দশদিক মাসিক

হোম আউট অব নেটওয়ার্ক : অতঃপর শিখন

আউট অব নেটওয়ার্ক : অতঃপর শিখন

- এস জে রতন

ক্রিং ক্রিং হ্যালো হ্যালো
কে ওপারে? শুনছি, কথা বলো বলো।

হ্যালো, কথা বুঝতে পারছি না ভাল
একটু জায়গা চেঞ্জ করো, হেলো না হয় দোলো।

তবে নেটওয়ার্ক পাবে ভালো, স্পষ্ট হবে কথা
ওহ্! লাইনটাই কেটে গেলো, লাগলো মনে ব্যথা!

২০০১ সালের কথা। শখ করে টিউশনীর টাকা জমিয়ে একটা গ্রামীণফোন সিমসহ নকিয়া সেট কিনল তমাল। তমালের বাবা ছেলের এমন ভাবে সঞ্চয় করে কোনকিছু কেনার বিষয়ে বেশ খুশি হল। অন্তত ঘরের জমানো টাকা ব্যবহার না করে নিজের যোগ্যতায় কিছু করাটা বেশ ভাল চোখে দেখলো। তমাল তার এই মনের বাসনার কথা মোবাইল কেনার আগে কখনো কাউকে জানায়নি। তবে খুব ইচ্ছে ছিল কি করে একটা মোবাইল কেনা যায়। বাবা স্বউদ্যোগী হয়ে মোবাইলের জন্য দামী একটা মোবাইল কাভার কিনে দিলেন। বললেন- তোর কাজে খুশি হয়ে এটা আমার টাকা থেকে তোকে কিনে দিলাম। পরিবারের সবার মধ্যে এই একটাই মোবাইল ফোন তখন। পরিবারের লোকজন তো বটেই, পাড়া পড়শি অন্যান্যরাও তাদের সাথে যোগাযোগের জন্য এই তমালের সেল নাম্বারই দিতে শুরু করল। কতজন কত রকমের কথা বলার জন্য কতজনকে যে চায়, তা আর বলার অপেক্ষাই যেন রাখে না। এমন কিছু কলও আসতো যার জন্য মধ্যরাতে কাঁচা ঘুম থেকে উঠে, এক কিলোমিটার হেঁটে চিৎকার করে ডেকে তারপর কথা বলার জন্য মোবাইল এগিয়ে দিতে হত। তমালের কল খুব কমই আসতো। কারণ তখন তমাল সবেমাত্র পড়া শেষ করে নতুন একটি চাকরিতে যোগদান করেছে। গ্রামে থাকলে ঘরের বাইরের আঙ্গিনায় যেখানে খোলা মাঠের সবুজ দৃশ্য চোখ জুড়িয়ে যায় সেখানে মোবাইল নেটওয়ার্ক পাওয়া যেত। ঘরের মধ্যে নেটওয়ার্ক কখনো পাওয়া যেত কখনো পাওয়া যেত না। তবে রাত্রে নেটওয়ার্ক থাকত। মোবাইল স্ক্রীনে ভেসে থাকা নেটওয়ার্কের পাঁচটি বারের মধ্যে এক আর দুইয়ের মধ্যে থাকত। দুর্বল নেটওয়ার্ক। তবে কথা বলা যেত। কখনো কখনো এমন হত সারাদিনে বাড়ির খোলা আঙ্গিনার কাছে গেলেও নেটওয়ার্ক পাওয়া যেত না বা ধরা যেত না। তখন বাড়ির সামনের পুকুরের কাছে গেলে নেটওয়ার্ক পাওয়া যেত। পানির সাথে নেটওয়ার্কের একটা সম্পর্ক আছে বোধ হয়। পানির অপর নাম জীবন। ঠিক তেমনি জীবনের সাথেও নেটওয়ার্কের একটা সম্পর্ক আছে। জীবন থাকলেই নেটওয়ার্ক থাকে আর জীবন নেই তো নেটওয়ার্ক নেই।

পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে এক কবি ভদ্রলোক তার জরুরী এক দরকারে তমালের নানার সাথে দেখা করার জন্য অনেক পথ মাড়িয়ে, ভ্রমণে অনেক কষ্ট সহ্য করে জামালপুরে এসে কবি বন্ধুর বাড়িতে এসে পৌঁছলেন। নানা কবির সাথে এই কবি ভদ্রলোকের কোন একসময় বেশ বন্ধুত্ব ছিল। সে অনেক বছর আগের কথা। দুই বন্ধু তখন একসাথে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে সবাইকে মাতিয়ে রাখতেন। কালের পরিক্রমায় যোগাযোগটা এক পর্যায়ে বন্ধ হয়ে যায়। জীবনের প্রায় শেষ সময়ে এসে এই কবি ভদ্রলোকটির মনে পড়ে যায় তমালের নানার কথা। সে সময়ে হাতে গোনা কিছু পত্রিকা আর মিডিয়া ছিল। যে কারণে কোনভাবে যোগাযোগ আর সম্ভব হয়ে ওঠেনি। একে অপরের কিছু কবিতার গুরুত্বপূর্ণ পান্ডুলিপি এই দুই বন্ধুর কাছেই ছিল। বিশেষ প্রয়োজনেই এগুলো এখন বাংলাদেশ সরকারের এক ট্রাস্টিতে সংরক্ষণ করতে চাইছেন এই কবি ভদ্রলোক। যেগুলো নাকি যুগের পর যুগ আর্কাইভে থাকবে আর নতুন নতুন কবিরা এই লেখাগুলো নিয়ে গবেষণা করবে। যখন জানানো হল উনি আর বেঁচে নেই, তখন প্রায় অজ্ঞান হবার মত অবস্থা হলো অতিথি কবির। কাঁদতে কাঁদতে বললেন- উনার কাছে কবিতা সাহিত্যের অনেক মূল্যবান সম্পদ ছিল, যা শুনে বা জেনে লিখে রাখা যেত। অনেক বড় ক্ষতি হয়ে গেল। আউট অব নেটওয়ার্ক হলে যা হয় তাই হল। যদি এই দুই বন্ধুর মাঝে কোন না কোনভাবে যোগাযোগ রাখা সম্ভব হত তাহলে হয়তো এমনটা হত না। ভদ্রলোক এই বাড়িতে থাকা অবস্থায়ই তার পরিচিত আরো কিছু কবি বন্ধুর নাম ও ঠিকানা মনে করে তালিকা করে লেখার চেষ্টা করল, যাতে এই ধরনের ভুল আর না হয়। আমরা মানুষ, এমন ধরনের যে যখন আমাদের কাছে রতœ মাণিক্য থাকে তখন তার গুরুত্ব অনুধাবন করি না। আবার যখন কাছে না থাকে বা কোনভাবেই আর তাকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয় না, তখন ব্যতি-ব্যস্ত হই, আফসোস করি আহা কি হারিয়েছি! জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার জীবদ্দশায় দুঃখ করে বলেছিলেন- বাংলা সাহিত্যের গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধে আমি কি দিয়েছি জানি না, তবে আমার গানে আমি যা দিয়েছি তা আমার মৃত্যুর পর মানুষ উপলব্ধি করবে।

একটু খানি ছিল তোমার পূঁজি
তাতেই একটু আমার প্রেম বুঝি;

একটু ভাললাগা বাড়লো বড়
তবে নেটওয়ার্কটা তুমিই শক্ত করো;

