• শিরোনাম

    জাপানি ভাষা

    আশির আহমেদ | ১২ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ৮:২৪ পূর্বাহ্ণ | পড়া হয়েছে 124 বার

    জাপানি ভাষা

    একটা বিদেশি ভাষা শিখতে কতদিন লাগে? তিনটি মাত্র জাপানি শব্দ পুজি নিয়ে জাপানে এসেছি। আবুনাই মানে বিপদজনক, ওহাইয়ো গোজাইমাস মানে শুভ সকাল। আরেকটা যে কি ছিল মনে করতে পারছিনা। আন্ডারগ্রেডে ঢোকার আগে ভাষা শেখা কম্পালসারি। ৬ মাসে সম্পূর্ণ নুতন একটা ভাষা শিখে এই ভাষায় ইঞ্জিনিয়ারিং পড়বো। সম্ভব? বলেন না, সম্ভব?

    দেশে ১২ বছর ইংরেজী শিখলাম। ফলাফল কি দাঁড়াল? কথা বলতে গিয়ে দেখি শব্দ খুঁজে পাইনা। শব্দ পেলে বাক্য মেলাতে পারিনা। একই বাক্যের মধ্যে “আই মিন”, “য়ু নো”,“হাউ ক্যান আই সে” জাতীয় শব্দমালা লাগিয়ে দেই। কাঁধ দুটো মৃদু ঝাকুনি দেই। তাতে নেইটিভ নেইটিভ ভাব আসে। কিন্তু কথোকপথন চলে না। ওদিককার কথা অনেকটাই বুঝি, কিন্তু এদিক থেকে কিছুই বের হয়না। যে যত বেশী “আই মিন”, “য়ু নো”,“হাউ ক্যান আই সে” এই শব্দ গুলো লাগিয়ে কথা বলবে, ধরে নেবেন তার স্পিকিং লেভেল ততটা সবুজ-সাথী লেভেলের।



    একটা ভাষায় বাহাদুর হবার জন্য সেই ভাষায় লিখিত(রাইটিং), পড়িত(রিডিং), শুনিত(লিসনিং), বলিত (স্পি

    কিং) সব গুলো স্কিল ই সমভাবে জরুরী। দেশে ইংরেজী লিখতে শিখেছি, পড়তে শিখেছি, ইংরেজী সিনেমার কল্যাণে শুনতে শিখেছি, কিন্তু বলতে শিখিনি। রেপিড স্পিকিং ইংলিশ নামে একটা বই ফুটপাতে, নীলক্ষেতে দেখেছি। কোনদিন কেনার চিন্তা ও করিনি।
    “হেইয়া কিন্না অইবে ডা কি কন দেহি? সিলেবাসে আছে না পরীক্ষায় আইবে? এইসব বই কেনার পয়সা কি গাঙ্গে দিয়া বাইয়া আইবে? ”

    সব আশঙ্কা দুর করে দিয়ে ছয় মাসে সত্যি সত্যি জাপানি ভাষাটা শেখা হয়ে গেল। একেবারে রক্ত মাংসের সাথে মিশে ও গেল। “Red” বল্লে যদ্দুর “লাল” মনে হয়,

    “আকা” বললে আরো “লাল” ত্ব খুজে পাই। তিন বন্ধু একসাথে জাপানে এসেছি। বয়স আমাদের ১৮-১৯। একজন সারা দিনরাত পড়াশুনা করে। আর আমরা দুজন সুযোগ পেলেই ঘোরাঘুরি করি। টোকিও শহরটা আমাদের পছন্দ হলো। য়ামানোতে লাইন নামে একটা সার্কুলার ট্রেন আছে। সর্বমোট ২৯ টা স্টেশন। এক স্টেশন থেকে যাত্রা শুরু করলে ৫৫-৬৫ মিনিটের মাথায় আবার সেই স্টেশনে ফেরা যায়।

    লোকে বলে ভাষা শেখার জন্য সবচেয়ে উত্তম পন্থা হলো ঐ ভাষাভাষীর একটি বয়/গার্ল ফ্রেন্ড বানিয়ে ফেলা। টোকিও তে জাপানি ভাষা শেখার জন্য আমার দ্বিতীয় থিওরীটা হচ্ছে য়ামানোতে লাইন ব্যবহার করা। প্রুভেন মেথড।

    আমাদের টেকনিকটা ছিল নিম্নরূপ-

    য়ামানোতে লাইনে একেক দিন একেক স্টেশনে নামবেন। নেমেই আধা ঘন্টা রেন্ডম ভাবে (ব্রাউনিয়ান মোশনে) হেঁটে নিজেকে হারিয়ে ফেলবেন। যখন থামবে কোলাহল -বুঝবেন যথেষ্ট হারানো হয়েছে, এখন ফিরবার পালা। এবাউট টার্ন। তারপর লোকজনকে জিজ্ঞেস করে করে স্টেশনে ফিরবেন। অচেনা লোকদের সাথে কথা হবে। নুতন শব্দ আবিষ্কার করবেন- ভোকাবুলারি বাড়াবেন। সত্যিকারের উচ্চারণ, বাচণভঙ্গি সবই ধরতে পারবেন। একটা ভাষা কে রক্ত মাংসের সাথে মিশাতে হলে শুধু বই পড়লে হবে না।

    জাপানিরা ছবি তোলার সময় কিভাবে পোজ দেয় দেখেছেন? দুই আংগুলে ভি সাইন বানিয়ে বলবে চি-জ। এগুলো কি বইয়ে লেখা থাকে?

