দশদিক মাসিক

হোম ভ্রমনআরামকুঠুরি

আরামকুঠুরি

শাহ মুহাম্মদ মোশাহিদ

হাঁটছি চাঁদপুরের রেললাইন ধরে। চাঁদপুর কোর্ট স্টেশন থেকে যাবো বড় স্টেশনে। তারপর ইলিশ মাছের আড়তে।
ঘড়ির কাঁটা তখন রাত নয়টা ছাড়িয়ে। রেল লাইনের দু’পাশেই বসতি এবং দোকানঘর। ঘরগুলোর ঝকমকে আলোয় মাঝে মাঝেই উজ্জ্বল হয়ে উঠছি আমরা। একবার আলোকিত হচ্ছি, আবার ডুবে যাচ্ছি ঘুটঘুটে অন্ধকারে। একেবারে সামনের সারিতে অনেকটা এগিয়ে গেছে তুহিন ও রোমন। এর আরো একটু পেছনে সজিবের সাথে হাঁটছেন আহমদ আমিন । আর এ দু’জনের সাথে তাল রাখার চেষ্টা করছে সাদ। কিন্তু হঠাৎ করেই হাঁটার তাল হারিয়ে ফেললো সে।
আমি তখন ওদের থেকে অনেক পেছনে। উদাসী হয়ে লাইনের স্পাত গুনতে গুনতে এগুচ্ছি। সাদকে দেখলাম থেমে যেতে। তারপর দুই স্পাত পেছনে এসে একেবারে আমার মুখোমুখি। ঘটনা কী?
ঘটনা তেমন কিছুই নয়। ওর ফোনে আমার কল এসেছে।
কানে নিতেই ওপাশ থেকে সাবরিনার কণ্ঠ- হ্যালো...
আমি গড়গড় করে একটু আগে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর বিবরণ দিতে শুর করলাম। কিন্তু থামিয়ে দিলেন সাবরিনা- আগেই সব শুনবো না। তাহলে ভ্রমণবত্তান্তপড়ে মজা পাওয়া যাবে না।
সাবরিনা সোবহান নিশিদলের সদস্য না হয়েও দলের ওপর খবরদারি করেন। দলের ভালো-মন্দ বিশেষণ করেন। সূচার দৃষ্টি রাখেন আমাদের গতিবিধির ওপর। আর রাতভ্রমণের লেখাগুলো নিয়ে উপস্থাপন করেন যৌক্তিক ও ধারালো সমালোচনা। বিশেষ করে
লেখার ভেতর বেখাপ্পা কোনো ইংরেজি শব্দ ঢুকে গেলে রক্ষে নেই। দল ও লেখার সাবলীলতা নষ্ট হওয়ার শঙ্কায় মাঝে মাঝে আমাদের বিপরীতে ষড়যন্ত্রের নকশাও আঁকতে ছাড়েন না তিনি।
কী সেই ষড়যন্ত্র?
আপাতত না হয় গোপনই রাখলাম। সব বলে দিলে শেষে মামলা পর্যন্ত গড়াতে পারে।
তবে এতটুকু বলে রাখা প্রয়োজন, সাবরিনার এই ফোন কলেও আমি গভীর ষড়যন্ত্রের লক্ষণ পেয়েছি। তিনি মূলত আমাদের দলটাকে জনসমাগমের ভেতরেই আটকে রাখতে চাইছিলেন। অর্থাৎ কোনোক্রমেই যেন নির্জন অন্ধকারমুখো না হই। কিংবা নৌকা ভাড়া করে যেন বিপজ্জনক এলাকায় না যাই। এর আগে পারিবারিক ভ্রমণে তিনি চাঁদপুর ঘুরে গেছেন। নিজের চোখে দেখেছেন রাতের ভয়ঙ্কর ঘূর্ণি।
সুতরাং আমাদেরকে নিরাপদ জায়গায়ই অবস্থান করতে হবে।
শহরের সবচেয়ে কোলাহলমুখর স্থানে নিরাপদে ঝিমুতে ঝিমুতে না হয় একটি রাত পার করে এলাম। কিন্তু সেই রাতের বর্ণনা লিখতে গেলে ঝিমুনি ছাড়া আর কোনো রসদ খুঁজে পাওয়া যাবে কী?
ওসব বিতা এড়িয়ে আমি আবার ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো বলতে শুর করলাম। তিনি বাধা দিলেন। তারপরও কিছুটা বলতে পারলাম। বললাম অবাক বালক শুক্কুর আলীর কথা। তিনি জানতে চাইলেন, এখনো আমরা তার পিছু পিছু ঘুরছি কি না।
আমি আশ্বস্ত করলাম- না।
সাবধান ওইসব পোলাপান কিন্তু সুবিধার হয় না। পেছনে ঘুরাইতে ঘুরাইতে আপনাদের বিপদে ফেলবে।
কে এই শুক্কুর আলী?
শুক্কুর আলীর সাথে পরিচয় সেই সদরঘাট থেকে।
সময় তখন সাড়ে চারটা, ৩ অক্টোবর ২০১৩। সিঁটি বাজিয়ে টার্মিনাল থেকে বিচ্ছিন্ন হলো আমাদের লঞ্চ ঈগল। নাক ঘুরিয়ে বুড়িগঙ্গার জল কেটে রওয়ানা হয়েছে চাঁদপুরের উদ্দ্যেশ্যে। লঞ্চের ছাদে একটি গোল টেবিলকে কেন্দ্র করে ছয় ছয়টি চেয়ারে গোল হয়ে বসেছি নিশিদলের ছয় সদস্য। মজার ব্যপার হলো আমাদের দলের সদস্য সংখ্যা ছয়, আর এই টেবিল ঘিরে ছয়টি চেয়ারই রয়েছে।
