দশদিক মাসিক

হোম ভ্রমনহাওয়ায় দোলা হাওর জলে

হাওয়ায় দোলা হাওর জলে

নাজনীন তৌহিদ

ছেলেবেলা থেকে শুনে এসেছি হাকালুকি হাওয়ের কথা। কিন্তু ইদানিং টাঙ্গুয়ার রূপবৈচিত্রের প্রচারণা আর প্রসারতার মাঝে যে চাপা পড়েছে হাকালুকি। যাকে নিয়ে এত লেখালেখি সে সৌন্দর্যের জলদেবী টাঙ্গুয়ার হাওরকে যেন ছুঁয়ে না গেলেই নয়। বহুদিনের বাসনা হাসন রাজার বসতবাটি দেখার। তাই সুযোগ যখন এলো এক ঢিলে দুই পড়ল। এক বেড়ানো আর দুই মনের তথ্য ভান্ডারে কিছু খোরাক জমানো। হাজবেন্ড সেনা কর্মকর্তা বলে ঘুরে ফিরে দেখার সুযোগ হয়েছে বাংলার আনাচে কানাচে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে, ঘুমিয়ে-ঝিমিয়ে, লুকিয়ে-ঢিমিয়ে থাকা সৌন্দর্যের নয়নাভিরাম স্নিগ্ধতা মেখে নিয়েছি সবটুকু। এবার তার সুনামগঞ্জ পোস্টিং, তাও আবার (বিডিআর) বর্তমান বিজিবি তার মানে হাসন রাজার বাড়ি আর মরমি কবির সবকিছু জানা যাবে নির্ভেজালভাবে। ছাতকের কমলায় রসনা তৃপ্ত করে পুরোসিমেন্ট ফ্যাক্টরি পর্যবেক্ষণ, টেকের ঘাট চুনাপাথর প্রকল্প আর জৈন্তা খাসিয়ার পাশঁেঘষে ছুটে চলা হাওরবিলের তাজা মাছের সুঘ্রাণে পুরোদস্তর মাছে-ভাতে বাঙালি! আর সুরমার জলে জলকেলি! এত্তসব ভালো লাগা ভাবতেই চনমনে হলো মন। পূর্ণ হলো বাসনা- ডুবে গেলাম টাঙ্গুয়ার রূপ রহস্যের জলাধারের মোনীয়তায়। মেঘালয়ের পাদদেশে বিশাল জলরাশির খেলা, যেদিকে চোখ যায় পাহাড়ে ঘেরা চারিধার, স্বচ্ছ আকাশ-স্বচ্ছ জল যেন আকাশের সবটুকু নীল মিশে গেছে স্বচ্ছ জলধারায়। ভরা বর্ষায় চোখেরও ভুল হয়; এ কি তবে কোনো শান্ত সমুদ্র! আর দূরে দূরে দ্বীপের মতো ভেসে থাকা গ্রামগুলো! দূরন্ত বেগে স্পিডবোটের ছুটে চলা সে যে এক ভালো লাগার অভূতপূর্ব শিহরণ! যারা ইতোমধ্যে অবলোকন করেছেন এ হাওর তারা নিশ্চয়ই স্মৃতিখুড়ে রোমাঞ্চিত হচ্ছেন। সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে টাঙ্গুয়ার হাওরের উচ্চতা গড়ে ৪ মিটার। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব প্রান্তে সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর ও ধর্মপাশা উপজেলার ভারত সীমান্তের জৈন্তা খাসিয়ার কোলঘেঁষে এর দখলদারিত্ব। দৈর্ঘ্য ১০ কিমি আর প্রস্থে ৭ কিমি জুড়ে এর বিস্তৃতি। মোট ৫১ টি বিল নিয়ে এ জলাশয় বিশালাকার জলাভূমিতে পরিণত হয়েছে। এর পাশ ঘেঁষে রয়েছে ৪৬টি গ্রাম আর গড়ে উঠেছে শতাধিক কান্দা। ভরা বর্ষায় এর আয়তন হয় ২০ হাজার একর আর শীত মৌসুমে ৭ হাজার একর। বর্ষায় গ্রামগুলো ভেসে থাকে দ্বীপের মতো আর শুল্ক মৌসুমে জলাধারে চাষাবাদ হয়ে ধানের। এ এক রূপ বৈচিত্র্যের খেলা। এখানকার মানুষের জীবিকা মাছ ধরা আর কৃষিকাজ করা।
সুনামগঞ্জ জেলা শহর থেকে হাওরে যেতে হলে রয়েছে ইঞ্জিনচালিত নৌকা ও স্পিডবোট।
