• শিরোনাম

    জাপানের অর্থনীতির পুনরুত্থান ও বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা

    ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ: | ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ | ৬:৫৩ পূর্বাহ্ণ | পড়া হয়েছে 193 বার

    জাপানের অর্থনীতির পুনরুত্থান ও বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা

    বিশ্ব অর্থনীতির সমকালীন সূচকগুলো পর্যালোচনা করলে একথা স্পষ্ট হয়ে দাঁড়ায়, জাপান বর্তমান বিশ্ববাজারে একটি অন্যতম অর্থনৈতিক পরাশক্তি। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ১৯৯৬ সালে যখন জাপানে মাথাপিছু আয় ছিল ৩৬ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলার, তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মাথাপিছু আয় ছিল ২৭ হাজার ৮০০ ডলার। সে বছর বিশ্ববাণিজ্যের ১০ শতাংশ ছিল একা জাপানের। বছরটিতে ৪১১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রফতানির বিপরীতে দেশটির আমদানির পরিমাণ ছিল ৩৪৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। পরের বছর ১৯৯৭ সালে জাপানের বৈদেশিক মুদ্রার মজুদের পরিমাণ ২ হাজার বিলিয়ন ডলারের ওপর পৌঁছে। অথচ এর ঠিক ৫০ বছর আগে অর্থাৎ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অব্যবহিত পরে জাপানের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত শোচনীয়, বিধ্বস্ত এবং দুর্বল; যা বর্তমান সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার তুলনায় সম্পূর্ণ বিপরীত।

    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসলীলায় জাপানের অর্থনীতি মূলত পঙ্গুু হয়ে পড়ে। ১৯৪৫ সালে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরবর্তী বছরগুলোয় দারুণ খাদ্যাভাব, অস্বাভাবিক মূল্যস্ফীতি ও ব্যাপক চোরাকারবারি ব্যবসায় অর্থনীতি বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়। জাপানিরা বহির্বিশ্বে তাদের সব দখলীয় এলাকা থেকে বিতাড়িত হয়। ফলে আট কোটি জনসংখ্যার সঙ্গে সহসা ৬০ লাখ বিদেশফেরত জাপানি যুক্ত হয়। বোমা হামলায় কলকারখানাগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। সামরিক ক্রয় ও কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাজার হঠাৎ করে সীমিত হয়ে পড়ে। মার্কিন জেনারেল ডগলাস ম্যাকার্থারের নেতৃত্বে মিত্রবাহিনীর দখলদার প্রশাসন জাপানের বহির্বাণিজ্যের ওপর বিশেষ নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। ফলে বিদেশের বাজারে জাপানি সামগ্রীর চাহিদা পড়ে যায়, কাঁচামাল আমদানি বাধাগ্রস্ত হওয়ায় উৎপাদন ও সরবরাহ সক্ষমতা হ্রাস পায় এবং এর ফলে বিতরণ ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিশাল কর্মজীবী বেকার হয়ে পড়েন।

