• শিরোনাম

    জাপানিজ সেলিব্রিটি

    আশির আহমেদ | ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ১১:২২ পূর্বাহ্ণ | পড়া হয়েছে 638 বার

    জাপানিজ সেলিব্রিটি

    মেক্সিকো তে এসেছি, একটা কনফারেন্সে। সান্তা ফে শহরে। একটি এলবামের কথা মনে পড়লো। নাম সান্তা ফে। ১৮+ বয়সীদের জন্য। ১৯৯১ সালের নভেম্বরের কথা। আন্ডারগ্র্যাড এর থিসিস নিয়ে মহাব্যস্ত। আমার প্রজেক্ট হলো Z80 CPU দিয়ে রোবট ডিজাইন করা। ফ্লোরে সাদা দাগ একে দিলে এই দাগ বরাবর চলবে রোবট। কিন্তু কিছুতেই রোবট সাহেব আমার কথা শুনছে না। দোষ কোথায়- প্রোগ্রামে, সেন্সরে, নাকি সার্কিট বোর্ডে? কিছুতেই বের করতে পারছিনা। ট্রাবলস্যুট-ফ্রেন্ডলি ডিজাইন হয়নি দেখে স্যার মিটিমিটি হাসছেন আর বলছেন গাম্বারে, আশিরু গাম্বারে।

    ল্যাব থেকে ক্লাসে ফিরে দেখি ছাত্ররা গুঞ্জন করছে। আমাকে বলবে কি বলবে না দ্বিধাতে আছে। বলে রাখি, ক্লাসে আমিই একমাত্র বিদেশি। গুঞ্জনটি একটি এলবাম নিয়ে। নাম সান্তা ফে। মিয়াযাওয়া রিয়ে নামক এক মডেল [১] এর নগ্ন ছবির এলবাম। সান্তা ফে র কথা জাপানের ১৮+ বয়সী নাগরিকের ৯০% লোক জানার কথা।



    মিয়াযাওয়া রিয়ে ছিলেন জাপানের সবচেয়ে পরিচিত মুখ। ১৭ বছর বয়সেই বিশাল জনপ্রিয়তা। এই মেয়ে ১৮ বছরে পা দিলেই কয়েক দশক প্রকাশক ঝাঁপিয়ে পড়বেন- তার নগ্ন ছবি প্রকাশের জন্য প্রস্তাব দিবেন। নগ্ন শুনলেই আমরা কেমন অসামাজিক অসামাজিক এর গন্ধ পাই। কিন্তু এই ক্ষেত্রে কাহিনী আলাদা। আধা জাপানী, আধা ডাচ এই মেয়ের দেহাকৃতিতে নাকি কেমন ফিমেইল লাইন আছে যা ক্লিওপেট্রা কে ও ছাড়িয়ে যাবে। সৃষ্টিকর্তার এই সৃস্টকর্ম ক্যামেরা বন্দী করা চাই। সেজন্যই এত উঠে পড়ে লাগা।

    ১৮ বছর না হলে ন্যুড এলবাম আইনত বৈধতা পাবে না। ৬ মাস ধরেই মিডিয়া মহল রিয়ে-র এলবামে পোজ দেয়া ঠিক হবে কি না হবে -এ নিয়ে গুঞ্জন চলছিল। উপসংহার যা দাঁড়ালো তা হলো -এটা মানবজাতির জন্য জাদুঘরে রাখার জন্য এক শিল্প কর্ম। আঠারোর শরীর বিশে উঠলে আর একরকম থাকবে না। ফিমেইল লাইন টা পাওয়া যাবেনা। কিন্তু রিয়ে-র মা কিছুতেই রাজি হচ্ছিলেন না। প্রকাশকদের ধারনা টাকার অঙ্ক শুনলে মা একসময় গলে যাবেন।

    হলো ও তাই। ১৮ বছরে পা দিতেই আসাহি পাবলিকেশন একদিন নিউজ পেপারে এক পৃষ্ঠা জুড়ে বিজ্ঞাপন দিলেন। জ্বি, রিয়ে-র পরিবার শুধু যে রাজি হয়েছেন তা নয়, ইতিমধ্যে শুটিং, এডিটিং, প্রিন্টিং সব শেষ করে এলবাম বিক্রির বিজ্ঞাপন দিলেন। এলবামের দাম ৪৪০০ ইয়েন (৫০ ডলার এর মত)। অর্ডার দিতে পারবেন, আগে আসলে আগে পাবেন ভিত্তিতে। প্রথম মুদ্রণ হবে ৫ লক্ষ কপি। এই ৫ লক্ষ কপির অর্ডার মাত্র ১০ ঘণ্টাতেই শেষ হলো। ক্রেতাদের চাপে কয়েকদিনের মধ্যে আরও ১০ লক্ষ ছাপানোর প্রতিশ্রুতি দিলেন প্রকাশক। জাপানের ইতিহাসে ১৫ লক্ষ কপি বিক্রি হওয়া এলবাম এই পর্যন্ত এটাই প্রথম, হয়তো এটাই শেষ।