স্পিডবোটে চড়ে হাওরে যেতে সময়ের তারতম্য একক মৌসুমে একক রকম। বর্ষা মৌসুমে দুরত্ব ৪০কিমি আর সময় লাগে ১ ঘন্টা। শীত মৌসুমে পানি কমে যায় বলে পথের দূরত্ব ও সময় দুই বাড়ে। তখন সময় লাগে ৩ ঘন্টারও বেশি।
বিশাল জলরাশির মাঝে ঘুরে ঘুরে কীভাবে যে সময় পার হয়ে দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে বোঝাই যায় না তাই এখানে ঘুরতে হলে হাতে পর্যাপ্ত সময় নিতে হয়। মাছের ছোটাছুটি, পাখির কলতান আর ওড়াউড়ি, নীলাভ জলে আকাশ মাটির মিতালি, জলে ভেসে থাকা নানা নামের নানা জাতের জানা অজানা জলজ উদ্ভিদ, কখনো হিজল করচের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া এ যে এক চরম ভালো লাগা।
কখনো দেখা যায় গারো জাল দিয়ে জেলেদের মাছ ধরা কিংবা ছোট ছোট ডিঙি বেয়ে জীবিকার সন্ধানে দূরে ছুটে চলা। তবে এখানে অবাধে মাছ ধরা নিষিদ্ধ। মাছের প্রাচুর্য থাকায় জেলেদের মাছ ধরার প্রবণতা বেশি। কিন্তু হাওর মাছের আর পাখিদের অভয়াশ্রম। সুন্দরবনের পর এটি দ্বিতীয় রামসার এলাকা ঘোষিত হবার পর এর আন্তর্জাতিক গুরুত্বও বেড়েছে। বাংলাদেশসহ পৃথিবীর একমাত্র সর্বশেষ জলাধার এটি যেখানে মাছ, পাখি আর জলজ উদ্ভিদের পরস্পর ভারসাম্যতা বজায় রয়েছে।
মৎস্য সম্পদ রক্ষা এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণার্থে তথা সরকারের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য টঙ্গুয়ার হাওর আজ মাছেদের আর পাখিদের নিরাপদ বিচরণ ভূমিতে পরিণত হয়েছে। আর এ সম্পদ রক্ষা তথা বন উজার না করা আর অবাধে মৎস্য নিধন না করার জন্য গড়ে উঠেছে বিভিন্ন ক্যাম্প। আর নিয়মিত টহল দিচ্ছে আনসার, পুলিশ, বিজিবি সহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। টাঙ্গুয়ার হাওর ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে জেলা প্রশাসক সুচারুরূপে এ সকল কাজের সমন্বয় সাধন করেন। তাদের নজরদারির ফলশ্র“তিতে টাঙ্গুয়ার মিঠা পানির মাছ বিভিন্ন নদীনালা, খালবিলের মাধ্যমে সারাদেশের জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়ে দেশবাসীর প্রাণীজ প্রোটিনের চাহিদা পূরণ করছে।
টাঙ্গুয়ার হাওরে জলের মধ্যে মাথা উঁচু করে জেগে আছে হিজল করচপার বন। পানিতে ভেসে আছে নীল শাপলা, পানি ফল হেলেঞ্চাসহ নানা উদ্ভিদ আরো রয়েছে দুর্বিলত, নলখাগড়া, শীতলপাটি, স্বর্ণলতা, চাইলা, ছন বনতুলসী, শতমূলী ইত্যাদি নানা জাতের দুশো প্রজাতিরও বেশি গাছগাছালি। অভাবী মানুষের জীবিকা আর জ্বালানি চাহিদা মেটাতে, সৌখিন শিকারির থাবা ভরে দিতে আমরা হারিয়েছি প্রকৃতির স্তন্যপায়ী অকৃপন দানকে, তবু হারিয়ে যেতে যেতেও বিলুপ্ত প্রায় দশ প্রজাতির পাখি, ছয় প্রজাতির স্তন্যপ্রায়ী চার প্রজাতির সাপ, তিন প্রজাতির কচ্ছপ, দুই প্রজাতির গিড়িগিটি, এক প্রজাতির উভচর, পঞ্চান্ন প্রজাতির মাছ এবং একান্ন প্রজাতির পাখি তাদের নিরাপদ আশ্রয় স্থান হিসেবে বেছে নিয়েছে এ হওরকে।
