দশদিক মাসিক

হোম মন ময়ূরী আজি পেখম মেলে

মন ময়ূরী আজি পেখম মেলে

-এস জে রতন
ত কিছু করতে যে চায় মন।
করে আনচান হৃদয়, ।
খন্ডিত বা আংশিক নয় ।
পুরো প্রাপ্তিতে প্রতি অনুক্ষণ;
থলে ভরা কচকচে কয়েন ।
মন আকুলি খরচের লাগি ।
কেহ নাহি নিয়ন্ত্রিত জীবন মাগি।
মানে, শ্রদ্ধায় বড়, যিনি নিয়ন্ত্রিত রহেন।
হঠাৎ বৃষ্টি। কাঁধে ঝোলানো অফিসের ব্যাগ থেকে ছাতা বের করতে করতেই বৃষ্টিতে ভিজে একাকার। এমন শীতের মৌসুমেও যে হঠাৎ করে বেরসিক বৃষ্টি নামতে পারে, ভাবনাতেও ছিল না। ছাতাটা চারফোল্ডিং-এর ছিল। ছাতার বাঁটের বাটনে চাপ দিতেই আচমকা বাতাসে পটাস শব্দে ঝুরঝুর করে দু’শো পঞ্চাশ টাকার ছাতাটির সকল কল-কব্জা, ডানা ভেঙ্গে চুরমার হলো। আপাতত অকাল মৃত্যু হলো ছাতার। যে উদ্দেশ্যে ছাতা ব্যাগে করে কবে বৃষ্টি আসবে তার আশঙ্কায় প্রতিদিন বয়ে বেড়ানো, সেই ছাতাই কি না সময়ের প্রয়োজনে বিগড়ে গেল। মেজাজটা তেতিয়ে উঠলো। কষ্টে, দু:খে ভিজেই অফিসের বাকিটা পথ হাঁটা শুরু করলো তমাল।
তারপর হাঁচি পর হাঁচি। এ যেন হাঁচি নয় একেকটা গ্রেনেড বিস্ফোরণ। সারাদিন ভেজা শার্ট-প্যান্ট শরীরের তাপেই শুকায়। রাত্রে ভীষণ জ্বর, কাশি, ঠান্ডায় বুক ধরে আসছিল। সামান্য ধৈর্যচ্যুতিতেই এ অবস্থা হলো তমালের। সেদিন বৃষ্টির সময় কাছের কোন দোকানে বা কোন শেড-এ একটু সময় দাঁড়ালেই হয়তো এই অসুস্থতাটুকু এড়িয়ে যাওয়া যেত। অল্প নিয়ন্ত্রণহীন হওয়াতেই যা হলো পূর্ণ নিয়ন্ত্রণহীন হলে কি হয় তা সহজেই অনুমান করা যায়।
ফেইসবুকে সত্য মিথ্যের মিশেল নতুন কিছু নয়। কোন তথ্যটি যে সত্য আর কোনটি যে মিথ্যে তা নির্ণয় করা খুবই মুশকিল কাজ। আলফ্রেড নোবেল তার আবিষ্কারের অপব্যবহার রোধে ভাল কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ নোবেল পুরস্কার প্রবর্তন করেন। মার্ক জুকারবার্গ ফেইসবুকের মাধ্যমে তথ্যাদি আদান-প্রদান করে একে অপরের সাথে সামাজিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বিপরীত মানসিকতা আর অনিয়ন্ত্রিত বাসনা কেন যেন প্রকৃত তথ্য দিতে কুণ্ঠিত করে আমাদের। তাই হরহামেশাই মিথ্যের আশ্রয় নেয় মানুষ। মানুষের এই অপইচ্ছের বিপরীতে আছে সুনিয়ন্ত্রিত আর পরিকল্পিত জীবন। রায়হান দু’বছর হলো একটি সরকারী ব্যাংকে সিনিয়র পদে কাজ করছেন। মেধাবী বলে এই চাকরিটা পেতে তার খুব বেগ পেতে হয়নি। আরো কয়েকটা ভাল চাকরীর অফার