এভাবেই শুরু, আর শেষটা যেন না হয়
তোমার আমার এই নেটওয়ার্কটা আজীবন যেন রয়।

স্কুল জীবন থেকে ভাললাগা। নরম স্বভাবের নীলিমা মেধাবী বাদলের সবকিছুতেই যেন আকর্ষণ অনুভব করে। পড়া সংক্রান্ত যে কোন বিষয়ে প্রায়ই সাহায্য নিত নীলিমা। পাশের গ্রামে এক চয়োরম্যানের বাড়িতে লজিং থেকে পড়াশোনা করত বাদল। বাদলদের বাড়ি খুলনায়। ময়মনসিংহে এসে নীলিমাদের স্কুলে অষ্টম শ্রেণীতে ভর্তি হয়। নবম শ্রেণীতে প্রথম হয়েই সবার নজরে আসে বাদল। স্কুলের শিক্ষক, অভিভাবক, পাড়া-পড়শি, বন্ধু-বান্ধবি সবাই খুব আদর, স্নেহ আর সমীহ করে। স্কুল থেকে ফেরার সময় একসাথে হেঁটে বাড়ি যেত নীলিমা বাদলসহ চার পাঁচজন বন্ধু। একদিন নীলিমা হঠাৎ মাথা ঘুরে রাস্তায় পড়ে যায়। অন্য বন্ধুরা নীলিমার বাবাকে খবর দেবে বলে চলে গেলে বাদল সেখানেই নীলিমার পাশে ছিল। অনেকটা সময় পেরিয়ে গেলে বন্ধুদের কেউ বা নীলিমার বাবা বা কোন আত্মীয়-স্বজন যখন এগিয়ে আসতে দেখা গেল না, তখন বাদল নীলিমাকে দুইহাতে ধরে তুলে নিয়ে ঘাসে শুইয়ে দেয়। নীলিমা অজ্ঞান হয়ে শুয়ে থাকে। মেঠো পথ, কাছে কোলে কোন বাড়ি না থাকায় নীলিমাকে জাগিয়ে ধীরে ধীরে কাছের এক বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার চিন্তা করে বাদল। কিন্তু নীলিমাকে তো জাগিয়ে তুলতে হবে। পাশের এক নিচু জলাশয় থেকে হাতের পাঞ্জায় করে পানি এনে নীলিমার চোখে-মুখে ছিটিয়ে দেয়। নীলিমা জেগে উঠলে বাদলের কাঁধে ভর দিয়ে নীলিমাকে পাশের এক বাড়িতে নিয়ে যায়। এই ঘটনার পর থেকেই বাদলের প্রতি টান অনুভব করতে থাকে নীলিমা। শুচি শুদ্ধ এক পবিত্র প্রেমের উপক্রমণিকা যেন। প্রয়োজন আর লেখাপড়ায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের কারণে যোগাযোগে কিছুটা হলেও ছেদ পড়ে নীলিমা আর বাদলের মধ্যে। ভিন্ন কলেজে ভর্তি হওয়া, ভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া, জীবন নিয়ে ভাবা, চাকরীর সন্ধান, বিভিন্ন বিষয় বেশ গুরুত্বের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলে। অনেকগুলো সময় পেরিয়ে যায়। মোবাইলে কথা হত সবসময়। হঠাৎ বাদলের মোবাইল বন্ধ। নীলিমা খুলনায় বাদলের পূর্ণাঙ্গ ঠিকানা নেবার প্রয়োজন কখনো অনুভব করেনি। কারণ মোবাইলেই সবসময় কথা হত। আর সম্পর্কটা চলছিল অনেক ভদ্রোচিতভাবে, তাই হয়তো অতোটা খোলামেলা হয়ে সবকিছু জেনে নেয়া সম্ভব হয়নি। প্রায় নয় বছরের সম্পর্ক হঠাৎ মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ হবার কারণে শেষ হয়ে যাবে, এটা মেনে নিতে খুব কষ্ট হচ্ছিল নীলিমার। নীলিমা ভাবছিল- আমি না হয় তার বাড়ি চিনিনা কিন্তু চাইলে সে তো ময়মনসিংহে আসতে পারে। আমার বাড়ি, ঠিকানা সবকিছু চেনে সে। কোন কারণও খুঁজে পাচ্ছেনা। কেন হঠাৎ এমন হবে? বাদলের তো নীলিমার নাম্বার জানাই আছে, তাহলে যে কোন ভাবে কথা বলা সম্ভব। এমন তো হবার কথা না? কিন্তু এমন হল। এতো আলাপ হতো তাদের দু’জনের মাঝে, কত গুরুত্বহীন কথায় দিনের পর দিন, সময়ের পর সময় পার করেছে এই দু’জনে। অথচ কত কিছুই না অজানা থেকেছে? সারা জীবনে মানুষ এভাবেই বোধ হয় অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাদ দিয়ে গুরুত্বহীন বা কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে সময় পার করে। মনের সাথে অনেক বোঝা পড়া করে একসময় খুলনার উদ্দেশ্যে রওনা হয় নীলিমা। বাদলের সাথে কথা বলার সময়, খুলনায় তাদের বাড়ি, স্কুল সেখানকার আত্মীয়-স্বজন বিভিন্ন বিষয় জানিয়েছিল, সেই কথাগুলো মনে করে, অনেক কষ্টে নীলিমা ঠিকই বাদলের বাড়ি খুঁজে পেয়েছিল। কিন্তু সড়ক পথে দুর্ঘটনায় বাদল মারা যাবার সময় কেউ নীলিমাকে এই খবর জানাতে পারেনি। বাদলের নাম্বারও সেসময় থেকেই বন্ধ। বাদল এখন আউট অব নেটওয়ার্ক। কোন নেটওয়ার্কেই তাকে আর ধরা যাবে না। এখন নীলিমার সংসার আছে। সন্তান আছে। স্বামী সন্তানকে সারাক্ষণ নজরে নজরে রাখে। এদের প্রতিটি কথা আর মুহূর্তকে গুরুত্ব দেয়।

