দশদিক মাসিক

হোম দ্য থার্ড ওয়েব (৪০তম পর্ব)

দ্য থার্ড ওয়েব (৪০তম পর্ব)

মূল রচনা: এ্যালভিন টফলার
ভাষান্তর: স্কোয়াড্রন লিডার আহ্সানউল্লাহ (অব:)

তৃতীয় ভাগ: তৃতীয় ঢেউ

মহাশূন্য ভ্রমনকারী (The Space Traveler)
সময়ের ধারনায় পরিবর্তন স্থানের ধারনাকেও পাল্টে দেয়, কারণ দু’টোই পরস্পর জড়িত। আমরাও স্থানের চিত্র খুব দ্রুত বদলে দিচ্ছি। যে জায়গায় আমরা বাস করি, কাজ করি, খেলি, তাকে আমরা বদলে দিচ্ছি। যেভাবে কাজ করি, যতদূর ও যতবার ভ্রমণ করি, যেখানে বাস করি- এই সবকিছু স্থান সম্পর্কে আমাদের অভিজ্ঞতাকে প্রভাবিত করে। বস্তুত তৃতীয় ঢেউয়ের আগমনের সঙ্গে স্থানের সাথে মানবতার সম্পর্ক স্থাপনে আমরা এক নয়া পর্যায়ে প্রবেশ করছি।
প্রথম ঢেউ সারা বিশ্বে কৃষিকে ছড়িয়েছিল, সঙ্গে এনেছিল, যে কারণে অধিকাংশ মানুষ সারাজীবন বাস করত তাদের জন্মস্থানের কয়েক মাইলের মধ্যে। কৃষি সূচনা করল এক নিবিড় স্থায়ী-বাসস্থানের অস্তিত্ব এবং লালন করল স্থানীয় অনুভূতি বা গ্রাম মানসিকতা।
দ্বিতীয় ঢেউ সভ্যতা তার বিপরীতে বিপুল জনসংখ্যাকে বড় বড় শহরে একত্রিত করল এবং ভ্রাম্যমান লোকজনের সৃষ্টি করল কারন দূর থেকে সম্পদ আনয়ন এবং দূরে দূরে মালামাল বিতরনের জন্য এর প্রয়োজন ছিল। তৈরী করল গ্রামকেন্দ্রিকের পরিবর্তে নগর বা জাতীকেন্দ্রিক সংস্কৃতি। তৃতীয় ঢেউ আমাদের এই অভিজ্ঞতাকে পরিবর্তন করে। জনসংখ্যাকে কেন্দ্রিভূত করার পরিবর্তে বিকেন্দ্রিভূত করে। এখনও বিশ্বের শিল্পায়িত দেশসমূহের কোথাও কোথাও লক্ষ লক্ষ মানুষ শহর নগরে এসে ভীড় জমায়। ঠিক তখন উন্নত প্রযুক্তির দেশে তার উল্টো ঘটছে, মানুষ শহর ছেড়ে ছড়িয়ে পড়ছে শহরতলী বা দূর গাঁয়ে। টোকিও, লন্ডন, জুরিখ, গ্লাসগো এবং ডজন ডজন এরূপ অন্যান্য প্রধান নগরে জনসংখ্যা কমছে, আবার মধ্যম বা ছোট সাইজের শহরগুলোতে জনসংখ্যা বাড়ছে।
জনসংখ্যার এই পূণর্বিন্যাস এক সময়ে ব্যক্তিগত ও সামাজিক স্পেস, চলাচলের সুবিধাজনক দূরত্ব, বসবাসের ঘনত্ব এবং আরো অনেক কিছু সম্পর্কে আমাদের অনুমান ও প্রত্যাশাকে পাল্টে দেবে। এতসব পরিবর্তন ছাড়াও তৃতীয় ঢেউ নতুন দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম দেবে যা হতে পারে তীব্রভাবে স্থানীয়, আবার বৈশ্বিকও এমনকি গ্যালাকটিক / মহাবৈশ্বিকও। আমরা পাব এক নয়া যুথবদ্ধ রাজনৈতিক ও স্থানীয় বন্ধনে আবদ্ধ গোষ্ঠি, সম্প্রদায় ও পড়শী। একই সময় ঐ বিপুল জনগন স্থানীয় হলেও বিশ্ব ইস্যু নিয়েও ভাববে-- দশ হাজার মাইল দূর দেশে কোন দুর্ভিক্ষ দুর্বিপাক দেখা দিলে তারা ব্যথিত হবে।
যেহেতু উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার বিস্তার ঘটছে এবং আমরা কাজকে ইলেকট্রনিক কটেজে ফিরিয়ে নিতে শুরু করেছি, আমরা এই দ্বৈত মিলনকে উৎসাহ দেব, বিপুল সংখ্যক লোকজন নিজের ঘরে বা ঘরের কাছে থাকবে, কম মাইগ্রেট করবে, আনন্দের জন্য প্রচুর ভ্রমণ করবে, ব্যবসার জন্য কমই বাইরে যাবে, যদিও তাদের মন এবং অনুভূতি প্রকাশের সীমা থাকবে সমস্ত পৃথিবী জুড়ে এবং এমনকি পৃথিবীর বাইরে মহাশূন্যেও। তৃতীয় ঢেউ এভাবেই দূর ও নিকটকে এক করে নতুন মানসিকতার জন্ম দেবে, যার নাম তৃতীয় ঢেউ মানসিকতা।
আমরা অবশ্য স্পেসের আরও গতিশীল ও আপেক্ষিক ছবিও দ্রুতভাবে নিজের বলে গ্রহন ও ব্যবহার করছি। স্যাটেলাইটের মাধ্যমে এখন জীবন্ত। চলমান মানচিত্র পাওয়া যায়। শহরে বা গ্রামে সজিব মানুষকে স্পষ্ট চিহ্নিত করা যায়। তবে ভবিষ্যতে মানচিত্র স্থীর চিত্রের পরিবর্তে চলচ্চিত্রে রূপান্তরিত হবে। এ থেকে আমরা কোন নির্দিষ্ট ভূ-খন্ডের সংবেদনশীল চলমান পরিবর্তনের চিত্র এবং তার সাথে আমাদের সম্পর্ক দেখতে পাব।
