দশদিক মাসিক

হোম একটি চঠিি এবং অতঃপর

একটি চঠিি এবং অতঃপর

-মুহাম্মদ সাজিদুল হক
য় দেড় যুগ আগের কথা বলছি। মোবাইল মেসেজের পেরন তখনও হয়নি। নিত্য প্রয়োজনীয় দূরবর্তী যোগাযোগের একমাত্র বিশ্বস্ত মাধ্যম তখন চিঠিপত্র। বাবার কাছে টাকা চাহিয়া পত্র বা বন্ধুর নিকট কোন উল্লেখযোগ্য ঘটনার বর্ণনা দিয়ে পত্র লিখা তখন বাংলা দ্বিতীয় পত্র পরীক্ষার প্রতি বছরের প্রায় নির্ধারিত প্রশ্ন ছিল। ঘটা করে আমরা তখন সুন্দর করে পত্র লিখা শিখতাম। কোন জরুরী সংবাদ অথবা কোন হৃদয়ে ঝড় তোলা আবেগ কলমের কালি দ্বারা কাগজে লিপিবদ্ধ অবস্থায় খামে বন্দি হয়ে ঐ ডাকপিয়নের হাত দিয়েই বিলি বন্টন হতো। তাই ডাকপিয়ন তখন অনেক কাঙ্খিত ব্যক্তি হিসেবে পোস্টঅফিস টু প্রাপকের বাড়ি দাপিয়ে বেড়াত।
জায়েদ তখন সবে এইচ, এস,সি পাশ করেছে। নামকরা সব সরকারী বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গন ঘুরে বেড়াচ্ছে নিজে কোন একটিতে তার পছন্দের বিষয়ে সুযোগ করে নিতে। সরকারী বিশ্ববিদ্যালয় তখন সবে তের টি। বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় স্বভাবতই ভাল ছাত্রদের কাছে ততটা গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। জায়েদ বেশ ভালমানের ছাত্র। এস,এস,সি তে উপজেলায় প্রথম। ৮৫০ এর উপর নম্বর। রেসিডেন্সিয়াল থেকে এইচ, এস, সি। তার লক্ষ্যটাও তাই প্রথম সাড়ির যেকোন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালমানের সাবজেক্ট।
এবারের মিশন ছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। তখন যমুনা সেতুর নাম গন্ধও নেই। তাই টাঙ্গাইল থেকে লঞ্চ/ফেরীতে যমুনা পেরিয়ে কষ্টসাধ্য স্মৃতিবিজড়িত এক যাত্রা ছিল ওটা। ফেরীঘাট কখনও এখানে তো কিছুদিন পর আবার অন্যখানে। তপ্ত বালি পেড়িয়ে এলোমেলো প্রায় ১/২ কিলোমিটারের রাস্তা। সব কষ্ট সহ্য করে বন্ধুদের নিয়ে হৈ হুল্লোর করে বেশ ভালোভাবেই পরীক্ষাপর্ব সম্পন্ন করেছিল। ঘটনার শুরু ফেরার পথে। প্রচন্ড ভীর সামলে ওর জায়গা হয়েছিল লঞ্চের ছাদে। দুপুর ১২ টার সূর্য স্বভাবতই খুব তেতে ছিল। নাভিশ্বাস উঠা গরমে সবার স্বস্থি ছিল নদীর খোলা হাওয়া আর ছাউনীর নীচে ছায়াযুক্ত জায়গাটুকু। জায়েদ ছাদের রেলিং ঘেঁষে পা ছড়িয়ে বসেছিল। ট্রাভেলিং ব্যাগটাকে পেছনের দেয়ালের সঙ্গে দাড় করিয়ে পিঠটা তাতে ঠেস দিয়ে জুতসই অবস্থান তৈরি করে নিয়েছিল ও। পরনে ছিল নীল স্কীনটাইট জিন্স আর লাল, সাদা ও বেগুনী রংয়ে আড়াআড়ি স্ট্রাইপের হাফহাতা পলো। চোখে ছিল ব্ল্যাক সানগ্লাস। বেশ হিরো হিরো ভাব নিয়ে মাথার নীচে হাত রেখে রেলিং-এর ফাঁক গলে পানির সমতলে আকাশ দেখছিল।