আছে। সিদ্ধান্ত নিয়ে জয়েন করলেই হয়ে যায়। রাত্রে মেসে ফিরে ল্যাপটপে ফেইসবুকটা যেন বাড়তি আনন্দ দেয় তাকে। সদ্য ছেড়ে আসা ভার্সিটির কিছু বন্ধু-বান্ধবি আছে ফ্রেন্ড লিস্টে। তাদের সাথে পারিবারিক, অফিসিয়াল, মনস্তাত্ত্বিক বিভিন্ন ভাললাগা মন্দলাগার বিষয়গুলো শেয়ার করেন। রশ্মি নামের এক বান্ধবির সাথে ইদানিং চ্যাটিংটা বেশি হচ্ছে। রশ্মিকে সে চেনে ভার্সিটি জীবন থেকেই। কিছুদিন পাঁচ-সাতজন বন্ধুর সাথে এক হয়ে এক শিক্ষকের কাছে ফিন্যান্স পড়ার সময় ঐ মেয়েটিকেও কাছ থেকে চেনা হয়। কিন্তু তখন বন্ধুত্বের সম্পর্কটাই মুখ্য ছিল। তখন অন্য কিছু ভাবার কারো কোন সময় বা ইচ্ছে ছিল না। তারপর একে একে সবার বিভিন্ন অফিসে চাকরী হয় আর ফেইসবুকে যোগাযোগ বাড়তে থাকে। ফেইসবুকের সব তথ্য যে রায়হান বিশ্বাস করতো তা কিন্তু নয়। তবে কিছু কিছু তো বিশ্বাসযোগ্য হতেই পারে। চাকরী আর ব্যস্ততায় রশ্মি এবং রায়হানের মধ্যে দেখা করা সম্ভব হচ্ছিল না। দেখা করার ব্যাপারে রশ্মির আগ্রহও কম ছিল। রায়হান এমনিতেই খুব নিয়ম মেনে চলা ছেলে। যথা সময়ে গোসল, নাস্তা, অফিস যাওয়া, খাওয়া, পড়ালেখা, বিনোদন সব কিছুতেই একটা নিয়ন্ত্রণের ছাপ আছে তার। কিন্তু হঠাৎ কেন যেন অফিস শেষে বাসায় ফিরে ফ্রেশ হওয়া বা খাবারের আগে যেন ফেইসবুকটাই আগে চেক করে দেখতে হবে, যে কে কে তাকে কি ম্যাসেজ দিল বা কি চ্যাট করলো বা কারা কারা চ্যাটে বা অনলাইনে আছে। নেশার মতই হয়ে গেল প্রায়। বুঝতে পারলো এটা নেশায় রূপ নিচ্ছে, বিশেষ করে রশ্মির সাথে চ্যাটিং বেড়েই চলেছে। ঘন্টার পর ঘন্টা চ্যাটিং চলছে। ইচ্ছে করলেই কল করে মনের সব কথা জানানোর সুযোগ থাকলেও সেটা না করে শুধু চ্যাট করে সময় কাটাতে থাকলো তারা। একসময় রশ্মিকে বিয়ের সিদ্ধান্ত নিল রায়হান। রায়হানের মতো স্থিরবুদ্ধি সম্পন্ন ছেলে সঠিক সিদ্ধান্ত নেবে এমনটা ভাবা তার অভিভাবকদের কাছে যথার্থই মনে হতে পারে।
ছেলের বিয়ের বয়স হয়েছে, ছেলের জন্য মা পাত্রী দেখছেন। ছেলেকে বিভিন্ন জায়গায় মেয়ে দেখাতেও নিয়ে গেছেন। কোন মেয়েই তার কাছে পছন্দসই হচ্ছে না। আবার রায়হান তার পছন্দের কথাও বলতে পারছে না। একদিন রশ্মির সাথে চ্যাট করে সিদ্ধান্ত হলো যে তারা কোন এক রেস্টুরেন্টে দেখা করবে। রায়হানের সাথে বাবা মা বোনও ছিল। এটাই প্রথম দেখা হবে রায়হান আর রশ্মিও মধ্যে। রায়হান তার বাবা মা বোনকে না