দশদিক মাসিক

হোম ভ্রমনআরামকুঠুরি

আরামকুঠুরি

আরামকুঠুরি

শাহ মুহাম্মদ মোশাহিদ

বরিনার সাধনার কারণেই সঙ্কেত চলে গিয়েছিলো সজিবের পরিচিত সেই ঠগের কাছে। ঠগ সক্রিয় হলো। অতঃপর সাড়ে সাত লাখ টাকা মেরে ভাগল। সজিব বিমর্ষ হলো। আর এমন বিমর্ষ অবস্থায় নিশিদলের সাথে ট্রিপে না যাওয়াটাই স্বাভাবিক।
সম্ভবত ঠিক সেই মুহুর্তেই সময় স্বল্পতার কারণে সাধনায় ছেদ পড়ল সাবরিনার। আর সজিবও ঘোর কাটিয়ে উল্টো সিদ্ধান্তনিল দলের সাথে যাওয়ার।
ধৈর্য্য ও অধ্যবসায়ের অভাবে তীরে এসে তরী ডুবালেন সাবরিনা।
আমাদের তরী ঈগল কিন্তু মাঝপথে ডুবে যায়নি, আমরা প্যরাসাইকোলজির বিভিন্ন শাখা-উপশাখায় মগ্ন থাকতে থাকতেই ভিড়ল চাঁদপুর ঘাটে। রাত তখন ৮টা বেজে ৩৩ মিনিট।
তাড়াহুড়ো করে নামলাম আমরা। একনজর দেখে নিলাম জেটি। একটি কাঠের সেতু দিয়ে স্থলের সঙ্গে সংযুক্ত জেটিটি। লম্বা জেটির ওপরই কয়েকটি কাউন্টার। আর কিছু খোপ খোপ ঘর।
আমরা জেটি থেকে উঠে এলাম স্থলে। সরগরম ঘাট। লোকে লোকারণ্য। রিকশা, সিএনজি ডাকাডাকি করছে। চলছে যাত্রীদের মালামাল নিয়ে টানাটানি।
কিন্তু আমাদের গন্তব্য কোথায়?
সবাই ভেতরে ভেতরে যা কামনা করছিল, সেই সিদ্ধান্তই জানালো তুহিন- আমরা এখন হালকা খাবার খাবো।
কিন্তু কী খাবো, কোথায় খাবো?
চাঁদপুরের কালীবাড়ি এলাকায় ‘ওয়ান মিনিট মিষ্টির দোকান’-এ। জানালো রোমন।
তার এক সহকর্মীর কাছ থেকে তথ্য নিয়ে এসেছে, এ দোকানটিতে ছোট আকারের মিষ্টি পাওয়া যায়, খেতে সুস্বাদু।
বাহ, পরাটা দিয়ে পুঁচকে মিষ্টি!
একবাক্যে রাজি হয়ে গেলাম সবাই।
তারপর রিকশা দাম করি, মোটরচালিত অটোরিকশা দাম করি। দাম করতে করতে একটি অটোরিকশার সাথে বনিবনা হলো। আমরা উঠলাম কালিবাড়ি যাবো বলে। অটোরিকশা স্টার্ট নিল। কিন্তু হঠাৎই আমাদের বাহনের সামনে এসে হাজির শুক্কুর আলী। অনুরোধ করলো তাকেও অটোরিকশায় তুলে নেয়ার। এতক্ষণ যার কথা আমরা ভুলেই গিয়েছিলাম। সে আমাদের ভুলতে পারেনি। আমরা অনুরোধ রাখলাম। শুক্কুরকে তুলে নিলাম সাথে। ওর বাড়িও কালিবাড়ি এলাকায়। আমরা অটোরিকশায় করে না নিলে হেঁটেই যেতো।
তৃপ্তির হাসি হাসছে শুক্কুর। কিন্তু এই হাসিটা বন্ধ হয়ে যেতে বাধ্য হলো আহমদ আমিনের কথায়। তিনি সবাইকে জানিয়ে দিলেন, আমরা রাতের খাবার শুক্কুরের বাড়িতেই খাবো।
এতটুকু উপকারের বিনিময়ে এতবড় মাশুল চাইবো ভাবতেও পারেনি সে।
মুখটা কালো হয়ে এলো ওর। দুলতে শুরু করলো শঙ্কায়। আমরা যদি সত্যি সত্যিই ওর বাড়িতে চলে যাই, তাহলে এতগুলো অনাহুত
অতিথিকে সামাল দেয়া তার পক্ষে অসম্ভব।
সবাই যখন ওর বাড়িতে খাওয়ার ব্যপারে একমত হলাম, শুনেও না শোনার ভান করলো শুক্কুর। বেচারার চেহারাটা তখন দেখার মতো বিব্রতকর হয়ে উঠেছিল। মনে হলো সম্ভব হলে চলন্তরিকশা থেকে লাফিয়ে পড়বে।
লাফিয়ে সে পড়েনি। কিন্তু আমাদের বাহনটি যখন কালিবাড়ি এসে থামলো, তখন জোর করেও তাকে আটকে রাখা যাচ্ছিল না। কই মাছের মতো পিছলে পাছলে সটকে যেতে চাচ্ছিল।
কিন্তু সাইমুম সাদের হাতের বাঁধন থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন। তাছাড়া তুহিন আর রোমন ততক্ষণে ‘ওয়ান মিনিট মিস্টির দোকান’ এর সন্ধান করছে।
মিষ্টির দোকানের নাম উচ্চারণ করার পর শুক্কুরকে আর জোরাজুরি করতে হলো না। নিজেই জানালো এই দোকানটি সে চেনে। সত্যি সত্যিই মিনিটখানেকের ভেতর আমাদের নিয়ে হাজির করল ‘ওয়ান মিনিট’ এর সামনে।
জিভে পানি এসে গেল। আহ, পুঁচকে মিষ্টিগুলো খেতে মন্দ হবে না।
কিন্তু ওয়ান মিনিট মিষ্টির দোকানের ভেতরে প্রবেশ করে হতাশ হতে আমাদের ওয়ান মিনিট সময়ও লাগলো না। দোকানে মিষ্টি নেই।
ধ্যত্তেরি ছাই ছাতা।
তারপর ছয়জন ছয়টি হতাশ ও বিধ্বস্ত জিভ নিয়ে শুক্কুরের পিছু নিলাম। সে আমাদের নিয়ে হুট করে একটি হোটেলে ঢুকে গেল। দ্বিধায় পড়লাম, কেমন হবে এখানকার খাবার?