আশেপাশে মানানসই কোন হিরোইন চোখে না পরলেও পাশেই চারজনের মেয়েদের দলের একটা তুমুল আড্ডা চলছিল। ওরা মাঝেসাঝে জায়েদের দৃষ্টি আকর্ষণমূলক কথা বললেও তা জায়েদের সঙ্গে কথা শুরু করার জন্য যথেষ্ট ছিলনা। জায়েদ অবশ্য খুব বেশী একটা টানও বোধ করছিলনা। কিন্তু হঠাৎ করেই পরিস্থিতিটা পাল্টে গেল। বেশ দূর থেকে ঐ দলের সাথে আরেকটা মেয়ের চোখাচোখি হলো। ওদের উষ্ণ ভাব বিনিময়ের পর মেয়েটা এসে যোগ দিল ওদের দলে।
আরে এটা তো সেই মেয়েটা- কাঠের পাটাতন বেয়ে লঞ্চে উঠার সময় জায়েদ সাহায্য করেছিল মেয়েটিকে উঠতে- মেয়েটিও সানন্দে নির্ভর করেছিল ওর উপর- তারপর দুজন দুদিকে চলেগিয়েছিল।
ভাগ্য সহায় থাকলে যে সবই সম্ভব তাই আরেকবার প্রমাণ হলো। তখন মনে তলিয়ে যাওয়া অনেক সম্ভাবনাকে আবার উসকে দিল বর্তমান পরিবেশ। জায়েদ সুযোগের অপেক্ষায় থাকল। এরইমধ্যে কয়েকজন ফেরিওয়ালা এসে ঘুরে গেছে। মেয়েদের দলটি বাদাম কিনে বাদামবাজি চালিয়ে যাচ্ছে। লঞ্চটির দোল খাওয়া ওদের আড্ডাবাজিতে বাড়তি মাত্রা যোগ করছিল। জায়েদ এবার অসহায় বোধ করছে। চেষ্টার তরী পাড়ে ভিরছিলনা তাই আরও খারাপ লাগছিল। এবার জায়েদ কিছুটা আস্থা খুঁজে পেতে চায় চানাচুরওয়ালার কাছে। গলা বাড়িয়ে হাক ছাড়ে-
এই চানাচুর- চানাচুরওয়ালা চলে আসে। আমাকে ৫ টাকার দাও-
চানাচুর নিয়ে টাকা দেয়ার সময় ঘটে গেল কাঙ্খিত ঘটনাটি। ঐ মেয়েটির সাথে চোখাচোখি হয় জায়েদের। মেয়েটি জায়েদকে অবাক করে দিয়ে পরিচিত হাসি বিনিময় করে। জায়েদ কি করবে এবার বুঝতে পারেনা তাই সঙ্গত কারণেই আবার নীরবতা।
ধুর তাল কেটে গেল এবার-
জায়েদ ঝিমিয়ে পড়েছিল। তন্দ্রা ভাঙ্গল ওদের রোল করে পাকানো লম্বা একটি কাগজের গুতোতে। সঙ্গে সঙ্গে "সরি" বৃষ্টি শুরু হয়। জায়েদ স্বভাব সুলভ বিনয় প্রকাশ করে। ওদের অতিরিক্ত উল্লাস আর হট্টোগোলে অসতর্কতাবশত কাগজের গুতো লেগেছিল জায়েদের শরীরে। এতে বরং ওদের পরিচয়ের পথ খুলে যায়। গ্র“পের সিনিয়র মেয়েটি বলে-
এডমিশন টেস্ট দিলেন? জায়েদ, হ্যাঁ- আমি থার্ড ইয়ার বাংলায়। তোমাকে তুমি করেই বলছি।
জায়েদ মৃদু ধাক্কা খায়, ভাবে সবাই আবার সিনিয়র নয় তো, মুখে বলে না না সমস্যা নেই, তুমিই তো সম্বোধন করা উচিত।
তোমার বাসা কোথায়? ঘাটাইল- কি বলো আমাদেরও তো ঘাটাইল- ঘাটাইলে ৯৫ ব্যাচের রতন, আনোয়ার, চাঁদ- জায়েদ কথা শেষ করতে দেয়না। বলে হ্যাঁ হ্যাঁ ওরা সবাই আমার খুব কাছের বন্ধু। ব্যাস্ এবার জায়েদের ভাবনার পালে হাওয়া ধরলো।
গ্র“পের সিনিয়র জন পরিচয় করিয়ে দেয়- আমি শিল্পি, ও শিউলি, পরের জন পাপিয়া, তার পর পলি আর-
কথা কেড়ে নিয়ে শেষের জন বলে আমি অনু। আপনার সাথে লঞ্চে উঠার সময় দেখা হয়েছে। বলেই লাজুক হাসি হাসে। এবার প্রশ্ন ছুড়ে দেয় জায়েদের দিকে-আপনি?
