• শিরোনাম

    জাপানের ইয়াকুজা ও কাস্ট সমস্যা

    আশির আহমেদ | ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ৪:৪৪ পূর্বাহ্ণ | পড়া হয়েছে 166 বার

    জাপানের ইয়াকুজা ও কাস্ট সমস্যা

    জাপানে কি জাতিভেদ প্রথা চালু আছে? (১) ১৯৯১ সাল। ওইতা শহর। জাপানি একটা পরিবারের সাথে পরিচয় হলো। মা, বাবা আর একটা ছেলে ১৯-২০ বয়স। বাবা কি যেন করতেন। মহিলা ছিলেন দারুন সুন্দরী। ঝাঁড়-ফুক করতেন। মহিলা মনে করেন প্রত্যেক অসুখ / ব্যথার পিছনে ভুতের আছর আছে। উনি ঝাঁড় ফুক দিয়ে সেই আছর দুর করে দেন। ওনার বাড়িতে দেশ থেকে সদ্যাগত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রফেসর সহ বেড়াতে গেলাম। প্রফেসরের ঘাড় ব্যথা ছিল। মহিলা অভিনব উপায়ে ঘাড় মালিশ করলেন। দোয়া ও পড়লেন। ব্যথা চলে গেল। প্রফেসর সাহেব পরে আমাকে বল্লেন – মাসাজটা ভাল ছিল। ঝাঁড় ফুক অংশটা এড়িয়ে গেলেন।
    পরিবারটা অত স্বচ্ছল মনে হলো না। বাবা টাকে মনে হলো মাতাল। ছেলেটা মা-র সুন্দরতা পেয়েছে, চুপচাপ কিন্তু মুখে বিরক্তি ভাব।
    একদিন ছেলেটা হঠাৎ আমার ডরমিটরিতে এসে হাজির। তার সাথে একবারই দেখা। তেমন বন্ধুত্ব তৈরি হয়নি। কিভাবে কি করবো বুঝতে পারছিলাম না। ছেলেটা চুপচাপ। কোন কথা বলছেনা। আমি ও কথা বলার টপিক খুজে পাচ্ছিনা।
    জুস খেতে দিলাম।
    খেয়ে নিল।
    কিছু বলতে চাও?
    চুপচাপ।
    আমি যা-ই জিজ্ঞাস করি, সে মনোযোগ সহকারে শুনে কিন্তু কোন প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেনা। হুমায়ুন আহমেদ এর এইসব দিনরাত্রির বাবলুর মত চু-প করে বসে আছে।
    পরদিন আমার পরীক্ষা ছিল। আমি পড়াশুনায় মন দিলাম।
    একটু পর মাথা নীচু করে কাচুমাচু হয়ে বললো- আমি আর চাকুরী করবো না।
    বলো কি? তুমি চাকুরী করতে নাকি? পড়াশুনা করো না?
    নাহ, নাইন পর্যন্ত পড়েছি। তারপর কিছুই করিনি। একদিন বাবা মা আমাকে একটা কাজ চাপিয়ে দিলেন। এই কাজ আমার পছন্দ না। বাড়ী ভাল্লাগছেনা। এই শহর ও না। আমি টোকিওর দিকে চলে যাবো।
    কেন? কি কাজ ছিল তোমার?
    লাশ ধোয়া। নরমাল মৃত্যুর লাশ ধোয়া অত কঠিন না। কিন্তু এক্সিডেন্ট, আত্মহত্যা, বিশেষ করে গন্ধ বেরিয়ে যাওয়া লাশ গুলো প্রসেস করা কঠিন। আমার বস আমাকে বেছে বেছে ওগুলোই ধুতে দেন।
    আমি আর শুনতে চাইলাম না। কিছুক্ষন বসে ছিল। তারপর নিজে নিজেই চলে গেল।
    সপ্তাহ খানেক পরের কথা। ওর বাবা-মা এসে হাজির। তোমার এখানে কি আমাদের ছেলে আছে?
