেখে মোহিত না হয়ে পারা যায়না। তাছাড়া সর্বত্র আধুনিক স্থাপত্য কীর্তির নিদর্শন বহনকারী দৃষ্টিনন্দন স্থাপনাসমূহের দিকে তাকিয়ে আমি বার বার অভিভূত হয়ে যাচ্ছিলাম। অবশেষে আমরা যখন হোটেলে এসে পৌঁছুলাম তখন দুপুর দুটো বেজে গেছে। সবাই লাঞ্চ সেরে রুমে যাওয়ার আগে জানানো হলো পরবর্তী প্রোগ্রামের কথা। বিকেল চারটায় স্থানীয় কোন এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দেখতে যাব আমরা। কিন্তু আমার কিছুতেই যেতে মন চাইছিল না সেখানে। তাই রুমে যাবার আগে জানিয়ে দিলাম যে আমি যাব না ঐ অনুষ্ঠানে। বিকেলে সবাই চলে যাবার পর আসরের নামাজ পড়ে বের হলাম আমি। আশেপাশের মার্কেট থেকে টুকটাক কেনাকাটা করে রুমে এসে মাগরিব এর নামাজ পড়লাম। তারপর আবার বের হয়ে গেলাম সেই আল কারামা সেন্টার নামক মার্কেটে। কেনাকাটা শেষ করে রুমে ফিরলাম রাত দশটায়। এশার নামাজ পড়ে বিছানায় যাওয়ার সাথে সাথে দুবাইয়ের শেষ দিনটি আমাদের দিনলিপি থেকে হারিয়ে গেল।
পরদিন ৭ জুলাই, ২০১৩ তারিখে আমাদের দেশে ফেরার পালা। স্থানীয় সময় দুপুর সোয়া একটায় ফ্লাইট। সকাল সাড়ে দশটায় আমরা হোটেল ছেড়ে এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। নির্দিষ্ট সময়ে আমিরাত এয়ারলাইনসের ফ্লাইটটি বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে আকাশে চড়ল।


পাতাটি ১৯০৬ বার প্রদর্শিত হয়েছে।