কিন্তু খাবার মুখে নিয়ে সবাই শুক্কুরের প্রশংসায় পঞ্চমুখ।
সবার সামনেই রুটি। আমি আর রোমন রুটির সাথে ডাল নিয়েছি। তুহিনের সামনে হালুয়া। সাদ, আহমদ আমিন এবং সজিবের পছন্দ মিষ্টি। আর শুক্কুরের পছন্দ অবশ্যই মিষ্টি। সে নিজে মিষ্টি খাচ্ছে এবং অপরকে মিষ্টি খেতে উৎসাহিত করছে। কিন্তু আমি আর রোমন কেন ডাল দিয়ে খাচ্ছি তা বোধগম্য নয় শুক্কুরের। আমার দিকে আঙ্গুল তুলে একটা অবজ্ঞার হাসি হেসে অন্যদের জিজ্ঞেস করল- ডাইল খায়! ডাইল দিয়া খাইয়া কী মজা পায়?
একচোট হাসল সবাই। এতে মোটেও বিব্রত হলো না শুক্কুর। তার মনে প্রশ্ন থেকেই গেল, বাড়িতে তো সবসময়ই ডাল খাওয়া হয়। হোটেলে মিষ্টি রেখে ডালের মতো গড়পড়তা খাবার বেছে নেয়ার পক্ষে কোনো যুক্তিই খুঁজে পাচ্ছে না সে।
খেতে খেতেই খাওয়ার ব্যাপারে আরো সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিল আমাদের। উদাহরণ দিল নিজের সচেতনতার। আচমকা সে তার ডান হাতটা ভি আকৃতির মতো বানিয়ে পেশিটা শক্ত করে ধরল। টান টান হয়ে পেশির ভেতর থেকে ডিমের মতো একটা পি- ফুলে উঠল। তারপর বাম হাত দিয়ে এই পিন্ডটার ওপর দুইবার চাপড় বসালো- এই যে দেখতাছেন না ডিম। এইডা লঞ্চে বইসা খাইছি।
তারপর গলার দিকটায় ইশারা করে দেখাল, সেই ডিমটাই গলার ভেতর দিয়ে পেটে চালান হয়েছে। তারপর পেট থেকে এই হাতের পেশিতে এসে স্থির হয়েছে।
কাজেই খেতে হলে সবসময় ভালো কিছু খেতে হয়।
অবাক বালক শুক্কুরের খাওয়া এবং খাওয়ার ব্যপারে গবেষণা দেখে আমরা রীতিমতো অবাক । আরো অবাক হওয়ার মতো তথ্য দিলেন তার মা।
হোটেলে খাওয়া শেষ করে আমরা পাশেই চাঁদপুর কোর্ট রেলস্টেশনে গেলাম। সেখানেই দেখা শুক্কুরের মা মনি আক্তারের সাথে। মনি আক্তার থাকেন স্টেশনের কাছাকাছিই একটি ছাপড়াতে।
স্টেশন কেন্দ্রিক তার জীবিকা। এখানেই ফুটফরমাশ খাটেন। আবার লোকের বাড়িতে কাজ করেন। ওর বাবাও স্টেশনকেন্দ্রিকই শ্রমিকের কাজ করেন।
ওরা দুই ভাই, দুই বোন। দুই বোন ওর চেয়ে বড়। আর ওর ছোট ভাইটাকে দেখলাম স্টেশনেই দৌড়াদৌড়ি করছে। শুক্কুরের মতোই চঞ্চল। মায়ের সাথে দুই ভাইয়ের একসাথে ছবি তোলার সময়ও সে স্থির থাকতে চাইছে না। ছবি তোলার জন্য ওর মা ওকে খেলা থেকে ধরে এনেছে। তাই সে আমাদের প্রতি প্রচুর বিরক্ত।
নিজের গোমর ফাঁস হয়ে যাওয়ায় কিছুটা বিরক্ত হলো শুক্কুরও।
আমাদের প্রতি নয়, ওর মায়ের প্রতি। শুক্কুরের মা মনি আক্তার যা বললেন, তাতে শুক্কুরকে একটা বড়সড় খাদক বলা যায়।
তিনি জানালেন, সে শুধু খায় আর খায়। পয়সাওয়ালা লোকের সন্তানও তার মতো খেতে পারে না।
শুক্কুর প্রায় প্রতিদিন লঞ্চে করে ঢাকায় যায়। আবার সেই লঞ্চে করেই চাঁদপুর ফিরে। লঞ্চে আমাদের মতো অনেকেই তাকে কাছে টানে। এটা ওটা খেতে দেয়। টাকা পয়সা দেয়।
কিন্তু একটি টাকাও সে তার মা কিংবা বাবার হাতে তুলে দেয় না।
প্রতিদিনের আয় প্রতিদিনই খেয়ে শেষ করে শুক্কুর।
কী খায় সে?
অস্বাভাবিক কিছুই না।
বেশি বেশি ডিম খায়। ভাজা পোড়া খায়। ঝালমুড়ি, চানাচুর। পথে ঘাটে যা পায়, তাই খায়।
মাঝে মাঝে ইচ্ছে হলে ছোট ভাইটার জন্য কিছু উচ্ছিষ্ট নিয়ে আসে।
শুক্কুর আলীকে স্কুলে ভর্তি করানোর চেষ্টা করেছেন মা। কিন্তু তার কেবল খাওয়ার নেশা। আর খেতে হলে স্কুলে নয়, যেতে হবে লঞ্চে। তাই লঞ্চই ওর স্কুল। লঞ্চই ওর নেশা।
এই খাওয়া আর লঞ্চের নেশা থেকে কেউ ফেরাতে পারে না শুক্কুরকে। না তার বাবা, না মা। চোখে চোখে রাখলেও চোখ ফাঁকি দিয়ে ঘাটে চলে যায়। মাঝে মাঝে রাত দুইটা তিনটায়ও বাড়ি ফেরে।