এরই মধ্যে কোন কোন মানচিত্রকার দ্বিতীয় ঢেউ মানচিত্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে। শিল্প বিপ্লবের পর থেকে মার্কেটরের প্রজেকসনের ভিত্তিতে তৈরী মানচিত্র বেশী প্রচলিত। এগুলো সমুদ্রে চলাচলের উপযোগী হলে স্থল-ভূমির জন্য সঠিক প্রতিনিধিত্বমূলক পরিমাপ নয়। যেমন স্ক্যান্ডিনিভিয়াকে মনে হয় ভারতের চেয়ে বড় কিন্তু বাস্তবে ভারত তার তিনগুনেরও বেশী।
জার্মানীর আর্মো পিটারস উদ্ভাবিত নতুন প্রজেকসন ম্যাপের পরিমাপ পদ্ধতি স্থল ভূমির জন্য উপযোগী। তবে এ নিয়ে নতুন পুরনোয় রীতিমত তুলকালাম কান্ড চলছে। পিটারের অভিযোগ মার্কেটর মানচিত্র শিল্পোন্নত দেশসমূহের স্বার্থ রক্ষা করছে শুধু, অনুন্নত দেশকে সেখানে চিহ্নিত করা কঠিন তদুপরি ফটোগ্রাফি নীতি বিবর্জিত। এসব বাদানুবাদ প্রমান করে যে, আসলেই সঠিক মানচিত্র আজও হয়নি। যে যার মতো স্পেসকে নিজের সুবিধাজনকভাবে দেখে। তবে বস্তুত তৃতীয় ঢেউ এক নতুন পদ্ধতি ও দৃষ্টিকোন নিয়ে এসেছে পৃথিবীর জন্য।

সমগ্রতাবাদ ও অর্ধবাদ (Wholism and Halfism)
দ্বিতীয় ঢেউ সংস্কৃতি বস্তুকে পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন করে পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করে। অন্যদিকে তৃতীয় ঢেউ সংস্কৃতি বস্তুর পশ্চাদপট, পারষ্পরিক সম্পর্ক এবং সামগ্রিকভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার প্রতি গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে। এই গভীর পরিবর্তন প্রকৃতি, ক্রমবিবর্তন, অগ্রগতি, স্থান ও কালকে পরষ্পর সম্পর্কিত ও একত্র করে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি তৈরীতে আমাদেরকে প্রভাবিত করছে।
১৯৫০ এর দশকে জীববিজ্ঞানীদের জেনেটিক কোড আবিস্কার থেকে শুরু করে বেল ল্যাবের কম্যুনিকেশন থিওরিস্ট ও ইনজিনিয়ারগণ, আইবিএম এর কম্পিউটার বিশেষজ্ঞগণ, বৃটেনের পোস্ট অফিস ল্যাবরেটরীর পদার্থ বিজ্ঞানীগণ এবং ফ্রান্সের জাতীয় বিজ্ঞান গবেষণা সংস্থার (Le Ceutre National de Recherehe Scientifique) বিজ্ঞানী / বিশেষজ্ঞগণ বিভিন্ন আবিস্কার ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে এক প্রবল সাড়া জাগানো কর্মযজ্ঞ যুগের প্রবর্তন করেন।
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় পরিচালিত “অপারেসন্স রিসার্চ” কে টেনে আরো এগিয়ে এনে প্রযুক্তি বর্গ (Phylum)- এর জন্ম দেয় যা কলে-কারখানা ও অফিসে তৃতীয় ঢেউ উৎপাদনের ভিত্তি নির্মান করে। অটোমেশন বিপ্লবের প্রধান উৎপন্ন ফসল ছিল “সিস্টেম্স এ্যাপ্রৌচ”। একদিকে যখন কার্তেজিয়ান (Cartesian) চিন্তাবিদরা মূল বিষয়কে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে বিশ্লেষণের কথা বলেন, অন্যদিকে তখন সিস্টেম চিন্তাবিদরা গুরুত্ব আরোপ করেন সিস্টেম থিওরীর প্রারম্ভিক প্রবক্তা সাইমন র‌্যামো’র (Simon Ramo) ভাষায়, “সমস্যাটাকে সামগ্রিক রূপে দেখতে হবে, খন্ড খন্ড আকারে নয়”। সাবসিস্টেমসমূহের মধ্যে এবং এগুলো দ্বারা গঠিত বৃহত্তর ‘সমগ্রে’র সাথে ফিডব্যাক সম্পর্কের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে, সিস্টেম চিন্তাধারা ১৯৫০ এর দশকে ল্যাবরেটরী থেকে বেরিয়ে আসে। তারপর থেকেই এ চিন্তাধারা এক পরিব্যাপক সামাজিক প্রভাব বিস্তার করে। এর ভাষা ও ধারনা সমাজবিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানী, দার্শনিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, যুক্তিবাদী ও ভাষাবিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ও প্রশাসক সবাই নিজ নিজ ক্ষেত্রে কাজে লাগিয়ে আসছেন।