আমি জায়েদ। অনুর মৃদু সম্মতিপূর্ণ সমর্থন জায়েদের আবেগকে আরও কয়েক ডিগ্রী উপরে তুলে দেয়। এরপর চলতে থাকল জানা আর জানানোর ট্রেন। সবার মাঝে পরিচিতির বন্ধন বন্ধুতে রূপ নেয় খুব অল্প সময়ে। লঞ্চ থেকে নেমে একসাথে দুপুরের খাবারটাও খেয়ে নিল সবাই মিলে। বিলটা শিল্পি আপু দিয়ে দিল পুরো অধিকার খাটিয়ে। জায়েদ সুযোগ বুঝে আইসক্রিম কিনে আনে সবার জন্য একটি করে। আইসক্রীম খেতে খেতে চুপচাপ হাটছিল সবাই। শিল্পি আপু নিরবতা ভাঙে।
আমরা চারজনতো টাংগাইলে থেকে যাবো- কিন্তু অনুতো যাবে ঘাটাইল- ওকে তো একা ছাড়া ঠিক হবেনা- অনু বলে না আপু এখান থেকে আমি একাই যেতে পারবো-
জায়েদ নিজে থেকে বলার সাহস পাচ্ছিলনা তবে তার মন চাইছিল অনুকে পৌঁছে দেয়ার দায়িত্বটা তার উপর পরলে আরও কিছুক্ষণ একসঙ্গে থাকা যেত।
শেষকালে পাপিয়া আপু যেন ওর মনের কথাটাই বলে দিল- কেন জায়েদ তো একই রাস্তায় যাচ্ছে। অনু তুই ওর সাথে চলে যা।
এবার জায়েদ সাহস সঞ্চয় করে এক নিঃশ্বাসে বলে দেয় হ্যাঁ তাইতো অনু তো আমার সাথেই যেতে পারে।
কিছু না বলে অনু স্বেচ্ছায় নিজেকে সমর্পণ করলো সবার সিদ্ধান্তে। কিছুক্ষণ পর ৬ জনের দল ৪ আর ২ এ ভাগ হয়ে গেল। শিল্পি আপুরা চলে যায় শহরের উদ্দেশ্যে আর জায়েদ অনুকে নিয়ে রিক্সায় উঠল টাঙ্গাইল ষ্টেশনের উদ্দেশ্যে। এতক্ষণ ফুরফুরে মেজাজে থাকলেও জায়েদ এবার দায়িত্বের ভার অনুভব করে।
অনু নিরবতা ভেঙে জিজ্ঞেস করে- তুমি এত চুপচাপ কেন? কই নাতো- কোন সমস্যা? জায়েদ না না, আমি ভাবছিলাম অল্প সময়ে কতকিছু ঘটে গেল- অনু কেন তোমার ভালো লাগেনি? জায়েদ ভালো লেগেছে তবে ভাললাগাটা কি স্থায়িত্ব পাবে? অনু কেন এভাবে ভাবছো?
জায়েদ এই যে তোমার সাথে পরিচয় হলো, আমিতো ভাবতেই পারিনি। দূর থেকে ভালোলেগেছিল তোমায়। শুধু সাহায্য করতে পেরেই খুশি ছিলাম। পরে নিয়তি তোমার সাথে পরিচয় করিয়ে দিল। সময় কাটানোর উপলক্ষ্যও তৈরী করল। আবার এখনো পাশাপাশি আছি। তোমাকে বাড়ি পৌছে দিচ্ছি। এতো কিছুতো আমি চাইনি। বাড়ি পৌছে দিয়ে কি এই স্বল্পস্থায়ী মূহুর্তের চির সমাপ্তি ঘটবে?
অনু উত্তরে কিছু বললনা।
দুজনেই গাড়ীতে উঠে পড়ল। পাশাপাশি আসনও পেয়ে গেল। পুরো যাত্রা পথে দুজন দুজনের মৃদু স্পর্শে শিহরিত হয়েছে বার কয়েক। হয়তো কিছুটা উষ্ণতাও ছড়িয়েছে কিন্তু কারও মুখে আর ভাষা তৈরী করেনি। অল্প সময় পর ঘাটাইল ষ্টেশন। অপু নেমে যাবে চিরতরে। হয়তো আর দেখা হবেনা। তবু তো ভাললাগার এই ছোট গল্পটি জায়েদকে নায়ক বানিয়েছিল, এটাই বা কম কিসে?