চেয়ারগুলো ছাদের সাথে আটকানো। টেবিলের মাঝ বরাবর একটি বড়সড় ছাতার কাঠামো ওপরের দিকে ছড়িয়ে গেছে। এই কাঠামোসর্বশ্ব কঙ্কাল ছাতার নিচে বসে আছি আমরা ছয়জন- আমার ডান দিকে নিশিপ্রার্থী আহসান সজিব। তারপর একে একে নিশাচর সাইমুম সাদ, জাফর হায়দার তুহিন, মফিজুর রহমান রোমন এবং নিশিপ্রার্থী আহমদ আমিন।
আমাদের মাথার ওপর তখনো বিকেলের পড়ন্ত রোদ। এই রোদঝলমল বুড়িগঙ্গায় ঝলমলে চেহারা নিয়েই হাজির হলো শুক্কুর। তারপর আমাদের দিকে ডান হাতটা বাড়িয়ে ধরলো। টাকা চাইলো। আমরা অবাক হয়ে তাকালাম এই অবাক বালকের দিকে।
গায়ে লাল রঙের টি শার্ট, পরনে কালো হাফপ্যন্ট। গোলগাল ফর্সা চেহারা। চোখে তার সারল্যের ঝলকানি। আর মুখে প্রশস্ত একটি হাসি।
কী এক অদ্ভূত কারণে সে কেবল হাসছে। আমাদের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে টাকা দাবি করছে ঠিকই, কিন্তু মুখে এতটুকু মলিন ভাব নেই। নেই কোনো অসহায়ত্বের ছাপ।
ফিক ফিক করে হাসতে হাসতেই বাড়িয়ে দেয়া হাতটা টেবিলের ওপর মেলে ধরলো। অবাক বালকের অবাক হাসি দেখে চঞ্চল হয়ে উঠলাম সবাই। আমাদের সমস্ত মনযোগ গিয়ে পড়লো ওর ওপর। সেও অন্যসব ভুলে আমাদের সাথেই নিবিড় হয়ে এলো।
নাম কী তোর? জিজ্ঞেস করলেন আহমদ আমিন।
ঝটপট উত্তর- শুক্কুর আলী।
এবার শুক্কুর আলীকে কাছে ডাকলো তুহিন- বয়স কত?
ডান হাতের তর্জনি আঙ্গলটি উঁচু করে দেখালো, অর্থাৎ এক বছর।
নিশ্চিত হওয়ার জন্য আবার বয়স জিজ্ঞেস করল সাদ।
আবার আঙ্গুল উঁচু করল সে। সাথে সাথে মুখেও উচ্চারণ করল- এক বছর।
খিক খিক করে হেসে উঠলো পুরো নিশিদল। হাসল শুক্কুর আলীও। হাসতে হাসতেই আমাদের ঘিরে একটি চক্কর দিলো। অর্থাৎ বুঝিয়ে দিলো, আমাদের পছন্দ হয়েছে তার।
আমাদেরও ভালো লেগেছে এক বছর বয়স দাবিদার আট-নয় বছর বয়সি শুক্কুর আলীকে। সম্ভবত এ কারণেই আমাদের সম্বোধন পরিবর্তন হয়ে ’তুই’ থেকে ‘তুমি’তে এলো।
সজিব পকেট থেকে দশ টাকা বের করে ধরিয়ে দিল ওর হাতে। দুই টাকার দু’টি নোট দিলেন আহমদ আমিন। খুব যত্মসহকারে
টাকাগুলো গুনে গুনে হাফপ্যন্টের পকেটে রাখল শুক্কুর। তারপর ফকফকে সাদা দাঁত বের করে আবারো একঝলক হাসল সে।
ততক্ষণে রোমনের ক্যমেরা চালু হয়ে গেছে। বেশ কয়েকটি ছবি তোলা হলো। বিষয়টা তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করল শুক্কুর। তারপর ক্যমেরার ভেতর নিজের ছবিগুলো দেখার জন্য পরম নিশ্চিন্তে রোমনের পাশ ঘেঁষে দাঁড়াল।
সাইমুম সাদ চেয়ার থেকে ওঠে এসে শুক্কুর আলীকে কোলে করে টেবিলের ওপর বসিয়ে দিল। আমরা হাসছি। তার মুখেও লজ্জ্বার হাসি। এর আগে সম্ভবত অমন করে সবার মধ্যমনি হয়ে টেবিলে বসার সৌভাগ্য হয়নি তার।
এবার লঞ্চের ছাদে বসা অন্যান্য যাত্রীদের দৃষ্টিও এই অবাকবালকের দিকে। সবাই মিট মিট করে হাসছে। জবাবে সে কয়েক সেকেন্ডের জন্য মাথা নিচু করে রাখল। তারপর হঠাৎ করেই মুখ তুলে বিটকেলে ধরনের একটা হাসি দিয়েই স্বাভাবিক হলো।
নিজ থেকেই কথা বলতে শুরু করল আমাদের সাথে। রোমন ও সজিবের সেলফোন দুটো নিয়ে ওর ভীষণ কৌতূহল। এ দুটোর দাম কত? একবার কেনার পর কতদিন টেকে? কিভাবে ছবি তোলে?
টেবিলে বসে থেকেই ফোন দুটোকে উল্টে পাল্টে দেখছে, আর আনমনা হয়ে আমাদের প্রশ্নের জবাব দিচ্ছে শুক্কুর।


পাতাটি ১৬০৪ বার প্রদর্শিত হয়েছে।