তবে সিস্টেম থিউরীর প্রবক্তারা ছাড়াও আরো অনেকে বিগত দশকগুলো ধরে সমস্যাগুলোকে আরো সমন্বিত রূপে দেখবার চেষ্ট করেছেন। সংকীর্ণ অতিবিশেষজ্ঞকরণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শক্তি পায় ১৯৭০ খৃ. এর পরিবেশ আন্দোলন প্রচারনা থেকে। কারন, পরিবেশবিদগণ (ecologist) ক্রমবর্ধমানহারে আবিস্কার করতে থাকেন প্রকৃতির ‘জাল’ (Web), প্রজাতিগুলোর মধ্যে আন্তসম্পর্ক এবং ঈকোসিস্টেম বা গাছপালা-পশুপাখীর সাথে পরিপার্শ্বের পারষ্পরিক সামগ্রিক ক্রিয়া। অপরিবেশবাদীরা চায় বস্তুকে খন্ডে খন্ডে ভাগ করে প্রত্যেকটির ভিন্ন ভিন্ন সমাধান। আবার পরিবেশবাদীরা চায় আংশিক না করে সামগ্রিকভাবে ভারসাম্য বজায় রেখে সমস্যার সমাধান। ঈকোলজিক্যাল অ্যাপ্রোচ এবং সিস্টেম অ্যাপ্রোচ যুগপত একসঙ্গে শুরু হয় এবং সিনথেসিস ও জ্ঞানের এবং সমন্বয়ের দিকে একই ধাক্কা শেয়ার করে।
এরই মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে অনেক আন্ত বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা / গবেষণার (Interdisciplinary thinking) জন্য অনেক আহ্বান শোনা যায়। তখনো চিন্তার সঙ্কর-প্রজনের এবং তথ্যের সমন্বয় করনে (integration) বিভাগীয় বাধা ছিল। এখন বেশীর ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্ত বা বহু বিষয়ে (multi-disciplinary) কাজ করার সুযোগ এত অবারিত যে, এটি রীতিমত প্রথাগত গুণাবলী অর্জন করেছে।
বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনের এই পরিবর্তনগুলো সমভাবে প্রতিফলিত হয়েছে অন্যান্য সংস্কৃতিতেও। উদাহরণ স্বরূপ, প্রাচ্যের ধর্মগুলোর প্রতি ইউরোপীয় মধ্যবিত্তদের ক্ষুদ্র একটা অংশের আসক্তি ছিল কিন্তু শিল্প সমাজ ভেঙ্গে যাওয়ার পর থেকেই হাজার হাজার পশ্চিমা তরুন এগুলোর প্রতি ঐকান্তিকভাবে উৎসাহী হয়ে ওঠে। তারা ভারতীয় স্বামীদের গুরুত্ব দিতে শুরু করে, ষোল বছর বয়স্ক গুরুর বচন শুনতে আশ্রমে ভীড় করে, ভারতীয় রাগসঙ্গীত শোনে, হিন্দুয়ানী নিরামিষের রেস্তোঁরা খোলে এবং পঞ্চম এভিুন্যতে গিয়ে নাচে। হঠাৎ করে যে জগতে গিয়ে তারা কীর্তন গাইল, পসই ‘এককত্ব’ (one ness) ভেঙ্গে কার্তেজিয় চিপ্স বা চাকতি হয়নি।
মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে, ‘সমগ্র ব্যক্তি’কে সারিয়ে তোলার উপায় খোঁজেন। এজন্য তারা সমগ্রতাবাদ থেরাপি কাজে লাগান। ফলে সমগ্রতাবাদ ছড়িয়ে পড়ে আমেরিকায়, সব প্রতিষ্ঠানেই সমগ্রতাবাদী মনোচিকিৎসক নিয়োগের হিড়িক পড়ে যায়। এই কর্মকান্ডের লক্ষ্য ছিল ব্যক্তির ইন্দ্রিয় সচেতনতা ও প্রত্যক্ষণকে সমন্বিত করে এবং বাইরের জগতের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরী করে তার সুপ্ত মানবিক সম্ভাবনা শক্তিকে জাগিয়ে তোলা এবং বিকশিত করা।
মেডিসিনে বা চিকিৎসা ক্ষেত্রে ব্যক্তির সুস্থতা শারীরিক, আত্মিক ও মানসিক অবস্থার সমন্বয়ের ওপর নির্ভর করে-- এই ভাব ধারার ভিত্তিতে “সামগ্রিক স্বাস্থ্য” (holistic health) আন্দোলন গড়ে ওঠে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের চিন্তাশীল উদ্ভাবন ও হাতুড়ে চিকিৎসার সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলে ১৯৭০ খৃ. এর দশকে এই আন্দোলন পাশ্চাত্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। সামগ্রিক স্বাস্থ্য মতবাদ থেকেই বিকল্প চিকিৎসা বা নিরাময়, চোখ দেখে রোগ নির্ণয় (iridology), আকুপ্রেসার, বৌদ্ধিক ধ্যান বা যোগ সাধনা এবং ইলেকট্রোমেডিসিন প্রভৃতি চিকিৎসা বা নিরাময় পদ্ধতি বিকল্প হিসেবে ব্যবহারের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়। এতে ‘সামগ্রিক’ কথাটি জনপ্রিয় ভাষায় পরিগনিত হয় এবং বিভিন্ন কাজে বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যবহৃত হতে থাকে। বর্তমানে এশব্দটি নির্বিচারে যেমন ‘সামগ্রিক আবাসন’, ‘সামগ্রিক স্টাডি’, সামগ্রিক পড়া’, ‘সামগ্রিক ব্যায়াম’ অর্থাৎ সব ক্ষেত্রেই কমবেশী চলে।