অবাকবালক শুক্কুরের অধ্যায় সমাপ্ত করে আমরা গেলাম ইলিশ মাছের আড়তে। কোর্ট স্টেশন থেকে রেললাইন ধরে বড় স্টেশন। তারপর এর বিপরীতেই ইলিশের আড়ত। আড়ত থেকে সোজা একটি ঢাল নেমে গেছে ডাকাতিয়া নদীতে। এই নদী হয়েই প্রতিদিন এক দেড় হাজার মন ইলিশ আসে আড়তে।
আমরা যখন প্রবেশ করেছি, তখন প্রায় ঝিমিয়ে এসেছে আড়ত। পাইকাররা চলে গেছে। আড়তদাররা ইলিশ গোটানোর জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। তবুও কয়েক জায়গায় বেচাকেনা হচ্ছে। একনজরে দেখলাম হাজার হাজার রুপালি ইলিশ। দেশের বিভিন্ন যায়গায় ইলিশ ধরা পড়লেও চাঁদপুরের ইলিশের আলাদা খ্যাতি রয়েছে।
এখানকার অনেক মানুষই ইলিশ ব্যবসার সাথে জড়িত। ধারণা করা হয় চাঁদপুর নামটা চাঁদ সওদাগর নামে এক বণিকের নামানুসারেই হয়েছে। আগে এর নাম ছিল জুবকী বাজার। দ্বীপের মতো এ এলাকাটি ১৮৫৮ সালে থানা এবং ১৮৭৮ সালে মহকুমা হয়। আর জেলা হয় ১৯৮৪ সালে। পুরো চাঁদপুর শহরটিকে ঘিরে রেখেছে
ডাকাতিয়া। এ নদীটি পশ্চিম দিকে গিয়ে মিশেছে পদ্মার সাথে। এর একটু দক্ষিণেই মেঘনা।
নদীবেষ্টিত এ জেলা শহরটিও ভাঙনের কবলমুক্ত নয়। জেলার অন্যান্য এলাকার মতো শহরেও আঘাত হানে ভাঙন। সর্বশেষ ২০০০ সালের দিকে শহরের লঞ্চ ঘাট, বড় স্টেশন ও আড়ত এলাকার ভাঙনের চিহ্ন এখনো রয়ে গেছে।
আমরা আড়তের সামনের দিকটায় পায়চারি করে চলে গেলাম পেছনে। একেবারে ডাকাতিয়ার ঢালে। ওখানেও মানুষের সরগরম যাতায়াত।
একটি চায়ের দোকানে বসলাম। দোকানি চা তৈরি করছে, আর আমরা কথা বলছি আড়তকেন্দ্রিক যাদের জীবিকা এমন কয়েকজনের সাথে। একজনের নাম মোফাজ্জল। তিনি জানালেন এই আড়ত মূলত চাঁদপুরের ইলিশের জন্য বিখ্যাত হলেও, এখানে মাছ আসে হাতিয়া, সনদ্বীপ থেকেও।
চাঁদপুরের মাছগুলো সাধারণত ধরা হয় শহর হতে একটু দূরে পদ্মা, মেঘনা এবং ডাকাতিয়া নদীর সঙ্গমস্থল থেকে। এছাড়া হাতিয়া ও সনদ্বীপ এলাকা থেকে এখানে মাছ আসে নৌকায় এবং গাড়িতে করেও। বিশেষ করে হাতিয়ার মাছগুলো ডাকাতের ভয়ে গাড়িতে করেই বেশি আসে। আর রাঙ্গাবালি, কুয়াকাটা থেকে ধরা মাছগুলো আসে ট্রলারে করে। দোকানি চা বানাতে বানাতেই আমাদের প্রতি কৌতুহলি হয়ে উঠল অনেকেই। কথা বললেন, তথ্য দিলেন বেশ কয়েকজন। এদেরই একজন মো. রফিক। মাথায় টুপি, গলায় মাফলার পেঁচানো। আর গায়ের রঙটা কুঁচকুঁচে কালো। বয়স বিয়াল্লিশ-তেতাল্লিশ হবে। তাকে দেখেই মনে হলো তিনি মোটামুটি বিচার-বিবেচনা করে কথা বলেন।
মো. রফিক চায়ে চুমুক দিতে দিতে অনেক তথ্যই দিলেন আমাদের। বললেন ইলিশ ধরার বিত্তান্তও জেলেদের রসায়ন।
সাগরে ইলিশ ধরার একটি নৌকার পেছনে দেড় লাখ টাকার মতো খরচ হয়। একেকটি নৌকায় ১২ থেকে তের জনের মতো জেলে যান। সাগরে থাকতে হয় গড়পড়তায় ১৫ দিনের মতো। নৌকার ভেতরই খাবার-দাবারসহ জরুরি সবকিছুর আয়োজন থাকে। ইলিশ মাছ সবসময় পাওয়া যায় না। অনেকে ইলিশ না পেয়ে খালি নৌকা নিয়েও ফেরে। ভাগ্য ভালো হলে দুই তিন দিনের মাঝেই ইলিশের ঝাঁকে খেউ দিয়ে নৌকা বোঝাই করে ফিরে আসেন জেলেরা। মাছ বিক্রি করে লাভের তিনভাগের দুইভাগ থাকে মালিকের। আর একভাগ নেন জেলেরা।
ইলিশ এবং চাঁদপুরের ব্যাপারে কথা বলতে বলতেই মো. রফিক আমাদেরকে পরামর্শ দিলেন টোডার মাথা থেকে ঘুরে আসতে।
টোডার মাথা কী?
প্রশ্ন শুনে একটু ঘাবড়ে গেলেন তিনি। বোঝানোর চেষ্টা করলেন এটি একটি এলাকার নাম। যেখানে দাঁড়ালে নদীর চিত্রটা ভালো করে দেখা যায়।
তা বুঝলাম, কিন্তু টোডার মাথা নাম হলো কেন?
এবার আরো বিব্রত হলেন- “হেইডাতো কইতে পারুম না। দুই পাশে নদী। মাঝখান দিয়া পাখির ঠোঁটের মতো একটু যায়গা বাইর অইয়া আছে..”