করেছিল যেন প্রথম দেখাতে তারা না থাকেন। কিন্তু নাছোড় বান্দা সবাই, আর রায়হানের কাছে রশ্মির কথা শুনতে শুনতে যেন ব্যাপারটা এমনই হয়েছিল যে রশ্মির সাথে সবার কতো পরিচয় আছে আর সাক্ষাৎ হয়েছে। সবাই রেস্টুরেন্টে অপেক্ষা করছে। আইফোনে চ্যাট চলছিল। -আমরা অপেক্ষা করছি তোমার সাথে দেখা করবো বলে। - ওকে কাছেই এসে গেছি। এক্ষুণি ঢুকবো। -ঠিক আছে। -না ঠিক নেই। -কেন? -আমার পক্ষে তোমাদের সাথে দেখা করা সম্ভব না। রশ্মি নামের যে মেয়েটি এতদিন রায়হানের সাথে চ্যাট করতো সে সদ্য ইন্টার পাশ করা একটি ছেলে। তার কোন এক পরিচিতার নাম ব্যবহার করে মেয়ে সেজে এতদিন চ্যাট করেছে। রেস্টুরেন্টে ঢুকে রায়হান ও তার পরিবারের সবাইকে খুব কাছে থেকে দেখে, বসে সময় নিয়ে চ্যাট করে জানাচ্ছিল তার এই অপারগতার কথাগুলো। রেস্টুরেন্ট জমজমাট। সন্ধ্যার সময়। অফিস বা ক্লাস বা কাজ সেরে সবাই এই সময়টাতে রেস্টুরেন্টে ঢোকে। বোঝার কোন উপায়ই থাকলো না যে কোন মেয়েটি বা মানুষটি রায়হানের সাথে চ্যাট করছে। চ্যাট চলছে।
-কি হয়েছে রশ্মি? আমাকে খুলে বলো! -না, বলতে পারবো না। তবে এটা আমার অন্যায় হয়েছে। এতটুকু শুধু বলতে পারি, আমি আসলে রশ্মি না। আপনার সাথে মিথ্যে করে মিথ্যে তথ্য দিয়ে এতদিন মজা করার জন্য এগুলো করেছি। রায়হানের সারা জীবনের সমস্ত অভিজ্ঞতা, সফলতা, চৌকসপনা, বুদ্ধিমত্তা মুহূর্তেই উবে গেল যেন। ভাবতেই পারছিল না যে কেন কোন মুহূর্তের জন্যও তার কাছে স্পষ্ট হলো না যে সে কোন নারীর সাথে চ্যাট বা যোগাযোগ করছিল না। নিজেকে যারপর নাই খুব বোকা মনে হলে লাগলো। বিশেষ করে এমন সিরিয়াস ব্যাপারে যে বোকা হতে পারে মানুষ তা যেন তার মস্তিষ্কেই ঢুকছিল না। রায়হান স্তব্ধ হয়ে গেল। বাবা মা বোন জিজ্ঞেস করলো -কি হলো? -না, অ্যাকসিডেন্ট, সে আসতে পারবে না। পরে বলছি। চলো বাসায় চলো। রায়হান নিজের কাছ থেকে ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিল। তাই এতো বড়ো বোকা সাজতে হলো। আবেগ, সিদ্ধান্ত, পরিকল্পনা আর গুরুত্ব দেয়ার বিষয়গুলো হয়ে উঠলো অর্থহীন।