এই প্রতিটি আন্দোলন হুজুগ এবং সাংস্কৃতিক স্রোতধারা ভিন্ন ধরনের ভিন্ন মাত্রার। কিন্তু তাদের সাধারন উপাদান পরিস্কার। এদের সবাই ‘অংশকে আলাদাভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সমগ্রকে বুঝা যায়’ এই প্রতিষ্ঠিত ধারনাকে আক্রমনে একজোট। তাদের আঘাতকে যোগ করলে যা দাঁড়ায়, তা প্রধান সিস্টেম থিউরিস্ট ও দার্শনিক আরভিন লাজলোর (Ervin Laszlo) ভাষায়, “আমরা প্রকৃতির এক আন্তযুক্ত সিস্টেমের অংশ, এটা জানা না থাকলে ‘সার্বজনীনতাবাদীরা’ এটা নিয়ে ব্যবসা শুরু করবে, তাদিয়ে আন্তসংযোগের প্যাটার্নের ধারাবাহিক তত্ত্ব তৈরী করবে, তারপর আমাদের স্বল্প মেয়াদী প্রকল্পগুলো এবং সীমিত নিয়ন্ত্রন ক্ষমতা আমাদের নিজেদেরকেই ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবে।”
এই আক্রমন খন্ডিত, আংশিক ও বিশ্লেষণের ওপর এত তীব্র হয় যে, অনেক গোঁড়া সমগ্রতাবাদীও তাদের অবর্ণনীয় সামগ্রিক কাজে প্রানবন্তভাবে অংশ বা খন্ডকে ভুলে যায়। ফলাফল মোটেই সমগ্রতাবাদ না হয়ে, হয় আরেক রকমের খন্ডন। তাদের সমগ্রতাবাদ পরিনত হয় অর্ধবাদে (halfism)।
আরও চিন্তাশীল সমালোচকরা অবশ্য দ্বিতীয় ঢেউয়ের বিশ্লেষনধর্মী দক্ষতাগুলোকে সংশ্লেষনের ওপর অধিকতর গুরুত্বপ্রদান করে তার সঙ্গে ব্যালান্স করতে চায়। এই ধারনা / তত্ত্ব সম্ভবত সবচেয়ে পরিস্কারভাবে প্রকাশিত হয়েছে পরিবেশবিজ্ঞানী য়ুজিন পি. অডাম (Eugen Pleasant Odum) এর বক্তব্যে। তিনি সহকর্মীদের বলেছিলেন সমগ্রতাবাদের সাথে লঘুকরনবাদকে (reductionism) মেশানোর জন্য। সমগ্র সিস্টেমের পাশাপাশি তার অংশসমূহকেও দেখার জন্য। কারন, তাঁর ভাষায়, “পযহেতু কোনকিছু গঠনে সহায়তাকারী ক্ষুদ্রতর উপাদানসমূহ সংযুক্ত হয়েই কার্যকর বৃহত্তর ‘সমগ্র’ তৈরী হয় এবং যা কাছে থেকে দেখা যায় না, তাই নতুন।”
“তার অর্থ এই নয় যে আমরা লঘুকরনবাদী বিজ্ঞানীকে পরিত্যাগ করব কারন এই তাত্ত্বিক যুক্তি থেকে গোটা মানবজাতী অনেক ভাল ফলাফল পেয়েছে।” কিন্তু এখন সময় এসেছে “বৃহত্তর স্কেলের সমন্বিত সিস্টেমের” উপর গবেষণায় সমান পৃষ্ঠপোষকতা করার।
সিস্টেম থিউরি, বাস্তব্যবিদ্যা বা ঈকোলজি এবং সমগ্রতাবাদী চিন্তার সাধারনীকৃত গুরুত্বপূর্ণ অংশ-- যেমন সময় ও স্থান সম্পর্কে আমাদের ধারনার পরিবর্তন-- এগুলো সব দ্বিতীয় ঢেউ সভ্যতার বুদ্ধিবৃত্তিক অবয়বের (Premises) উপর তৃতীয় ঢেউয়ের সাংস্কৃতিক আক্রমনের অংশ। ঐ আক্রমন অবশ্য ঘটনার কার্য-কারন সম্বন্ধ উদ্ভাবনে নতুন ভাবনার আবির্ভাব ঘটাতে চূড়ান্ত সাফল্য অর্জনে সক্ষম হয়েছে।

মহাজাগতিক খেলাঘর (The Cosmic Playroom)
দ্বিতীয় ঢেউ সভ্যতা আমাদের নিশ্চিন্ত রেখেছিল যে আমরা জানতে পারতাম কেন ঘটনা ঘটে। প্রত্যেক ঘটনা বা ফেনোমেনন স্থান ও কাল ভেদে সর্বত্র নিরূপনযোগ্য, যেমন কর্ম তেমনি ফল হয় এবং পুরো মহাজগত জুড়েই কারন ও কার্য (causes & effects) বিরাজমান।