    বিপর্যস্ত ও বিব্রতকর এ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে প্রাথমিক পর্যায়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেরই অর্থনৈতিক সহায়তায় জাপানি জনগণ তাদের অর্থনীতি পুনর্বাসন ও পুনর্গঠনে আত্মনিয়োগ করে। আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান, কঠোর পরিশ্রমী ও আত্মমর্যাদা সম্পর্কে সচেতন জাপানি জনগণ শত প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে সাফল্যের সন্ধান পায়। ১৯৫১ সালের মধ্যে জাপানের জিএনপি ১৯৩৪-৩৬ সালের পর্যায়ে পৌঁছে এবং ১৯৫৪ সালে রিয়াল টার্মে মাথাপিছু আয় ১৯৩৪-৩৬ সালের পর্যায়ে পৌঁছতে সক্ষম হয়। পরিত্যক্ত সামরিক বাহিনীর লোকবল এবং বিদেশফেরত বেসামরিক জনবল একত্রে জাপানের বিশাল কর্মিবাহিনীতে রূপান্তর হয়। বিশাল সামরিক ব্যয় ও যুদ্ধে যুবকদের বাধ্যতামূলক ব্যবহার বন্ধ হওয়ায় শিল্প-কলকারখানার জন্য বাড়তি বরাদ্দ এবং প্রশিক্ষিত ও সুশৃঙ্খল লোকবল পাওয়া যায়। ম্যাকার্থার প্রশাসন কর্তৃক বেশকিছু সংস্কারমূলক কর্মসূচি গ্রহণের ফলে আর্থপ্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়। একচেটিয়া ব্যবসায় নিয়োজিত বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান (জাইবাত্সু) ভেঙে দেয়ায় তাদের দখলে থাকা বিশাল ভূসম্পত্তি জনসাধারণ, বিশেষ করে চাষীদের মধ্যে ভাগ করে দেয়া সম্ভব হয়। লেবার ইউনিয়নের কর্মকাণ্ডে বিব্রতকর বাধাগুলো অপসারণ করা হয় এবং সবার চাকরির শর্তাবলি পুনর্নির্ধারিত হয়। ফলে কর্মপরিবেশে শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। উৎপাদনে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জাতীয় অর্থনীতির মুখ্য দুই খাত হিসেবে কয়লা ও ইস্পাত শিল্পকে নির্বাচন করায় এ দুই খাতে উল্লেখযোগ্য উৎপাদন নিশ্চিত হয়, যা পশ্চািশল্পসংযোগ হিসেবে অন্য অধিকাংশ শিল্পের টেকসই উন্নয়নে বিশেষ সহায়ক হয়। নতুন শাসনতন্ত্রে ‘যুদ্ধ নাস্তি’ ধারা সংযুক্ত হওয়ায় সামরিক ব্যয় সম্পূর্ণ লোপ পায়। ফলে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের জন্য সামরিক বাহিনী বাবদ ব্যয় সাশ্রয় শুধু নয়, জাতীয় চিন্তা-চেতনার ক্ষেত্রেও একটা পরিশীলিত প্রত্যয় ও মেজাজ ফিরে আসে। যুদ্ধে ত্যক্ত-বিরক্ত ও সর্বস্বান্ত জাপানি জনগণ জেনারেল ম্যাকার্থারের শাসনতান্ত্রিক সংস্কারকে স্বাগত জানায় এবং যুদ্ধে উন্মত্ত জাপানি জাতিকে বাধ্যতামূলকভাবে শিল্প-কারখানা ও কৃষিতে ফিরিয়ে দেয়ায় তাদের আর্থসামাজিক জীবন ব্যবস্থায় যে বিশেষ তাত্পর্যবাহী অগ্রগতি সাধিত হয়, তার জন্য কৃতজ্ঞতাবোধ করে। দীর্ঘমেয়াদে দেখা যায়, যুদ্ধে পরাজয়বরণ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে মিত্রবাহিনীর দখলদারিত্বে এবং বিশেষ করে জেনারেল ম্যাকার্থারের প্রশাসনাধীনে অর্থনৈতিক ভিত পুনর্নির্মাণের সুযোগ লাভের ফলে বিশ শতকের শেষার্ধে জাপান অর্থনৈতিক পরাশক্তির পর্যায়ে পৌঁছতে সক্ষম হয়।

    যুদ্ধ শেষ হওয়ার নয় বছর পর, ১৯৫৫ সালে জাপানি অর্থনীতি যুদ্ধ-পূর্ববর্তী অবস্থায় আসতে সক্ষম হয়। ১৯৫৬ সালে জাপান সরকার ‘অর্থনৈতিক শ্বেতপত্রে’ ঘোষণা দিতে সক্ষম হয়, ‘যুদ্ধোত্তরকালের অবসান ঘটেছে, যুদ্ধ-পূর্ববর্তীকালে অর্থনীতি যেখানে ছিল, আমরা এখন সেখানে।’ উল্লেখ্য, ১৯৫৬ সালে জাপানের অর্থনীতির আকার ছিল বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থানের ১ শতাংশেরও কম। সে সময় মাথাপিছু আয় ছিল ২৬৯ ডলার, রফতানি ২ বিলিয়ন ডলার, আমদানি ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার আর বৈদেশিক মুদ্রার মজুদের পরিমাণ ছিল মাত্র শূন্য দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি থেকে জাপানি অর্থনীতি মূলত টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জনের দিকে অগ্রসর হয়। পুরো ষাটের দশকে এ অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকে, এর মাঝে ১৯৬২ সালে একটি এবং ১৯৬৫ সালে আরেকটি অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবেলা করেই। পুরো ষাটের দশকে গড় বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ১১ শতাংশের কাছাকাছি থাকে। এর তুলনায় এ দশকে জার্মানিতে গড় প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৪ দশমিক ৬ শতাংশ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৪ দশমিক ৩ শতাংশ। ষাটের দশকে জাপানের এ প্রবৃদ্ধি ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পূর্ববর্তী ত্রিশের দশকের গড় প্রবৃদ্ধির (৪%) প্রায় তিন গুণ তো বটেই।