অর্থাৎ তিনি বলতে চাইছেন, পাখির ঠোঁটের মতো দেখতে বলেই
এটাকে ঠোঁটার মাথা, কথ্য ভাষায় টোডার মাথা বলা হয়। আবার এ জায়গাটা ছেঁড়া-টোডা বলেও হয়তো টোডার মাথা বলা হতে পারে। রাত তখন এগারটা। ইলিশের আড়ত থেকে বেরিয়ে আমরা রওয়ানা দিলাম টোডার মাথার উদ্দেশ্যে। বড় স্টেশনের সামনে থেকে রেললাইন ধরে একটু এগিয়েই একটি স্মৃতিস্তম্ভ দেখতে পেলাম। নাম ‘রক্তধারা’। স্তম্ভের ওপর থেকে তিনটি রক্তের ফোঁটা যেন টপ টপ করে পড়ছে। দেখে মনে হলো এখনি টুপ করে মাটিতে রক্তপতনের আওয়াজ হবে। এটি একটি বধ্যভূমি, এখানে শহীদ হয়েছেন অগণন মুক্তিযোদ্ধা। এই স্মৃতিস্তম্ভটি কে তৈরি করেছেন, দেখার জন্য ফলক পড়তে শুরু করলাম। কিন্তু কোথাও শিল্পীর নাম লেখা নেই। তবে বড় বড় অক্ষরে লেখা রয়েছে স্তম্ভটি যিনি উদ্বোধন করেছেন তার নাম। রক্তধারা পেরিয়ে আমরা প্রবেশ করলাম একটা অন্ধকার গলিতে। কয়েক কদম দূরত্বের এই গলিটা পেরিয়েই পা রাখলাম টোডার মাথায়। দৃষ্টিসীমায় ঘুটঘুটে অন্ধকার। চাঁদহীন কালো আকাশ। আকাশের ছাউনির তলায় একপ্রস্থ জমি। জমিতে দাঁড়িয়ে আকাশ স্পর্শ করতে চাইছে কয়েকটি গাছ। অভিবাবকহীন পড়ে আছে দুই-তিনটি চটপটি ফোঁচকার টঙ দোকান। বসার জন্য তৈরি করা হয়েছে কয়েকটি ইট-সিমেন্টের তৈরি বেঞ্চি। অর্থাৎ দিনের আলোতে এই এলাকাটা সরগরম থাকে
আমরা এগিয়ে চললাম। হাতের বা দিকে নদী, ওপারে জ্বলছে টিমটিমে আলো। ডানে অন্ধকার। আর সামনে একেবারে হঠাৎ করেই অন্ধকারের একটি দেয়াল। আমরা সহজেই বুঝে গেলাম, এ দেয়াল বেয়েই টোডার মাথা নেমে গেছে ডাকাতিয়া নদীতে।
আমাদের শরীর স্পর্শ করে বয়ে গেলো ঠান্ডা বাতাস। গাছের পাতায় পাতায় শব্দ হলো। মুহুর্তের জন্য শরীরটা শিরশির করে উঠল। একটা ঠান্ডা গুমোট পরিবেশ। যেকোনো মুহুর্তে আমাদের ওপর লাফিয়ে পড়তে পারে বিপদ।
বুঝে শুনে পা বাড়ালাম আমরা। একেবারে মাথার কাছাকাছি এসেই চোখে পড়লো দৃশ্যটা। ঠিক অন্ধকারের দেয়াল ঘেঁষেই একটি বেঞ্চি দখল করে আছে দুই দুটি ছায়ামূর্তি। নিঃশব্দ, চুপচাপ।
এরা কারা?
এদের পরিচয় নিয়ে এত বেশি মাথা ঘামালাম না। নিজেদের মধ্যে স্বাভাবিক আলাপ-আলোচনা অব্যাহত রেখেই স্পর্শ করলাম অন্ধকারের দেয়াল। অবস্থান নিলাম ওদের থেকে দশ পনেরো ফুট দূরত্বের বেঞ্চিটার সামনে।
এখান থেকেই ইট-সিমেন্টের পাটাতনগুলো নেমে গেছে নদীতে। আমাদের থেকে বড়জোর পঁচিশ ফুট দূরত্বের ঢাল পেরিয়েই ডাকাতিয়া নদীর প্রবাহ। কিন্তু অন্ধকারের চাদর আমাদের দৃষ্টি থেকে ঢেকে রেখেছে নদীর জল। কানে এসে ঠেকছে ছলাৎছল ছলাৎছল।
এটা ডাকাতিয়ার কান্না। নদীরা এমন করেই কাঁদে। মানুষের রোদ্ররোষে পড়ে কাঁদে। আবার ভাঙনে ভাঙনে মানুষকে ভিটেমাটিছাড়া করে কাঁদে। ওদের জন্মই পাহাড়ের কান্না থেকে। ওরা কাঁদবে এটাই স্বাভাবিক। কাঁদতে কাঁদতে গড়িয়ে পড়বে সাগরে।
ডাকাতিয়ার কান্নাকাটিতে নরম হয়ে এলো মন। হু হু করে উঠল বুক। ইচ্ছে হলো জল ছুঁয়ে দিয়ে সহমর্মিতা জানাই। কিন্তু এই হু হু অনুভূতির ভেতরও এক ধরনের ভালো লাগা আছে। আমি ডাকাতিয়ার কান্না থামাতে গেলাম না। কাঁদছে যখন, কাঁদুক না।
ডাকাতিয়া নদীকে পেছনে রেখে সার করে দাঁড়ালাম আমরা। একটা দলছবি প্রয়োজন। কিন্তু দলের ছয়জনকে ক্যামেরায় আনতে হলে সপ্তম ব্যক্তি ছাড়া হবে না।
কী করা যায়?
আমি এগিয়ে গেলাম সেই ছায়ামানবদের কাছে। হ্যাডফোন লাগিয়ে দু’জনেই গান শুনছে। হাতে জ্বলন্তসিগারেট। রুক্ষ রুক্ষ চেহারা। আমার পায়ের শব্দ পেয়েও নির্বিকার রইলো। কী এক গভীর ভাবনায় দু’জনেই বুদ। পর পর দুইবার দৃষ্টি আকর্ষণের চেস্টা করে সফল হলাম। ঝট করে একজন তাকালো আমার দিকে। পাশেরজন তখনো নির্বিকার। আমি অনুরোধ করলাম একটি ছবি তুলে দেয়ার জন্য। ছায়ামানব কোনো কথা বললো না। বেঞ্চির নিচের দিকটা থেকে পায়ের স্যন্ডেল খুঁজে বের করে ওঠে দাঁড়াল। তারপর আমাকে অনুসরণ করল। নিঃশব্দেই তার হাতে দামি সেলফোনটা ধরিয়ে দিলো রোমন। আমি দাঁড়ালাম দলের সাথে। তারপর- ক্লিক, ক্লিক..।
কয়েকটা ছবি তোলার পর সেলফোনটা আমার হাতে ফিরিয়ে দিয়ে আবার নিঃশব্দেই ছায়ার মতো ফিরে গেল সেই ছায়ামানব
তারপর একে একে আমরা নামতে শুরু করলাম ঢাল বেয়ে। আমি ছাড়া সবাই পা বাড়িয়ে ছুঁয়ে দিল জল। আমি স্পর্শও করলাম না। কিন্তু ওদের পায়ের স্পর্শের পরই ছলাৎছল শব্দটা হারিয়ে গেল অন্য একটি শব্দের ভাঁজে। একটি লঞ্চের ভেঁপু কানে তালা লাগিয়ে দিল। টোডার মাথা ঘেঁষেই যাচ্ছে ওটা। লঞ্চবাতির আলোয় ফর্সা হয়ে এলো ডাকাতিয়া। অন্ধকারের দেয়াল কেটে এই প্রথমবারের মতো দেখলাম নদীটাকে। এরপর একটু পর পর লঞ্চ আসছে, যাচ্ছে। ইঞ্জিনের গুঞ্জনে খান খান হচ্ছে রাতের নীরবতা। সেই ছলাৎছল ছলাৎছল শব্দটাও যেনো হারিয়ে গেল কোথায়!