কার্য কারন তত্ত্ব সম্পর্কে এই মেকানিস্টিক দৃষ্টিভঙ্গি আগে যেমন উপযোগী ছিল আজও তেমনি বর্তমান। রোগ নিরাময়ে গগনচুম্বি অট্টালিকা নির্মানে, সুপ্রযুক্ত মেশিন ডিজাইনে এবং বিশাল বিশাল সংগঠন সংযোজনে ইহা আমাদের সাহায্য করে। তারপরও একটি মেশিনের কাজ ব্যাখ্যা করতে ইহা যতখানি শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারে, জন্ম মৃত্যু ক্রমবিকাশ-ক্ষয়প্রাপ্তি, নতুন কোন জটিলতায় আকস্মিক বিরাট সাফল্য অর্জন, বড় বড় পরিবর্তন হঠাৎ মিইয়ে যাওয়া দৈবাৎ কোন ক্ষুদ্র ঘটনা আকস্মিকভাবে দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে বিশাল বিষ্ফোরনধর্মী শক্তিতে পরিনত হওয়া, এমন ঘটনাকে ততখানি সন্তোষজনকভাবে পারে না।
আজ নিউটনিয় পুল টেবিলকে জোর করে ধাক্কা দিয়ে মহাজাগতিক খেলাঘরের এক কোনে ফেলে রাখা হচ্ছে। মেকানিস্টিক / অধিযন্ত্রবাদী কার্যকারন তত্ত্বকে একটি বিশেষ কেস হিসেবে দেখা হচ্ছে যা ঘটনা বিশেষ প্রয়োগযোগ্য সবখানে নয়। আমাদের দ্রুত পরিবর্তিত মনোভঙ্গির প্রেক্ষিতে সারা বিশ্বের নানা মতের বিজ্ঞানী ও পন্ডিতরা একমত হয়ে প্রকৃতি, বিবর্তন এবং স্থান, কাল ও বস্তুর অগ্রগতি সম্পর্কে দৈব ঘটনা ও কার্য কারন তত্ত্ব সম্পর্কে নতুন মতামত দিচ্ছেন। জাপানী জ্ঞানতত্ত্ববিদ (eplistemologist) মাগোরো মারুইয়ামা (Magoroh Maruyama), ফরাসী সমাজবিজ্ঞানী এডগার মরিন (Edgar Morin), তথ্য তাত্ত্বিকদের (Information thecorists) মধ্যে স্ট্যাফোর্ড বিয়ার (Stafford Beer) ও হেনরি ল্যাবরিট (Henri Laborit) এবং আরো অনেকেই অযান্ত্রিক ব্যবস্থায় যেমন বাঁচা, মরা, জন্ম নেয়া, বড় হওয়া এবং বিবর্তন ও বিপ্লব উভয়কে অতিক্রম করার মধ্যে কার্য-কারন সম্পর্ক কিভাবে কাজ করে তার হদিস দিয়েছেন। বেলজিয় নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ইলিয়া প্রিগজিন (I1ya Prigogine) সুশৃংখলতা ও উশৃংখলতা, দৈব ঘটনা ও আবশ্যকতা প্রভৃতি ধারনা এবং এগুলো কিভাবে কার্য-কারন সম্মন্ধের সঙ্গে জড়িত সে সম্পর্কে এক অসাধারন সংশ্লেষন (Synthesis) প্রস্তাব রেখেছেন।
উদীয়মান তৃতীয় ঢেউয়ের কার্য-কারন সম্পর্ক আংশিকভাবে সিস্টেম থিউরির প্রধান ধারনা : ফলাবর্তন প্রক্রিয়া (The idea of feedback) থেকে উদ্ভূত। এই মতামতের দৃষ্টান্ত স্বরূপ শীতকালে ঘর গরম রাখার যন্ত্র, স্বয়ংক্রিয় তাপমান যন্ত্র বা থার্মোস্ট্যাটের কথা বলা যায়, যার সাহায্যে ঘরের তাপমাত্রার ভারসাম্য বজায় রাখা হয়। থার্মোস্ট্যাট রুম হিটার বা ফার্নেসকে চালু করে লক্ষ্য রাখে বা সেন্সর করে তাপমাত্রা কতদূর উঠলো। রুম পর্যাপ্ত পরিমানে গরম হলে এটা ফার্নেস বা হিটারকে স্বয়ক্রিয়ভাবে বন্ধ করে দেয়। আবার তাপমাত্রা নীচে নেমে গেলে, থার্মোস্ট্যাট বুঝতে পারে এবং পূনরায় ঝাঁকি দিয়ে ফার্নেস বা হিটারকে চালু করে।
আমরা দেখি এখানে একটি ফলাবর্তন প্রক্রিয়া (feedback process) ভারসাম্য বজায় রাখে, নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করলে দমিয়ে রাখে। এর নাম ‘নেতিবাচক ফলাবর্তন’ (negative feedback), এর কাজ সুস্থিত (stability) অবস্থা বজায় রাখা।
১৯৪০ ও ১৯৫০ এ দশকের মাঝামাঝিদিকে তথ্য তাত্ত্বিক ও সিস্টেম চিন্তাবিদরা বিভিন্ন পরীক্ষ-নিরীক্ষা পূর্বক নেতিবাচক ফলাবর্তন সংজ্ঞায়িত করেন। তারপর থেকে বিজ্ঞানীরা এর সদৃশ বা অনুরূপ বস্তু অথবা দৃষ্টান্ত অনুসন্ধান করতে থাকেন। প্রবল আনন্দ-উত্তেজনার মধ্যে তারা ব্যক্ত করেন যে, একই ধরনের সুস্থিতি- সংরক্ষন ব্যবস্থা (Stability-protecling system) একেবারে শরীরবিদ্যা থেকে রাজনীতি পর্যন্ত জ্ঞান বিজ্ঞানের প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিদ্যমান। জীবদেহে যেমন তাপমাত্রার স্থিতাবস্থা বজায় রাখার ব্যবস্থা বিদ্যমান, তেমনি রাজনীতিতে বা রাষ্ট্রনীতিতে কোন সংস্থাপন বা সংগঠন গ্রহনযোগ্যতার সীমা অতিক্রম করলে তাকে প্রত্যাখান / প্রত্যাহার করার জন্য মতামত দেয়া হয়। অতএব, নেতিবাচক ফলাবর্তন বা নেগেটিভ ফিডব্যাক আমাদের চারপাশে সর্বত্র সকল বস্তুর স্থিতি বা ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য কাজ করে বলে প্রতীয়মান হয়।
