• শিরোনাম

    আমরা জাপানিরা কেন এত কাজ করি?

    মানাহো ইগুরা, জাপান থেকে | ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ৬:২২ পূর্বাহ্ণ | পড়া হয়েছে 190 বার

    আমরা জাপানিরা কেন এত কাজ করি?

    বলা হয় যে জাপানের মানুষ অন্য প্রায় সব দেশের মানুষের চেয়ে অনেক বেশি পরিশ্রমী। কোনোরকম অভিযোগ না করে সাগ্রহে কাজ করার মানুষ হিসেবে নিজেদের নিয়ে আমরা গর্বিত। কিন্তু কোনোরকম অভিযোগ ছাড়া মনোযোগ দিয়ে কাজ করে যাওয়া সব সময় ভালো নয়।

    মাত্রাতিরিক্ত কাজ করার কারণে প্রতি বছর প্রায় দশ লাখ মানুষ জাপানে মারা যাচ্ছেন। অন্যান্য উন্নত দেশে, যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ব্রিটেনে এত বড় সংখ্যা দেখা যায় না। মূলত উন্নত দেশে শরীর খারাপ না হওয়া পর্যন্ত কাজ করতে থাকা বিরল। অন্যদিকে জাপানের মানুষের কাছে পরিবারের চেয়ে কর্মজীবন অগ্রাধিকার পায়। তাই স্বামীরা বাড়ির                                      -ছবি লেখিকা : মানাহো ইগুরা



    বাইরে অনেক কাজ করলেও, শিশু পরিচর্যা বা গৃহস্থালির কাজে তারা একদম অংশ নেন না—সেরকম পরিবারও জাপানে অনেক আছে। এর সবচেয়ে বড় কারণ, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত প্রায় প্রতি সপ্তাহে সবটা সময় অফিসে তারা ব্যয় করেন। এরা মনে করেন, শিশুর যত্ন নেওয়া বা গৃহস্থালির কাজ করার সময় তাদের নেই। আর এমন কাজ হচ্ছে মায়েদের কাজ। জাপানের সাধারণ যেসব পরিবারে বাবা-মা উভয়েই কাজ করেন, সেই সব পরিবারে মায়েদের ওপর চেপে বসা কাজের বোঝা তাই অনেক বেশি। ফলে জাপানের মানুষ প্রতিদিনের কাজে পুরোপুরি অবসন্ন হয়ে পড়েন।
    তাহলে কেন আমরা এত উৎসাহ নিয়ে খাটি? প্রথমত, অর্থনৈতিক কারণে অনেক কাজ মানুষকে এখন

    করতে হয়। ১৯৯০-এর দশক থেকে জাপানের অর্থনীতি মন্থর হয়ে আসে। প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে ২০১২ সাল থেকে জাপানের অর্থনৈতিক সমস্যা ভালভাবে সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে আমাদের জীবনে ভালো কোনো পরিবর্তন আসেনি। বিগত কয়েক দশকে খাদ্য ও দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় অনেক কিছু, যেমন জল, বিদ্যুৎ আর গ্যাসের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই সাধারণ মানুষের জন্য বিশেষত টোকিও বা শহর এলাকায় থাকার খরচ এখন অনেক।