বর্তমানে ছোটবড় ১৪১ প্রজাতির মাছ আর ২০৮ প্রজাতির পাখি যার মধ্যে দেশি ১১০ প্রজাতি আর অতিথি ৯৮ প্রজাতি। হাওর পাড়ে হিজল করাচের ডালে ডালে পাখিদের আবাস। তাদের কলকাকলিতে মনে হয় এ এক পাখিদের পৃথিবী। কখনো সাদা বক আকাশে সাদা মেঘের মতো ভাসে কখনো ডাঙ্গায় কানিবক, গুজিবক খাবার খোঁজে। কালিম পাখির ছোটাছুটি আর পানকৌড়ির ডুব সাঁতার, মাছরাঙার ছোটাছুটি পাতিহাঁস আর রাজহাঁসের লুটোপুটি এ এক নিত্যকার খেলা আর শীতের সকাল সন্ধ্যা দেশি পাখির সাথে লাখ লাখ অতিথি পাখির ঝাঁকে যেন নুযে পড়ে আকাশ! এখানকার তাপমাত্রা সহনশীল বলে বাড়ে পাখিদের আনাগোনা। ছোটমাছ আর জলজ উদ্ভদ পাখিদের খাবার। আর পাখিদের বিষ্ঠা মাছের খাবার অন্যদিকে পাখিদের বিষ্ঠার জন্য জলজ উদ্ভিদ বেশি জন্মে। এ এক অভূতপূর্বক ভারসাম্যতা। বিশ্বজুড়ে বিপন্ন প্রায় বিরল প্রজাতির ‘প্যালাসাস ফিশ ঈগল’ উড়ে চলে এ জলাধারে আবাসস্থল খূঁজে পায় করচের বনে, হিজলের ডালে।
মিঠাপানির মাছ হিসেবে টাঙুয়ার হাওরের মাছ সুস্বাদু। মাছের মধ্যে রয়েছে, রুই, কাতলা, চিতল, কালিবাউস, মৃগেল, আইর, বোয়াল, রিঠা, গনিয়া, বাঘাইর, ঘাউরা, কলাবাত, নেফতান ইত্যাদি এমনকি দেশি সরপুঁটি ও বিলুপ্ত মহাশোলও পাওয়া যায় এ হাওরে। এ ছাড়াও নানা প্রজাতির বিরল মাছের আবাস্থল এ হাওর। বৈশাখের শুরুতে পানি ঢুকতে থাকে হাওরে তখন অবাধে মাছ ডিম ছাড়ার জন্য নদীতে মিশে যায়। নতুন পানি পেয়ে মাছগুলো উজান বেয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে নদীতে যায়। পাটলাই, গজারিয়া হয়ে সুরমায় মেশে এসব মাছ। ডিমওয়ালা মাছের অবাধ বিচরণের জন্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মতৎপরতা বেড়ে যায় বহুগুণে। অক্লান্ত পরিশ্রম আর নির্ঘুম রাত কাটে তাদের। এ সময় তারা গ্রামবাসীদের নানাভাবে বোঝাতে থাকে। মাইকিং, সভা-সমাবেশ এমনকি বাড়ি বাড়ি গিয়ে তারা মৎস্য নিধন না করার প্রচারণা চালায়। ডিম ছাড়ার পর চারিদিক সয়লাব হয় পোনা মাছে তখন গরিব জেলেরা শোনে না জ্ঞানের কথা, বোঝে না সভা-সমাবশে তাদের সাথে যোগ হয় লোভাতুর দৃষ্টি। তাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহলরত চোখ ফাঁকি দিয়েও কারেন্ট জাল দিয়ে মাছ ধরে। তাই পুলিশ, বিজিবি বাহিনী ধাওয়া করে দিনরাত, খুঁজে খুঁজে একসাথে জড়ো করে অবৈধ জাল। এভাবে প্রতি সপ্তাহে লাখ লাখ টাকার অবৈধ জাল পুড়িয়ে ফেলা হয়। বর্ষায়-বন্যায় প্লাবিত অসহায় জেলেদের জালের বিনিময়ে চাল কর্মসূচি গ্রহণ করে আর্থিক স্বচ্ছলতা প্রদান করে সচেতনতা রোধে উদ্বুদ্ধ করা হয়। বর্ষাকালে হাওর এলাকা পুরোটাই ডুবে থাকে বলে গরিব গ্রামবাসীর জীবিকার জন্য হাওরে তৈরী