তবে ১৯৬০ এর দশকের প্রথম দিকে প্রফেসর মারুইয়ামার মতো সমালোচকরা লক্ষ্য করেন যে, স্থীতিশীলতার (Stability) প্রতি যত বেশী মনোযোগ দেয়া হচ্ছে, পরিবর্তনের (Change) প্রতি সে তুলনায় মোটেই না। তিনি তখন “ইতিবাচক ফলাবর্তন” (Positive feedback) নিয়ে আরো গবেষনা করা পয়োজন বলে মতামত রাখলেন। এই (ইতিবাচক ফলাবর্তন) প্রক্রিয়া পরিবর্তনের শক্তি বৃদ্ধি করে, দমন করে না স্থিতিশীলতাকে চ্যালেঞ্জ করে, এমনকি মাঝে মাঝে বিধ্বস্তও করে। মারুইয়ামা গুরুত্ব দিয়ে বলেন পজিটিভ ফিডব্যাক কোন সিস্টেমের ছোট একটা রীতি লংঘন করে বা ‘লাথি’ দিয়ে এবং একে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে অতিরঞ্জিত করে এক বিশাল ভীতিপ্রদ কাঠামোয় রূপান্তরিত করতে পারে।
ফলাবর্তনের নেতিবাচক প্রক্রিয়া পরিবর্তন লাঘব-প্রবন আর ইতিবাচক প্রক্রিয়া পরিবর্তন উৎসাহী-প্রবন। দুটোর প্রতিই সমান গুরুত্ব দেয়া আবশ্যক। ইতিবাচক ফলাবর্তন (ইফ) দ্বারা অনেক দুর্বোধ্য ও বিভ্রান্তিকর প্রক্রিয়ার কার্য-কারন সম্পর্কে সুষ্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রদান সম্ভব। কারন, ইহা (ইফ) স্থিতাবস্থাকে ভেঙ্গে দেয় এবং নিজেই নিজের রসদ জোগায় ; দুষ্টচক্র (Vicious circles) এবং শুদ্ধচক্র (Virtuous circle) কে ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে। থার্মোস্ট্যাটের দৃষ্টান্তটাকে একটু উল্টো করে কল্পনা করা যাক সেন্সরসহ এর ট্রিগার কার্যপদ্ধতি যদি বদলে দেয়া হয়, দেখা যাবে কক্ষ বা ঘর গরম হলেও, থার্মোস্ট্যাট ফার্নেস বন্ধ করার পরিবর্তে চালু রাখবে। ফলে তাপমাত্রা উষ্ণ থেকে উষ্ণতর হতে থাকবে। অথবা অর্থনীতির একচেটে বা মনোপলি ব্যবসার কথা কল্পনা করা যাক, যেমন- কোন ব্যক্তির যত বেশী টাকা থাকে, সে ততবেশী সম্পদ কিনতে পারে (জমি কেনা, বাড়ি বানানো বা ব্যবসা ফাঁদা ইত্যাদি) আর তত বেশী সে ভাড়া বা লাভ পায়; অতএব যত টাকা ততো সম্পদ কেনা। এ দুটোই ইতিবাচক ফলাবর্তন বা পজিটিভ ফিডব্যাকের দৃষ্টান্ত।
পজিটিভ ফিডব্যাক স্ব-ব্যাখ্যাত বা সেল্ফ এক্সপ্ল্যানাটরি এবং যে কোন প্রক্রিয়ার ব্যাখ্যাদানে সহায়ক। যেমন পাকিস্তান একবার এক নতুন ধরনের যুদ্ধাস্ত্র তৈরী বা ক্রয় করলে ভারত তারচেয়ে বড় বা আধুনিক অস্ত্র তৈরী করে বা কেনে। এটা দেখে পাকিস্তান আবার তার চেয়েও উন্নততর মারনাস্ত্র তৈরী বা কেনায় উদ্বুদ্ধ হয়। অনুরূপভাবে ভারতও। এভাবেই মারাত্মক সমরাস্ত্র প্রতিযোগিতা জঙ্গি উম্মতায় পর্যবসিত হয়
এবং নেতি ও ইতিবাচক ফিডব্যাক একত্র করলে বুঝা যাবে কি করে এ দুটো ভিন্নধর্মী প্রক্রিয়া জটিল বা উন্নত প্রানীদের মধ্যে পারস্পরিক ক্রিয়া করে, মানব মস্তিস্ক থেকে অর্থনীতি পর্যন্ত চমকপ্রদ অন্তর্জ্ঞান বা উপলব্ধি জাগে। কোন সত্যিকার জটিল সিস্টেম / ব্যবস্থা-- জৈবিক, প্রানী, নগর বা আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক নিয়ম যাই হোক না কেন-- তার ভেতরেই পরিবর্তন সহায়ক ও পরিবর্তন নিরোধক ব্যবস্থা থাকে অর্থাৎ ইতি ও নেতিবাচক ফিডব্যাক লুপ দুই-ই পারষ্পরিক ক্রিয়া করে। আমরা যদি এই সত্য স্বীকার করি তবে আমাদের অতি পরিচিত বিশ্বে এক পুরো নতুন স্তরের জটিলতা একটু একটু করে দেখতে পাব। এতে কার্য কারন সম্বন্ধে আমাদের নতুন উপলব্ধিরও অগ্রগতি হবে।
