দশদিক মাসিক

হোম ক্যারিয়ারসাংবাদিকতা ও সংবাদ উপস্থাপনা

সাংবাদিকতা ও সংবাদ উপস্থাপনা

মুহাম্মদ ইমতিয়াজ
সংবাদ। ইংরেজিতে ঘঊডঝ। এই সংবাদ বা খবরকে কেন্দ্র করে মানুষের কৌতুহলেরও শেষ নেই যেন। সব মানুষই নতুন কোন ঘটনার সন্ধানী। কোন কিছু সৃষ্টি বা ধ্বংস হোক তা জানতে মানুষ তাদের মেধা বা শারীরিক সর্বোচ্চ শ্রম দিয়ে থাকে। শুধুই জানা নয়, জানানোর তাগিদ কবে থেকে শুরু হয়েছে তা জানা অনেক ক্ষেত্রে দুস্কর। সম্ভবত: মানুষ প্রথম বিবিসি বা সিএনএন এর মাধ্যমে জানতে পেরেছে যে পৃথিবীটা কখন কী কী ঘটনার জন্ম দিচ্ছে। এই কৌতূহলী মানুষের ঘাটতি নেই আমাদের এই স্বপ্নময় বাংলাদেশেও। একসময় রেডিও নির্ভর ছিল গ্রাম বাংলার মানুষ। তবে বিশ্বায়নের হাওয়ায় নিজেদের আধুনিক করে নিতে বেশি সময় নিতে হয়নি। একটা সময় ছিল যখন ডিশ এ্যান্টেনা আসেনি শুধুই বিটিভি ছিল। যেন যখন যা দেখানো হবে তাই দেখতে হবে। তারপর আসল প্রযুক্তির জোয়ার। বাড়তে লাগল চ্যানেল। মানুষ চোখ বুলাতে লাগল পছন্দের চ্যানেলে। বিশেষ করে খবরের জন্য এখনকার মানুষের যে চাহিদা তা পূরণে পুরোপুরি সফল বলেই মনে হচ্ছে সাংবাদিকদের। সেকেন্ডের কাঁটা ঘুরতে লাগল সাথে সাথেই ভেসে আসল শিরোনামের কণ্ঠ তারপর হাস্যোজ্জ্বল একজন পর্দায় ভেসে উঠল এবং দর্শকদের উদ্দেশ্যে বলল যে, এতক্ষণ শিরোনাম শুনছিলেন এবার বিস্তারিত। তারপর এক এক করে গুরুত্বপূর্ণ খবরের আনাগোনা।
দেশে-বিদেশে, মাঠে-ময়দানের বিভিন্ন প্রান্ত হতে প্রতিবেদকগণ প্রতিবেদন তৈরী করছেন। আর সারাদিনের উৎসুক মনটাকে খবরের আয়নায় সাজিয়ে দিতে চ্যানেলগুলোর এই যে আয়োজন তাকে মাধূর্যপূর্ণ করতে সংবাদ উপস্থাপকদের যে ভূমিকা তা নিঃসন্দেহে এক মাইলফলক। আর পেছন থেকে যারা স্বশরীরে সংবাদ সংগ্রহের কাজে সদা ব্যস্ত সেই রিপোর্টাররাও কান্তিহীন এক অনবদ্য নেশার পেছনে ছুটছে। তাদের ত্যাগ এবং কাজের মূল্যায়ন করাটা সর্বমহলের বিশ্লেষকদের একান্ত করণীয় বলে আমি মনে করি।
সুষ্ঠু পরিকল্পনা বা ভালভাবে শুরু করা মানে কাজের অর্ধেক সমাপ্তি কথাটি আপনারা নিশ্চয়ই অবগত। টেলিভিশন সাংবাদিকতা এবং সংবাদ উপস্থাপনায় আগ্রহী ব্যক্তিদের শুরুটাও ভালভাবে করতে হবে।
কিন্তু সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও ভালভাবে শুরুর জন্য দীর্ঘ অক্ষেপা নয়। প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য কিছুটা সময় নেয়া যেতে পারে। প্রস্তুতি গ্রহণকে কাজের অংশ ধরা হলে এটাকে শুরু মনে করা যায়। আমি মনে করি এ ক্ষেত্রে ভাল শুরুর অপেক্ষা না করে আজই শুরু, এ মুহুর্ত থেকেই শুরু করতে হবে। এমন অনেক শিক্ষার্থী আছেন যারা বলে থাকেন যে, আগামীকাল অমুক সময় থেকে নিয়মিত পড়াশুনা করব। কিন্তু সেটা আগামীকাল। পড়াশুনা নিয়মিত করা ও জাতির বিবেক হবার সিদ্ধান্ত নিলে আগামীকাল উক্ত সময়ের জন্য অপেক্ষা না করে আজ সামনে যে সময় আছে তখন থেকে শুরু করা উচিত। টেলিভিশন সাংবাদিকতায় এখন তরুণরা দলে দলে অংশগ্রহণ করছে এবং সফলতাও পাচ্ছে।