    এটা সর্বজনবিদিত ও স্বীকৃত, পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে জাপানি অর্থনীতির অভূতপূর্ব সাফল্য বেসরকারি খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ এবং নিত্যনতুন শিল্পোদ্যোগ গ্রহণের ফলেই সম্ভব হয়েছিল। জাপানিদের ঘরোয়া সঞ্চয়ের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্যাংকগুলোর অধিক অর্থলগ্নিতে তথা বেসরকারি খাতে বিনিয়োগে পুঁজি সরবরাহে সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। নতুন নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার এবং বিদেশী কোম্পানির লাইসেন্স নিয়ে ব্র্যান্ড আইটেম উৎপাদনে জাপানিদের গভীর মনোনিবেশের ফলে উৎপাদনে প্রকর্ষসহ উৎপাদিত সামগ্রীর প্রকার, পরিমাণ ও গুণগত মান বৃদ্ধি পায়, সরবরাহ বৃদ্ধি পায় এবং বহির্বিশ্বের বাজারে জাপানি সামগ্রীর নতুন চাহিদা সৃষ্টি হয়, জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়। এ সময়ে জাপানি উৎপাদন ব্যবস্থায় আরেকটি বিশেষ সুযোগ সংযুক্ত হয়। আর তা হলো, পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রশিক্ষিত শ্রমিক। এ সময় প্রতি বছর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক তরুণ ও প্রতিভাদীপ্ত শ্রমিক উৎপাদন কর্মে সংযুক্ত হতে থাকেন এবং কৃষি থেকেও শ্রমিক শিল্প-কারখানায় ব্যাপকভাবে স্থানান্তর হতে থাকেন। এ প্রেক্ষাপটে বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে জাপানের অর্থনীতিতে অর্জিত অভূতপূর্ব সাফল্যে সে দেশের শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্যের ভূমিকাই যে ছিল মুখ্য তা বলা বাহুল্য।

    অতি সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদ, মোট ভূখণ্ডের মাত্র ৩০ শতাংশ বাস ও চাষযোগ্য জমি এবং ভূমিকম্পপ্রবণ দ্বীপপুঞ্জের দেশ জাপানের অর্থনীতির ভিত মূলত শিল্প-ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর একান্তভাবে নির্ভরশীল। প্রক্রিয়াজাত শিল্পসামগ্রী রফতানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনই জাপানের অর্থনীতির অন্যতম অবলম্বন। বিদেশী প্রযুক্তি প্রয়োগ ও প্রক্রিয়াজাত শিল্প উৎপাদনের জন্য বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজনীয়তা প্রাথমিক পর্যায়ে ছিল অপরিসীম। আর এ উদ্দেশ্য অর্জনে কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন ও প্রয়োগ প্রক্রিয়ায় জাপানের বড় বড় ট্রেডিং হাউজের (জাপানি ভাষায় ‘শোগো শোষা’) ভূমিকাও ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে শোচনীয় পরাজয়ের পর যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠন ও পুনরুজ্জীবনের লক্ষ্যে জাপান সবকিছুর ওপর শিল্প-ব্যবসা-বাণিজ্যে বিনিয়োগে মনোনিবেশের মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়নের নীতি গ্রহণ করে। ১৯৪৭ সালে অর্থাৎ যুদ্ধ শেষ হওয়ার দুই বছরের মধ্যে বৈদেশিক বাণিজ্য বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়ার লক্ষ্যে পদ্ধতি সংস্কারসহ নিয়ন্ত্রণমূলক নীতিমালায় আনা হয় ব্যাপক পরিবর্তন। এর দুই বছর পর ১৯৪৯ সালে মুদ্রাবিনিময় হার ডলারপ্রতি ৩৬০ ইয়েনে বেঁধে দেয়া হয়। জাপান সরকার এ সময়  বৈদেশিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে কয়েকটি পোশাক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, ১৯৪৭ সালের মে মাসে প্রতিষ্ঠিত মিনিস্ট্রি অব ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (মিটি), ১৯৫০ সালে এক্সপোর্ট ব্যাংক অব জাপান [যা সত্তরের দশকে এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট (এক্সিম) ব্যাংক এবং হালে জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন (জেবিআইসি) হিসেবে ওভারসিজ ইকোনমিক কো-অপারেশন ফান্ডের (ওইসিএফ) সঙ্গে একীভূত হয়] এবং ১৯৫৮ সালে জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেট্রো)। মিটি আন্তর্জাতিক বাজারে জাপানের প্রবেশ নিশ্চিত করতে নীতি ও পদ্ধতি নিয়ে নিরন্তর গবেষণা এবং বহির্বাণিজ্য বৃদ্ধির কর্মপন্থা নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণ করে। এক্সিম ব্যাংক আমদানি-রফতানিকারকদের পুঁজি সরবরাহসহ যাবতীয় আর্থিক লেনদেনে নিশ্চয়তা নির্ভরতার বিধান করে। জেট্রো জাপানি পণ্যের বিদেশে বাজার সৃষ্টিতে এবং একই সঙ্গে বিদেশী পণ্যের (কাঁচামাল) জাপানে আমদানি বিষয়ে উৎসাহ, অনুপ্রেরণা ও প্রণোদনার দায়িত্ব পালন করতে থাকে। বিদেশে জাপানি পণ্যের বাজার প্রসার এবং সরকারের সঙ্গে আমদানি-রফতানি নীতি-রীতি-পদ্ধতি সংস্কার সংক্রান্ত সংলাপ ও সুবিধাবলি আদায়ে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের নিমিত্তে পণ্য ও শিল্প খাতওয়ারি আমদানি-রফতানি সমিতিগুলো গড়ে ওঠে এ সময়ে। সমিতিগুলো বাজার গবেষণা, তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ ও নিজেদের উৎপাদিত পণ্যের গুণগত মান উন্নয়নে মনোনিবেশ করে এবং বাজার অনুসন্ধান ও উন্নয়নমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করে। ব্যবসা-বাণিজ্যবিষয়ক তথ্য-উপাত্ত ও সংবাদবাহী দৈনিক পত্রিকা এবং বিশেষায়িত সাময়িকীগুলোর প্রকাশনাও শুরু হয় এ সময়ে।