    জ্বি না নেই। তবে এসেছিল।
    কিছু বলেছে? কোথায় গেছে জানো?
    আমি যদ্দুর জানি সবই বললাম। ঐ পরিবারের সাথে ওটাই আমার শেষ দেখা।
    (২) ১৯৯৪ সাল, অগাস্ট মাস। হিরোশিমা শহর। বিদেশী ছাত্রদের নিয়ে একটা সম্মেলন হচ্ছিল। তখন আমি সেন্দাই তে তোহকু বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদেশী ছাত্রদের সংগঠন TUFSA র প্রেসিডেন্ট। সেই সুবাদে একটা আমন্ত্রন পেয়ে সেন্দাই থেকে উড়ে গেলাম। সম্মেলন শেষে সিদ্ধান্ত নিলাম ওইতা থেকে ঘুরে আসি।
    সম্মেলন শেষ করে বিরাট এক জাহাজে উঠলাম। নাম সান ফ্লাওয়ার। প্রশান্ত মহাসাগরে ১৫ ঘন্টার ভ্রমণ। ওইতা শহরের বেপ্পু পোর্টে পৌছবে পরদিন সকালে। আমি সবচেয়ে সস্তা টিকেট কেটেছি। প্রচন্ড গরম ছিল। ডেকে বসে রাত কাটিয়ে দিব- এটাই প্ল্যান।
    সুন্দর চাঁদ উঠেছে। আধা পুর্ণিমার একটু বেশী। রাত যতই বাড়ছে, ঠান্ডা ও বাড়ছে। চাঁদ আরো স্পস্ট হয়ে উঠছে। সমুদ্রে চাঁদের আলো এত সুন্দর দেখায়। দাঁড়ান আরেকবার বলি-সমুদ্রে চাঁদের আলো এত সুন্দর দেখায়। উথাল পাতাল জোছনা। ঠান্ডা সইতে না পেরে রবীন্দ্র সংগীত গাওয়া শুরু করলাম- জোছনা রাতে সবাই গ্যাছে বনে। হঠাৎ পাশে এসে একটা ছেলে বসল। হাতে সিগারেট। আমি একটু দুরে সরে গেলাম। সিগারেটের গন্ধ আমি সইতে পারিনা।
    সে সিগারেট শেষ করে বললো -রোমান্টিক গান গাচ্ছিলে না-কি কাঁদছিলে? কাউকে মনে পড়ছে?
    শীত শীত লাগছিল। গান গাচ্ছিলাম। (আমার দাদি বলতেন- শীত লাগলে গীত গা)।
    জাপানিরা সাধারণত যাচিয়ে কথা বলে না। এই ছেলে পুরোটাই আলাদা। বিভিন্ন প্রসঙ্গ নিয়ে কথা হলো। রাজনীতি, ধর্ম, মানব অধিকার। ভোর ৩ টা পর্যন্ত এই ছেলের সাথে গল্প করলাম। সারাংশ দিচ্ছি।
    (ক)
    সে যাচ্ছে বেপ্পুতে। তার বন্ধুর মৃত্যুবার্ষিকিতে। একসময় তারা বেপ্পুতে ছিল। বো-সো-জকু-র সদস্য। জাপানের ইয়াকুজা (গ্যাংস্টার গ্রুপ) এর জুনিয়র মেম্বার বলতে পারেন। পুলিশি ভাষায় ইয়াকুজা মানে হলো ভায়োলেন্স গ্রুপ। আর ওরা নিজেরা নিজেদের বলে সাহসী গ্রুপ।
    সাধারণ জনগন কে সরাসরি তেমন ক্ষতি করেনা। মাঝে মাঝে গভীর রাতে শহরের বড় শহর গুলোতে ১০-২০ জনের দল বাইকে করে মহড়া দেয়। বাইকের সাইলেন্সর পাইপ টা খুলে ফেলে। সাউন্ড এম্প্লিফায়ার টাইপের কিছু লাগায় কি-না জানিনা। বিকট শব্দ হয়। মনে হয় হারলে-ডেভিডসনের বাপ। প্রচন্ড বিরক্তিকর। বয়স্ক লোকজন পুলিশের কাছে কম্প্লেইন করেন। পুলিশের গাড়ি ভ্যা ভো করতে করতে মাঝে মাঝে ধাওয়া করে। কোন ফল হয় বলে মনে হয়না। কেমন যেন টম এন্ড জেরি খেলা মনে হয়।