আমি এবং আমরা অলস ভঙ্গিতে বসে রইলাম যে যার মতো। রোমন তখনো পানিতেই। আচমকা সে ক্যমেরায় ক্লিক শুরু করল। বলল- তোমাদের জীবনের সেরা কয়েকটা ছবি তুলে দিলাম।
ক্যমেরায় ক্লিক করতে করতেই আদেশ জারি করল- যে যেখানে আছো, সবাই ওঠে দাঁড়াও।
আমরা তার আদেশ শিরোধার্য করলাম। আবার ক্যমেরায় ক্লিক।
তারপর স্ক্রিনে যখন নিজেদের ছবিগুলো দেখলাম, অবাক হতে বাধ্য হলাম। ছবিতে একপ্রস্ত রাতজমিনের ওপর এলোমেলো নিশিদল।
আরো কিছুক্ষণ অলস বসে থাকতাম সেখানে। কিন্তু বড় ধরনের একটি শঙ্কা এসে জমাট বাঁধল। ব্যপারটা প্রথম লক্ষ্য করল রোমন-
ছায়ামানবদের দলটা ক্রমেই ভারি হচ্ছে। দুইজন থেকে চারজন। মিনিট খানেকের মধ্যেই চারজন থেকে ছয়জন। তারপর সাত, আট করতে করতে দশ এ পৌঁছল।
নিশিদলের বিপরীতে এই ছায়াদল কী তাহলে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে?
কোনো সম্ভাবনাই উড়িয়ে দেয়া যায় না, মত দিল তুহিন।
যদি সত্যিই রণপ্রস্তুতি নিয়ে থাকে, তবে ওরা যে পরিমাণ সৈন্যসমাগম করছে তার তুলনায় নিশিদলের সৈন্য সংখ্যা অপ্রতুল। তাছাড়া ওরা স্থানীয় বলে বাড়তি একটা সুবিধা পাবে।
সুতরাং রণাঙ্গন ছেড়ে পলায়ন করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
আমরা রণাঙ্গন থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে নিলাম। অন্ধকার ছেড়ে চললাম আলোর দিকে। আমাদের চলে যেতে দেখে ছায়াদল একটা হোঁচট খেলো। তারপর আর পেছন ফিরে তাকাইনি। তবে
ডাকাতিয়ার কান্নাটা আবারো শুনতে পেলাম।
এবার আর মন নরম হলো না আমার। ভাবলাম, নদীর কান্নাকে পশ্রয় দিয়ে কী লাভ? পৃথিবীতে কত মানুষের কান্নাকেই এড়িয়ে গেছি। বুকে পাষাণ বেঁধে চোখ বন্ধ করে রেখেছি। অথচ মানুষের ভেতর একটি নয়, হাজারটি নদীর প্রবাহ। এই হাজারনদীর কোরাস কান্নাও যেখানে গুমরে বেড়ায়, সেখানে এক নদীর কান্না তো মামুলি।
গুমড়ানো কান্না দেখলাম টাইগার পাগলার ছলোছলো চোখে। না, সে অশ্রু বিসর্জন দিয়ে কাঁদছিল না। কাঁদছিল তার ভেতরকার হাজারটি নদী। টোডার মাথা থেকে ফিরে এসে একটি মুদি দোকানের সামনে এই পাগলের সাথে দেখা। পরনে প্যাঁচানো লাল কাপড়। উর্ধাঙ্গেও একটুকরো কাপড় জড়ানো। হাতে বিশাল চটের থলে। চুলে জট। থুতনি থেকে বেড়িয়ে এসেছে ধারালো দাড়ি। নাকের নিচে দু’গুচ্ছ গোঁফ। চেহারাটা একনজর দেখলে মনে হবে চীনদেশের কুংফু কারাতে মাস্টারদের মতো। কোমল পানীয় টাইগার পছন্দ করে সে। তাই লোকে তাকে টাইগার পাগলা নামেই চেনে।
রাত তখন ১১টা বেজে ৩৪ মিনিট। একটি দোকানের কোণায় তাকে দেখেই কাছে ভিড়লাম। তুচ্ছতাচ্ছিল্যের সাথে জিজ্ঞেস করলাম- নাম কী?
পাগলা কোনো কথা বলল না। কেবল দুটো আঙ্গুল ঘষা দিয়ে বোঝাল, ওর টাকার ভীষণ প্রয়োজন। আমরা মস্করা করলাম। একরকম পেয়ে বসলাম ওকে। একের পর এক প্রশ্ন করছি। কোনো জবাব নেই। সে চুপ থাকছে এবং আমাদের ওপর বিরক্ত হচ্ছে।
আমরাও বিরক্ত হয়ে প্রায় চলেই যাচ্ছিলাম। কিন্তু বিপত্তিটা ঘটালো সজিব। ও হঠাৎ করেই পাগলের আঙ্গুলে কি যেনো আবিষ্কার করল। আমাকে কাছে ডাকল।
দেখলাম, পাগলটার দুই হাত ভর্তি আঙটি। প্রতিটা আঙ্গুলেই কম করে হলেও দুটি করে হবে। এতে আর অস্বাভাবিক কী? রাস্তাঘাটে এরকম অনেক আঙ্গটিপড়া পাগলই দেখা যায়। ওর ডান হাতটার দিকে ইঙ্গিত করল সজিব।
প্রথম দৃষ্টিতেই শরীরটা ঝাড়া দিয়ে উঠলো আমার। ভয়ঙ্কর এক দৃশ্য - টাইগার পাগলার ডান হাতের সবচেয়ে শক্তিশালী আঙ্গুলের সামনের দিকটা মুলোর মতো ফুলে আছে। মোটেও বাহুল্য বলছি না। সত্যি সত্যিই ছোটখাটো একটা মূলোর মতো হয়ে আছে আঙ্গুলটা।
কেন, কিভাবে?
দেখলাম এই আঙ্গুলে আঁটসাট করে একটি আঙ্গটি পড়া। আর যে অংশটা জুড়ে আঙটি জড়ানো আছে, সেটার আকৃতি স্বাভাবিক। কিন্তু বাইরের অংশটা মুলোর মতো। ধারণা করলাম, হয়তো আঙটিটা নিয়ে সে বিপাকে আছে।
কিন্তু এই ধারণাকে পাল্টে দিলেন স্থানীয় এক দোকানি- পাগলারে বইলা কোনো লাভ নাই। লাখ টাকা দিলেও হ্যায় আঙটি খুলবো না।
তারপর হাতে করে একটি টর্চ নিয়ে দোকান থেকে বের হলেন লোকটা। আলো ফেললেন টাইগার পাগলার আঙ্গুলের দিকে। গা রি রি করে উঠলো আমার। আঙটি আর মুলোর মাঝামাঝি যায়গাটা একেবারে পঁচে গলে মাংস খসে পড়ছে। কিলবিল করছে পোকা!
