দশদিক মাসিক

হোম বণ্ঢাসফেমি আইন

বণ্ঢাসফেমি আইন

এ্যাডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক
গ্রিক শব্দ ‘ব্লাসফেমেন’ থেকে ব্লাসফেমি শব্দের উৎপত্তি। যার অর্থ ‘ধর্ম নিন্দা’ বা ‘ঈশ্বর নিন্দা’। এককথায় কারো ওপর অপবাদ বা কলঙ্ক আরোপ করা বা সম্মানে আঘাত করা। তবে ব্লাসফেমি বলতে প্রকৃতপক্ষে ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি অসম্মান বোঝায়। কোন ব্যক্তি এইসব অপরাধ করলে যে আইনে তার বিচার করা হয়, সেটাকেই ব্লাসফেমি আইন বলে। প্রাচীন ও মধ্যযুগে ইউরোপে ব্লাসফেমির উদ্ভব হয়েছিল। সে সময় রাজা বাদশাদের বলা হত ঈশ্বরের প্রতিনিধি, তাই রাজাদের বিরুদ্ধে কিছু বলা মানে ঈশ্বরের বিরুদ্ধে বলা, এইভাবে রাজার অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে জনগণের আন্দোলন যাতে গড়ে না উঠতে পারে সেই জন্য ওই সময় ব্লাসফেমি নামের এই কালো আইন তৈরি হয়েছিল। ইউরোপে সর্বপ্রথম এই আইনের প্রবর্তন করা হয়। বর্তমানে আফগানিস্তান, পাকিস্তান, সোমালিয়া, মালয়েশিয়াতে ব্লাসফেমি আইন চালু রয়েছে।
ধর্ম অবমাননা কিংবা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার অপরাধগুলো আমাদের বিদ্যমান আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়ে আসছে বহু আগ থেকেই। উনবিংশ শতকে প্রণীত দণ্ডবিধি ও ফৌজদারি কার্যবিধির আইনের বিভিন্ন ধারায় ধর্ম অবমাননার যে শাস্তি ছিল ২০০৬ সালে এসে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনে সেই সাজা বৃদ্ধিও করা হয়েছে।
ধর্মীয় অবমাননার উদ্দেশ্যে কিছু লেখা : বাংলাদেশ দণ্ডবিধি আইনের ২৯৫ক ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে বাংলাদেশের যে কোনো নাগরিকের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার অসদুদ্দেশ্যে লিখিত বা মৌখিক বক্তব্য দ্বারা কিংবা দৃশ্যমান অঙ্গভঙ্গি দ্বারা সংশ্লিষ্ট ধর্মটিকে বা কারো ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি অবমাননা করে বা অবমাননার চেষ্টা করে, সে ক্ষেত্রে সেই ব্যক্তিকে দুই বছর পর্যন্ত মেয়াদের কারাদণ্ড অথবা অর্থদণ্ড কিংবা উভয়দণ্ডে দণ্ডিত করা যেতে পারে। উল্লেখ্য, ১৮৬০ সালের মূল আইনে এ ধারাটি ছিল না। পরবর্তীতে ১৯২৭ সালে এক সংশোধনীর মাধ্যমে এ ধারাটি যুক্ত করা হয়। উপরোক্ত এ লেখার ইংরেজি রুপ নিম্নরুপ:
Whoever, with deliberate and malicious intention of outraging the religious feelings of any class of the citizens of Bangladesh, by words, either spoken or written, or by visible representations insults or attempts to insult the religion or the religious beliefs of that class, shall be punished with imprisonment of either description for a term which may extend to two years, or with fine, or with both.