    এই পদ্ধতি অবলম্বন করে দুইমাসের মাথায় আমরা পুটোস পাটুস কথা বলা শুরু করলাম। বাক্য শেষ করতে না পারলে “আনো আনো” বলে টান দেই। যারা কথায় কথায় “আনো আনো” বলবে, ধরে নেবেন এরা এখনো কিন্ডার-গার্টেন লেভেলের।

    কত মজার ঘটনা ঘটলো কোনটা ছেড়ে কোনটা বলি।

    (১) একবার য়োকোহামাতে পথ হারিয়ে ফেল্লাম। পুলিশকে জিজ্ঞাস করলাম, “য়োকোহামা একি ওয়া ইকুরা দেস কা?” য়োকোহামা স্টেশনের দাম কত। উনি যা বুঝার বুঝে নিলেন, আমাদের য়োকোহামা স্টেশন দেখিয়ে দিলেন। আমরা যে আরব দ্যাশের শেখের বাচ্চা না, তা আমাদের সুরত দেখেই বুঝে নিয়েছেন।

    (২) শীতের জ্যাকেট কিনবো। তখনো চাইনিজ প্রোডাক্ট জাপানের মার্কেটে ঢুকেনি। ২৫,০০০ ইয়েনের নীচে কোন জ্যাকেট পাচ্ছি না। এক দোকানের সাইন বোর্ডে লেখা জ্যাকেট ২১০০ ইয়েন। দৌড়ে গিয়ে বল্লাম দুইটা দেন। জিজ্ঞেস করলেন, কালার কি? ইশারায় বোঝালাম কালার পরে হবে আগে সাইজ দেখান। পরে বুঝলাম ওটা লন্ড্রী শপ। ধোয়ার মূল্য ২১০০ ইয়েন। মহিলা আমাদের অন্য একটা জ্যাকেট দোকান দেখিয়ে দিলেন।

    (৩) জাপানিরা কথায় কথায় “হাই” “হাই” করে। এই “হাই” এর মানে হলো,”ইয়েস”। “হাই” মানে হলো “আচ্ছা”। জাপানে আসার ৩-৪ মাস পরের কথা। একদিন ফোনে আব্বার সাথে কথা বলছি। আর নিজের অজান্তে “হাই” “হাই” করছি। আব্বা জিজ্ঞাস করলেন তুই কথায় কথায় এত “হাই” “হাই” করিস কেন? “হাই” মানে কি “ইয়েস”? আমি উত্তর দিলাম “হাই”।

    তবে সব ঘটনাই যে মজার,তা নয়-
    (১) আমেরিকার মিনিয়াপোলিস এয়ারপোর্ট এ নামলাম। তারপর সিডার রেপিডস এর একটা ডোমেস্টিক ধরবো। আমার নামে “আহমেদ” দেখে অফিসার আমাকে স্পেশাল রুমে নিয়ে গেলেন। ওখানে আরো আহমেদ মোহাম্মেদরা আছেন (একবিংশ শতাব্ধির সবচেয়ে বড় নগ্ন ডিস্ক্রিমিনেশন)। গুটিকয়েক চাইনিজ কোরিয়ান ও আছেন। ইমিগ্রেশন পুলিশ এক সন্দেহভাজন কে খুঁজে পেয়েছেন যিনি শুধু জাপানি আর কোরিয়ান জানেন। ইংরেজী বোঝেন না।

    ইমিগ্রেশন অফিসাররা এয়ারপোর্ট জুড়ে “দোভাষি” খুজছেন। আমার কাজ শেষ হয়ে গিয়েছিল – ভাবলাম একটু ভলান্টিয়ার সার্ভিস দেই। আমি হাত তুললাম। দোভাষীর কাজ শেষ হলো। কিন্তু আমাকে আবার আটকালেন। আধা ঘন্টা। দোষ হলো- আমার নাক চ্যাপ্টা না, চোখ ও ছোট না- জাপানি ভাষা জানলাম কিভাবে। কাহিনি কি?