হয়েছে ফসল রক্ষা বাঁধ। হাওরে কি পরিমাণ মাছ রয়েছে তা অনুমান করা এক এলাহী ব্যাপার। তবু ধারণা নেবার জন্য জরিপ কার্য চালানো হয় এ সময়। কিছু জায়গা ঘেরাও করে ছোট ডিঙি নিয়ে দশ-বারোজনের দল গড়ে জাল দিয়ে মাছ ধরা হয়। এসব মাছ ধরার দৃশ্য চিত্রধারণ করে রাখা হয় এ এক মনমাতানো দৃশ্য! বিভিন্ন জরিপে জানা যায় টাঙ্গুয়ার হাওরে বর্তমানে যে মাছ মজুদ রয়েছে তার বাজার মূল্য ৩০০ কোটি টাকারও বেশি।
শীতে স্বচ্ছ পানিতে খালি চোখে দেখা যায় পানির নিচের মাটি আর নরম মাটি ভেদ করে অঙ্কুরিত হওয়া জলজ উদ্ভিদ। মাছের ডুবসাঁতার, উচ্ছ্বাস দেখে ছেড়ে যেতে ইচ্ছে হবে না তাদের সঙ্গ। এ এলাকায় নিয়মিত টহল প্রদানের ফলে বেড়েছে শিক্ষার মান, সচেতনতা বোধ আর নিরাপদ জীবন জীবিকা।
শীত মৌসুমে বাড়ে পর্যটকের ভিড়। তবে শুধু শীত নয় সব মৌসুমে এখানে মাছেদের আর পাখিদের সাথে বিচরণ করে উপভোগ করা যায় এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। কোন ভরা বর্ষায় নেমে পড়–ন না বোটিং-এ। নতুন পানিতে মাছেদের মতো, নদীর মতো মনের মাঝেও জলস্রোত বাড়বে, বাড়বে ভালো লাগার উন্মাদনা। শীতে পরিযায়ী পাখিদের দেখতে যেমন আসেন পর্যটক তেমনি গবেষক, পর্যবেক্ষক এ যেন গুণীদের মিলনকেন্দ্র। তাই বাংলাদেশ ছাড়াও আমেরিকা বেলজিয়াম, ব্রিটেনসহ নানান দেশের নানান মানুষের ভিড়ে মুখরিত হয় হাওরের নির্জনতা। একে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে সবার দাবিতে হয়েছে বিভিন্ন মতবিনিময় সভা। যোগাযোগ সুবিধা বাড়লে এর পর্যটন মূল্য আরো বৃদ্ধি পাবে। কেননা এ হাওরের প্রান্তে রয়েছে চুনাপাথর, খনি প্রকল্প। টেকেরঘাট চুনাপাথর খনি। এখান থেকে চুনা পাথর পাঠানো হয় ছাতকে, রয়েছে ন্যারো কেজ রেলপথ। এখানে রয়েছে ডাকবাংলো তাই থাকা-খাওয়ার চিন্তা ঝেড়ে বিশ্রাম শেষে ঘুরে বোড়ানো যায় আরো কিছুক্ষণ। হাত দিয়ে ছোঁয়া যায় ভারত বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলের উত্তরের শেষ সীমান্ত মেঘালয় রাজ্যের পর্বতমালা। পাশেই বড়ছড়া নদী, মনাইর টিলা আর জুদুঘেরা দৃষ্টি নন্দন জাদুকাটা নদী। বর্ষা আর শরতে এ নদী ফুঠে উঠে সাগরকন্যার রূপে। জাদুকাটার পূর্বপাশে প্রাচীন লাউর রাজ্য, ঝর্ণা আর শাহ আরেফিনের দরগা ঘুরে আসা যায়। আর সময়টা যদি হয় চৈত্রমাস তবে ধর্মপিপাসুরা ওরস দেখে আসতে পারেন।
আর সময়টা যদি হয় রাসপূর্ণিমার তবে যারা দুবলার চরে রাসপূর্ণিমা দেখার ইচ্ছে জাগান মনে তারা কিছুটা হলেও জোছনা স্নাত হয়ে চাঁদের আলিঙ্গনে টাঙ্গুয়ার ভরা যৌবনের স্রোতে ভেসে ভেসে ফিরে আসুন সুরমার তীরে। টাঙ্গুয়ার আলিঙ্গন থেকে ছাড়িয়ে নিজেকে তৈরী করুন আবার অন্য কোনো অভিসারে যাবার। কেননা এখনি সময় দূর্বার গতিতে ছুটে চলার।


পাতাটি ৩৬৬৯ বার প্রদর্শিত হয়েছে।