দশদিক মাসিক

হোম একটি হাসির কান্না

একটি হাসির কান্না

একটি হাসির কান্না

-মুহাম্মদ সাজিদুল হক

সেলো মেশিনের গগনবিদারী আর্তচিৎকারের সাথে সাথে মুহূর্তকয়েকের মধ্যেই পুরো পাইপের মুখ ভরে বেরিয়ে আসে স্বচ্ছ টলমলে পানির অবারিত স্রোতধারা। অল্পসময়েই নলের মুখ বরাবর অগভীর নালাটি সফেদ সাদা ফেনায়িত পানিতে পরিপূর্ণ হয়ে যায়। নালার চারধার ছুঁই ছুঁই পানি এবার পথ করে নেয় ভেতরবাড়ির উঠোন বরাবর। দ্রুত ধাবমান পানির রেলগাড়ি গড়াগড়ি করে এগিয়ে চলে সমুখপানে। চলার পথে ভাসিয়ে নিয়ে চলে আম-কাঠালের খসে পড়া পাতা, শুকনো খড়কুটো। আর ভাসিয়ে নিয়ে যায় দুরন্ত বালক জায়েদের কৌতহলী, পুলকিত ছটফটে মন।
জায়েদ তার দাদাবাড়ির ছোটকোণায় দাঁড়িয়ে এতক্ষণ ঘটে চলা এসব ঘটনার পূর্বাপর খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিল। এখন তার দাড়ানোর ফুরসত নেই। সে নালা উপচে বেরিয়ে যাওয়া পানির প্রথম স্রোতের সাথে তাল মিলিয়ে ছুটে চলেছে। কখনো স্রোতের মুখে দাঁড়িয়ে পেছনের নালার শুকনো অংশ বরাবর পিছিয়ে যেয়ে পানিকে স্বাগত জানাচ্ছে আবার কখনোবা নিজেই পাতা বা খড়কুটো ছেড়ে দিচ্ছে পানির মুখে নৌকা বানিয়ে। এভাবে সে সবুজ ধানক্ষেতের আইল কেটে বানানো পানি প্রবেশের মুখ পর্যন্ত পৌছে যায়। অপেক্ষা করে তার খড়কুটো আর ঝড়াপাতার নৌকো কিভাবে কতদূর পর্যন্ত এগিয়ে যায় তাই দেখতে। সদ্য যৌবনা সবুজ ধানগাছগুলোর পা ধরাধরি করে পানির প্রবাহের সাথে জায়েদের নৌকাগুলো বেশ দূরঅবধি পৌছে যায়। তারপর হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যায় সবুজ ধানের গহীন সজীবতায়।
সূর্য ততক্ষণে ধীরে ধীরে তার মৃদু-কোমল তুলতুলে আভাকে তাতিয়ে তুলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। জায়েদ আর অপেক্ষা করেনা। সে ফিরে আসে পানির উৎসমুখে। সে অবাক বিষ্ময়ে তাকিয়ে রয়, পানি যেন আর পাইপের মুখে ধরেনা। বলকে, ছলকে, ঝলকে সমানে ফেনিয়ে তুলেছে পুরো নালাটিকে। অগভীর কাচা জলাধারটি ছিটকে উঠা পানিতে তার চারধার সহ ভিজে উঠেছে। এরই মধ্যে বিড়লের নাদুস-নুদুস বাচ্চাটি নালার ধার বরাবর মায়ের সাথে দৌড়তে যেয়ে হঠাৎ পনিতে চুবুনি খেয়েছে। প্রতিকূলতায় অনভ্যস্থ বাচ্চাটি সামলে চলতে না পেরে পুরো নাকাল হয়েছে। অবস্থা আরও খারাপ হওয়ার আগেই দাদী ওকে উদ্ধার করে মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিয়ে এসেছে।
জায়েদ এবার ধীরে ধীরে পানির ড্রেন বরাবর সামনে এগোয়। উৎসমুখে ফুলে ফেপে উঠা পানির স্রোত ক্রমস কমতে থাকে সামনের দিকে। আরও সামনে পানি পুরো স্থির স্থবির। পুরো ড্রেন ভরে রয়েছে। শুধু কাচা নালাটির পাশ দিয়ে পুষ্ট হয়ে গজিয়ে উঠা ছোট-বড় আগাছাগুলোর স্রোত বরাবর হেলে যাওয়া বুঝিয়ে দিচ্ছিল পানি বহমান। এটা জায়েদকে খুব মুগ্ধ করে। ও এবার এগিয়ে যায় বাহির-বাড়ির গোয়াল ঘরের কোণায়। সেখানে লাউয়ের মাচা থেকে চুপিসারে সংগ্রহ করে একটি লম্বা পাটকাঠি। ওটা দিয়ে সে ড্রেনের পানিতে নাড়িয়ে দিচ্ছিল