সম্পাদকীয়

হোম দশদিক সংখ্যাঃ ৭৮


সানাউল হক
সম্পাদক,দশদিক


বাংলাদেশের শ্রমিকরা আজ বিশ্বের নানা প্রান্তে আগুন, বিস্ফোরণ কিংবা ধ্বংস যজ্ঞে অকাতরে প্রাণ দিয়েছে। একটু ভাল থাকার আশায় শত কষ্টের হিমালয় পেড়িয়ে সুদূর লন্ডনে গিয়েও আগুনে পুড়ে ছাই হচ্ছে। সম্প্রতি সৌদিতেও প্রাণ গেল এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায়, সেখানেও বাংলাদেশীদের লাশের সারি। মালয়েশিয়াতেও ভাল নেই শ্রমিকেরা। মধ্য প্রাচ্যের প্রবাসী শ্রমিকরা জীবন সংগ্রামে আজ বড্ড বেশী ক্লান্ত। লিবিয়াতে অবস্থানরত শ্রমিকরা জীবনের মায়া ত্যাগ করে পাড়ি জমাচ্ছেন ভূমধ্য সাগর, লক্ষ্য ইতালি কিংবা গ্রীস। ডুবে মরছেন মাঝ সাগরে। লাশ তো দূরের কথা নিহতের পরিবার তাঁর ঐ ডুবে যাওয়া প্রিয়জনের কথা জানতে পারবে কী না, তা নিয়েও আছে মহা সংশয়। পরিসংখ্যান বলছে, ইউরোপ আমেরিকাতে অভিবাসী কিংবা অবৈধ অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যার বিচারে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়, কোন কোন মাধ্যম দ্বিতীয়ও বলছে! আবার যারা ওয়ার্ক ভিসায় বিদেশ যাচ্ছেন, তাঁদের অধিকাংশই অল্প শিক্ষিত। ভিসা সংক্রান্ত জটিল এবং ধোঁয়াশাচ্ছান্ন কাজ তাঁদের একার পক্ষে করা আদৌ সম্ভব নয়। মূলত শ্রমিকদের একপ্রকার লালসায় ফেলে প্রতারনা করছে এক শ্রেণীর দালাল চক্র।

সরকারি হিসেব অনুযায়ী গত ৪০ বছরে প্রবাসী বাংলাদেশিরা কমপক্ষে ১০ লাখ ৪৬ হাজার ৩২ কোটি টাকা পাঠিয়েছেন বাংলাদেশে৷ প্রকৃত অঙ্কটি নিঃসন্দেহে অনেক বেশি হবে৷ পরিবার ও দেশের জন্য এমন অবদান রাখতে গিয়ে অকাতরে জীবনও দিচ্ছেন অনেকে৷ একটি জাতীয় দৈনিকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৬ থেকে ২০১৬ সালের মার্চ পর্যন্ত মোট ৯৮ লাখ ৮৯ হাজার ৫৫৫ জন বাংলাদেশি বিভিন্ন দেশে কাজ করতে গিয়েছেন৷ ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় বাংলাদেশিদের বিদেশে পাড়ি জমানোর প্রবণতা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে৷ এর পাশাপাশি প্রবাসে নির্যাতনও বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে৷ প্রায় নিয়মিতই আসছে মৃত্যুর খবর৷ পরিবারে সুদিন ফেরানোর আশায় বিদেশে গিয়ে লাশ হয়ে ফিরছেন অনেকে৷ গত এক দশকে ২৫ হাজার ২২৯ জন ফিরেছেন লাশ হয়ে৷ গত বছর, বাংলাদেশে এসেছে মোট ৩ হাজার ৩০৭ জন প্রবাসীর লাশ! অধিকাংশেরই মৃত্যুর কারণ মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ, হৃদরোগ, কর্মক্ষেত্র বা সড়ক দুর্ঘটনা কিংবা ক্যানসারের মতো জটিল কোনো রোগ৷ সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রায় ৯০ লাখ বাংলাদেশি কাজ করছেন৷ এর মধ্যে প্রায় ৫০ লক্ষই আছেন সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার, ওমানসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে৷ ওই দেশগুলোতে কাজের সার্বিক পরিবেশ খারাপ, শ্রমিক নির্যাতনও বেশি৷

প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড জানাচ্ছে, গত এক দশকে বিদেশ থেকে ২২ হাজার ৬৫১ জনের লাশ ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হয়ে বাংলাদেশে এসেছে৷ এর মধ্যে ১২ হাজার ৫৫৭ জনই কাজ করতেন মধ্যপ্রাচ্যের কোনো-না-কোনো দেশে৷ ৫ হাজার ৭৩১ জন ছিলেন সৌদি আরবে, ২ হাজার ৫২০ জন সংযুক্ত আরব আমিরাতে, ২ হাজার ১৮৪ জন কুয়েতে, ১ হাজার ১০২ জন ওমানে, ৫৩৪ জন বাহরাইনে এবং ৪৮৬ জন কাতারে ভাগ্যান্বেষণে গিয়ে লাশ হয়ে ফেরেন৷ গত কয়েক বছরে নারীদের বিদেশ গমনও বেড়েছে৷ বিদেশে তাঁদের জীবন আরো কঠিন৷ দৈনিক ১৮ ঘণ্টা কাজ করেও অনেকে প্রাপ্য পারিশ্রমিক পান না৷ শারীরিক, মানসিক নির্যাতন তো আছেই, যৌন নিপীড়ন, এমনকি ধর্ষণের শিকারও হন অনেকে৷ নিয়োগকর্তা স্বজনহীন পরিবেশে অসহায়ত্বের সুযোগে নারীদের দেহ ব্যবসায় বাধ্য করছেন – এমন খবরও নতুন কিছু নয়৷ সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের উচিত হবে বিদেশের ভিসা হওয়া শ্রমিকদের ভিসার আদ্যোপান্ত খতিয়ে দেখে নিশ্চিত হওয়া, এ সংক্রান্ত একটি হেল্প ডেস্কও খোলা যেতে পারে। আর আমাদের মনে রাখতে হবে- যারা শুধুমাত্র পেটের দায়ে জীবন বিলিয়ে দিয়ে হলেও বিদেশ যেতে পারেন, তাঁরা বহিঃশত্রুর হাত থেকে নিজের পরিবার ও দেশের তরে অনায়াসে হাসি মুখে জীবনও বিলিয়ে দিতে পারেন। আমাদের প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তার জন্য আমাদের সরকারেরই মুখ্য ভুমিকা পালন করতে হবে।

পাতাটি ৩০৮ বার প্রদর্শিত হয়েছে।