    দ্বিতীয় কারণ হলো, কাজ করা নিয়ে জাপানের সমাজের নিজস্ব মনোভাব। জাপানে পুরা জীবন এক কোম্পানিতে কাজ করে যাওয়া হচ্ছে প্রচলিত নিয়ম। খুব অল্পসংখ্যক লোকজনই যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের মতো তাদের ব্যবসায়ী দক্ষতা উন্নত করার সুযোগ হিসেবে বা ব্যক্তিগত জীবনের সমৃদ্ধির জন্য কাজ বদল করেন। এ ছাড়া জাপানের ঐতিহ্যগত নিয়ম অনুসরণ করে কোম্পানিতে কে কত দিন কাজ করেছেন, তার ওপর ভিত্তি করে পদোন্নতি হয় এবং বেতন বৃদ্ধি পায়। তাই একটি কোম্পানিতে আমাদের দীর্ঘকাল ধরে কাজ করে যেতে হয়। ফলে কোম্পানির মালিক বা ওপরের কর্মকর্তা যখন যুক্তিহীনভাবে হঠাৎ বকাবকি শুরু করে দেন, সেরকম অবস্থায়ও আমরা যে বিরক্ত হচ্ছি সেটা আমরা দেখাই না। মনিব অনেক বেশি কাজ চাপিয়ে দিলেও ধৈর্য ধরে আমরা সেই কাজ করি। কেন? আমরা সবাই কাজ নষ্ট করতে চাই না। তাই এমনকি ছুটির দিনেও আমরা কাজ করতে থাকি। কাজের জায়গার চাহিদার দিকে ‘না’ বলতে না পারা আমাদের অবধারিত নিয়তি।
    এ ছাড়া জাপানের কোম্পানিতে আজকাল নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না করতে পারলে ওভারটাইম কাজ করার নিয়ম চালু আছে। সেরকম কাজের বেলায় বাড়তি বেতনের ব্যবস্থাও থাকলেও বাস্তবে সেটা দেখা যায় না। কারণ, জাপানে অতিরিক্ত সময় কাজ করার মানে হলো নির্ধারিত সময়ের কাজে ফাঁকি দেওয়া। আশ্চর্যজনকভাবে এমন অবস্থায় তাই বেতনের কোনো তারতম্য নেই। অনেক সময় দেখা যায় যে, মানুষ কাজের সময়ের বেতনসহ ছুটিতে ভ্রমণ করলে কিংবা সন্তানদের সঙ্গে খাওয়াদাওয়া করার জন্য আগে বাড়ি ফিরে গেলে কাজের জায়গায় মালিক কিংবা সহকর্মীদের সমালোচনার মুখে তাদের পড়তে হয় এবং পারদর্শিতার খারাপ মূল্যায়ন করা হয়। এইভাবে তাই জাপানের অদ্ভুত সামাজিক মূল্যবোধ ‘পরিশ্রমী জাপানি’ পুনরাবৃত্তি করে চলেছে। বাচ্চারা প্রতিদিন কাজ করে যাওয়া তাদের বাবা-মায়ের পিঠ দেখছে এবং ভবিষ্যতে ওরাও বাবা-মায়ের মতোই ‘পরিশ্রমী’ মানুষ হয়ে উঠবে। জাপানের মানুষের এ রকম সামাজিক নিয়ম স্বয়ংক্রিয়ভাবে মেনে নেওয়া হচ্ছে গভীর এক সমস্যা। তরুণ প্রজন্ম আজকাল অবশ্য কাজের নিজস্ব পথ খুঁজে নেওয়ার চেষ্টায় জাপানের কাজের সনাতন ধারণা পরিবর্তনের চেষ্টায় নিয়োজিত হতে শুরু করেছে। কিন্তু আমার মনে হয় দীর্ঘ সময় এতে দরকার হবে।

    কেন আমরা এত কাজ করি? প্রতিদিন কীসের জন্য আমরা কাজ করি? মালিকের বকাবকি যেন শুনতে না হয় সে জন্য? নাকি কোম্পানি বা সমাজ যেন আমাদের খুব ভালোভাবে মূল্যায়ন করে তার জন্য? উত্তর অবশ্যই হচ্ছে মানুষের মতো বসবাস করতে পারার জন্য আমরা কাজ করি। অর্থাৎ, কাজ করার জন্য আমাদের বেঁচে থাকা নয়। টাকাপয়সা দরকার, তবে অর্থই কেবল সবটা নয়। কাজ করে পাওয়া উপার্জন দিয়ে অন্য অনেক কিছু আমরা করতে পারি। যেমন সিনেমা দেখতে পারি, ভালো খাবার খেতে পারি, ভ্রমণ করতে পারি। কিন্তু এসব করতে পারার সময় না হলে কোনো কিছুরই মানে হয় না। পরিবারের সঙ্গে আমরা কথা বলি, ছুটির দিনে সন্তানের সঙ্গে খেলাধুলা করি, বন্ধুর সঙ্গে দেখা করি এবং এসব কিছু করার মধ্যে দিয়ে আমাদের মনকে আমরা সমৃদ্ধ করে নিতে পারি। আমরা সবাই যদি কাজ করতে গিয়ে সমস্ত সময় হারিয়ে ফেলি, আমাদের মন তাহলে দরিদ্র হয়ে যাবে। আমাদের এই জীবন তো শুধু একবারের।

    Facebook Comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২০

    ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২০

    ১২ অক্টোবর ২০২০

    ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২০

    ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০

    ০৪ অক্টোবর ২০২০

    ০১ অক্টোবর ২০২০

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫১৬
    ১৭১৮১৯২০২১২২২৩
    ২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
    ৩১  
  • ফেসবুকে দশদিক