    পঞ্চাশের দশকে জাপান সরকার ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষেত্রে বেশকিছু পদ্ধতি প্রবর্তন করে, যার মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল রফতানি উৎসাহিতকরণ। এর মধ্যে রফতানি আয় থেকে করযোগ্য আয় বাদ দেয়ার পদ্ধতি, রফতানি অর্থায়নের ব্যবস্থা সহজীকরণ, রফতানি বীমা পদ্ধতি প্রবর্তন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ব্যবসা ও বণিক সমিতিগুলোর মতামত, পরামর্শ ও প্রস্তাবকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হতো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর, শিল্প ও বাণিজ্য সংস্থার প্রধান, শিল্প গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনগুলোর নেতারা প্রতি মাসে নিজ নিজ নির্ধারিত তারিখে পৃথকভাবে সংবাদ মাধ্যমগুলোর সঙ্গে দেশের অর্থনীতি, শিল্প উৎপাদন পরিস্থিতি ও ব্যবসা-বাণিজ্য বিনিয়োগ নীতি, নিয়মাবলি ব্যাখ্যা এবং সেসবের প্রয়োগ সম্পর্কে খোলামেলা আলোচনা এবং মতবিনিময় করতেন। এ পদ্ধতি ও কর্মসূচি এখনো বলবৎ আছে।

    যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠন প্রয়াসে জাপানে অবস্থানরত মার্কিন প্রশাসনের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় জেনারেল হেডকোয়ার্টার থেকে মার্কিন প্রতিরক্ষা প্রশাসনের পক্ষে জারিকৃত বিভিন্ন ফরমান দ্বারা ব্যবসা-বাণিজ্যে বড় বড় কোম্পানিকে প্রায়ই বেশ ঝামেলা পোহাতে হতো। ১৯৪৭ সালের জুলাইয়ে ফরমান জারির মাধ্যমে জাপান সরকার ‘মিত্সুই বুশান কাইসা’ ও ‘মিত্সুবিশি সোজি কাইশা’ (বর্তমান মিত্সুই ও মিত্সুবিশি কোম্পানির পূর্বসূরি) বন্ধ ঘোষণা করে। এ ফরমানে শুধু মিত্সুবিশি কিংবা মিত্সুই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, এর দ্বারা দাইকেন সাংগিও (বর্তমানের ইতোচু ও মারুবেনির  পূর্বসূরি) কোম্পানিকে তাদের কেন্দ্রীয় দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার ব্যাপারে রীতিমতো নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়। ফলে মিত্সুই ও মারুবেনি অনেকগুলো ছোট বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। পরবর্তীকালে এসব ছোট কোম্পানি একত্র হওয়ার উদ্যোগ নেয় এবং ষাটের দশকেই তারা আবার একত্র হয়।

    অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বস্ত্র, ইস্পাত, খনিজ ও জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে শিল্প বিকাশের মাধ্যমে মাঝারি ও ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠার পশ্চাত্সংযোগ সুবিধা সৃষ্টির যে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় জাপানের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার প্রয়াসে। দেখা যায় পঞ্চাশের দশকের শেষ ভাগে এসে তাতে বেশ ইতিবাচক সাফল্য এসেছে। যখন মিত্সুই ও মারুবেনি বিলুপ্ত হয়, তখন মধ্য জাপানে কানসাই (ওসাকা) এলাকায় বস্ত্র ও ইস্পাত শিল্প এবং বাণিজ্যে অন্যান্য ম্যানুফ্যাকচারিং ও ট্রেডিং কোম্পানি গভীর মনোযোগের সঙ্গে কাজ করতে থাকে। নাগোয়াতে টয়োটা পরিবার প্রথমে বস্ত্র এবং পরবর্তীতে অটোমোবাইল শিল্পে অতি সামান্য অবস্থা থেকে বিশাল মহীরুহে উন্নীত হওয়ার ইতিহাস সৃষ্টি করে। আজকের ইতোচু, মারুবেনি, তোমেন, নিচিমেন, নিশশো ইওয়াই প্রভৃতি ট্রেডিং কোম্পানিও এ সময় আত্মসংগঠনে সক্ষম হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে অবশ্য এসব ট্রেডিং কোম্পানি ততটা শক্তিশালী ছিল না, যা কোরিয়ান ওয়ার বুম অবসানের পর জাপানের অর্থনীতিতে যে মন্দাভাব দেখা দিয়েছিল তা মোকাবেলা করার মতো।

    কোরিয়ান ওয়ার বুম যুদ্ধোত্তর জাপানের অর্থনীতিকে সবল হতে সাহায্য করেছিল। কোরিয়ার যুদ্ধের সুবাদে জাপানি ট্রেডিং ও ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানিগুলো বেশকিছু কৌশলগত উৎপাদন ও সরবরাহের সাব-কন্ট্রাক্টিং লাভ করে। জাপানের বাড়তি দক্ষ ও সুশৃঙ্খল লোকবল এসব কাজে ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি হয়। বিদেশী সামগ্রীর নির্মাণশৈলী অভিনিবেশসহকারে পর্যবেক্ষণ ও নিজেদের উদ্ভাবনী শক্তির সমন্বয়ে জাপানিরা নিত্যনতুন মডেলের পণ্য উৎপাদনে পারঙ্গমতা প্রদর্শন ও পারদর্শিতা অর্জন করে। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পসামগ্রীর চমত্কারিত্বের মধ্যে পণ্য উৎপাদন ও নির্মাণ নিষ্ঠার পরিচয় পাওয়া গেল। এসব সফল কুটির শিল্পই পরবর্তীকালে মাঝারি ও ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠার প্রেরণা ও উৎপাদন উপাদান সরবরাহের উৎস হিসেবে পরিগণিত হয়। জাপানের মাঝারি ও ভারী শিল্প কোনো একক উদ্যোগের প্রতিষ্ঠান নয়, হাজার হাজার ক্ষুদ্র শিল্প পরিবারের সমন্বয় ও সংশ্লেষের ফসল। পঞ্চাশের দশকেই ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তাদের সার্বিক স্বার্থ সংরক্ষণ ও তাদের উন্নয়ন প্রয়াসকে প্রযত্নদানের জন্য রাষ্ট্রীয় সংস্থা স্মল অ্যান্ড মিডিয়াম এন্টারপ্রাইজেস করপোরেশন গঠিত হয়। এ সংস্থা এখন জাতীয় প্রতিষ্ঠান। এ সংস্থা তৃতীয় বিশ্বের অনেক উন্নয়নশীল দেশে একই নামে ও কাজে গঠিত নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের মতো শিল্প প্লট তৈরি আর লাইসেন্স প্রদানের মতো অনুৎপাদনশীল কাজে সময় ব্যয় করে না, কীভাবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোগকে একটা গঠনমূলক কর্মপরিকল্পনার মধ্যে আনা যায়, কীভাবে দক্ষ জনবল সৃষ্টির মাধ্যমে উৎপাদনে উত্কর্ষ আনা যায় এবং যেকোনো সংকট সন্ধিক্ষণেও যাতে আত্মনির্ভরশীলতার সুযোগ বিদ্যমান থাকে, তেমন একটি টেকসই মূল্যবোধগত অবয়ব গড়ে তুলতে নিরন্তর গবেষণায় ও কর্মপন্থা নির্ধারণে এ প্রতিষ্ঠান নিয়োজিত। কর্মপরিবেশের জন্য যোগ্য কর্মী সৃষ্টিকে বর্ধিত ও টেকসই উৎপাদনের অন্যতম উপায় বলে বিবেচনা করে এ প্রতিষ্ঠান প্রশিক্ষণ ও কর্মী ব্যবস্থাপনার উন্নয়নের ওপর বেশি জোর দেয়। শিল্পনীতি নির্ধারণে এ সংস্থাকে সরকারের অন্যতম উপদেষ্টা ও পরামর্শক বিবেচনা করা হয়।