সাগরকে সবাই চেহারায় ফিট বলেই স্মার্ট বলত। স্মার্ট হবার জন্য আরো যে বিষয়গুলো আছে তা পরিমাপ করার আগেই বিশেষ করে মেয়েরা তাকে সহজ কথায় স্মার্ট আর হ্যান্ডসাম বলত। এটাকে পঁূঁজি করে সাগরও কম যেতো না। সাগরের বুকে যেমন সব নদীরা এসে মেশে। তেমনটি প্রেমিকার সংখ্যা নেহায়েত কম ছিল না সাগরের। খাওয়া দাওয়ায় একটু নাক সিটকানো ভাব আর বেছে বেছে খাওয়ার অভ্যাসই নাকি সাগরের শরীর ফিট রাখার মন্ত্র। পার্কে, সাইবার ক্যাফে, কম্পিউটার ল্যাবে, সিনেপ্লেক্সে, আড্ডায় বেশি দেখা গেলেও রেস্টুরেন্ট বা খাবারের কোন আয়জনে কমই দেখা যেত। হঠাৎ এক অসুস্থতার কারণে তাকে বেশি পরিমাণে আমিষ ও ¯েœহ জাতীয় খাবার খাওয়ার পরামর্শ দিলেন ডাক্তার। মাস দুই সেই অসুস্থতা কটিয়ে উঠে স্বাভাবিক হলো। কিন্তু ততদিনে খাদ্যাভাসটা যেন বদলেই গেল। নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা কিছুটা হলেও শিথিল হলো। বন্ধু বান্ধব আত্মীয় স্বজন সবাই বলল- মাত্র তো অসুখ থেকে সেরে উঠলি, একটু ধৈর্য ধর, তারপর শরীরটাকে আবারো ফিট করতে পারবি। সেই যে শুরু হলো। এখন সাগরকে চিনতে গেলে ভূড়ি আর বিশাল দেহ দেখে চিনতে হয়। নিয়ন্ত্রণ এমন একটা বিষয় এটা ধীরে ধীরে অনিয়ন্ত্রণের দিকে যেতে থাকলে তাকে ফিরিয়ে আনা দুষ্কর হয়। তারপরও পরিকল্পনা, ধৈর্য আর সংকল্প মানুষকে যে কোন অবস্থা থেকে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়। মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত এই সুযোগটি থাকে। সেই জন্য দরকার আত্মসমালোচনা, ধৈর্য, একাগ্রতা আর দৃঢ় প্রতিজ্ঞা। এটা থাকলে অসাধ্যকে সাধ্য করা সম্ভব।
ছোট্ট শিশু রাব্বি। একটা লাল পিঁপড়া তার বাহু বেয়ে হাতের কব্জির দিকে নামছিল। হঠাৎ বিষাক্ত কামড়। অপর হাত দিয়ে মলে দিল রাব্বি। মাকে বলল- মা পিঁপড়া। মা কাছে এসে দেখলো বেশ ফুলে গেছে রাব্বির হাতটা। ছোট্ট লাল পিঁপড়াটি আধ মরা হয়ে ফ্লোরো পড়ে আছে। রাব্বির ফুলে যাওয়া হাতের স্থানে বাম লাগাতে লাগাতে তার মা খেয়াল করলো, পিঁপড়াটি একটু ছটফট করে শান্ত হলো। তারপর তার শরীরটা ব্যায়ামের মতো করে ঠিকঠাক করে নেবার চেষ্ট করলো। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে শরীরটা ঠিক হলো। ধীরে ধীরে আহত শরীরটাকে টানতে সক্ষম হলো। এক পর্যায়ে বেশ জোরে সোরেই হাঁটতে পারলো। রাব্বির মা’র চোখ কতক্ষণ আটকে ছিল এই ঘটনাটি দেখার তা মনে নেই। তবে পিঁপড়ার পুনর্বার জেগে ওঠা, শক্তি সঞ্চয় করা, যথাযথ নিয়ন্ত্রণ রেখে স্বকাজে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারটি মুগ্ধ করলো। দেখতে ইচ্ছে করলো বার বার কত অল্প সময়েই পিঁপড়ার কাছ থেকে মানুষের একটি বড় সময়ের জীবনের শিক্ষা আহরণ করা যায়।