চাকরির প্রয়োজনে প্রশিক্ষণ করাতে পার্বত্য এলাকায় গিয়েছেন তমাল। রাঙ্গামাটির এক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে বার দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ চলছে। বছর দশেক আগের কথা। এই এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক প্রায়ই সমস্যা করত। নেটওয়ার্ক পাওয়া যেন ভাগ্যের ব্যাপার ছিল। ঘুরতে ঘুরতে কোন স্থানে নেটওয়ার্ক পাওয়া গেলেও বেলা বাড়া বা কমার সাথে সাথে নেটওয়ার্কের সবলতা দুর্বলতার পার্থক্য ঘটত। সন্ধ্যা বা গভীর রাত বা খুব ভোরে নেটওয়ার্ক কিছুটা পাওয়া যেত। তমাল ঢাকার সাথে, পরিবারের সাথে ঐ সময়গুলো খেয়াল রেখেই কথা বলত। প্রশিক্ষণ সময়ের শেষে একদিন বিকেলে অংশগ্রহণকারী এবং তমাল মিলে কর্ণফুলী নদীতে ঘোরা এবং সুবলং ঝর্ণা দেখবে বলে নৌকা ভাড়া করল। সাধারণত যেটা হয়, যেকোন জমায়েতেই দেখা যায় প্রায়ই জমায়েত দু’টো ভাগে ভাগ হয়। একটি হচ্ছে মোটামুটি তরুণ বা কম বয়েসীদের দল অন্যটি হচ্ছে এই বয়সের চেয়ে একটু বেশি বয়সের কিছুজনের আরেকটি দল। নৌকা চলতে চলতে একটি ঘাটে থামাল। কেমন করে যেন ঘুরতে ঘুরতেই দু’টো দলে ভাগ হয়ে গেল পুরো মূলদলটি। দু’টো মেয়ে অংশগ্রহণকারী তারাও ঐ তুলনামূলক তরুণের দলেই দলভুক্ত হলো। প্রশিক্ষকসহ চব্বিশ জনের মধ্যে চৌদ্দজন তমালদের সাথে বাকি দশজন লাপাত্তা। এই তো এখানেই ছিল, সবার একসাথেই তো থাকার কথা ছিল। কিন্তু বাকিরা কোথায় গেল? -এক অংশগ্রহণকারী বলছিলেন। একজন তো মজা করে বলেই ফেললেন- ভাই আমাদের দলের ট্রেইনার স্যারও তো তরুণ, তাকে বয়ষ্কদের দলে দিয়ে বাকিরা কিভাবে দল গঠন করল? এ ভারি অন্যায়, কালকের ক্লাসে এটা নিয়ে ঐ গ্র“পের জরিমানা ধরা হবে। সন্ধ্যা হয়ে আসলো প্রায়। এর মধ্যে ঐ দলের কারো সাথে কয়েকবার মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে পুত পুত শব্দ করে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছিল। যার যার কাছেই মোবাইল ছিল, হাতে নিয়ে দেখা গেল মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই। একজন বলে উঠলেন- ঐ দলে তো রাঙ্গামাটির স্থানীয় কেউ নেই। সন্ধ্যার পর এখানে অপরাধের মেলা বসে, কিছু একটা হয়ে গেলে কি অবস্থা হবে তাদের? তমালের খুব দুশ্চিন্তা হল। সর্বোপরি সে এই পুরো দলের লিডার, প্রশিক্ষক। যদি সে তাদের সাথে না থাকত বা এই ঘোরাফেরার অনুমোদন না দিত তবে হয়ত দায় থেকে মুক্ত থাকা যৌক্তিক হত। তিন্তু এখন তো সে উপায় নেই। এই তাগড়া তাগড়া যুবক আর মধ্যবয়ষ্ক লোকগুলোকে নিয়ে তার এমন বিপদে পড়তে হবে ভাবতেই যেন পারছিল না।