পত্রিকা অথবা টেলিভিশন যেখানেই হোক। কারো যদি সাংবাদিকতা করার অভিপ্রায় থাকে তবে সর্বোত্তম সময় হচ্ছে এইচ এস সির পর থেকে শুরু করা। তবে হ্যাঁ নেশাটা সেই ছোটকাল থেকেই পেয়ে বসে তাও জানি। প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিকরা পেশাগত কাজে প্রচুর পরিশ্রম, একাগ্রতা এবং ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে থাকে। টেলিভিশন সাংবাদিকতায় যারা আছেন তারা আরো বেশি একাগ্রতা এবং ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন। হঠাৎ করে যারা টেলিভিশন সাংবাদিকতা শুরু করবেন তাদের পরিশ্রম, একাগ্রতা, নিষ্ঠা, ঝুঁকি যেমন বেশী তেমনি সাফল্য পেতে একটু সময় লাগতে পারে। লক্ষ্য করুন, প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিকরা টেলিভিশন সাংবাদিকতায় যেমন সফল তেমনি অনেক সাংবাদিকরা সংবাদ উপস্থাপনায় সফল।
সেজন্য টেলিভিশন সাংবাদিকতায় জড়িত হওয়ার পূর্বে প্রিন্ট মিডিয়ায় সাংবাদিকতা করা ভাল। সাংবাদিকতা শুরুর জন্য প্রিন্ট মিডিয়ায় রয়েছে প্রচুর সুযোগ। প্রিন্ট মিডিয়াকে সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণের সূতিকাগার বলা যেতে পারে। প্রিন্ট মিডিয়া থেকে যারা টেলিভিশন সাংবাদিকতা শুরু করবেন তারা টেলিভিশন সাংবাদিকতার কিছু টেকনিক্যাল বিষয় জেনে নিয়েই যে কোন টেলিভিশন চ্যানেলে কাজ শুরু করতে পারেন। দেশে এখন ২৫টির অধিক স্যাটেলাইট টেলিভিশন সম্প্রচার রয়েছে। আর চ্যানেলের সংখ্যা ও পত্রিকার সংখ্যা আস্তে আস্তে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেজন্য টেলিভিশন প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিকতায় প্রচুর সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
একজন ভালমানের সংবাদ কর্মী সেটা রিপোর্টে হোক বা উপস্থাপনায় তাকে অবশ্যই ব্যক্তিত্বসম্পন্ন হতে হবে। এটাই মানুষের ভাল করার মূল চাবিকাঠি। যে কোন টেলিভিশন চ্যানেলে রিপোর্টার, শিক্ষানবিশ রিপোর্টার হিসেবে কাজ করার জন্য আজই আবেদন করুন এবং সাক্ষাৎকার দিয়ে টেলিভিশন সাংবাদিকতায় যুক্ত হয়ে যান। এ ক্ষেত্রে সাক্ষাৎকার দেয়ার সময় টেলিভিশন চ্যানেল কর্তৃপক্ষ যেন মনে করে টেলিভিশন সাংবাদিকতা সম্পর্কে আপনার ধারণা আছে এবং আপনি কাজটি পারবেন। সেজন্য আপনার কিছু প্রস্তুতি থাকা দরকার। রাজধানীতে বেশকিছু প্রতিষ্ঠান এক মাস বা তিন মাসব্যাপী টেলিভিশন সাংবাদিকতা, সংবাদপাঠ বিষয়ক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে থাকে। আপনি এসব প্রতিষ্ঠানে একটি কোর্স করতে পারেন।