তমাল স্বভাবতই গানের লোক। গানের সাথে ভাললাগা আর পবিত্রতার বিষয়টি মৌলিকভাবে গ্রথিত থাকলেও, এই গানকে ঘিরে যা কিছুই হচ্ছে সবই যেন সভ্য সমাজে মানার মতো মনে হয় না। তাই ছোটবেলায় সবারই লক্ষ্য থাকে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হবার। শিল্পী হবার নয়। তমালের অফিসে এক গানের শিল্পী তার এলাকার এক বড় ভাইকে সাথে করে দেখা করার জন্য এসেছিল। এলাকায় ঐ শিল্পী নিজেকে শিল্পী বলে পরিচয় দিতে চান না। কারণ, এলাকায় সম্ভাব্য যে কয়েকটি মেয়ের সাথে তার বিয়ের কথাবার্তা হয়েছে, তাদের অভিভাবকদের কেউই গান গায় এমন ছেলের কাছে মেয়ে বিয়ে দেবেন না বলেছেন। অথচ এই মেয়েদের যে কোন একটিকে পছন্দ করে বিয়ে করার জন্য প্রস্তুত এই শিল্পী। তমাল কথা বলার এক পর্যায়ে ঐ শিল্পীকে শিল্পী সম্বোধন করায় আড়চোখে ইশারা করে জানিয়ে দিলেন, এলাকার বড় ভাইয়ের সামনে শিল্পী হিসেবে যেন তাকে না বলা হয়। ব্যাপারটি পরে একদিন ঐ শিল্পী খুলে বলেছিলেন তমালের কাছে। ময়মনসিংহ শিল্পকলা অ্যাকাডেমি প্রাঙ্গণ। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত। ফরমাল অনুষ্ঠান শেষ হয়েছে সন্ধ্যার একটু আগে। দেশের বরেণ্য কণ্ঠশিল্পীরা কিছুক্ষণ আগেই গান গেয়ে মাতিয়েছেন ময়মনসিংহ স্টেডিয়ামের পরিপূর্ণ দর্শক-শ্রোতাদের। এবার অন্য রকম গান হবে। ইনহাউজ গান। গান গাওয়ার যন্ত্রাদি, স্পীকার, কন্ট্রোলার সব কিছুই প্রস্তুত করা হয়েছে। একের পর এক গান চলছে। চলছে স্পেশাল পানীয়। তমালের এই অভ্যাসটা কখনোই ছিল না। তাছাড়া বরাবরই এটার বিরুদ্ধে তার অবস্থান শক্ত করে তুলে ধরেছে সবার কাছে। অন্যরা বলতে থাকলো- আরে এটা এ সময় চলে। একটা জোশ থাকতে হবে না। এখন তো আমরা আমরাই। ব্যাপারটা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছলো যে তমাল এটা গ্রহণ না করলে যেন সবাইকে অপমান করা হচ্ছে। কি করবে ভেবে পেল না তমাল। বুঝলো, অভিনয় করা ছাড়া এমন অবস্থায় আর কিছু করা নেই। -এই নিচ্ছি বলে, পানীয়ের বোতল ধরেই বাঁ হাতে পেটে হাত দিয়ে কঁকিয়ে উঠলো তমাল। চাপা চিৎকার করে উঠলো। কোঁকাতে কোঁকাতে বলল- গ্যাস্ট্রিকের ব্যথা হবে হয়তো। আমাকে বাইরে নিয়ে চলো। কয়েকজন ধরে বাইরে নিয়ে গেল তমালকে। অ্যাম্বুলেন্স কল করে ময়মনসিংহ জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হলো