এদিকে সন্ধ্যা প্রায় ঘনিয়ে আসছে, অন্ধকার জেঁকে বসছে। সন্ধ্যা হওয়ায় মোবাইলের স্ক্রীনে নেটওয়ার্ক বার এক-দুই করে আপ-ডাউন করতে দেখা গেল। তমাল বলল- আপনাদের কারো কাছে ঐ দলের কারো নাম্বার আছে? তমালদের দলের একজনকে পাওয়া গেল যে ঐ দলের কোন একজনের সাথে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে একই কক্ষে থাকে। তার কাছে তার রুমমেটের মোবাইল নম্বর আছে কি না জানতে চাওয়া হলে বলল- একসাথে থাকতে গিয়ে অনেক কথাই তো হয়েছে এই এগার দিনে কিন্তু কেন যেন মোবাইল নম্বরটা নেয়া হয়নি, ভেবেছি শেষ দিনে নেব। তমালের প্রায় রাগই হচ্ছিল। অভিজ্ঞতা থেকে বললেন- হ্যাঁ শেষ দিনেই তো নেবেন! শেষ দিনে ব্যাগ গোছাতে গোছাতে, ভাই আমার বাসের সময় হয়ে গেছে, বেরোচ্ছি, পরে দেখা হলে মোবাইল নম্বরটা নিতে পারবো, পরে যেকোন ট্রেনিং-এ আবার দেখা হবে, তখন বিস্তারিত আলাপ হবে। বার দিনেই আসল তথ্যগুলো শেয়ারিং-এর সুযোগ হল না, আবার কি না কোন অনিশ্চিত কালে দেখা হলে তখন মোবাইল, ঠিকানা ইত্যাদি নেয়া হবে। এটাই করি আমরা। যখন আউট অব নেটওয়ার্ক হই, তখই গুরুত্ব বুঝতে পারি কি ভুলটা হলো। এবার ঐ দলের একজনের নাম্বার এখানকার একজনের কাছে থাকায় সে কল দেবার চেষ্টা করে কিন্তু এখানে নেটওয়ার্ক থাকলেও ঐ অংশগ্রহণকারী হয়তো আউট অব নেটওয়ার্ক তাই বেরসিক নারী কণ্ঠ বলে উঠল- এই মুহূর্তে মোবাইল সংযোগ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। অনুগ্রহ করে আবার চেষ্টা করুন। প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে কল করে আরো কিছু অংশগ্রহণকারীর মোবাইল নাম্বার নিয়ে কল করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হল, কারণ ঐ দলটি যেখানে আছে সেখানে হয়তো নেটওয়ার্ক নেই। অগত্যা দশজনকে ছাড়াই দ্রুত কর্ণফুলী নদীর জল চিরে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে উপস্থিত হল তমালরা। এবার অপেক্ষা করা কখন আল্লাহ্র দয়া হয় আর বাকি চৌদ্দজন কেন্দ্রে আসেন। রাত বারটা পর্যন্ত অপেক্ষা করে সবাইকে অক্ষত পাওয়া গিয়েছিল বটে। তবে শিক্ষা হয়েছিল প্রচন্ড যে আলোচনা, পরিকল্পনা, শেয়ারিং, যোগাযোগ আর নেটওয়ার্কের মধ্যে থাকার মধ্যে গুরুত্ব কত।