প্রমাণের বিষয় এই ধারার অভিযোগ প্রতিষ্ঠা নিম্নবর্ণিত তথ্যাবলীর প্রমাণের উপর নির্ভরশীলঃ
ক. অভিযুক্ত ব্যক্তি কিছু বলেছিলেন বা কোন শব্দ লিখেছিলেন বা কোন ভাবভঙ্গি করেছিলেন।
খ. অভিযুক্ত ব্যক্তি ওইরকম কর্ম দ্বারা কোন শ্রেণীর ধর্মকে বা ধর্মীয় বিশ্বাসকে অবমাননা করেছিলেন।
গ. অভিযুক্ত ব্যক্তি উক্ত শ্রেণীর ধর্মীয় অনুভূতিতে কঠোর আঘাত আনার অভিপ্রায়ে ইচ্ছাকৃত এবং বিদ্বেষাত্মকভাবে তা করেছিলেন।
এ বিষয়ে উচ্চতর আদালতে সিদ্ধান্তসমূহ (১) কোন কাজ ইচ্ছাকৃত হতে পারে কিন্তু বিদ্বেষাত্মক নাও হতে পারে। ২৯৫ক ধারার অপরাধের জন্য এ দুই প্রকার অভিপ্রায়ই থাকা প্রয়োজন। অন্য কথায়, জেনে, শুনে, দেখে, বুঝে এবং বিদ্বেষাত্মকভাবে যে ব্যক্তি কোন ধর্মকে আঘাত করে, সেই ব্যক্তি এই ধারায় দোষী হয় [AIR ১৯৩৯ (Rang)১৯৯১].
(২) বিদ্বেষ বলতে কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অকল্যাণ কামনা করা বুঝায়। এটাই এই শব্দের সাধারণ অর্থ। কিন্তু আইনে বিদ্বেষাত্মকভাবে বললে অন্যের ক্ষতিজনক কাজ ইচ্ছাকৃতভাবে করাকে বুঝায়। যখন কোন ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে অন্যের ক্ষতিজনক কোন কাজ করেন, তখন তিনি বিদ্বেষাত্মকভাবে কাজ করেছিলেন বলে ধরা হয়। সাধারণভাবে বিদ্বেষ বলতে গেলে অন্যের সাথে শত্র“তা বা অন্যের বিরুদ্ধে অমঙ্গল কামনা স্পষ্ট হয়ে উঠে। কিন্তু আইনের ভাষায় বিদ্বেষাত্মক বলতে অন্যের ক্ষতি হতে পারে ইচ্ছাকৃতভাবে এমন কাজ করা বুঝায় [AIR ১৯৬০ All)৭১৫]
লাহোর হাইকোর্টের এলাকায় রাজপাল নামে এক ব্যক্তি একখানি পুস্তক লিখেছিলেন। এ পুস্তকখানির নাম ছিল রঙ্গিলা রসুল। ঐ পুস্তকে তিনি হযরত মুহাম্মদ (দ) এর যৌন জীবনের অবৈধতার কথা লিখেছিলেন। রাজপাল পাকিস্তান দণ্ডবিধির ১৬৩ ক ধারায় অভিযুক্ত ও দণ্ডিত হয়েছিলেন, কিন্তু লাহোর হাইকোর্ট মনে করেন যে, ধর্মের প্রতিষ্ঠাতার ব্যক্তিগত চরিত্রের উপর আঘাত করাকে একটা সমগ্র শ্রেণীর উপর আঘাত করা গণ্য করা যায় না। এই কারণে লাহোর হাইকোর্ট রাজপালের দণ্ড নাকচ করে দেন।
(৩) অন্য দেশে একই প্রকার পুস্তক প্রকাশিত হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ আনা হয় নাই, একই কথা বলে বা এই অজুহাত তুলে কোন ধর্মীয় অবমাননাকর পুস্তক রচনা বা প্রকাশের দায় হতে মুক্তি পাওয়া যায় না। [AIR ১৯৫৮ (All) ৭১৫]
(৪) অন্য ব্যক্তি তার ধর্ম আক্রমন করেছেন বলে তিনি ঐ ব্যক্তির ধর্মের বিরুদ্ধে অবমাননাকর কিছু লিখেছেন, এই অজুহাতও আইনে গ্রহণযোগ্য নয়। [AIR ১৯৫৫ (Punj) ৭১৫]
(৫) ধর্ম প্রবর্তক, প্রচারক এবং মুনী-ঋষীদের সম্পর্কে কটাক্ষ করা বা তাদের ব্যক্তিগত জীবনের কুৎসা কাহিনী বর্ণনা করা বা প্রচার করা এই ধারানুযায়ী অপরাধ [৭ DLR-১৭ (wp)W.M.M. Trust] লাহোর বনাম সম্রাট।
