দশদিক মাসিক

হোম কেউ জানে কেউ জানেনা (৩১তম সংখ্যা)

কেউ জানে কেউ জানেনা (৩১তম সংখ্যা)

শরাফুল ইসলাম

(গত সংখ্যার পর)
ব্যক্তিগত উদ্যোগে অনেকেই কবি সাহিত্যিকদের পরিচিতিমূলক গ্রন্থ সংকলন করেছেন। বাংলা একাডেমীও এ বিষয়ক কার্যক্রম করছে। কিন্তু এতে করে সারাদেশের সেকাল একালের প্রায় সকল লেখকদের অন্তর্ভুক্তির কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু এটি হওয়া বাঞ্ছনীয় বাংলাদেশের সাহিত্যকর্মী শিরোনামেও কাজটি সম্পন্ন করা যেতে পারে।
গত সংখ্যায় কিছু অখ্যাত, অপরিচিত সাহিত্য কর্মীর সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিয়েছিলাম। যা নিতান্তই আমার ব্যক্তিগত পরিচয় মণ্ডলের। এ রকম অসংখ্য সাহিত্য কর্মী ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন সারাদেশে। যাদের সৃজনশীল কর্মগুলো সংরক্ষণ করা দরকার। হয়তোবা এক সময় এগুলো আমাদের সম্পদ হবে।
বাংলাদেশে লেখকদের বিভিন্নভাবে সম্মানিত করা হয়। সরকারী, বেসরকারী সর্বক্ষেত্রেই এর প্রচলন তীব্র। কিন্তু এতেও দলীয়করণ, বেসরকারী ক্ষেত্রে ব্যবসা বা মুনাফা অর্জনÑ নানা জটিলতা রয়েছে। তারপরও এসব পুরস্কার কোনো লেখককে বাঁচিয়ে রাখবে না। একজন লেখক বেঁচে থাকবেন তখন, তার সৃষ্টিগুলো যখন পাণ্ডুলিপি থেকে মুদ্রাকারে সংরক্ষিত হবে। এক্ষেত্রে সরকারী উদ্যোগে সারাদেশের সকল লেখকদের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি, সেই সঙ্গে তাদের লেখাগুলো পুস্তকারে প্রকাশ করা যেতে পারে। হতে পারে এটা শত-সহস্র খণ্ড। চর্যাপদ পাওয়া গিয়েছিল নেপালে। যা বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন। যার উপর দাঁড়িয়ে আমরা এত দূর এসেছি। আমাদের পত্রিকাগুলোর সাহিত্যপাতা কিংবা বিশেষ সংখ্যাগুলোতে অসংখ্য সাহিত্যকর্মী সন্নিবেশিত হয়। জাতীয় কবিতা উৎসবে হাজার হাজার স্বরচিত কবিতা পড়েন। তাই একটি সম্পাদনা পরিষদ করে এসব সাহিত্য কর্মীদের ছোট ছোট লেখাগুলো নিয়ে হতে পারে একটি রতœভাণ্ডার।
গত সংখ্যায় আমার পরিচিত ক’জন কবির কথা লিখেছিলাম। এদের মধ্যে আরেকজনের কথা মনে পড়ছে। তিনি সিলেটের কবি দিলওয়ারের উত্তরাধীকার কবি কিশওয়ার ইবনে দিলওয়ার। তিনি অবলীলাক্রমে কবিতা রচনা করেন। এতে ব্যাকরণও ছুটে যায় না। আমার অফিসের টেবিলে বসে অনেকবার কবিতা লিখেছেন। যা আমি প্রকাশও করেছি।
বাংলাদেশের হাতেগোনা মাত্র ক’জন কবি বা লেখক ছাড়া কেউই সবার মনে বেঁচে নেই। অথচ অনেক কবি ছিলেন, যারা একসময় বিশিষ্ট কবি হিসেবে আখ্যায়িত হয়েছিলেন। অনেক লেখকের একটি উপন্যাস ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছিল। তাই সেই সব সাড়া জাগানো লেখক সাহিত্যিকসহ দেশের সমস্ত সাহিত্য কর্মীর সৃজনীটুকুকে উপজীব্য করে শত শত খণ্ড সাহিত্য সংকলন প্রকাশ করা যেতে পারে। শুধু কবিতা কিংবা গল্প উপন্যাসই নয়। নাটক, সিনেমার চিত্রনাট্যসহ সাহিত্যের সমস্ত শাখারই এ কাজটি করা জরুরি। বাংলাদেশের শিশু বিষয়ক সাহিত্য একটি বিশাল সম্পদ। গীতি কবিতাজুড়ে আছে সারাদেশের আনাচে কানাচে। প্রতিদিন রেডিও, টেলিভিশনসহ অডিও জগতে প্রকাশিত হচ্ছে অসংখ্য গান। বাংলা সাহিত্যের মূলধারা ছিল গান। চর্যাগীতিকা তারই প্রমাণ। তাই গীতি কবিতাগুলোকেও অধিকতর গুরুত্ব দিয়ে বাংলাদেশের সাহিত্য সম্পদ হিসেবে সংরক্ষণ করা দরকার।