মিনিট পাঁচেক পর গাড়ীর হেলপার উচ্চস্বরে ঘাটাইল কলেজ গেইট বলে চিৎকার করল। অনূ তখনও নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেনা। জায়েদ কিছু বলতে যাবে এমন সময় অনু জায়েদকে একটি কাগজ ধরিয়ে দিলো। বলল আমি কাজী রোডে নেমে যাচ্ছি। ভালো থেকো। জায়েদ কাগজটি খুলতে পারলনা। আবেগ তার মুখের কথা কেড়ে নিয়েছে। তার বোবা চাহনি, এই বিদায় বেলায় অনুকে কি বলেছিল কে জানে? অনুর কালো বড়বড় টানা চোঁখ দুটির কোণা বেয়ে নেমে এলো অশ্র“ধারা। ব্যাগ হাতে দাড়িয়ে রইল গাড়ি ষ্টেশান ত্যাগ করা পর্যন্ত। জায়েদ দেখেছিল পেছন ফিরে চোখের জলের ধারা খুব করে লুকোনোর চেষ্টা করছিল অনু।
জায়েদ বাড়ি ফিরে এল ঠিকভাবে। কিন্তু কি যেন ঠিক ছিলনা। মা-বাবার আদর, ছোট ভাইয়ের সঙ্গ সবই আগের মতই ছিল কিন্তু জায়েদের কেবলই মনে হয়েছিল কি যেন নেই, কোথায় যেন শূন্যতা। প্রায় ১৫ দিন কেটে গিয়েছিল একইভাবে। তার সম্বল ছিল কেবল একটি আশ্বাস। কাগজের লিখাটি- অনু লিখেছেল- আমি তোমার সাথে যোগাযোগ রাখব। সময় কেটে গেলেও জায়েদ এখনও ওই একছত্র লিখার উপর আস্থা রাখাতেই স্বস্থি বোধ করে। অনু মিথ্যে বলতে পারেনা।
সেদিন ছিল মঙ্গলবার। কোন একটা কারণে স্কুল অর্ধেক বেলা চলার পর ছুটি হয়েছিল। তাই জায়েদের ছোটভাই আর ওর বন্ধুরা আগেই বাড়ি ফিরেছিল। এই সুযোগে ওরা বাসার পেছনের ছোট মাঠে ক্রিকেট ম্যাচ আয়োজন করেছিল। জায়েদকে ওদের অনুরোধে সাড়া দিতে হয়েছিল। খেলার মাঝ পর্যায়ে ওর বাবা এসে জানালো পিয়ন তোমার নামে একটি চিঠি দিয়ে গেছে। খবরটা ওকে এতোটাই বিমোহিত করল যে খেলার মাঠে তার আর এক মূহুর্তও মন টিকলোনা। সে দ্রুত মাঠ ছেড়ে বাসার উদ্দেশ্যে চলে গেল। তার কেবলই মনে হচ্ছিল ওটা অনুর চিঠিই হবে। উত্তেজিত কণ্ঠে মায়ের কাছে জানতে চাইল তার চিঠিটা কোথায়? আম্মু জানাতেই ওটা নিজের দখলে নিল। হ্যাঁ ওটা অনুর চিঠিই। জায়েদ এতটাই মুগ্ধ ছিল যে এটা তার মাধ্যে একটা অস্থিরতার তৈরি করেছিল। তার হাত কাপছিল, ঠিকভাবে ওটা খুলতেও যেন কষ্ট হচ্ছিল।
অবশেষে ওটা খুলল। গোটা গোটা স্পষ্ট সুন্দর হস্তাক্ষরে যতœ নিয়ে লিখা এক মনোরম পরিবেশনা। এটা শুধু জায়েদের উদ্দেশ্যেই, ওই এটার একচ্ছত্র মালিক, আর কারও এতে অংশিদারিত্ব নেই। একরাশ আবেগময়তা যেন অনু নিজে এসে জায়েদের কানে তুলে দিয়ে গেল। জায়েদ পড়ছে, পড়ছে আর বিমোহিত হচ্ছে, শিহরিত হচ্ছে। ঘাটাইলে আনোয়ারের কাছ থেকে কিভাবে ঠিকানা সংগ্রহ করেছে অনু। কেন লিখতে এতো দেরী হলো। অনাকাঙ্খিত দেরী হওয়াতে ক্ষমা চেয়েছে। এর মধ্যেই জায়েদের ভাবনা আকাশ ছুঁয়েছে। তাকে উত্তর দিতে হবে। আজই লিখতে হবে। কিভাবে লিখবে, আর কিভাবে তাদের এই সম্পর্ককে স্থায়িত্ব দিবে। কি কি প্রস্তাবনা থাকবে। কিভাবে মনের গভীরের আবেগকে ওর কাছে প্রকাশ করবে- এরকম আরও অনেক কিছু। চিঠির শেষে ওর ঠিকানাটাও দিয়েছে। বুদ্ধীমতী মেয়ে। ঠিকানাটা যেনে নিতে চোখ বোলাতেই যেন জায়েদ সজোড়ে ধাক্কা খেল। কোথায় যেন তাল কেটে গেল। এভাবে তো কখনোই ভাবেনি জায়েদ। কেন এমন হলো। তার বেড়ে উঠা মধ্যবিত্ত রক্ষণশীল সমাজে কিভাবে এটার প্রতিষ্ঠা করবে সে। ওর দুরন্ত বেগে ছুটে চলা আবেগময় মন হঠাৎ গতিহীন হয়ে মুখ থুবড়ে পড়ল।