(৬) ২৯৫ক. ধারার উপাদান তখনই পূর্ণ হয় যখন এটা প্রতিষ্ঠিত হয় যে পরিকল্পিতভাবে এবং বিদ্বেষত্মাকভাবে কোন ধর্মকে অবমাননা করা হয়েছে। যখন কোন ধর্মকে ধর্মীয় চেতনা অবমামনা করার জন্য আপত্তি করা হয় এবং এমন কোন নির্ভরযোগ্য বিষয় থাকে না যার উপর ভিত্তি করে তাকে সমর্থন করা যায় তখন আদালত এটা অনুমান করে নিতে পারে যে, এটা পরিকল্পিতভাবে এবং বিদ্বেষাত্মকভাবে করা হয়েছে [PLD ১৯৬২(DBl)] -
ধর্মীয় বিদ্বেষে উস্কানি দিলে পত্রিকা বাজেয়াপ্ত করার বিধান : ১৮৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধির ৯৯ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো সংবাদপত্র যদি রাষ্ট্রবিরোধী কোনো কিছু বা এমন কিছু প্রকাশ করে যা নাগরিকদের মধ্যে শত্র“তা ও ঘৃণা তৈরিতে উস্কানি দেয় কিংবা ধর্মীয় বিশ্বাসে আঘাত হানে, সে ক্ষেত্রে সরকার ইচ্ছা করলে ওই সংবাদপত্রের সংশ্লিষ্ট কপিগুলো বাজেয়াপ্ত করতে পারে। তবে সরকারি এ আদেশের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি ইচ্ছা করলে হাইকোর্ট বিভাগে আবেদন করতে পারবেন।
অনলাইনে ধর্ম অবমাননার সাজা : ২০০৬ সালে প্রণীত তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় ইলেক্ট্রনিক ফরমে মিথ্যা, অশ্লীল অথবা মানহানিকর তথ্য প্রকাশ সংক্রান্ত অপরাধ ও তার দণ্ড বলা হয়েছে। উল্লিখিত ধারা অনুসারে, কোনো ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইটে বা অন্য কোনো ইলেক্ট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করে, যা মিথ্যা ও অশ্লীল বা সংশ্লিষ্ট অবস্থা বিবেচনায় কেউ পড়লে, দেখলে বা শুনলে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ হতে উদ্বুদ্ধ হতে পারে অথবা যার দ্বারা মানহানি ঘটে, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটে বা ঘটার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়, রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হয় বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে বা করতে পারে বা এ ধরনের তথ্যাদির মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে উস্কানি দান করা হয়, তাহলে তার এ কাজ হবে একটি অপরাধ। কোনো ব্যক্তি এ অপরাধ করলে অনধিক দশ বছর কারাদণ্ডে এবং অনধিক এক কোটি টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবে।
৬৯ ধারা অনুসারে, সাব-ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার নিচে নন, এরকম কোনো পুলিশ কর্মকর্তার লিখিত রিপোর্ট এবং নিয়ন্ত্রক বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোনো কর্মকর্তার পূর্ব অনুমোদন ছাড়া বিশেষ ট্রাইব্যুনাল কোনো অপরাধ বিচারের জন্য গ্রহণ করবেন না।