    পুরনো ট্রেডিং কোম্পানিগুলো যখন জাপানের রফতানি তথা বহির্বাণিজ্যে যথেষ্ট প্রভাব ও অবদান রাখতে সক্ষম বলে স্বীকৃত হতে শুরু করে, তখন জাপান সরকার ট্রেডিং কোম্পানি তথা শোগো শোষাদের সহায়তাকল্পে অনেক পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এসব পদক্ষেপের মধ্যে ছিল— রাবার, চামড়া ও ফ্যাটের (জাপানিরা সে সময় বলত সানকো আতারাশি মনো বা নতুন তিন পণ্য) বাজার বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষাকল্পে উদ্ধার প্যাকেজ প্রদান, কর রেয়াত দ্বারা রফতানি বাজার বাতিল হওয়াজনিত ক্ষতি থেকে পুঁজি পুনর্গঠনের সুযোগ এবং বিদেশে অবস্থিত ট্রেডিং অফিসগুলোর জন্য বিশেষ অবচয় প্রয়োগ সুযোগের দ্বারা ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা। রফতানি নীতিতে এসব লক্ষ্যে বিভিন্ন রেয়াত ও সুবিধার সমাহার ঘটানো হয়। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতামূলক এসব পদক্ষেপের ফলে ট্রেডিং কোম্পানিগুলো বহির্বিশ্বে বাজার খুঁজে জাপানি পণ্য উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থায় বিশেষ অবদান রাখার মতো শক্ত-সমর্থ হয়ে ওঠে।

    একই সময় দেশের বৈদেশিক মুদ্রা মজুদে অপ্রতুলতার প্রেক্ষাপটে সরকার আমদানি বাণিজ্যে বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণের হেতু হিসেবে বেশকিছু নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। এত দিন আমদানিকারকদেরকেই বৈদেশিক মুদ্রা বরাদ্দ করা হতো, ট্রেডিং কোম্পানিগুলোকে নয়। ফলে ট্রেডিং কোম্পানিগুলো মানুফ্যাকচারারদের পক্ষ হয়ে কাজ করত। ১৯৫৬ সালে বৈদেশিক মুদ্রা বরাদ্দ ব্যবস্থায় সংশোধনী আনা হয় এবং ট্রেডিং কোম্পানিগুলোকেও স্বাধীনভাবে বহির্বাণিজ্যে  সুবিধাদানের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দান পদ্ধতি প্রবর্তিত হয়। বৈদেশিক মুদ্রাপ্রবাহের ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কড়া পরিবীক্ষণ ব্যবস্থাকে বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ক্রমান্বয়ে পুনর্বিন্যাস করা হয়। আমদানি-রফতানি ও প্রত্যাবাসন সূত্রে বৈদেশিক মুদ্রার আগমন-নির্গমন পরিস্থিতির ওপর নিত্যনজরদারি এবং মুদ্রাবিনিময় হারকে সুসামঞ্জস্য করার ওপর নীতিগত তাগিদ আরোপ করা হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরকে মিডিয়ার সঙ্গে নিয়মিত পাক্ষিক ব্রিফিংয়ে বৈদেশিক মুদ্রাপ্রবাহ ও রিজার্ভ পরিস্থিতির ওপর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের প্রথা চালু করা হয়।

    পঞ্চাশের দশকের শেষ ভাগে ছোট ছোট কোম্পানির মধ্যে একত্রিত হওয়ার প্রয়াস লক্ষ করা যায়। একসময়ের ভেঙে যাওয়া জনবুত্সু আবার নতুন উদ্যমে সংগঠিত হতে থাকে। হোল্ডিং কোম্পানিগুলোকে একত্র হওয়ার জন্য একসময়কার লিকুইডেশন কমিটিই অনুমোদন দিতে থাকে। এমনকি কোম্পানির পুরনো নাম ও ট্রেডমার্ক ব্যবহারের অনুমতি দেয়া হয় এবং এটা লক্ষণীয় হয়ে ওঠে ১৯৫৪ সালের মিত্সুবিশি করপোরেশন এবং ১৯৫৯ সালে মিত্সুই অ্যান্ড কোম্পানি পুনর্জন্মলাভ ও পুনর্গঠিত হওয়ার সময়। এ ধারা ২০ বছরের মতো অব্যাহত থাকে ইতোচু আতাকার সঙ্গে একত্রিত হওয়ার সময় পর্যন্ত। একত্রিত হওয়ার ফলে ট্রেডিং কোম্পানিগুলো পেতে থাকে নানা সুযোগ-সুবিধা। ফলে তাদের আর্থিক সচ্ছলতা বৃদ্ধি পায়, ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতার সমাহার ঘটে এবং ব্যবসার জন্য পণ্যের পরিমাণ ও মাত্রা এবং সার্বিকভাবে ব্যবসায়িক কার্যক্রমের পরিধি বৃদ্ধি পায়।