ঠিকানাতে ওর নাম লিখা- অপর্ণা দত্ত অনু।
হিন্দু-মুসলমান সমাজের এই সম্পর্ক গড়ার সীমাবদ্ধতার বেড়াজালকে কিভাবে অতিক্রম করবে জায়েদের বাড়ন্ত মনের প্রথম ভালোলাগার আবেগ জড়ানো এই অনুভূতি? জায়েদ স্তব্ধ হয়ে গেল। স্তব্ধ হয়ে গেল ওর ভাবনা। সদ্য কৈশর উত্তীর্ণ মনের প্রথম ভালোলাগাটা একটা বিশাল প্রশ্নবোধক চিহ্নের সামনে খুব অসহায় মনে হতে লাগলো।-মুহাম্মদ সাজিদুল হক
য় দেড় যুগ আগের কথা বলছি। মোবাইল মেসেজের পেরন তখনও হয়নি। নিত্য প্রয়োজনীয় দূরবর্তী যোগাযোগের একমাত্র বিশ্বস্ত মাধ্যম তখন চিঠিপত্র। বাবার কাছে টাকা চাহিয়া পত্র বা বন্ধুর নিকট কোন উল্লেখযোগ্য ঘটনার বর্ণনা দিয়ে পত্র লিখা তখন বাংলা দ্বিতীয় পত্র পরীক্ষার প্রতি বছরের প্রায় নির্ধারিত প্রশ্ন ছিল। ঘটা করে আমরা তখন সুন্দর করে পত্র লিখা শিখতাম। কোন জরুরী সংবাদ অথবা কোন হৃদয়ে ঝড় তোলা আবেগ কলমের কালি দ্বারা কাগজে লিপিবদ্ধ অবস্থায় খামে বন্দি হয়ে ঐ ডাকপিয়নের হাত দিয়েই বিলি বন্টন হতো। তাই ডাকপিয়ন তখন অনেক কাঙ্খিত ব্যক্তি হিসেবে পোস্টঅফিস টু প্রাপকের বাড়ি দাপিয়ে বেড়াত।
জায়েদ তখন সবে এইচ, এস,সি পাশ করেছে। নামকরা সব সরকারী বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গন ঘুরে বেড়াচ্ছে নিজে কোন একটিতে তার পছন্দের বিষয়ে সুযোগ করে নিতে। সরকারী বিশ্ববিদ্যালয় তখন সবে তের টি। বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় স্বভাবতই ভাল ছাত্রদের কাছে ততটা গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। জায়েদ বেশ ভালমানের ছাত্র। এস,এস,সি তে উপজেলায় প্রথম। ৮৫০ এর উপর নম্বর। রেসিডেন্সিয়াল থেকে এইচ, এস, সি। তার লক্ষ্যটাও তাই প্রথম সাড়ির যেকোন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালমানের সাবজেক্ট।
এবারের মিশন ছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। তখন যমুনা সেতুর নাম গন্ধও নেই। তাই টাঙ্গাইল থেকে লঞ্চ/ফেরীতে যমুনা পেরিয়ে কষ্টসাধ্য স্মৃতিবিজড়িত এক যাত্রা ছিল ওটা। ফেরীঘাট কখনও এখানে তো কিছুদিন পর আবার অন্যখানে। তপ্ত বালি পেড়িয়ে এলোমেলো প্রায় ১/২ কিলোমিটারের রাস্তা। সব কষ্ট সহ্য করে বন্ধুদের নিয়ে হৈ হুল্লোর করে বেশ ভালোভাবেই পরীক্ষাপর্ব সম্পন্ন করেছিল। ঘটনার শুরু ফেরার পথে। প্রচন্ড ভীর সামলে ওর জায়গা হয়েছিল লঞ্চের ছাদে। দুপুর ১২ টার সূর্য স্বভাবতই খুব তেতে ছিল। নাভিশ্বাস উঠা গরমে সবার স্বস্থি ছিল নদীর খোলা হাওয়া আর ছাউনীর নীচে ছায়াযুক্ত জায়গাটুকু। জায়েদ ছাদের রেলিং ঘেঁষে পা ছড়িয়ে বসেছিল। ট্রাভেলিং ব্যাগটাকে পেছনের দেয়ালের সঙ্গে দাড় করিয়ে পিঠটা তাতে ঠেস দিয়ে জুতসই অবস্থান তৈরি করে নিয়েছিল ও। পরনে ছিল নীল স্কীনটাইট জিন্স আর লাল, সাদা ও বেগুনী রংয়ে আড়াআড়ি স্ট্রাইপের হাফহাতা পলো। চোখে ছিল ব্ল্যাক সানগ্লাস। বেশ হিরো হিরো ভাব নিয়ে মাথার নীচে হাত রেখে রেলিং-এর ফাঁক গলে পানির সমতলে আকাশ দেখছিল।