৭৭ ধারা অনুসারে, তথ্যপ্রযুক্তি আইনের অধীন কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে যে কম্পিউটার, কম্পিউটার সিস্টেম, ফ্লপি, কমপ্যাক্ট ডিস্ক (সিডি), টেপ ড্রাইভ বা অন্য কোনো আনুষঙ্গিক কম্পিউটার উপকরণ বা বস্তু সম্পর্কে বা সহযোগে সেই অপরাধ সংঘটিত হয়েছে সেগুলো ওই অপরাধের বিচারকারী আদালতের আদেশানুসারে বাজেয়াপ্তযোগ্য হবে। তবে যদি আদালত এই মর্মে সন্তুষ্ট হয় যে, যে ব্যক্তির দখল বা নিয়ন্ত্রণে ওই কম্পিউটার, কম্পিউটার সিস্টেম, ফ্লপি ডিক্স, কমপ্যাক্ট ডিস্ক বা অন্য কোনো আনুষঙ্গিক কম্পিউটার উপকরণ পাওয়া গেছে তিনি এ আইনের কোনো বিধান লঙ্ঘনের জন্য বা অপরাধ সংঘটনের জন্য দায়ী নন, তাহলে ওই কম্পিউটার, কম্পিউটার সিস্টেম, ফ্লপি ডিস্ক, কমপ্যাক্ট ডিক্স, টেপ ড্রাইভ বা অন্য কোনো আনুষঙ্গিক কম্পিউটার উপকরণ বাজেয়াপ্তযোগ্য হবে না। তবে এ আইনের অধীনে সাধারণ ফৌজদারি আদালতে বিচার হবে না। সরকারকে এ উদ্দেশ্যে বিশেষ সাইবার ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে। আইনের ৬৮ ধারা অনুসারে, একজন দায়রা জজ বা অতিরিক্ত দায়রা জজকে সরকার সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক হিসেবে নিয়োগ দিয়ে এ ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে পারে।
ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করা অপরাধ নয় : কোনো ব্যক্তি, সংবাদপত্র বা প্রতিষ্ঠান যদি সাধারণ মুসলমানদের ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা সম্পর্কে সচেতন করার উদ্দেশ্যে কোনো বক্তব্য দেয় বা কিছু প্রকাশ করে, সে ক্ষেত্রে সেটিকে ধর্ম অবমাননা বলে চালিয়ে দেয়া যাবে না এবং আদালতে এ ধরনের কোনো মামলা গ্রহণযোগ্যও হবে না। শামসুদ্দিন আহমেদ বনাম রাষ্ট্র ৫২ ডিএলআর-এর মামলায় আদালত এ প্রসঙ্গে স্পষ্ট রায় প্রদান করেছেন।
সংশ্লিষ্ট আইনঃ -বাংলাদেশ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩২। আইনানুয়ায়ী ব্যতীত জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতা হইতে কোন ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা যাইবে না।
বাংলাদেশ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪১। (১) আইন, জনশৃংখলা ও নৈতিকতা সাপেক্ষে
(ক) প্রত্যেক নাগরিকের যে কোন ধর্ম অবলম্বন, পালন, বা প্রচারের অধিকার রহিয়াছে;
(খ) প্রত্যেক ধর্মীয় সম্প্রদায় ও উপ-সম্প্রদায় নিজস্ব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের স্থাপন, রক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার অধিকার রহিয়াছে।
সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্র, অনুচ্ছেদ--১৮ প্রত্যেকেরই চিন্তা, বিবেক ও ধর্মের স্বাধীনতার অধিকার রয়েছে নিজ ধর্ম অথবা বিশ্বাস পরিবর্তনের স্বাধীনতা এবং একাই অথবা অপরের সহিত যোগসাজশে ও প্রকাশ্যে বা গোপনের নিজ ধর্ম বা বিশ্বাস শিক্ষাদান, প্রচার, উপাসনা ও পালনের মাধ্যমে প্রকাশ করার স্বাধীনতা এই অধিকারের অন্তর্ভূক্ত।
প্রতিকার- বাংলাদেশ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১০২। (১)- কোন সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির আবেদনক্রমে এই সংবিধানের ৩য় ভাগের দ্বারা অপির্ত অধিকারসমূহের (মৌলিক অধিকার অনুচ্ছেদ ২৬-৪৭) যে কোন একটি বলবৎ করিবার জন্য প্রজাতন্ত্রের বিষয়াবলীর সহিত সম্পর্কিত কোন দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তিসহ যে কোন ব্যক্তি বা কতৃর্পক্ষকে হাইকোর্ট বিভাগ উপযুক্ত নির্দেশাবলী বা আদেশাবলী দান করিতে পারিবেন।
(২) হাইকোর্ট বিভাগের নিকট যদি সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হয় যে, আইনের দ্বারা অন্যকোন সমফলপ্রদ বিধান করা হয় নাই, তাহা হইলে
(ক) যে কোন সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির আবেদনক্রমে
(অ) প্রজাতন্ত্র বা কোন স্থানীয় কর্তৃপক্ষের বিষয়াবলীর সহিত সংশ্লিষ্ট যে কোন দায়িত্ব পালন রত ব্যক্তিকে আইনের দ্বারা অনুমোদিত নয়, এমন কোন কার্য করা হইতে বিরত রাখিবার জন্য কিংবা আইনের দ্বারা তাঁহার করণীয় কার্য করিবার জন্য নির্দেশ প্রদান করিয়া; অথবা
(আ) প্রজাতন্ত্র বা কোন স্থানীয় কতৃর্পক্ষের বিষয়াবলীর সহিত সংশ্লিষ্ট যে কোন দায়িত্ব পালনে রত ব্যক্তির কৃত কোন কার্য বা গৃহীত কোন কার্যধারা আইনসংগত কতৃর্ত্ব ব্যতিরেকে করা হইয়াছে বা গৃহীত হইয়াছে ও তাহার কোন আইনগত কার্যকারিতা নাই বলিয়া ঘোষণা করিয়া উক্ত বিভাগ আদেশ দান করিতে পারিবেন; অথবা
(খ) যে কোন সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির আবেদনক্রমে
(অ) আইনসংগত কর্তৃত্ব ব্যতিরেকে বা বেআইনী উপায়ে কোন ব্যক্তিকে প্রহরায় আটক রাখা হয় নাই বলিয়া যাহাতে উক্ত বিভাগের নিকট সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হইতে পারে সেইজন্য প্রহরায় আটক উক্ত ব্যক্তিকে উক্ত বিভাগের সম্মুখে আনয়নের নির্দেশ প্রদান করিয়া; অথবা
(আ) কোন সরকারী পদে আসীন বা আসীন বলিয়া বিবেচিত কোন ব্যক্তিকে তিনি কোন কতৃর্ত্ববলে অনুরূপ পদমর্যদায় অধিষ্ঠানের দাবী করিতেছেন, তাহা প্রদর্শনের নির্দেশ প্রদান করিয়া উক্ত বিভাগ আদেশদান করিতে পারিবেন।