    পঞ্চাশের দশকের শেষ ভাগ এবং ষাটের দশকের প্রথম ভাগে জাপানের অর্থনীতিতে এক অভূতপূর্ব সাফল্য ও স্থিতিশীলতা আসে এবং এ সময় জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার অব্যাহতভাবে কমবেশি গড়ে ১০-এর উপরে থাকে। এ সময়ে জাপানের রফতানি প্রবৃদ্ধির হার বিশ্ববাণিজ্যে রফতানি বৃদ্ধির গড় মাত্রা অতিক্রম করে। বিশ্ববাণিজ্যে জাপানের বাণিজ্যের হিস্যা, যা ১৯৫৫ সালে ছিল ২ দশমিক ১ শতাংশ, তা ১৯৭০ সালে ৬ দশমিক ২ শতাংশে উন্নীত হয়। জাপানের রফতানি প্রবৃদ্ধির পেছনে জাপানি কোম্পানিগুলোর বর্ধিত পুঁজি বিনিয়োগ এবং অর্থনীতির সার্বিক প্রবৃদ্ধির বিশেষ সহায়ক ভূমিকা ছিল। প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে উন্নতমানের পণ্য বিপুল পরিমাণে বিশ্ববাজারে সরবরাহের সক্ষমতা অর্জিত হওয়ায় এবং একই সময়ে বিশ্ববাজারে সে পণ্যের বিপণন সুবিধা সম্প্রসারণ হওয়ায় রফতানির মাত্রা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়। বর্ধিত বাজার অনুসন্ধান ও চাহিদা সৃষ্টিতে জাপানের অর্থনৈতিক কূটনীতি ও ট্রেডিং কোম্পানিগুলোর ব্যাপক কর্মতত্পরতা তাত্পর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

    জাপান সরকার ১৯৬০ সালে ১০ বছর মেয়াদি জাতীয় আয় দ্বিগুণ অর্জন কর্মসূচি ঘোষণা করে। এ কর্মসূচির মুখ্য নীতি ও কৌশল ছিল অভ্যন্তরীণ সঞ্চয় বাড়ানোর জন্য উৎসাহ প্রদান, বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য পুঁজি বাজারের উন্নয়ন, মূল্য সংযোজনকারী উৎপাদনমুখী শিল্প-কারখানার উন্নয়নে উৎসাহব্যঞ্জক যাবতীয় সহায়তা প্রদান, সংরক্ষণমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে বিদেশী শিল্প আগ্রাসনের হাত থেকে দেশের সম্ভাবনাময় শিল্পগুলোকে নিরাপত্তা প্রদান এবং রফতানি আয় বাড়ানোর যাবতীয় উদ্যোগ গ্রহণ। জাপান এ সময় বিশ্ব অর্থনীতিতে বিদ্যমান স্থিতিশীল পরিবেশের সুযোগ পায় এবং বিশ্ববাজার থেকে স্বল্প দামে জ্বালানিপ্রাপ্তিও ছিল আরেকটি বাড়তি সুযোগ। এ প্রেক্ষাপটে ১৯৬৫ সালে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবেলা করেও জাপানি অর্থনীতি সত্তরের দশকের শুরু পর্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করতে থাকে। এর পেছনে আরো যেসব কারণ কাজ করে, তার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখ্য— (১) পর্যাপ্ত বিনিয়োগযোগ্য পুঁজির প্রাপ্যতা (২) রফতানি সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বাড়তি সুযোগ-সুবিধা প্রদানসহ অবকাঠামোগত ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন (৩) বিশ্ব ও অভ্যন্তরীণ বাজারের ক্রমবর্ধমান চাহিদার সঙ্গে মিল রেখে উৎপাদন কৌশল পরিবর্তন ও নতুন প্রযুক্তি প্রয়োগের জন্য যন্ত্রপাতি ও প্রয়োগিক জ্ঞানের সহজ প্রাপ্তি (৪) উৎপাদনে ও সমাজে শ্রমশক্তির উপযুক্ত উৎসাহ-উদ্দীপনা বৃদ্ধিতে সহায়তামূলক বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার (বাসস্থান, কর্মস্থলে নিরাপত্তা, চাকরির নিশ্চয়তা) সমাহার এবং পরিবেশ দূষণ রোধে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ। গবেষণা ও উন্নয়ন (আরঅ্যান্ডডি) এবং মান নিয়ন্ত্রণ (কিউসি) ব্যবস্থা জোরদারকরণে রফতানিযোগ্য পণ্যের গুণগত মান বৃদ্ধির ফলে বিশ্ববাজারে জাপানি পণ্যের চাহিদা বেড়ে যায় ব্যাপকভাবে।