তমালকে। অ্যাম্বুলেন্সে তমালের সাথে একজন মাত্র সঙ্গী হয়ে গেল। চরপাড়া মোড়ে আসার সাথে সাথেই অ্যাম্বুলেন্স থামিয়ে নেমে গেল তমাল। সঙ্গী লোকটিকে বলল- ভাই, এসবের অভ্যাস নেই আমার। অযথাই জোর করে কেন আমাকে বাধ্য করার চেষ্টা করলেন? আমার কিছু হয়নি। অভিনয় ছিল মাত্র। ক্লোজআপ ওয়ান প্রতিযোগিতার টাইটেল গানের কথা মনে পড়ছে- যদি লক্ষ্য থাকে অটুট/বিশ্বাস হৃদয়ে/হবে হবেই দেখা/দেখা হবে বিজয়ে। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য অন্ত:নিয়ন্ত্রণ যেমন দরকার তেমনি আন্ত:নিয়ন্ত্রণও দরকার। তবে মাঝে মাঝে কৌশল পাল্টে নিয়ন্ত্রণকে করা যায় আরো সুনিয়ন্ত্রিত। এখন প্রশ্ন হলো আপনি আপনাকে শুদ্ধের পথে ধরে রাখবেন নাকি রাখবেন না। নিশ্চয়ই এই গানের মতো জীবন কেউই চাই না আমরা- নেশার লাটিম ঝিম ধরেছে/চোখের তারায় রঙ জমেছে/এখন কোন দু:খ নেই/নেই কোন ভাবনা/এমনি করেই দিন যদি যায়, যাক না।
গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান। এক পাশে লাউড স্পীকারে গান চলছে। নাচানাচি করছে সবাই। নাচতে নাচতে অবস্থা বেগতিক। একজন রোমানাকে টেনে নিয়ে নাচতে নাচতে বলল- আরে আজ একটু নাচ না। রোমানা- একটু তো নাচলাম। - একটু হলে হবে? একটু পাগল হয়ে নাচ না। একদিন অমন ঝাক্কাস নাচলে কিচ্ছু হবে না। চল। রোমানা- শোন্, বেশি বেশি করিস না। পরে কিন্তু মাথা ঘুরে পড়ে যাবি। অতি মাত্রায় ধুম-ধাড়াক্কা নাচতে নাচতে ধপাস করে পড়ে গেল নাফিসা। নাক মুখ দিয়ে ফেনার মতো বের হতে শুরু করলো। গোঙ্গাতে থাকলো। ভয় পেয়ে গেল সবাই। সব আয়োজন হঠাৎ করেই বন্ধ হলো। পুরো আনন্দের আয়োজনটি মাটি হবার জোগাড় হলো। হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেবার পর ঠিক হলো নাফিসা। ততক্ষণে নাফিসার বড় একটা শিক্ষা হলো যে অনেক আনন্দের মাঝে, অনেক রাগের মাঝে, অনেক সমস্যার মাঝেও উঠে দাঁড়াবার জন্য নিজেকে সামলে রাখতে হয়। মহাজ্ঞানীরা যুগে যুগে তাই করেছেন। নিয়ন্ত্রিত জীবন যাপন করেছেন। ধৈর্যের পরীক্ষা দিয়েছেন সফলতাকে করায়ত্ত করতে।
আজ স্বপ্ন সাজুক মনে ।
বাজুক সুখের দামামা,।
নিত্য পরিকল্প তোমার ।
হোক দিব্য শুদ্ধনামা।
দিয়ো না করতে বিলিন।
সবটুকু অর্জন হাতে পেলে,।
করো সংযম নিজেরে তবে।
মন ময়ূরী আজি পেখম মেলে।

লেখক- এস জে রতন।
সঙ্গীত শিল্পী, উন্নয়নকর্মী ও প্রশিক্ষক।

পাতাটি ৩৮১১ বার প্রদর্শিত হয়েছে।