দশদিক মাসিক

হোম কেউ জানে কেউ জানেনা (২৯তম সংখ্যা)

কেউ জানে কেউ জানেনা (২৯তম সংখ্যা)

শরাফুল ইসলাম

(গত সংখ্যার পর)
টিনার অপমৃত্যু একজন নিষ্ঠাবার শিল্পীকে ছিনিয়ে নেয়। দৌলদিয়া ফেরীতে গাড়ী উঠানোর সময় ফেরীর দড়ি ছিড়ে গিয়ে পদ্মায় ডুবে যায়। সুস্থধারার চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রধান পুরুষ আলমগীর কবির ছিলেন একই গাড়ীতে। আরও ছিলেন পরিচালক মোরশেদুল ইসলাম। মোরশেদ বেঁচে আছেন। আর কেউ নেই। শোকের ছায়ায় বারী হয়ে গিয়েছিলো সেদিনের আকাশ-বাতাস। চলচ্চিত্রের সুনিপুণ কারিগর আলমগীর কবীরের মৃত্যুতে থেমে যায় সুস্থধারার আন্দোলন।

টিনাও কবিতা লিখতেন। আমার কাছে পাঠিয়েছেন একাধিকবার। কিছু ছেপেছি। কিছু ছাপা হয়নি। কবিতার বিষয় সুনির্বাচিত হলেও ছন্দের দৈন্যতায় সাবলিল সৃজনশীলতা থেকে বেশ দূরে ছিলো তার রচনা। তাই ছন্দের প্রাথমিক কিছু পাঠ দান শেষে বাকিটা সহজ সরল শিক্ষা গ্রন্থ ছন্দের জপ রেখা সংগ্রহ করতে পরামর্শ দেই। কারণ টিনার আগ্রহ আমার সমর্থন পেতে সাহায্য করে। তাছাড়া সুস্থধারার চলচ্চিত্রের একজন শিল্পী হিসেবে এই সহযোগিতাটুকু ওর প্রাপ্য ছিলো।

কিন্তু টিনাও চলে গেলেন অকালেই। ওর ভালো নাম ছিলো ফিরোজা খন্দকার। চলচ্চিত্র নাম টিনা। প্রিন্সেস টিনা খান। ছবিতে মূখ্য চরিত্রে নির্বাচন করে আখতারুজ্জামান তাকে এ নামেই পরিচিতি এনে দিয়েছেন চারিদিকে।

তাই এই সব অপরিচিতি, স্বল্প পরিচিত কিংবা অকালে হারিয়ে যাওয়া কবিতা প্রেমিদের কবি স্বীকৃতি দিয়ে বাংলা একাডেমীর উদ্যোগে প্রকাশনায় হাত দেওয়া প্রয়োজন।

টিনা নামের আরও একজন কবিতা লিখতেন। তিনি এক সময়কার তুখোড় মডেল কন্যা তাজি রহমানের বোন। তাজি রহমানের সঙ্গে একাধিক সাক্ষাতের সুবাদে পরিচয় ঘটে টিনার সঙ্গ্ েথাকতেন ডি ও এইচ এস এ, অনেকের মতো তিনিও কবিতা লিখে প্রকাশ করতে চাইতেন মনের ভাবনাগুলো। আমার কাছে পাঠিয়েছেনও। তার লেখায় কবিতার ভাষা বিদ্যমান। শব্দ চয়নও সাবলিল। উপমা এবং ছন্দের স্পর্শতায় পাঠোপোযোগী কবিতাই বলা যায়।

চট্টগ্রামের আনোয়ারা থানার ওসি ছিলেন একজন কবি। তিনি লিখতেন দুখু বাঙ্গাল নামে। অনেক কবিতা লিখেছেন। আমিও ছেপেছি তার অনেক কবিতা। নিয়মিত লিখতেন। সম্ভবত বই ও বেরিয়েছিলো। বলা যায় অনেক কবিদের অগ্রভাগেই ছিলেন তিনি।

আরও একজন পুলিশ ছিলেন শাজাহান ইকবাল। ছিপছিপে কালো লম্বা। সিপাহী। দারুণ লিখতেন। তার কবিতায় যৌবন আছে। ব্যাকরণেও ঘাটতি নেই। কিন্তু পুলিশ বিধায় অনেকেই বক্র দৃষ্টিতে দেখতেন তাকে। ভাবতেন গোয়েন্দাবৃত্তির কৌশল হিসেবে তার কবিতা নিয়ে পত্রিকা অফিসে আসা যাওয়া। তাই শাহজাহান ইকবালকে কৌশলে এড়িয়ে চলতেন অনেক সাহিত্যে সম্পাদক। আমার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। সহকর্মীদের সন্দেহের চোখ কর্তৃপক্ষের কানভারী করার অপচেষ্টা একজন প্রতিশ্রুতিশীল কবিকে আড়াল করে রাখে।

কবি আনওয়ার আহমেদ আজ আমাদের মাঝে নেই। প্রায় প্রতিদিন যার আসা যাওয়া ছিল আমার অফিসে। দু’টি সাহিত্য পত্রিকার প্রকাশক এবং সম্পাদক ছিলেন তিনি। কিছু ধনি এবং রূপম নামের কাগজ দু’টি দীর্ঘদিন বের করেছেন। আনওয়ার ভাই কবি ছিলেন। বইও বেরিয়েছে একাধিক। অসংখ্য কবিতা ছেপেছি আমি। কিন্তু এখনই তার কথা ভুলতে বসেছি আমরা। আনওয়ার আহমেদকে নিয়ে একটি স্মারক গ্রন্থ বের করার মতো উপাদান রয়েছে।

এক সময়কার শক্তিশালী কবি ও গীতিকার আজিজুর রহমানের নামেও আমরা অনেকেই জানিনা। কালজয়ী গীতিকার কবি সিরাজুল ইসলামের কথা মনে নেই কারো। এখনো তার হলুদিয়া পাখি/সোনারই বরণ/পাখিটি ছাড়িল কে, কিংবা আল্লাহু আল্লাহু/ তুমি জাল্লে জালালুহু/ শেষ করাতো যায় না গেয়ে তোমার গুন গান, অথবা নবী মোর পরশ মনি নবী মোর সোনার খনিসহ যুগোত্তীর্ণ অসংখ্য গান ও কবিতার লেখক তিনি। প্রায় ডজন খানেক বইও বেরিয়েছে। কিন্তু তার সৃষ্টিকে উপভোগ করলেও ভুলে গেছি এই অমর কাব্যের কবিকে।

পাতাটি ৩৪৭৪ বার প্রদর্শিত হয়েছে।