আশেপাশে মানানসই কোন হিরোইন চোখে না পরলেও পাশেই চারজনের মেয়েদের দলের একটা তুমুল আড্ডা চলছিল। ওরা মাঝেসাঝে জায়েদের দৃষ্টি আকর্ষণমূলক কথা বললেও তা জায়েদের সঙ্গে কথা শুরু করার জন্য যথেষ্ট ছিলনা। জায়েদ অবশ্য খুব বেশী একটা টানও বোধ করছিলনা। কিন্তু হঠাৎ করেই পরিস্থিতিটা পাল্টে গেল। বেশ দূর থেকে ঐ দলের সাথে আরেকটা মেয়ের চোখাচোখি হলো। ওদের উষ্ণ ভাব বিনিময়ের পর মেয়েটা এসে যোগ দিল ওদের দলে।
আরে এটা তো সেই মেয়েটা- কাঠের পাটাতন বেয়ে লঞ্চে উঠার সময় জায়েদ সাহায্য করেছিল মেয়েটিকে উঠতে- মেয়েটিও সানন্দে নির্ভর করেছিল ওর উপর- তারপর দুজন দুদিকে চলেগিয়েছিল।
ভাগ্য সহায় থাকলে যে সবই সম্ভব তাই আরেকবার প্রমাণ হলো। তখন মনে তলিয়ে যাওয়া অনেক সম্ভাবনাকে আবার উসকে দিল বর্তমান পরিবেশ। জায়েদ সুযোগের অপেক্ষায় থাকল। এরইমধ্যে কয়েকজন ফেরিওয়ালা এসে ঘুরে গেছে। মেয়েদের দলটি বাদাম কিনে বাদামবাজি চালিয়ে যাচ্ছে। লঞ্চটির দোল খাওয়া ওদের আড্ডাবাজিতে বাড়তি মাত্রা যোগ করছিল। জায়েদ এবার অসহায় বোধ করছে। চেষ্টার তরী পাড়ে ভিরছিলনা তাই আরও খারাপ লাগছিল। এবার জায়েদ কিছুটা আস্থা খুঁজে পেতে চায় চানাচুরওয়ালার কাছে। গলা বাড়িয়ে হাক ছাড়ে-
এই চানাচুর- চানাচুরওয়ালা চলে আসে। আমাকে ৫ টাকার দাও-
চানাচুর নিয়ে টাকা দেয়ার সময় ঘটে গেল কাঙ্খিত ঘটনাটি। ঐ মেয়েটির সাথে চোখাচোখি হয় জায়েদের। মেয়েটি জায়েদকে অবাক করে দিয়ে পরিচিত হাসি বিনিময় করে। জায়েদ কি করবে এবার বুঝতে পারেনা তাই সঙ্গত কারণেই আবার নীরবতা।
ধুর তাল কেটে গেল এবার-
জায়েদ ঝিমিয়ে পড়েছিল। তন্দ্রা ভাঙ্গল ওদের রোল করে পাকানো লম্বা একটি কাগজের গুতোতে। সঙ্গে সঙ্গে "সরি" বৃষ্টি শুরু হয়। জায়েদ স্বভাব সুলভ বিনয় প্রকাশ করে। ওদের অতিরিক্ত উল্লাস আর হট্টোগোলে অসতর্কতাবশত কাগজের গুতো লেগেছিল জায়েদের শরীরে। এতে বরং ওদের পরিচয়ের পথ খুলে যায়। গ্র“পের সিনিয়র মেয়েটি বলে-
এডমিশন টেস্ট দিলেন? জায়েদ, হ্যাঁ- আমি থার্ড ইয়ার বাংলায়। তোমাকে তুমি করেই বলছি।
জায়েদ মৃদু ধাক্কা খায়, ভাবে সবাই আবার সিনিয়র নয় তো, মুখে বলে না না সমস্যা নেই, তুমিই তো সম্বোধন করা উচিত।
তোমার বাসা কোথায়? ঘাটাইল- কি বলো আমাদেরও তো ঘাটাইল- ঘাটাইলে ৯৫ ব্যাচের রতন, আনোয়ার, চাঁদ- জায়েদ কথা শেষ করতে দেয়না। বলে হ্যাঁ হ্যাঁ ওরা সবাই আমার খুব কাছের বন্ধু। ব্যাস্ এবার জায়েদের ভাবনার পালে হাওয়া ধরলো।
গ্র“পের সিনিয়র জন পরিচয় করিয়ে দেয়- আমি শিল্পি, ও শিউলি, পরের জন পাপিয়া, তার পর পলি আর-
কথা কেড়ে নিয়ে শেষের জন বলে আমি অনু। আপনার সাথে লঞ্চে উঠার সময় দেখা হয়েছে। বলেই লাজুক হাসি হাসে। এবার প্রশ্ন ছুড়ে দেয় জায়েদের দিকে-আপনি?