আমি আর তাকাতে পারলাম না। কেবল ভেতর থেকে একবার অনুভব করার চেষ্টা করলাম ওর যন্ত্রণাটুকু। সেটাও করতে পারলাম না।
আরো কয়েকজন লোক জমে গেলো পাগলকে ঘীরে। ওদের সবার কাছেই সে পরিচিত। ওরা অনেকবার চেষ্টা করেছে টাইগার পাগলাকে
হাসপাতালে নিয়ে অপারেশন করানোর। কিন্তু সে যেতে রাজি নয়। ওদের ধারণা এই আঙটি নিয়েই পাগলার সমস্ত সাধনা। আঙটিতেই সে জগত দেখে। আঙ্গটিতেই খুঁজে মুক্তি।
অদ্ভূত দুনিয়া! অদ্ভূত পাগলের ভাবনা! এই অদ্ভূত টাইগার পাগলাকে একটি টাইগার কিনে দিল সজিব। একটু হাসি দিয়ে টাইগারের বোতলটি ধরে খেতে শুরু করল সে।
টাইগার পাগল খাচ্ছে। আর তাকে নিয়ে আলোচনা চলছে জটলায়। দোকানি বললেন- পাগলা বহুত বজ্জাত আছে। গোপনে গোপনে টেকা জমায়। কিন্তু খরচ করে না।
বিষয়টা সহ্য হয়নি পাগলার। হঠাৎই ভূতের স্বরে কথা বলে উঠল সে- মিথ্যা কথা কমু ক্যান, টেহা আমার আছে। কিন্তু সব মাইনষের কাছে। মাইনষে আমার টেহা মাইরা দ্যায়।
কথাগুলো বলতে খুব বেগ পোহাতে হলো টাইগার পাগলার। মুখ দিয়ে শব্দ বেরুতে চায় না। ধীরে ধীরে ঠোঁট নেড়ে চিউ চিউ করছিল। অর্ধেক কথা মুখ দিয়ে, আর বাকি অর্ধেক বলল নাক দিয়ে। শুনতে অনেকটা ভূতের কণ্ঠের মতো।
তারপর আমাদের সাথে আরো সহজ হয়ে এলো সে। কিন্তু হাতের আঙটিগুলো খুলতে বা আঙুল অস্ত্রোপচার করতে কোনোভাবেই রাজি হলো না।
টাইগার পাগলাকে রাজি করাতে না পেরে আমরা হাঁটা ধরলাম লঞ্চঘাটের দিকে। এলোমেলো ঘুরলাম কিছু সময়। রাত গভীর হয়ে এলো। সিদ্ধান্তনিলাম পানসি বা খেয়া নৌকায় চড়ার। কিন্তু এত রাতে নৌকা কোথায় পাওয়া যাবে?
লোকজন তথ্য দিল, সেই বড় স্টেশনের দিকে পেলেও পেতে পারি।
আমরা আবার রওয়ানা হলাম বড় স্টেশন অভিমুখে। রাতের খাবারের ব্যপারে রিকশা চালকের সাথে পরামর্শ করল তুহিন ও রোমন। চালক শাহজাহান ভাইয়ের হোটেলের সন্ধান দিল। আমরা সেখানে রিকশা থামিয়ে জেনে নিলাম হোটেলটি খোলা থাকবে রাত আড়াইটা পর্যন্ত। তখন সময় একটার কাছাকাছি।
বড় স্টেশন এলাকায় ঠিক ডাকাতিয়ার তীরে নামলাম রিকশা থেকে। দেখলাম সার ধরে নৌকা বাঁধা আছে। কিন্তু কোনোটাতেই মাঝি নেই। মাঝির সন্ধানে তোড়জোর চালালাম সবাই। নদীর ঢালে নেমে ডাকাডাকিও করলেন আহমদ আমিন। মাথা নুইয়ে নৌকার গলুইয়ের ভেতর মাঝির সন্ধান করল সাইমুম সাদ। কিছুতেই ফল হলো না। আমরা নদীর তীর ধরেই এগুতে লাগলাম টোডার মাথার দিকে।
হাতের ডানে লক্ষ্য করলাম একটি ক্লাবঘরের মতো। ভেতরে আলো জলছে। সামনে সাইনবোর্ড- মাঝি সমবায় সমিতি। মনে জোর পেলাম আমরা। সমিতিঘরের ভেতরে ঢুকল তুহিন। একটু পর একজনকে সাথে নিয়ে বের হয়ে হলো। পেছন পেছন আরো দুইতিনজন কৌতুহলী মাঝি।
কিছুক্ষণ মুলামুলি চলল। এ ক্ষেত্রে তুহিনের দক্ষ্য ও কৌশলী ভূমিকা কাজে দিলো। যথেষ্ট আন্তরিকতার সাথে আমাদের নিয়ে ডাকাতিয়ায় নৌকা ভাসালেন মাঝি আবদুর রহিম।
রাত তখন একটা বেজে পাঁচ মিনিট। ডাকাতিয়া খলবল খলবল করে ঘুরপাক খাচ্ছে। হাতে টানা হাল বেয়ে নৌকা ঠিক রাখতে যথেষ্ট বেগ পোহাতে হচ্ছে আবদুর রহিম চাচাকে। আমরা ভাসছি রাতের বিপরীতে। গন্তব্য টোডার মাথার দিক দিয়ে ঘুরে নদীর ওপারের কাছাকাছি গিয়ে তারপর আবার চলে আসবো। ওপারটাতে দেখা যাচ্ছে টিমটিমে আলো।
আমরা যখন নদীর মাঝামাঝি পৌঁছি, তখনি নৌকাজুড়ে শুরু হলো গানের মাতম। নদী নিয়ে একটি গানে টান দিল রোমন- ও.. নদীরে...।
সাথে সাথেই কোরাস ধরল সাইমুম সাদ। তারপর আহমদ আমিন, তুহিন, সজিব এবং সর্বশেষ আমি- একটি কথা শোধাই শুধু তোমারে/ বল কোথায় তোমার দেশ/ তোমার নেই কি চলার শেষ...
কোরাসটা যখন ঢিলে হয়ে আসছিল, তখনি হেঁড়ে গলায় অন্য একটি সুরে টান দিলাম আমি- ও..রে নীল দরিয়া...