এই আইনে পোলিশ বিজ্ঞানী কোপারনিকাসের সেই ‘দ্য রেভোলিওশনিবাস’ বইটি ধর্মের বিরুদ্ধে যাওয়ায় গির্জার পাদ্রীরা বইটিকে নিষিদ্ধ করে দেয়। কারণ ওই বইটিতে লেখা ছিল পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে, কিন্তু বাইবেলে লেখা ছিল পৃথিবীর চারদিকে সূর্য ঘোরে। ১৫৪৩ সালের ২২ ফেব্র“য়ারী তিনি মারা যান। এরপর ইতালিয় বিজ্ঞানী জিয়দারনো ব্র“নো সেই অপ্রকাশিত সত্য উৎঘাটন করেন, এবং তা তিনি প্রচার করতে শুরু করেন। এ কারণে তার প্রতি ধর্ম যাজকরা ক্ষিপ্ত হন এবং কঠোর শাস্তি প্রদানের উদ্যোগ নেন। বাধ্য হয়ে ইতালি ছেড়ে তিনি সুইজারল্যান্ডে যান, সেখানেও তিনি একই কারণে বহিষ্কৃত হন। পোপের নির্দেশে একের পর এক দেশ ব্র“নোর জন্য নিষিদ্ধ হয়ে যায়। এই সময় পোপের এক গুপ্তচর এক মিথ্যা প্রলোভন দিয়ে ব্র“নোকে ইতালিতে নিয়ে আসে। ১৫৯২ সালের ২৩ মে বিজ্ঞানী ব্র“নোকে বন্দি করে তার উপর শুরু হয় নির্যাতন, টানা আট বছর ধরে সীসের ছাদের নিচে রেখে বিচারের নামে প্রহসন চালায়, শেষে বিচারের রায় হল ‘পবিত্র গির্জার আদেশে পাপী ব্যক্তির এক বিন্দুও রক্ত নষ্ট না করে হত্যা। অর্থাৎ আগুনে পুড়িয়ে হত্যা। ১৬০০ সালের ফেব্র“য়ারি মাসে ব্র“নোকে নিয়ে যাওয়া হল এক বধ্যভূমিতে। তার জিভ শক্ত করে বাঁধা ছিল, যাতে শেষ বারের মতও তার আদর্শের কথা না বলতে পারে, আগুনে পুড়িয়ে এই বধ্যভূমিতে বিজ্ঞানী ব্র“নোকে হত্যা করা হয়। এখানেই শেষ নয়, ব্র“নোর পর ব্লাসফেমির আরেক শিকার বিজ্ঞানী গ্যালিলিও তার শেষ আটটি বছর কারাগারে দিন কাটান এবং সেখানে তার মৃত্যু হয়।
স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত-সমালোচিত ‘ব্লাসফেমার’ হলেন ইরানের সালমান রুশদী। ৭০ দশকের দিকে ‘স্যাটানিক ভার্সেস’ লেখার জন্য তার বিরুদ্ধে মৃত্যু পরোয়ানা জারি করেন ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা ইমাম খোমেনী। পাকিস্তানে এই আইনের ব্যবহারের মাধ্যমে অনেক মানুষের যাবজ্জীবন, মৃত্যুদণ্ডের ঘটনার অনেক নজির আছে, পাকিস্তানের ফয়সালাবাদে ১৯৯৩ সালের ১ ফেব্র“য়ারী ২৯৫ (গ) ধারায় একটি মামলায় আজও একজনের বিচার চলছে। পাঞ্জাব প্রদেশের ভাওয়ালপুর ১৯৯৩ সালের ৯ ফেব্র“য়াারি ২৯৫ (গ) ধারায় এক ব্যক্তিকে মৃত্যু দণ্ড দিয়েছিল। পাঞ্জাবে ১৯৯২ সালের ২ নভেম্বর কোর্টে মাত্র একজনের সাক্ষীর ভিত্তিতে ৪২ বছরের একজনের মৃত্যু দণ্ড দেন। (অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় ১৯৯৪ সালে মুক্তির নির্দেশ দেন)। বাংলাদেশে সর্বশেষ ‘ব্লাসফেমির’ অপরাধে বিচার হয়েছিলো ২০০৭ সালে। ধর্মীয় উস্কানিমূলক কার্টুন প্রকাশের দায়ে সে সময় কার্টুনিস্ট আরিফুর রহমানকে দুই মাসের জেল এবং ৫০০ টাকা জরিমানা করা হয়।
লেখকঃ এ্যাডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক সম্পাদক সাপ্তাহিক ‘সময়ের দিগন্ত, আইনগ্রন্থ প্রণেতা ও পিএইচ.ডি গবেষক।
seraj.pramanik@gmail.com

পাতাটি ৪২০০ বার প্রদর্শিত হয়েছে।