তারপরও, যখন শুরু থেকে প্রানীজগত ও সমাজ ব্যবস্থার ভেতরে পরিবর্তনের সহায়ক ও নিরোধক ব্যবস্থাগুলো কাজ করতে দেখা যায় না তখন আমরা বুঝতে পারিনা কি হচ্ছে, মনে সন্দেহ জাগে। সত্য এই যে, প্রথমে ব্যবস্থাগুলো অদৃশ্য বা অনুপস্থিত থাকলেও, পরে তার ভেতরেই জায়গামত তৈরী হয় বা জন্মায়, তখন দেখে মনে হয় যে ঘটনাটি দৈবক্রমে ঘটেছে। একারনেই কোন অনাহুত বা আকস্মিক ঘটনা এক বা একাধিক অপ্রতাশিত চমকপ্রদ ও পরষ্পর সংযুক্ত ঘটনাবলী ঘটতে পারে।
এই অবস্থা আমাদের জানান দেয়, কেন পরিবর্তনকে বোঝা দূরূহ ঠেকে, আন্দাজ করে নিতে হয় এবং এত রহস্যে বা বিস্ময়ে ভরা থাকে। এ কারনে কোন ধীর অথচ অবিচল প্রক্রিয়া হঠাৎ প্রচন্ড বিষ্ফোরনমুখী পরিবর্তন ঘটায় আবার উল্টোটাও হয়। এবং ইহাই আবার ব্যাখ্যা করে কেন সমধর্মী প্রারম্ভিক শর্তাদি সুষ্পষ্টভাবে বিপরীতধর্মী পরিনতি ডেকে আনে যা দ্বিতীয় ঢেউ মানসিকতার এক বিপরীত ধারনা।
তৃতীয় ঢেউ কার্য-কারন সম্পর্ক পরিবর্তন সহায়ক ও নিরোধক এবং আরো অনেক উপাদান সহ ক্রমাগত পারষ্পরিকভাবে মিথস্ক্রিয় শক্তির বিস্ময়ভরা এক জটিল বিশ্বের রূপ ধারন করছে। যে বিশ্ব দ্বিতীয় ঢেউ প্রস্তাবিত নির্মাণ কৌশলের চেয়ে অনেক বেশী অচেনা এবং একেবারেই নতুন।
সবকিছুকি দ্বিতীয় ঢেউয়ের যান্ত্রিক কার্য-কারন সম্বন্ধ কর্তৃক আরোপিত অনুমান নীতি নির্ভর ? নাকি সহজাতভাবে, অনিবার্য কারনে ভবিষ্যদ্বানী করা যায় না এমন বস্তুও আছে ? আমরা কি দৈব দ্বারা পরিচালিত নাকি প্রয়োজন দ্বারা ? এই পুরনো দ্বন্দ্ব সম্পর্কেও তৃতীয় ঢেউ কার্য-কারন সম্বন্ধের নতুন কিছু মজার বক্তব্য আছে। আসলে এই যুক্তি আমাদেরকে শেষ পর্যন্ত হয় / নয় (either/or) এর ফাঁদ এড়িয়ে চলতে সাহায্য করবে যা ডিটারমিনিস্ট ও এন্টি-ডিটারমিনিস্টদের মধ্যে তথা আবশ্যকতা প্রয়োজনের সঙ্গে দৈব ঘটনা বা ভাগ্যের সঙ্গে এতকাল যাবত ঝগড়া বাঁধিয়ে রেখেছে এবং এটাই হয়তো তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক সাফল্য হবে।

উঁইপোকা থেকে শিক্ষা গ্রহণ
ডক্টর ইলিয়া প্রিগোজিন (Dr I1ya Prigogine) (১৯১৭-২০০৩) ও তার সহকর্মীবৃন্দ ব্রাসেলস এর মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় ও অস্টিনের টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ে রাসায়নিক ও অন্যান্য কাঠামোগুলো প্রয়োজন ও বৈবের মিথস্ক্রিয়ায় পরবর্তি ভিন্ন ও জটিল উচ্চতর ধাপে কেমন করে লাখ দেয় (Leap), তা প্রমান করে দ্বিতীয় ঢেউয়ের সত্য হিসেবে মেনে নেয়া যুক্তি সমূহ মিথ্যা বলে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। এই উদ্ভাবনার জন্য তিনি ১৯৭৭ সনে রসায়নে নোবেল প্রাইজ লাভ করেন।
মস্কোতে জন্ম, বেলজিয়ামে শৈশব থেকে আমৃত্যু কাটিয়েছেন। যৌবনে সময় সমস্যার প্রতি প্রবলভাবে আকর্ষিত হন, এ নিয়ে তাঁর মনে দ্বন্দ্ব ও বিভ্রান্তি কাজ করত। একদিকে পদার্থবিজ্ঞানীদের এনট্রপির entropy প্রতি আস্থা অর্থাৎ মহাবিশ্ব ক্ষয়িষ্ণু এবং সকল সুসংগঠিত রীতি আদর্শ শেষ পর্যন্ত ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে এই বিশ্বাস ; অন্যদিকে, জীববিজ্ঞানীরা বলেন, জীবন নিজেই সংগঠন এবং আমরা অবিরত উচ্চ থেকে উচ্চতর, জটিল থেকে জটিলতর সংগঠনে আবির্ভূত হই যার নাম বিবর্তন (evolution)। Entropy পথ দেখায় একদিকে, Evolution দেখায় অন্যদিকে।