আমি জায়েদ। অনুর মৃদু সম্মতিপূর্ণ সমর্থন জায়েদের আবেগকে আরও কয়েক ডিগ্রী উপরে তুলে দেয়। এরপর চলতে থাকল জানা আর জানানোর ট্রেন। সবার মাঝে পরিচিতির বন্ধন বন্ধুতে রূপ নেয় খুব অল্প সময়ে। লঞ্চ থেকে নেমে একসাথে দুপুরের খাবারটাও খেয়ে নিল সবাই মিলে। বিলটা শিল্পি আপু দিয়ে দিল পুরো অধিকার খাটিয়ে। জায়েদ সুযোগ বুঝে আইসক্রিম কিনে আনে সবার জন্য একটি করে। আইসক্রীম খেতে খেতে চুপচাপ হাটছিল সবাই। শিল্পি আপু নিরবতা ভাঙে।
আমরা চারজনতো টাংগাইলে থেকে যাবো- কিন্তু অনুতো যাবে ঘাটাইল- ওকে তো একা ছাড়া ঠিক হবেনা- অনু বলে না আপু এখান থেকে আমি একাই যেতে পারবো-
জায়েদ নিজে থেকে বলার সাহস পাচ্ছিলনা তবে তার মন চাইছিল অনুকে পৌঁছে দেয়ার দায়িত্বটা তার উপর পরলে আরও কিছুক্ষণ একসঙ্গে থাকা যেত।
শেষকালে পাপিয়া আপু যেন ওর মনের কথাটাই বলে দিল- কেন জায়েদ তো একই রাস্তায় যাচ্ছে। অনু তুই ওর সাথে চলে যা।
এবার জায়েদ সাহস সঞ্চয় করে এক নিঃশ্বাসে বলে দেয় হ্যাঁ তাইতো অনু তো আমার সাথেই যেতে পারে।
কিছু না বলে অনু স্বেচ্ছায় নিজেকে সমর্পণ করলো সবার সিদ্ধান্তে। কিছুক্ষণ পর ৬ জনের দল ৪ আর ২ এ ভাগ হয়ে গেল। শিল্পি আপুরা চলে যায় শহরের উদ্দেশ্যে আর জায়েদ অনুকে নিয়ে রিক্সায় উঠল টাঙ্গাইল ষ্টেশনের উদ্দেশ্যে। এতক্ষণ ফুরফুরে মেজাজে থাকলেও জায়েদ এবার দায়িত্বের ভার অনুভব করে।
অনু নিরবতা ভেঙে জিজ্ঞেস করে- তুমি এত চুপচাপ কেন? কই নাতো- কোন সমস্যা? জায়েদ না না, আমি ভাবছিলাম অল্প সময়ে কতকিছু ঘটে গেল- অনু কেন তোমার ভালো লাগেনি? জায়েদ ভালো লেগেছে তবে ভাললাগাটা কি স্থায়িত্ব পাবে? অনু কেন এভাবে ভাবছো?
জায়েদ এই যে তোমার সাথে পরিচয় হলো, আমিতো ভাবতেই পারিনি। দূর থেকে ভালোলেগেছিল তোমায়। শুধু সাহায্য করতে পেরেই খুশি ছিলাম। পরে নিয়তি তোমার সাথে পরিচয় করিয়ে দিল। সময় কাটানোর উপলক্ষ্যও তৈরী করল। আবার এখনো পাশাপাশি আছি। তোমাকে বাড়ি পৌছে দিচ্ছি। এতো কিছুতো আমি চাইনি। বাড়ি পৌছে দিয়ে কি এই স্বল্পস্থায়ী মূহুর্তের চির সমাপ্তি ঘটবে?
অনু উত্তরে কিছু বললনা।
দুজনেই গাড়ীতে উঠে পড়ল। পাশাপাশি আসনও পেয়ে গেল। পুরো যাত্রা পথে দুজন দুজনের মৃদু স্পর্শে শিহরিত হয়েছে বার কয়েক। হয়তো কিছুটা উষ্ণতাও ছড়িয়েছে কিন্তু কারও মুখে আর ভাষা তৈরী করেনি। অল্প সময় পর ঘাটাইল ষ্টেশন। অপু নেমে যাবে চিরতরে। হয়তো আর দেখা হবেনা। তবু তো ভাললাগার এই ছোট গল্পটি জায়েদকে নায়ক বানিয়েছিল, এটাই বা কম কিসে?