আপুত হয়ে কোরাস তুলল সবাই- আমায় দেরে দে ছাড়িয়া/ বন্দী হইয়া মনোয়া পাখি হায়রে/ কান্দে রুইয়া রুইয়া/ কাছের মানুষ দূরে থুইয়া/ মরি আমি ধরফরাইয়া রে/ দারুণ জ্বালা দিবা নিশি/ অন্তরে অন্তরে/ আমার এতো সাধের মনোয়া পাখি হায় রে/ কি জানি কি করে ...
গানটা পুরোই গাইলাম আমরা। একটু পর পর ভোকাল পাল্টাল ঠিক, কিন্তু তালে তেমন হেরফের হলো না। একজনের গলা নেমে আসছে বুঝতে পারলেই আরেকজন গলা খিঁচে তালটা ধরে রাখলাম। সুর হোক বা না হোক।
আমি এমন কোনো লোক দেখিনি যে, এই গানটা শুনে বা গেয়ে আপুত হয়নি। এর কথাগুলো জীবনঘনিষ্ঠ। মানুষের জীবন দরিয়ার মতোই। আমরা ভাসছি এক অদ্ভূত দরিয়ায়। নোঙর করছি ঘাটে ঘাটে। বন্দরে বন্দরে দেখছি নতুন জনপদ। মুখরিত হচ্ছি অগুনতি পাখির কোলাহলে। কিন্তু সাধের মনোয়া পাখিটাকে যেখানে রেখে এসেছি, আমাদের নোঙর আটকে আছে সেখানেই।
আবারো বলতে হয়, সেই এক মানুষের ভেতর হাজার নদীর প্রবাহের কথা। এই হাজার নদীগুলোই পরস্পর বয়ে যায় সমান্তরাল। কোনোটা উত্তাল হয়। কোনোটা শান্তসুশীতল। কোনো নদীতে বাঁধ দিয়ে মেরে ফেলা হয়। আবার স্মৃতির ধূলোয় ঢাকা পড়ে একেকটা নদী। কেউ মরা নদীটার রেখাও মুছে দিতে চায়। আবার কেউ সেই রেখা ধরেই স্মৃতিকাতর হয় সঙ্গোপনে- আমার একটা নদী ছিল/ জানলো না তো কেউ/ এইখানে এক নদী ছিল/ জানলো নাতো কেউ/ নদীর জল ছিল না.../ ও...ও.. জল ছিল না কুল ছিল না/ ছিল শুধু ঢেউ ..../ আমার একটা নদী ছিল/ জানলো না তো কেউ...
থিক নবীর এই গানটা শেষ হতে না হতেই তুহিন টান দিল আরো একটি স্মৃতি রোমন্থনের সুর- আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম/আমরা/ আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম/ গ্রামের নওজোয়ান/ হিন্দু মুসলমান/ একসাথে বাউলা গান আর মুর্শিদি গাইতাম/ আমরা/ আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম ...
আগের দিন বাঘে খেয়েছে। দিন গেলে আর দিন ফিরে আসে না। সময়টা প্রবাহমান। ঠিক এই ডাকাতিয়ার জলের মতো। টোডার মাথা বরাবর মাঝ নদীতে দুই দিক থেকে এসে মোটামুটি শান্তএকটি ঘূর্ণি তৈরি হয়েছে। এই ঘূর্ণির মাঝখানে যদি সাইমুম সাদকে নৌকা থেকে ফেলে দেয়া যায়, তবে কম করে হলেও আধা কিলোমিটার দূরে গিয়ে ভাসবে।
নিশিদলের আরো পাঁচ সদস্যকে রেখে কেবল সাইমুম সাদকে ফেলে দেয়ার প্রশ্ন এলো কেন?
কারণ, সাইমুম সাদই সবার চেয়ে হ্যাঙলা। সম্ভবত ওজনেও কম। কাজেই ওকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়া অন্য সবার চেয়ে সহজ। সাইমুম সাদের পর হ্যাঙলার দিক থেকে দ্বিতীয় স্থানে আছেন আহমদ আমিন। এরপর আর স্থান নির্ধারণ করছি না। কারণ মাসখানেক ধরে খাওয়া দাওয়ার অনিয়মে আমিও শুকিয়ে গেছি। আমার আগের
মাপের প্যান্টগুলো ঢিলা হয়ে এসেছে। যায়গায় বেজায়গায় কোমর থেকে নিচে নেমে যায়।
এ নিয়ে তুহিন আর রোমন আমাকে খোঁচা মারতেও ছাড়ে না। কি আর করব- পড়েছি মোগলের হাতে, খানা খেতে হবে একসাথে।
খেয়া নৌকা থেকে নেমেই আমরা খানা খাওয়ার জন্য তোড়জোর শুরু করলাম। রাত তখন পৌনে দুইটা। চলে গেলাম সেই শাহজাহান ভাইয়ের হোটেলে। তারপর শুরু হলো রান্না।
সে আরেক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। হোটেলে ঢোকার প্রথম থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্তখাওয়া নিয়ে রোমাঞ্চিত ছিলাম নিশিদলের প্রতিটা সদস্য। চাঁদপুরের তাজা ইলিশ কেটে ছয়টি টুকরো করা হলো। কড়াইয়ে ঢালা হলো সরিষার তেল। চুলোর আঁচে তেল গরম হয়ে এলে মসলা মাখানো ইলিশটুকরাগুলো করে ছেড়ে দেয়া হলো কড়াইয়ে। সাথে পেঁয়াজ কুচি আর শুকনা মরিচ।
ঘ্রাণেই অর্ধভোজন হয়ে গেল আমাদের। তারপরও পুরোপুরি ভোজের জন্য জিহ্বা লালায়িত হয়ে রইলো। প্রতিটি সেকেন্ডকে মনে হলো একেকটি ঘণ্টা।
অবশেষে ইলিশভাজা সমাপ্ত হলো। তার আগেই ছয়জনের সামনে ছয়টি থালা এবং বোলভর্তি গরম ভাত চলে এসেছে। হাত ধুয়ে থালা মেলে বসে আছি সবাই। শাহজাহান ভাই ইলিশভাজাগুলো বড় আকারের একটি গোল বাটিতে করে তুহিনের হাতে ধরিয়ে দিলেন। তুহিন গরম গরম মাছ বণ্টন করে দিল থালায় থালায়। সাথে বণ্টন করল ভাজা পেঁয়াজকুচিও। বলতে দ্বিধা নেই, বণ্টন শেষে যে অতিরিক্ত পেঁয়াজকুচি ছিল, আমি সেগুলোর বেশিরভাগ অংশ নিজ দায়িত্বে আমার থালায় তুলে নিয়েছি।
ধারণা করেছিলাম এ নিয়ে দলের অন্যরা আপত্তি তুলবে। কিন্তু সবাইকে দেখলাম তাজা ইলিশ এবং এর স্বাদের তারিফ করতেই ব্যস্ত। মুখ ভরে তারিফ করার মতোই ছিল আমাদের এই ভোজটা। কড়া ভাজা টুকরোগুলোর ভেতরে আবার ডিমও রয়েছে। এই ডিমগুলো জিহ্বায় আলাদা মাত্রা যোগ করল। মোটামুটি সবাই গোগ্রাসে খেয়ে পেট টইটম্বুর করলাম। তারপর থালা চেটেপুটেও খেলাম।
অবাক ব্যাপার হলো লেখাটা লিখতে গিয়ে বার বার আমি বহুল প্রচলিত শব্দ ‘পেট’ এর পরিবর্তে ‘থালা’ শব্দটি ব্যবহার করছি!