এই জিজ্ঞাসা প্রিগোজিনকে সারা জীবন পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়ন শাস্ত্রের গবেষনায় উদ্বুদ্ধ করে। উচ্চতর আকৃতির সংগঠন কি করে হয় তার উত্তর খোঁজাই ছিল তার গবেষনার মূল বিষয়। প্রিগোজিন প্রমান করে দেখান যে, যেকোন জটিল সিস্টেম- তথা তরল পদার্থের অনু (molecules) থেকে শুরু করে মস্তিস্কের øায়ুকোষ বা নগরের ট্রাফিক ব্যবস্থা পর্যন্ত সবকিছুই আংশিকভাবে সবসময় একটু একটু করে পরিবর্তিত হচ্ছে অর্থাৎ পরিবর্তনশীলতাই তাদের ধর্ম। যে কোন সিস্টেমের ভেতরটা প্রতিনিয়ত অস্থিরতায় কম্পমান থাকে। মাঝে মাঝে যখন নেতিবাচক ফিডব্যাক কাজ করে তখন এই অস্থিরতায় দমিত হয় এবং সিস্টেমের ভারসাম্য রক্ষা পায়। কিন্তু, যখন ইতিবাচক ফিডব্যাক কাজ করে বা শক্তি বৃদ্ধি পায়, তখন এই অস্থিরতার কতেকাংশ প্রচন্ড শক্তিশালীভাবে বেড়ে গিয়ে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে যে, সমগ্র সিস্টেমের ভারসাম্য হুমকির মুখে পড়ে। এসময় সিস্টেমের বাইরের পরিবেশে অস্থিরতা থাকলে তা আঘাত করতে পারে এবং এর ফলে কম্পনের মাত্রা আরো অধিক পরিমানে বাড়তে থাকে-- যতক্ষন না সার্বিক ভারসাম্য ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় এবং বিদ্যমান (existing) কাঠামো ভেঙ্গে টুকরো টুকরো (Smashed) হয়।
অর্থনিয়ন্ত্রন ব্যবস্থার উদাহরণ দিয়ে বিষয়টা আরো পরিস্কার করা যেতে পারে। সরবরাহ এবং চাহিদার ভারসাম্য রক্ষা করা হয় ফিডব্যাক প্রক্রিয়ার সাহায্যে। বেকার সমস্যা ইতিবাচক ফিডব্যাক দ্বারা তীব্রতর করা যায় এবং নেতিবাচক ফিডব্যাক দ্বারা সমতা বিধান করা যায়। তা না করা হলে, পুরো সিস্টেমের স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়ে অস্থির হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তার সঙ্গে বাইরের অস্থিরতা (যেমন দ্রব্যমূল্যের উর্ধগতি, রাজনৈতিক বিশৃংখলা, বিদেশী হস্তক্ষেপ ইত্যাদি যুক্ত হয়ে এই অস্থিরতাকে আরো বাড়িয়ে তুলতে পারে, যতক্ষন না পুরো সিস্টেম ভেঙ্গে চুরমার হয়।
চলমান অভ্যন্তরিন অস্থিরতা বা বাইরের শক্তি বা দুটোরই মিশ্রনে, যেভাবেই বিদ্যমান ভারসাম্য নড়ে উঠুক না কেন তা কেবল বিশৃংখলা বা ভাংগনই সৃষ্টি করে না, সম্পূর্ণ নতুন উন্নততর কাঠামো নির্মাণেও সহায়তা করে। এই নতুন কাঠামো / সংগঠন হতে পারে পুরনোটার চেয়ে আরো বৈচিত্র্যময়, আভ্যন্তরিনভাবে মিথস্ক্রিয় বা পারষ্পরিক সক্রিয় ও জটিলতর। নিজেকে টেকসই রাখার জন্য প্রয়োজন হতে পারে আরো বেশী শক্তি এবং অন্যান্য সহায়ক বস্তু যেমন তথ্য এবং অন্যান্য সম্পদ। তবে প্রধানত ফিজিক্যাল এবং কেমিক্যাল প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে বলতে গিয়ে এবং মাঝে মধ্যে সামাজিক সদৃশ বস্তুসমূহের (Social analogues) দৃষ্টি আকর্ষন করতে গিয়ে প্রিগোজিন এই নতুন জটিলতর সিস্টেমগুলোকে আখ্যা দিয়েছেন “ক্ষয়িষ্ণু কাঠামো ডিসিপেটিভ স্ট্রাকর্চাস” (dissipative structures) হিসেবে।
তিনি প্রস্তাব করেন যে, বিবর্তন প্রক্রিয়া নতুন ও উচ্চতর ডিসিপেটিভ স্ট্রাকচারসমূহের আবির্ভাবের মাধ্যমে স্বয়ং ক্রমাগত এক জটিল (Complex) ও বৈচিত্র্যময় প্রানী ও সামাজিক প্রাণসত্ত্বার দিকে অগ্রসরমান হিসেবে দেখা যেতে পারে। প্রিগোজিনের মতে, এভাবে যেসব চিন্তায় ও ধারনায় রাজনৈতিক ও দার্শনিক অনুরনন-এর সাথে বিজ্ঞানভিত্তিক অর্থও থাকে, সেগুলো নিয়ে আমরা ‘অর্ডার আউট অব ফ্লাকচুয়েশন’ বা ‘অস্থিরতা থেকে শৃংখলা’র বিকাশ ঘটাই কিংবা তাঁর নিজের ভাষায় বলা যায়, “বিশৃংখলা থেকেই শৃংখলার বিন্যাস” (Order out of Chaos) ঘটে। (চলবে)

পাতাটি ৩৬০৯ বার প্রদর্শিত হয়েছে।