    একদিন বেপ্পুতে তারা মহড়ায় নেমেছে। পুলিশ ধাওয়া করলো। সিরিয়াস ধাওয়া। তারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেল। কিন্তু তাদের বন্ধুটা দুই পুলিশের গাড়ীর কবলে পড়ে গেল। ট্রেনিং অনুযায়ী সে স্পিড বাড়িয়ে দিয়ে হেলমেটহীন অবস্থায় পিলারে হিট করলো। খুলিখানা চ্যাপ্টা হয়ে গেল। “জান দেব তব ধরা দেব না”।
    রাত পোহালেই সেই বন্ধুর মৃত্যুবার্ষিকী। আজ দলের সবার একত্র হবার দিন।
    (খ)
    সে নিজেকে পরিচয় দিলে এভাবে-
    এতাহিমিন চিনো?
    নাহ। এটা কি জিনিস?
    ভারতে হিন্দুদের মত জাপানে ও কাস্ট প্রথা আছে/ছিল। আমার কাস্ট হলো সর্বনিম্নের। এতাহিমিন এই কাস্ট এর নাম।
    কাস্টের কারনে তার চাকরি গেছে। কেউ ডেস্ক্রিমিনেট করেনি তবে সে কারো সিম্পেথি ও চায়নি। অফিসে সেই এনভায়রেন্ট ছিল না।
    বিয়ে করেছে। ছেলে আছে। শ্বশুর শ্বাশুড়ি বিয়ে মেনে নেয়নি। তবে তারা সুখে আছে। বিয়ের আংটি দেখাল। আংটি দেখতে গিয়েই দেখলাম তার কানি আঙুলের অর্ধেকখানি নেই।
    আমি বোলিং খেলতে গিয়ে একবার আঙুল ভেংগে ফেলেছিলাম। সেই আঙুল বাঁকা হয়ে জোড়া লাগলো। আমি ও আমার বাঁকা আংগুল দেখিয়ে দিলাম। লিখে রাখ এক ফোঁটা দিলেম শিশির।
    তার কাটা আঙুলের ব্যাখ্যা জেনেছি পরে।
    ইয়াকুজা গ্রুপের কঠোর নিয়মাবলী আছে। বস হলো সর্ব ক্ষমতার অধিকারী। নরমাল সদস্যরা ভুল করলে বসের কাছে ক্ষমা চাইতে হয়। ক্ষমা চাওয়ার অন্যতম উপায় হলো আঙ্গুলের একটি কড়া বসের সামনে কেটে বসকে ফ্রেশ উপহার দেয়া।
    তার কানি আঙুলের দুই দাগ পর্যন্ত কাটা। তার মানে সে দুইবার ভুল করেছে। অথবা দুইদাগ সম একটা ভুল করেছে। এক হাতে আমরা ২০ পর্যন্ত গুনতে পারলেও সে গুনতে পারবে ১৮। বাকী ২ টা ইমাজিনারী নাম্বার।
    (গ)
    ফেরীর থেকে নামার সময় বললো আমাকে বেপ্পু স্টেশনে পৌছে দেবে। তার বন্ধুর দল এসেছে রিসিভ করতে। মাইক্রোবাস নিয়ে। কেমন কেমন টানা ভাষায় কথা বলে। মনে হচ্ছে একে অপরকে ধমকাচ্ছে। প্রথমেই বন্ধুর মৃত্যু ঘটনাস্থলে গেল। পিলার টার কাছে ফুল রাখলো। দল ধরে দাড়াল। শপথ করার ভঙ্গিতে সবাই হাত তুললো। ফেরীতে দেখা হওয়া ছেলেটা ইমামের ভুমিকা নিল। প্রথম সম্ভবতঃ রূহের মাগফেরাত কামনা করলো। তারপর বলা নেই কওয়া নেই চিল্লিয়ে শুরু করলো বিলাপ করে কান্না। পুরুষের দলীয় কান্না এই প্রথম দেখলাম। এই কান্না ছোঁয়াচে হবার কথা। আমার প্রতিক্রিয়া কি ছিল মনে নেই। এখন মনে হচ্ছে – পৃথিবীর সব বন্ধুদের ডি,এন,এ এক। এরা যা মিস করে প্রাণ থেকেই করে।