নষ্ট তুমি হয়েছ বেশ, এবার একটু থামো
গভীর জলের ঢেউ দেখেছ, এবার একটু নামো;

সাঁতার জেনে উঠলে কূলে, ভাবলে বেঁচে গেলে
কুমির তো জলেই আছে, ডাঙ্গার বাঘ দেখে ভয় পেলে?

সময়টাকে বেশ বোঝো তো, বানাও টাকা কড়ি
নিঃস্ব হওয়ার ক্ষণগুলো তো অপেক্ষায় পেতে আড়ি।

প্রতিটি উদ্ভাবনের বা আবিষ্কারেরই ভাল দিক আছে। আবার চাইলে এই ভাল দিকগুলোকে মন্দভাবেও ব্যবহার করা যায়। নেটওয়ার্কের মধ্যে থেকে এর ভাল ব্যবহারই সবার কাম্য। কিন্তু সবাই যদি অতো ভালই হতো তবে তো স্বর্গ এই বিশ্বই হতো। বাবার তিন তিনটা ছেলের মধ্যে এই ছেলেটি বেশ দুষ্ট। এখন তো আবার দুষ্ট বলতে মিষ্টি বোঝানো হয়। আসলে দুষ্ট বলতে খারাপ, নষ্ট। ছেলের নেটওয়াকিং ক্ষমতা যথেষ্ট চরম। কিন্তু ছেলে সম্পর্কে বাবার নেটওয়াকিং ছিল যথেষ্ট নরম। তাই ছেলে হাইস্কুল পার হতে না হতেই বড়দের সবকাজে অভ্যস্ত। অকালপক্ক যাকে বলে। আঠার বছর আগে প্রায় সবগুলো পত্রিকায় একটি খবর রেবিয়েছিল, আমেরিকার এক বার বয়েসী ছেলে শিশু কোন এক নামকরা কোম্পানীর সিইও হয়েছিলেন। তার বুদ্ধিমত্তা আর সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনা করার ক্ষমতা এত প্রখর ছিল যে স্কুলের শিক্ষকম-লী আর বোর্ড তাকে স্বপ্নদিনেই একের পর এক সার্টিফিকেট দিয়ে তার সমস্ত অ্যাকাডেমিক পরীক্ষায় তাকে উত্তীর্ণ ঘোষণা করেছিলেন। প্রতিষ্ঠানের কর্মকা-, পরিকল্পনা আর সিদ্ধান্ত গ্রহণে সে এত পারদর্শী ছিল যে, এত ছোট একটি শিশুকে অফিসের বিভিন্ন বয়েসী আর অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সমস্ত কর্মচারী-কর্মকর্তাগণ তার নির্দেশনায় চলত। সুনামও কুড়িয়েছিল বেশ, তাইতো বিশ্ব সংবাদে তাকে নিয়ে আলোচনার ঝড় উঠেছিল তখন। এই দুষ্ট ছেলেটি ঠিক তার উল্টো। বাবা, মা সংসার চাকরি কাজ নিয়ে ব্যস্ত। দু’টো ছেলে নিজ দায়িত্বেই মোটামুটি বড় হচ্ছিল। তৃতীয় এই ছেলেটি যাচ্ছে তাই। খারাপ বন্ধুদের সাথে বেশি মিশত। লেখাপড়ায় মনোযোগ কখনোই ছিল না। ভাল কাজের স্বীকৃতির মধ্যে আত্মার যে শান্তি নিহিত তা তাকে কখনো কেউ বোঝায়নি বা বোঝানোর চেষ্টা করেনি। একদিন এই ছেলেটি অনেক বড়লোক হল। শহরে, মহল্লায়, গ্রামে, পাড়ায়, পার্টিতে তার বেশ প্রভাব। নামকরাও বেশ। সবাই চেনে। সামনে দামও দেয়। অনেক লোকের কাছ থেকে যেমন চাঁদা নেয় তেমনি অনেক লোককে আবার পোষেও বটে। তাই দৃশ্যত তার কোন শত্র“ নেই বরং ভক্ত আছেন প্রচুর। ক্ষমতা আর দাপট দেখানো এবং নিজস্ব অন্যায় ব্যবসাগুলোকে ঠিকভাবে চালিয়ে নেবার জন্য বিশেষ বিশেষ দলবাজিও করেন। এখন বাবা-মা তাকে নিয়ে বেশ নিশ্চিন্তা। বাকি দুই ছেলে চাকরি করছেন, কোনমতে সংসারটাকে চালিয়ে নিচ্ছেন। কোন ঋণ নেই কারো কাছে। নিপাট ভদ্রলোক এরা। কাউকে বড় পরিসরে সাহায্যও করতে পারেন না, আবার কারো ক্ষতির কোন কারণও হন না। সমাজের চোখে সাদামাটা, সাধারণ, নিম্ন মধ্যবিত্ত।