এর মানে এটা কি ইংরেজি শব্দ নিয়ে সাবরিনার খবরদারির ফল?
হলেও হতে পারে। আর হলেই বা ক্ষতি কী? যেখানে ‘থালা’ ব্যবহার করেই সাবলীল বাক্য গঠন করা যায়, সেখানে খামোখা একটি ইংরেজি শব্দকে ডেকে আনার কী প্রয়োজন?
তবে অনেক সময় অনেক কিছুকে ডেকে আনতে না চাইলেও চলে আসে। আবার কোনো কোনো সময় সেই চলে আসাটাই খাপ খেয়ে যায়।
যেমন আমাদের পরিবেশের সাথে খাপ খেয়েছিল বৃষ্টিটা।
ইলিশভাজার ঢেকুর তুলতে তুলতে আমরা আবার গিয়েছিলাম টোডার মাথায়। ঘড়ির কাটা তখন তিনটা ছুঁই ছুঁই।
ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টিটা শুরু হয়েছিলো দুইটা পঁচিশের দিকে। মিনিট সাতেক পর সেটা ঝড়তে শুরু করলো মুষলধারে। টিকলো পঁচ-ছয় মিনিট। তারপর বিরতি।
এই বিরতির সময়টাতেই আমরা স্থানান্তরিত হই টোডার মাথায়। উদ্দেশ্য, ভরপেটে অলস সময় কাটানো। তাছাড়া সেই রণাঙ্গন ছেড়ে
আসার অতৃপ্তিটাতো থেকেই গেছে।
এবার আগের সেই প্রতিপক্ষ ছায়াদলের অস্তিত্ব পেলাম না সেখানে। কিন্তু আমাদের প্রতিপক্ষ হয়ে আবার ঝড়তে শুরু করল ইলশেগুঁড়ি। ঠান্ডা ঠান্ডা পরিবেশে বৃষ্টিটা উপভোগ্য, কিন্তু আমাদের মাথার ওপর কোনো ছাদ নেই।
সুতরাং আবার রণেভঙ্গ দিয়ে ছাড়তে হবে রণাঙ্গন!
না। এবার আর নিশিদলকে পিছু হটতে হলো না। পাশেই পেয়ে গেলাম চটপটি ফোঁচকা বিক্রি করার একটি টঙ দোকান। টঙের ওপরে ছাউনি। আর নিচের দিকে কোমর পর্যন্তউঁচু করে ইউ আকৃতির ডেস্ক। ইউ এর খোলা মুখ দিয়ে আমরা ঢুকে গেলাম ভেতরে। মাখখানে বড়জোর একজন দাঁড়ানোর যায়গা। গাদাগাদি করেও ছয়জনের সঙ্কুলান হওয়ার কথা নয়।
ছাউনির ভেতর প্রবেশ করেই আহমদ আমিনকে দেখলাম পেছনের হাত দিয়ে ভর দিয়ে ডেস্কের ওপর বসে যেতে। তারপর সেখানে পা ঝুলিয়ে আরাম করে বসলো তুহিন এবং রোমন। তিনজন ভালো ভালো তিনটি জায়গা দখল করে বসেছে।
বাকি থাকলাম আরো তিনজন। আমি আস্তে করে আহমদ আমিন এবং রোমনকে ঠেলে ঠুলে মাঝখানে যায়গা করে নিলাম। তারপর এলো সজিব। সে আমার এবং আহমদ আমিনের মাঝখানে বসে একটু চাড়া দিয়ে নিজের আসন পোক্ত করে নিল। সবশেষে সাদ রোমনকে অনুরোধ করে এক কোনায় বসার অনুমতি পেল।
মোটামুটি সবার নিরাপদ আসন নিশ্চিত হওয়ার পর আকাশে শুরু হলো গুড়–ম গুড়–ম। আমাদেরকেই ধমকাচ্ছে। আমরা পরোওয়া করলাম না। আলাপ শুরু হলো চাঁদপুর, চাঁদপুরের মানুষ ও সংস্কৃতি নিয়ে। তারপর সেই আলাপ গোটা বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে উদ্ধার করে ছাড়ল।
অন্যদিকে আকাশের গুড় গুড় গুড়–ম ধমকানি চলছেই। দূরে কোথাও বজ্রপাতও হচ্ছে। বইছে ঠান্ডা বাতাস। নদীতে মাঝে মাঝেই দেখা যাচ্ছে লঞ্চের আনাগোনা। লঞ্চবাতির আলোয় স্পস্ট হয়ে উঠছে রাতেস্বিনী ডাকাতিয়া। মাঝ নদীতে উদভ্রান্তের মতো ভেসে চলছে কচুরিপানা। হঠাৎ হঠাৎ আমাদেরকে চমকে দিয়ে পেছন থেকেও উদয় হচ্ছে লঞ্চবাতি। নিরবচ্ছিন্ন অন্ধকারের ভেতর এই আলোর বিভ্রম মোটেও স্বস্তিদায়ক নয়। আর স্বস্তিদায়ক নয় নিজেদের মধ্যে জায়গা দখল নিয়ে প্রতিযোগিতা।
তবুও মোটামুটি স্বস্তিতে কাটালাম আধঘন্টার মতো সময়। রাত তিনটা বেজে তেইশ মিনিটে ঝড়তে শুরু করল মুষলধারে বৃষ্টি। মিচকে ছাঁট এসে ভিজিয়ে দিতে লাগল আমাদের। শুরু হলো বৃষ্টির সাথে লুকোচুরি খেলা। এই খেলাটা চলল সাড়ে চারটা পর্যন্ত।
পুরো সময়টার প্রথম দিকে বিষয়টাকে পাত্তা দিতে চাইলাম না আমরা। সময়ের সাথে সাথে এর মাত্রা বাড়ছে। সাথে সাথে বাড়ছে কৌণিক বাতাস। বাতাস যতটা কৌণিক হয়


পাতাটি ৪০২৬ বার প্রদর্শিত হয়েছে।