    (২) ২০০১ সালে ঢাকা থেকে জাপান আসছি। ইমিগ্রেশন অফিসার আটকালেন। ১২ বছর ধরে জাপানে আছি -আমার চেহারা তা বলছে না। পাসপোর্টের ছবি, ভিসার পেজ..বিশেষ টর্চ দিয়ে দেখলেন …ওনার সন্দেহ দুর হলো না। ল্যাংগুয়েজ টেস্ট নিলেন, জিজ্ঞাস করলেন বলেন তো দেখি- “এরিগাটো” মানে কি।

    যারা জাপানি জানেন না, তাদের জন্য বলছি- এরিগাটো কোন জাপানি শব্দ না। কাছাকাছি শব্দটা হলো আরিগাতো, মানে ধন্যবাদ। ওনাকে তাই বল্লাম। ল্যাংগুয়েজ টেষ্টে পাশ করলাম। উনি পাসপোর্টে সিল দিলেন।

    সম্ভবতঃ আমিই প্রথম বাংলাদেশী যে জাপানীজ প্রফিসিয়েন্সি টেস্ট লেভেল-১ পাশ করা। গর্ব আর অপমানের মাঝামাঝি একটা হাসি দিয়ে তো বলতে পারিনাই, “কেউ আম্রে মাইরালা”। তবে প্লিজ, যেই ভাষা শিখবেন পারলে সেই স্ক্রিপ্টে পড়বেন। ইংরেজী হরফে লেখা Arigato কে অমন ভাবে উচ্চারণ করাটা পাপ। Ronaldo র ব্রাজিলিয়ান (পর্তুগীজ) উচ্চারণ না-কি হোনাউদো।

    (৩) আরেকবার এই ঢাকা এয়ারপোর্টেই এক মহিলা ইমিগ্রেশন অফিসার আমার ল্যাংগুয়েজ টেস্ট নিলেন। আমি কেন মাত্র ৩ দিনের জন্য দেশে গেলাম সধমক ময়মনসিংহ টোনে জেরা করলেন। মনে মনে বলি “মুই ছুডি ডা যদি ফাইতাম, ৩ দিন ক্যান, ৩ মাস ঠ্যাং এর উফরে ঠ্যাং দিয়া দ্যাশে কাডাইয়া দেতাম”। খালাম্মা আমার কৈফিয়ত না শুনেই জিজ্ঞাস করলেন, “বলেন, ‘ছুটি’র জাফানি কি বলেন।”

    আমি নিশ্চিৎ ছিলাম, উনি জাপানির “জ” ও জানেন না।
    আমিও ময়মনসিংহ টোনে জবাব দিলাম, “শি-রানাই”। উনি পাসপোর্টে সিল দিলেন। বুঝলাম, পাস।

    আসলে “শিরানাই” মানে হলো “জানিনা”।

    (৪) যাদের ফ্যামিলি নামে আহসান আছে এদের জাপানে আসা ঠিক না। আহসান এর জাপানি উচ্চারণ হবে আহো সান। আহো মানে হলো স্টুপিড আর সান হলো সাহেব। কি দাড়ালো- স্টুপিড সাহেব? আরেকটা হলো খায়ের। এটার উচ্চারন হবে খায়েরু। তার মানে হলো ব্যাঙ। খায়েরুল আহসান নামের এক ছোট ভাই এসেছিল জাপানে। সে তার নামের অর্থ বুঝে উঠার আগে, ৩ মাসের মধ্যেই জাপান ত্যাগ করলো।

    (৫) ১৯৯৯ সালে আমি সবে পি,এইচ,ডি শেষ করে তোহকু বিশ্ববিদ্যালয়ে জয়েন করেছি। আমার ভাগে মাস্টারস এর দুটো ছাত্র এসে পড়লো। ওদের গাইড করতে হবে। একটার নাম হাগা আরেকটা মুতো। এই হাগা মুতো কে সামনে রেখে গবেষনায় কিভাবে কন্সেন্ট্রেইট করি,বলেন ?

    জাপানে এসে শুধু যে জাপানি ভাষা শিখেছি তা নয়। স্পোকেন ইংরেজী শিখলাম, জার্মান শিখলাম আর শিখলাম বরিশাইল্যা (আমার সবচেয়ে প্রিয় ভাষা)। পার্ট টাইমে ভাষা শিখানো শুরু করলাম- বাংলা শিখালাম জাপানিদের, জাপানি শিখালাম ভারতীয় আর পাকিস্তানীদের, আর ইংরেজী শিখালাম কত্তোজনকে। বাংলা যে এতো মধুর এতো সায়েন্টিফিক একটা, ভাষা তা শেখাতে গিয়ে টের পেয়েছি। বাংলা শেখানোর অভিজ্ঞতা লিখবো কোন এক পরবর্তী পর্বে। স্টে টিউনড।

    -জাপান-কাহিনি ১৬/আশির আহমেদ

    Facebook Comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২০

    ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২০

    ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২০

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১
    ১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
    ১৯২০২১২২২৩২৪২৫
    ২৬২৭২৮২৯৩০  
  • ফেসবুকে দশদিক