জ্ঞানীদের চোখে এই দুইভাই-ই হচ্ছেন সবচেয়ে বড় ধনী ও সুখি। অন্যায় উপার্জন আর নৈতিকতা বর্জিত ক্ষণকালের ক্ষমতা দিয়ে হয়তো কিছু যুগ দাপটের সাথে বসবাস করা যায়। নেটওয়ার্কের সবচেয়ে চূড়ায় অবস্থান করা যায় কিন্তু আউট অব নেটওয়ার্ক হলে তখন? নেটওয়ার্ক বলতেই আমরা বুঝি অন্তত দু’টি বা বহু মাধ্যমে পুরো যোগাযোগ ব্যবস্থা সঠিকভাবে সম্পন্ন হওয়া। কিন্তু একপক্ষীয় নেটওয়ার্কও হতে পারে। তখন সেই নেটওয়ার্কের একপক্ষ শুধু তথ্য দিয়ে যাবে আর অপরপক্ষ শুধু তথ্য পেতে থাকবে কিন্তু কোন প্রত্যুত্তর করতে পারবে না। মৃত্যুর পর মানুষের তা-ই হয়। প্রায় সবকিছুই আমরা খুব সাধারণ চোখে দেখে থাকি। জ্ঞানী হতে হলে অসাধারণ চোখে দেখতে হবে। বিভিন্ন পর্যায় বা পক্ষ থেকে দেখতে হবে। তবেই বোঝা যাবে আসল রহস্য। একটা খুব জনপ্রিয় কৌতুক আছে- শিক্ষক ক্লাসের দুষ্ট ছেলেটাকে পড়ায় মনোযোগ ফিরিয়ে আানার জন্য প্রশ্ন করলেন- আবির, বলতো, তোমার একপাশে যদি জ্ঞান রাখা হয় আর অন্যপাশে যদি টাকা রাখা হয়, তবে তুমি কোনটি বেছে নেবে? আবিরের চটপট উত্তর- কেন স্যার? খুব সহজ, আমি টাকাই নেব। শিক্ষক বললেন- আমি হলে জ্ঞান নিতাম। আবির সবাইকে অবাক করে দিয়ে সাথে সাথে বলে উঠল- স্যার, যার যেটা অভাব! তাহলে বোঝাই যাচ্ছে এই ধরনের ছাত্র টাকাকে চিনবে না কি যে শিক্ষক বা যারা এই শিক্ষকের অনুসারী তারা বড়লোক হবে? অর্থের সাথে জ্ঞানের সম্পর্ক খুবই কম। জ্ঞানকে অর্থের মূল্যে কখনোই মাপা সম্ভব নয়। প্রকৃতপক্ষে জ্ঞানীরাই সুখি হয়, স্বর্গ পায়। এই নেটওয়ার্কের যেকোন প্রান্তই সচল থাকুক না কেন তা উপকারেই দেয়। মধ্যিখানের মিডিয়া হন স্বয়ং আল্লাহ্ই।