মিনিট পাঁচেক পর গাড়ীর হেলপার উচ্চস্বরে ঘাটাইল কলেজ গেইট বলে চিৎকার করল। অনূ তখনও নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেনা। জায়েদ কিছু বলতে যাবে এমন সময় অনু জায়েদকে একটি কাগজ ধরিয়ে দিলো। বলল আমি কাজী রোডে নেমে যাচ্ছি। ভালো থেকো। জায়েদ কাগজটি খুলতে পারলনা। আবেগ তার মুখের কথা কেড়ে নিয়েছে। তার বোবা চাহনি, এই বিদায় বেলায় অনুকে কি বলেছিল কে জানে? অনুর কালো বড়বড় টানা চোঁখ দুটির কোণা বেয়ে নেমে এলো অশ্র“ধারা। ব্যাগ হাতে দাড়িয়ে রইল গাড়ি ষ্টেশান ত্যাগ করা পর্যন্ত। জায়েদ দেখেছিল পেছন ফিরে চোখের জলের ধারা খুব করে লুকোনোর চেষ্টা করছিল অনু।
জায়েদ বাড়ি ফিরে এল ঠিকভাবে। কিন্তু কি যেন ঠিক ছিলনা। মা-বাবার আদর, ছোট ভাইয়ের সঙ্গ সবই আগের মতই ছিল কিন্তু জায়েদের কেবলই মনে হয়েছিল কি যেন নেই, কোথায় যেন শূন্যতা। প্রায় ১৫ দিন কেটে গিয়েছিল একইভাবে। তার সম্বল ছিল কেবল একটি আশ্বাস। কাগজের লিখাটি- অনু লিখেছেল- আমি তোমার সাথে যোগাযোগ রাখব। সময় কেটে গেলেও জায়েদ এখনও ওই একছত্র লিখার উপর আস্থা রাখাতেই স্বস্থি বোধ করে। অনু মিথ্যে বলতে পারেনা।
সেদিন ছিল মঙ্গলবার। কোন একটা কারণে স্কুল অর্ধেক বেলা চলার পর ছুটি হয়েছিল। তাই জায়েদের ছোটভাই আর ওর বন্ধুরা আগেই বাড়ি ফিরেছিল। এই সুযোগে ওরা বাসার পেছনের ছোট মাঠে ক্রিকেট ম্যাচ আয়োজন করেছিল। জায়েদকে ওদের অনুরোধে সাড়া দিতে হয়েছিল। খেলার মাঝ পর্যায়ে ওর বাবা এসে জানালো পিয়ন তোমার নামে একটি চিঠি দিয়ে গেছে। খবরটা ওকে এতোটাই বিমোহিত করল যে খেলার মাঠে তার আর এক মূহুর্তও মন টিকলোনা। সে দ্রুত মাঠ ছেড়ে বাসার উদ্দেশ্যে চলে গেল। তার কেবলই মনে হচ্ছিল ওটা অনুর চিঠিই হবে। উত্তেজিত কণ্ঠে মায়ের কাছে জানতে চাইল তার চিঠিটা কোথায়? আম্মু জানাতেই ওটা নিজের দখলে নিল। হ্যাঁ ওটা অনুর চিঠিই। জায়েদ এতটাই মুগ্ধ ছিল যে এটা তার মাধ্যে একটা অস্থিরতার তৈরি করেছিল। তার হাত কাপছিল, ঠিকভাবে ওটা খুলতেও যেন কষ্ট হচ্ছিল।
অবশেষে ওটা খুলল। গোটা গোটা স্পষ্ট সুন্দর হস্তাক্ষরে যতœ নিয়ে লিখা এক মনোরম পরিবেশনা। এটা শুধু জায়েদের উদ্দেশ্যেই, ওই এটার একচ্ছত্র মালিক, আর কারও এতে অংশিদারিত্ব নেই। একরাশ আবেগময়তা যেন অনু নিজে এসে জায়েদের কানে তুলে দিয়ে গেল। জায়েদ পড়ছে, পড়ছে আর বিমোহিত হচ্ছে, শিহরিত হচ্ছে। ঘাটাইলে আনোয়ারের কাছ থেকে কিভাবে ঠিকানা সংগ্রহ করেছে অনু। কেন লিখতে এতো দেরী হলো। অনাকাঙ্খিত দেরী হওয়াতে ক্ষমা চেয়েছে। এর মধ্যেই জায়েদের ভাবনা আকাশ ছুঁয়েছে। তাকে উত্তর দিতে হবে। আজই লিখতে হবে। কিভাবে লিখবে, আর কিভাবে তাদের এই সম্পর্ককে স্থায়িত্ব দিবে। কি কি প্রস্তাবনা থাকবে। কিভাবে মনের গভীরের আবেগকে ওর কাছে প্রকাশ করবে- এরকম আরও অনেক কিছু। চিঠির শেষে ওর ঠিকানাটাও দিয়েছে। বুদ্ধীমতী মেয়ে। ঠিকানাটা যেনে নিতে চোখ বোলাতেই যেন জায়েদ সজোড়ে ধাক্কা খেল। কোথায় যেন তাল কেটে গেল। এভাবে তো কখনোই ভাবেনি জায়েদ। কেন এমন হলো। তার বেড়ে উঠা মধ্যবিত্ত রক্ষণশীল সমাজে কিভাবে এটার প্রতিষ্ঠা করবে সে। ওর দুরন্ত বেগে ছুটে চলা আবেগময় মন হঠাৎ গতিহীন হয়ে মুখ থুবড়ে পড়ল।
ঠিকানাতে ওর নাম লিখা- অপর্ণা দত্ত অনু।
হিন্দু-মুসলমান সমাজের এই সম্পর্ক গড়ার সীমাবদ্ধতার বেড়াজালকে কিভাবে অতিক্রম করবে জায়েদের বাড়ন্ত মনের প্রথম ভালোলাগার আবেগ জড়ানো এই অনুভূতি? জায়েদ স্তব্ধ হয়ে গেল। স্তব্ধ হয়ে গেল ওর ভাবনা। সদ্য কৈশর উত্তীর্ণ মনের প্রথম ভালোলাগাটা একটা বিশাল প্রশ্নবোধক চিহ্নের সামনে খুব অসহায় মনে হতে লাগলো।

পাতাটি ৩৮২৫ বার প্রদর্শিত হয়েছে।