আর পানিতে তৈরি হওয়া মৃদু আলোড়ন যেন তার মনে অনুভব করছিল। তার খুব ইচ্ছে করে পানি ছুয়ে দেখতে। কিন্তু তৎক্ষণাত আম্মুর বারণ আর চোখ রাঙানির ভয় ওর মনের বিরুদ্ধে এসে তাকে শাসন করে। সে নিজেকে সামলে নেয়। এবার সে মাটিতে খসে পড়া লাল টুকটুকে একটি কঁঠাল পাতাকে কুড়িয়ে নেয়। ওটাকে ড্রেনের ঢাল বরাবর পানির দ্রুত বহমান স্রোতে ছেড়ে দেয়। ঢাল পার হয়ে দ্রুত ওটা স্থির পানির স্রোতে চলে আসে। ভাসতে থাকে আর জায়েদ ওটাকে পাটকাঠি দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে করতে সামনে এগোয়। কখনো আবার ঘাসে আটকালে কাঠি দিয়ে ওটাকে মুক্ত করে দেয়। এভাবে ধানক্ষেতের কাচা আইল বরাবর সে তার ইচ্ছে ঘুড়ি উড়াতে উড়াতে এগুতে থাকে।
দুরন্ত জায়েদের উড়ন্ত মনের লাগামে টান পড়ে যখন প্রকৃতির মাঝে মগ্ন জায়েদ হঠাৎ সরু আইলের পিচ্ছিল পথে ভারসাম্য হারায়। পুরো ড্রেনের পানিতে চিৎপটাং।
এই রে পুরো খবর আছে- হাফপ্যান্ট যে ভিজে শেষ- সেন্ডেল ও তো কাদায় আটকে আছে-
এবার?
আম্মু বলেছিল ঠান্ডা লাগানো যাবেনা। এমনকি না বলে বাইরে বের হওয়াও নিষেধ। নইলে পরের বার শীতে দাদাবাড়ি আসা বন্ধ।
এখনতো ও ধরা পরে যাবে-
কি করবে ভেবে পায়না জায়েদ। আবেগে দুচোখ ছাপিয়ে পানি চলে আসে।
কাদায় আটকানো সেন্ডেল তুলতে যেয়ে ফিতে খুলে গিয়েছিল। অনেক কষ্টে আব্বুর কাছ থেকে রপ্ত করা বুদ্ধিটা কাজে লাগিয়ে- পাটকাঠির টুকরা দিয়ে সেন্ডেলের ছিদ্র বরাবর ফিতেতে জোড়ে চাপ দিয়ে সেটা ঠিক করে নেয় সে।
ধরা পড়াতো যাবেনা- বুদ্ধি একটা বেড় করতেই হবে- কিন্তু উপায়?
আস্তে আস্তে ড্রেনের পানি দিয়ে পায়ের কাদা ধুয়ে নেয় সে। হাফপ্যান্ট তার ছোট হাতে যতটা পারে চিপে কচলিয়ে পানি বেড় করে দেয় সে। এবার চলে আসে ওদের বাঁধানো পারিবারিক গোরস্থানের কড়ই গাছ তলায়। শুকনো বাতাস বইছিল সেখানে। ঝিরঝির বাতাসে বৃষ্টির মতে খসে পড়ছিল বৃদ্ধ কড়ই পাতাদল। জায়েদ এবার বুদ্ধি খুঁজে পায়। বাতাসে দাড়িয়ে রোদ বরাবর পেছন ফিরে মাথাটা মাটির দিকে নীচু করে আরও খুব করে পেছনটা তুলে ধরে রোদের দিকে। ধর্য ধরে ১৫-২০ মিনিট একটু পর পর সে এভাবে রোদে প্যান্ট শুকোয়। প্যান্টটা বেশ শুকিয়ে গেলে এবার ওর নিজের বুদ্ধির ওপর আস্থা তৈরী হয়। খুব গর্ব বোধ করে নিজের মনে। আর ভাবে আজ বেঁচে গেলাম।
সেই সকালে খাঁটি সরিষা তৈলে মাখানো মুড়ি আর টোস্ট খেয়ে বেড়িয়েছিল। এখন প্রায় দশটা। আম্মু নিশ্চই ভাত খেতে খুজে বেড়াচ্ছে ওকে। নিজেও ক্ষুধা টের পায়। অগত্যা বাড়ির পথ ধরে ও। বেচে যাওয়ার ব্যাপারে খুব আতœবিশ্বাসী হলেও, ফিরতে দেরী হওয়াতে সে মায়ের চোখ এড়িয়ে সোজা দাদীর কাছে চলে আসে।
দাদী ক্ষুধা পেয়েছে-
খুব আদরে দাদী তাকে রান্না ঘরে বড় পিড়িতে বসিয়ে গরম ভাত, মুরগীর ডিম ভর্তা আর লাউ দিয়ে রান্না করা বড় শিং মাছের তরকারি দিয়ে খেতে দেয়। মা কোথায় যেন খুব ব্যাস্ত ছিল। তাই খাওয়া শেষে দাদীর অনুমতি নিয়ে আবার ছুট।