বৃক্ষের পরিচয় ফলেই। আবার একটা বৃক্ষ রোপন করলে যেমন বেঁচে থাকা পর্যন্ত তার ফল পেতে থাকার ব্যাপারটি থাকে, তেমনি পৃথিবীর সময় তো সময়ের শেষ পর্যায় নয়, ইহ-পরের মহাকালের ক্ষণিক অংশ মাত্র, তাই সুসন্তান, সুবংশধর বা সুকর্ম বা সুবিনিয়োগ থেকেও অনন্তকাল পর্যন্ত এর ভাল ফলাফল পাবার সুযোগ থাকে। তখন নেটওয়ার্ক মৃতব্যক্তির দিক থেকে একপক্ষীয়ভাবে বলবৎ থাকে। মৃতব্যক্তির কিচ্ছু করার থাকে না কিন্তু যা করে ফল পাবার ব্যাপারটি ছিল, তা থেকে ফল পেতে থাকেন। যদি ভাল কিছু করেন তো ভাল কিছুই পাবেন আর খারাপ বা মন্দ কিছু করে থাকলে মন্দই পেতে থাকবেন। দুনিয়ার দিক থেকে সকল নেটওয়ার্কের বাইরে থেকেও কিভাবে জীবন্ত মানুষগুলো মৃতব্যক্তিদেরকে, বিশেষ করে বাবা-মাকে সুখী বা অসুখী রাখছেন তা সহজেই অনুমেয়। প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে যেমন সকাল দেখি তেমনি একদিন ষাট/সত্তর/আশি/নব্বই বছর পর একদিন সকালে ঘুম থেকে জেগে মনে হবে- এতোগুলো সময় পেরিয়ে গেল? বুঝলামই না? আজ দেহের সেই টগবগে জৌলুস নেই, মনের সেই কামনা নেই-থাকলেও উপায় নেই, শত রোগে আর জরায় ক্লান্ত এ দেহটি নুয়ে ভেঙ্গে পড়ার অপক্ষোয়। মনে হবে সারাটা জীবন এতো এতো নেটওয়ার্কে থেকে প্রকৃত অর্থে কি উপকার করতে পেরেছি পৃথিবীর বা নিজের? অথচ আউট অব নেটওয়ার্কে যাবার আগে এখন বুঝতে পারছি- সব খেলা ছিল, শুধুই খেলা। তেল গেলে ফুরাইয়া বাত্তি যায় নিভিয়া/ কি হবে আর কান্দিয়া.../নকল হাটে আসল সোনা গেলাম বেচিয়া...।

লহো তারে বিনাশী, উগ্র বড় মত্ত রহে এ মম
বিলায়ে সবই, খোঁজো রবি, ভাঙ্গো মোর ভ্রম;

শুদ্ধ বিচারি, মগ্ন ধ্যানে করো মর্ম বিদারি
মহাকল্য পটে অবিকল্য করো তিমির বিদূরি।


লেখক: এস জে রতন
কথাশিল্পী, সঙ্গীতজ্ঞ, প্রশিক্ষক ও উন্নয়নকর্মী।

পাতাটি ৩৭৯৪ বার প্রদর্শিত হয়েছে।