এক সময় আমাদের বন্ধু প্রতীম ইসমাইল হোসেন গল্প লিখতেন। মৃগয়ায় পালংক বদল নামে তার একটি গল্প প্রকাশিত হয়েছিলো তৎকালীন সাপ্তাহিক বিচিত্রায়। যা ফটোকপি করেও বিক্রি হয়েছিল। পরবর্তীতে ‘র’ নামে ইসমাইলের একটি গল্প বইও বেরিয়েছিল। কিন্তু এখন আর নেই। নারায়ণগঞ্জ টানবাজারের শব মেহেরকে নিয়ে একটি স্বল্প দৈর্ঘ্য সিনেমা বানিয়েছিলেন ইসমাইল।
ইসমাইলের সঙ্গে আমার পরিচয় সৈয়দ আল ফারুকের বাসা স্বর্গীয় দূতাবাসে। মগবাজার নয়াটোলা। একই দিনে পরিচয় ঘটে নাসির আহমেদ, আবু হাসান শাহরিয়ার, আনওয়ারুল কবীর বুলু, সৈয়দ নাজাত হোসেনের সঙ্গে। জসীম রায়হান নামে নয়াটোলার এক বন্ধু নিয়ে যায় ফারুকদের বাসায়।
পরবর্তীতে সবাই সুবিখ্যাত হয়েছেন। প্রথম পরিচয়ে ইসমাইল নিজেকে ব্রাদার্স ইউনিয়নের খেলোয়াড়, বুলু নাজাতসহ সবাই বিভিন্ন পরিচয় দেয়। যা ছিলো পুরোটাই উপহাস করা। কিন্তু পরবর্তীতে আমার আরোহন, লেখা প্রকাশসহ পেশাগত উত্তরণের পাশাপাশি এদের সঙ্গে গভীর বন্ধুত্ব গড়ে উঠে। মাহবুবা হক কুমকুম তখন থেকেই লিখতেন। এটা ১৯৭৯ সালের কথা। শাহজাদী আঞ্জুমান আরা নামে ছিলেন আরেকজন। থাকতেন পল্টনে।
এই নাসির আহমেদ একজন শক্ত মাপের কবি এখন। সৈয়দ আল ফারুক, আনওয়ারুল কবীর বুলু, সৈয়দ নাজাত হোসেন ন্বনামখ্যাত ছাড়াকার। আবু হাসান শাহরিয়ার বহুমুখী প্রতিভা। তাই আমাদের সাহিত্যের সমস্ত কর্মীদের সৃজনশীল কর্মগুলো নিয়ে অনেক খণ্ডে প্রকাশ করা যেতে পারে বাংলাদেশের সাহিত্য সম্পদ। আতাউল হক মল্লিক নামে একজন ভালো কবিতা লিখতেন তখন। পরবর্তীতে সম্ভবত কোনো ঘরানার কবি হয়ে যাওয়ায় সর্বজন গৃহীত হননি। অথচ তার কাব্য ব্যকরণ সম্মত। আবদুল হাই শিকদারও ভালো কবিতা লিখতেন। আফগানিস্তান নিয়ে তার একটি কবিতা মনে রাখার মতো। মতিন সুন্দর কবিতা লিখতেন। আমি বেশ কটি কবিতা ছেপেছি। আমরা ঢাকা ফিল্ম ইনস্টিটিউট করেছিলাম। আখতারুজ্জামান, অনুপম হায়াৎ, মতিন রহমান, নাঈম এবং আমি ছিলাম এর প্রতিষ্ঠাতা। মূল সেনাপতি ছিলেন অনুপম হায়াৎ এবং আখতারুজ্জামান।

বাংলাদেশের শিল্পকলা একামেডী পরিচালক আলমগীর কবিরের নাট্যত্রয়ী প্রকাশ করে একটি বিশাল কাজ করেছিলো। সেই ধারায় শিল্প সাহিত্যের সমস্ত শাখার সমস্ত ফসল নিয়ে সুসম্পাদনার মাধ্যমে সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় বৃহৎ প্রকাশনায় গেলে দেশের সাহিত্য সম্পদ সংরক্ষিত হবে বলে আশা করি। দলীয় সংকীর্ণতা ভেঙে সাহিত্য প্রেমকে উপজীব্য করে এই কাজটি করলে জাতি সমৃদ্ধশালী হবে। (চলবে)

পাতাটি ৪৩৮৫ বার প্রদর্শিত হয়েছে।