    এ সময় সবচেয়ে বেশি লক্ষণীয় হয়ে ওঠে  রফতানি পণ্য তালিকায় ভারী শিল্পজাত পণ্যের অন্তর্ভুক্তি, যা রফতানি বাণিজ্যের পরিমাণ বাড়ার কারণ। ১৯৫৫ সালে জাপানি রফতানি পণ্যের সিংহভাগ ছিল ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পজাত পণ্য যেমন— বস্ত্র, পোশাক, খেলনা। কিন্তু ১৯৭০ সালে ভারী শিল্পজাত পণ্য রফতানি সামগ্রীর অংশ ৭০ শতাংশে পৌঁছে। বিশেষ করে গাড়ি ও হোম ইলেকট্রনিকস অ্যাপ্লায়েন্স ৪৬ শতাংশ জায়গা দখল করে নেয়। এ সময় জাপানি ট্রেডিং হাউজগুলোও বিশেষ ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। তারা ক্যাপিটাল সামগ্রী আমদানি এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহিত করে জাপানি শিল্পজগেক আধুনিকায়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। জাপানি শিল্প উৎপাদন ব্যবস্থায় একটা আন্তরিক প্রচেষ্টা ও প্রবণতা লক্ষণীয় হয়ে ওঠে যে, কীভাবে এ ক্যাপিটাল মেশিনারি ও প্রযুক্তি ব্যবহারের দ্বারা শিল্প উৎপাদন ব্যবস্থাকে বিশ্বের বাজারে প্রতিযোগিতামুখী করে তোলা যায়। বিশ্বের বড় বড় শিল্প উৎপাদন প্রতিষ্ঠান/কোম্পানিগুলোর এজেন্সি নেয়ার ব্যাপারেও জাপানি কোম্পানিগুলোর মধ্যে বিশেষ আগ্রহ দেখা যায়। ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বাজার এবং এর চাহিদা প্রকৃতি-সংক্রান্ত তথ্যাদি সংগ্রহ ও পর্যালোচনার গুরুত্ব যখন বেড়ে গেল, তখন ট্রেডিং হাউজগুলো নিজস্ব তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও বাজার যাচাইয়ের লক্ষ্যে আমদানিকারক বড় বড় দেশে নিজেদের প্রতিনিধি অফিস খুলে বসে। প্রায় সব আমদানিকারক দেশে অফশোর কার্যালয় এ সময়ই খোলা হয়। ফলে শুধু মেশিনারি আমদানি-রফতানি কাজে ব্যাপৃত থাকার পাশাপাশি বড় বড় ট্রেডিং কোম্পানি ক্রমান্বয়ে যন্ত্রপাতি স্থাপন, অর্থায়ন এবং এমনকি লাইসেন্সিংয়ের ব্যাপারেও নেগোসিয়েশনে ব্যাপৃত হয়। দিনে দিনে উন্নত প্রযুক্তি ও নির্মাণ কৌশলে উৎপাদিত নতুন নতুন পণ্য বাজারজাতের জন্য ট্রেডিং হাউজগুলো বহির্বিশ্বে বাজার খোঁজার কাজে তত্পর হয়। আর ক্রমবর্ধমান চাহিদার প্রেক্ষাপটে উৎপাদন বৃদ্ধির সুযোগ পেয়ে উৎপাদনকারীদের পক্ষে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে সামগ্রী সরবরাহে আগ্রহ এবং সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। এ প্রেক্ষাপটে ট্রেডিং হাউজগুলো কাঁচামালের উৎস ও সরবরাহ মূল্য থেকে শুরু করে পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতের যাবতীয় তথ্য সুকৌশলে সংগ্রহ ও ব্যবহারে বেশ মনোযোগ দিতে শুরু করে। তথ্য গবেষণাও অনুসন্ধানের দ্বারা বাইরের বাজার দখলে দক্ষতা অর্জনে ও নানা কূটকৌশল অবলম্বনে তারা বেশ যত্নবান হয়ে ওঠে।

    লেখক: সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান, জাপানে সাবেক বাণিজ্যদূত

    মন্তব্য করুন

    মন্তব্য

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

    ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

    ১৮ এপ্রিল ২০১৯

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২
    ১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
    ২০২১২২২৩২৪২৫২৬
    ২৭২৮২৯৩০  
  • ফেসবুকে দশদিক