    (৩) ২০১২ সাল। ওসাকার সেনবা নামক একটা জায়াগায় বসে পুরনো জাপানি বন্ধুদের সাথে বসে ডিনার করছি। জায়গাটিতে কোরিয়ান সাইন বোর্ডে ভর্তি। চিপায় চিপায় মাংসের দোকান। একটু দুর্গন্ধ ও আছে। বন্ধুটি বললো এটা এতাহিমিনদের এরিয়া। বিরাট ইতিহাস দিল। ইয়াকুজাদের কথা ও উঠলো। শুনালো কানি আঙ্গুল কাটার লোমহর্ষক কাহিনী।
    এতাহিমিন দের আরেক নাম বুরাকু-মিন। কবে থেকে এরা সমাজে এই স্ট্যাটাস পেল -এ নিয়ে বিভিন্ন মতবাদ আছে। হাজার বছর আগে কোন এক যুদ্ধে আটকে পড়া মানুষ গুলোকে দিয়ে সমাজের নোংরা কাজ করানো শুরু করলো। পয়ঃনিস্কাশন, লাশ কাটা/ধোয়া, জেলে ক্রিমিনাল হত্যা ইত্যাদি। প্রথম মহাযুদ্ধের পর জাপানে আটকে পড়া কোরিয়ানরা ও এই দলে যোগ দিল। আমাদের মোহাম্মদ পুরের জেনেভা ক্যাম্পের আটকে পড়া মানুষদের সাথে আমাদের সামাজিক সম্পর্ক কি?
    ষাট দশকে জাপান এই শ্রেণীটাকে একটা সামাজিক সমস্যা হিসাবে চিহ্নিত করে সমাজে আশ্রয় দেয়া শুরু করলো। বলা হয়, মাংসের দোকান অধিকাংশ এরা চালায়। বুচার মানে তারাই। শিক্ষাদীক্ষায় ও এগিয়ে গেছে। আজ ওসাকার যিনি মেয়র তিনি এই বুরাকু-মিন থেকে উঠে আসা একজন। পৃথিবী খ্যাত YKKর মালিক য়শিদা (যিনি বাংলাদেশে বিরাট একটি কোম্পানী দিয়েছেন) সান ছাড়াও গায়ক গায়িকা, নায়িকা ও আছেন। সমাজে এরা এম্পাওয়ার্ড হয়ে উঠছেন। গর্ব করার মত লোকজন তৈরি হচ্ছে যারা কিশোরদের হিরো।
    ১৯৯৫ সালের কোবে ভুমিকম্প, ২০১১ সালের তোহকু ভুমিকম্পের সময় সরকারী সাহায্য পৌছার আগে এই ইয়াকুজা গ্রুপটি নাকি সমাজ সেবায় নেমেছিল। অর্জন করেছে সমাজের শ্রদ্ধা।
    ৯১ তে হারিয়ে যাওয়া ছেলেটির এইসব খবর জানার সুযোগ ছিল না। এই উৎসাহ টুকু তার দরকার ছিল।

    জাপান কাহিনি-১২/আশির আহমেদ



    Facebook Comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২০

    ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২০

    ১২ অক্টোবর ২০২০

    ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২০

    ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০

    ০৪ অক্টোবর ২০২০

    ০১ অক্টোবর ২০২০

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫১৬
    ১৭১৮১৯২০২১২২২৩
    ২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
    ৩১  
  • ফেসবুকে দশদিক