সারাদিন পাড়া দাপিয়ে যখন গোছলের জন্য ডাক পড়ে তখন বাড়ি ফিরল জায়েদ। একান্ত অনিচ্ছায়, বারেক ভাইয়ের জোড়াজোড়িতে। বারেক ভাই ওদের বাড়ির বছরের চুক্তির কাজের লোক। জায়েদের খুব পছন্দের। কারণ সব দুরন্তপানা আর আবদারের অনেক বড় আশ্রয়স্থল হল এই বারেক ভাই। বারেক যখন বলল আম্মু খুব রেগে আছে, তখন আর দেরী করার সহস করলনা জায়েদ। চুপিসারে বারেক ভাইয়ের হাত ধরে আম্মুর সামনে এসে দাঁড়ায়। সামনে আসতেই আম্মুর চোখ চলে যায় ওর প্যান্টে শুকিয়ে উঠা হালকা ছোপ ছোপ কাদার দাগের দিকে।
আম্মু জিজ্ঞেস করে, জায়েদ তুমি কি পানি ধরেছ? জায়েদ উত্তর দেয়, না তো আম্মু।
আর কিছু বলেনা আম্মু। ভালভাবে শরীর রগড়ে গোসল দিয়ে দেয় আম্মু। তোয়ালেতে শরীর মুছিয়ে দেয়ার সময় সে আম্মুর শাড়ির আচলে খেলে চলে। শরীর মুছিয়ে উঠোনের রোদে জলচকিতে নিয়ে আসে আম্মু। তারপর শরীরে তেল লাগিয়ে, মুখে ক্রীম দিয়ে দেয়। মাথা আচড়াতে আচড়াতে আম্মু বলে-
জায়েদ আম্মুর কাছে কি মিথ্যে বলতে হয়, সোনা?
যায়েদ কিছু অনুমান করতে পারেনা। ফেল ফেল করে তাকায়। হঠাৎ তার মাথায় আসে ড্রেনের পানিতে পড়ে যাওয়ার কথা। সে সচকিত হয়ে পাল্টা প্রশ্ন করে-
তুমি কি করে বুঝলে আম্মু? আম্মু উত্তরে বলে-
আম্মুর কাছে কোন মিথ্যেই লুকনো যায়না বাবা, বলে মুচকি হাসে।
২৬ বছর আগের সেই পরম নির্ভরতা, সকল ভুলে-ত্র“টির শেষ আশ্রয়স্থল মায়ের চিরসুন্দর মমতাভরা মৃদু হাসিটির কথা মনে পরে জায়েদ আর চোখের পানি ধরে রাখতে পারেনা। তার চোখের পানি গাল গড়িয়ে ঝড়ে পড়ে তার কোলে শুয়ে থাকা অসুস্থ মায়ের মুখে। নিয়তির অঘোম নিয়মে জায়েদের মা আজ বার্ধক্যজনিত রোগে শয্যাশায়ী। ৭ দিন যাবত হাসপাতালে ভর্তি। ডাক্তারের ভাস্যঅনুযায়ী তার মায়ে রোগমুক্তি এখন অনেকগুলো যদির উপর নির্ভরশীল। সময়ের সাথে সাথে মায়ের অবস্থা ঝুলন্তভাবে প্রতিনীয়ত পরিবর্তনশীল। জায়েদ সবই জানে। সে আরও জানে মাও তার নিজের অবস্থা আঁচ করতে পেরেছে। জায়েদ পরম মমতায় তার মায়ের মুখটি কোলে তুলে নেয়। মায়ের রোগাক্লিষ্ট মুখের দিকে মমতাভরা চাহনি নিয়ে তাকাতেই পেছনের দিনগুলোর কথা মনে পড়তে থাকে ওর। আর তার বুক ফাটা আবেগে জন্ম নেয়া অশ্র“ অসাবধানতাবশত ঝড়ে পড়ে তার মায়ের মুখে। যা তার অসুস্থ মায়ের বেদনাজড়ানো অবচেতন মনকে সচেতন করে তুলে। ছেলের মনের না বলা বেদনার করুণ সুর মায়ের মনকে আন্দোলিত করে। তাই ছেলের কষ্টকে সহনীয় করার অদম্য ইচ্ছা, যেন মায়ের রোগজর্জড়িত দুর্বল মনে শক্তি যোগালো। রোগাক্লিষ্ট, পরিশ্রান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল-
বাবা যায়েদ কি হয়েছে- কষ্ট পাচ্ছ কেন?
জায়েদও মায়ের মনে সাহস যোগাতে নিজেকে যথাসম্ভব শক্ত রেখে বলে-
কই আম্মু কিছু হয়নিতো- আম্মু বলে- আম্মুর কাছে কোন মিথ্যেই লুকনো যায়না বাবা-
বলে তার রোগাক্লিষ্ট যন্ত্রণাকাতর মলিন মুখটি আপ্রাণ চেষ্টায় প্রসারিত করে সেই পরিচিত নির্ভরতার মুচকি হাসি হাসতে।
লেখক -মুহাম্মদ সাজিদুল হক
e-mail: msajidul.khan@yahoo.com

পাতাটি ৩৭৯৭ বার প্রদর্শিত হয়েছে।