এ কর্মশালায় অংশ নিয়ে আপনি কিছু ধারণা লাভ করতে পারবেন। সরকারী পর্যায়ে National Institute of Mass Communication (NIMC) ইলেক্ট্রনিক গণমাধ্যম বিষয়ক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে থাকে। সম্প্রতি উত্তরায় দশদিক মিডিয়া ইনিষ্টউটে সাংবাদিকতা, সংবাদ উপস্থাপনা সহ গণমাধ্যম বিষয়ক কোর্স চালু হয়েছে। এছাড়াও বেসরকারী পর্যায়ে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান নিয়মিত টেলিভিশন সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণ কোর্স পরিচালনা করে আসছে। সংবাদ পাঠ বিষয়টি এখন পুরোপুরি সংবাদ উপস্থাপনা। বর্তমানে সংবাদ উপস্থাপনা অনেক আধুনিক এবং উন্নত। সংবাদ উপস্থাপনার জন্য আপনাকে শুদ্ধ উচ্চারণ জানতে হবে এবং বাচনভঙ্গি সুন্দর করতে হবে। উল্লেখ্য যে, সংবাদ কর্মী বা সাংবাদিকরা যেহেতু আয়নাস্বরুপ অতএব তাদের চলন বলন, কথার ধরণে সব সময় দ্রুবের উপস্থিতি থাকা অত্যন্ত জরুরী। যেমন: উপস্থিত বুদ্ধি থাকা, কালার জ্ঞান থাকা, স্বাস্থ্য সচেতন হওয়া, সময় ও দিবস জ্ঞান থাকা, সাধারণ জ্ঞানে পারদর্শী হওয়া, কোন অবস্থাতেই আশাহত না হওয়া তথা ধৈর্যশীল হওয়া, সদা হাসোজ্জ্বল থাকা এবং স্পষ্টভাষী হওয়া। শুদ্ধ উচ্চারণের কোর্সে অংশগ্রহণ করলে আপনি শুদ্ধ উচ্চারণ রপ্ত করতে পারবেন। শুদ্ধ উচ্চারণ রপ্ত করার পাশাপাশি টিভি চ্যানেলের সংবাদ উপস্থাপনা মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করুন। এরপর কোন টেলিভিশন চ্যানেলে রিপোর্টার বা সংবাদ উপস্থাপনার জন্য আবেদন করুন। যথাসময়ে সাক্ষাতকার দিন এবং সংবাদ কর্মী হোন, সেটা রিপোর্টিংয়ে অথবা উপস্থাপনায়। বর্তমান সময়ের সবচেয়ে সাহসী পেশা হলো সংবাদ কর্মী হয়ে সমাজের আয়না হওয়া। কিছুদিন পূর্বে সাভারে যে ট্রাজেডি হয়ে গেল সেটা গোটা জাতির জন্য একটা বেদনার বিষয়। আর সেই চরম মুহুর্তগুলো সারা দেশ তথা সারা পৃথিবীর মানুষকে জানান দিয়েছিল সেই অকুতোভয় সংবাদকর্মীরা। তারা সেই স্বজন হারানোর বেদনায় কম্পিত আকাশের শব্দ পৌঁছে দিয়েছিল মানবতার কানে। অতএব এটা স্পষ্টভাবেই বলা যায় সাংবাদিকরা হলো এ যুগের নায়ক।
লেখক: মুহাম্মদ ইমতিয়াজ (সংবাদ উপস্থাপক, চ্যানেল ২৪ ও গণমাধ্যম প্রশিক্ষক)।


পাতাটি ৩২৬৩ বার প্রদর্শিত হয়েছে।