    আমাদের ক্লাসে ছাত্র সংখ্যা ৪৪। ১০০ ইয়েন করে চাঁদা নিয়ে এলবাম অর্ডার দেয়া হলো। আমি আর আরেকটি জাপানী ছেলে নাম “কানযাকি” এই দুইজন চাঁদার লিস্ট থেকে বাদ পড়লাম। আমাকে জানানো হয়নি। জানলে ও হয়তো চাঁদা দিতাম না। আমি আমাকে চিনি। ঐযে ঐ রকম “সুযোগের অভাবে চরিত্রবান” মার্কা একটা ভাব নিতাম। কেউ হয়তো আমাদের ভাগের ২০০ ইয়েন বেশি দিয়েছে। ক্লাসে একটি মেয়ে ছিল সেও চাঁদা দিয়েছে। বাহ।

    আমি আর কানযাকি ছাড়া ছেলের দল সবাই গ্রুপ করে এলবাম দেখছে আর “কিরেই, সুগই” বলে আওয়াজ দিচ্ছে। এমন সময় স্যার ক্লাসে ঢুকলেন। মুহুর্তেই এলবামের কথা জেনে গেলেন। এলবামটি ক্লাসে আছে সেটা ও আবিষ্কার করলেন। ক্লাস শেষ হল। গম্ভীর কণ্ঠে জানতে চাইলেন, কে অর্ডার দিল, কিভাবে এই বিরল জিনিস হাতে এলো। ভাবলাম স্যার হয়তো আজ এক দফা দেখে নিবেন।

    ৪৪০০ ইয়েনের জন্য ৪২ জন চাঁদা দিয়েছে শুনেই পকেটে হাত দিয়ে ২০০ ইয়েন টেবিলে রেখে এ,টি,এম সামসুজ্জামান এর মত লালস কণ্ঠে বললেন, “ওরে নি মো মিসেতে কুরে”- এই লহ চাঁদা, এলবাম আন, আমাকে ও দেখতে দে-হ।

    উনি একজন নগ্ন কিশোরী কে দেখলেন নাকি সৃস্টিকর্তার সৃষ্টকর্মকে দেখলেন, বুঝা গেল না।

    কিছু কথাঃ রিয়ে-র পরবর্তী জীবন তেমন সুখের হলো না। যতই শিল্পকর্ম ভাবা হোক না কেন, সমাজের সিনিয়র সিটিজেন রা রিয়ে-র ন্যুড হওয়াকে ভাল চোখে দেখলেন না। তার বহিঃপ্রকাশ ঘটলো ৯১ সালের NHK র কোহাকু প্রোগ্রামের সময়। প্রোগ্রাম থেকে রিয়েকে বাদ দেয়া হল। (কোহাকু জাপানের সর্বকালের সর্বোচ্চ টি,আর,পি প্রোগ্রাম। প্রতি বছর ৩১শে ডিসেম্বর রাতে ৭টা থেকে ১১টার শো। অনেকেটা আমাদের সেইকালের আনন্দমেলার মত)। ৯২ সালে বাকদান হলো জাপানের আরেক জনপ্রিয় সুমো খেলোয়াড় তাকানোহানার সাথে। কিছুদিনেই সেই বাকদান/বিয়ে ভেঙ্গে গেল। ৯৪ সালে রিয়ে মেরিলিন মনরো স্টাইলে হাতের রগ কেটে আত্মহত্যার চেষ্টা করলেন। সৌভাগ্য ক্রমে বেঁচে গেলেন। সব দেশেরই অধিকাংশ সেলিব্রেটিদের লাইফ এমন হয় কেন? বলতে পারবেন? আমি কিছুটা পারব।

    -জাপান কাহিনী-২২/ আশির আহমেদ

    Facebook Comments Box

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    ১২ অক্টোবর ২০২০

    ০১ অক্টোবর ২০২০

    ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২০

    ০৪ অক্টোবর ২০২০

    ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০

    ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২০

  • ফেসবুকে দশদিক