• শিরোনাম

    জাপানের শিক্ষা ব্যবস্থায় আমাদের নতুন প্রজন্ম, প্রস্ততি এবং বাস্তবতা (পর্ব-৩)

    ড. সৈয়দ জামান (লিংকন) | ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ৪:২৩ অপরাহ্ণ | পড়া হয়েছে 55 বার

    জাপানের শিক্ষা ব্যবস্থায় আমাদের নতুন প্রজন্ম, প্রস্ততি এবং বাস্তবতা (পর্ব-৩)

    প্রাথমিক বিদ্যালয় ও জাপানের সুনাগরিক গড়ার বীজবপন। ২০১২ সাল, আমার বড় মেয়ের প্রাথমিক স্কুলের নবীনবরন অনুস্টানে (ছবিটি নবীনবরণ এর) প্রধান শিক্ষক অভিনন্দন ভাষণে যে বক্তব্য দিয়েছিল তা এখনও আমার কানে বাজে। উনি তার স্কুলের নতুন বাচ্চাদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, তোমরা যদি তিনটি শব্ধ সবসময় ব্যাবহার কর তাহলে তোমাদের কোনদিন বন্ধুর অভাব হবে না, ১। Ohayōgozaimasu (গুড মর্নিং) ২। Arigatōgozaimasu (থ্যাঙ্ক ইউ) ৩। Gomen’nasai (সরি)। বাস্তবিক অর্থেই জাপানে এই তিনটি শব্ধ অনেক বেশী ব্যবহৃত হয়।
    জাপান সভ্য জাতী হিসেবে গড়ে উঠার পেছনে ওদের প্রাথমিক শিক্ষার অবদান অনেক বেশী। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় জাপানের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে সেরকম কোন পড়াশুনা হয় না। শিক্ষা জীবনে PSC, JSC, SSC, HSC কিংবা A level, O level এর মত কোন পরীক্ষা নেই। তারপরও জাপান কিন্তু জ্ঞানে বিজ্ঞানে পৃথিবীর সেরা জাতীর একটি।

    এবার মুল কথায় আসি, জাপানের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে বাচ্চাদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় বীজ বপন করা হয়। ট্রাফিক আইন, নিয়মানুবর্তীতা, সামাজিক দায়িত্ত, মানবতা, টিম ওয়ার্ক, সাম্যতার মত বিষয়গুলো মগজে ঢুকিয়ে দেয়া হয়। ওরা দলবেদে স্কুলে যায় এবং দলবেদে স্কুল থেকে ফেরত আসে। পাড়া মহল্লার নিদিষ্ট স্থানে নিদিষ্ট সময়ে জমায়েত হয়ে একজন দলনেতার নেতৃতে বাচ্চারা দলবেদে স্কুলে যায় এবং ফেরত আসে। একা একা স্কুলে স্কুলে যাওয়া নিষেধ, অর্থাৎ টিম ওয়ার্ক এর বীজ শুরুতেই বুনে দেয়া হয়।



    পুতিগত বিদ্যা জাপানের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শেখানো হয় না, বেশীরভাগ শিক্ষা হয় ব্যবহারিক অর্থাৎ হাতে কলমে। পোকামাকড় কিংবা গাছপালার সাথে পরিচয় করানোর জন্য ওদের কে বছরের নিদিষ্ট একটি সময়ে বনে জঙ্গলে নিয়ে যাওয়া হয়। স্কুলের মাঠে বাচ্চাদের দিয়ে যেমন কৃষিকাজ করানো হয় তেমনি বিজ্ঞানের বিষয় ল্যাব এ হাতে কলমে শেখানো হয়ে থাকে। মুখস্ত বিদ্যা নাই বললেই চলে। বার্ষিক পরীক্ষা না থাকলেও সাপ্তাহিক এবং মাসিক পরীক্ষা আছে এবং বছর শেষে এসব পরীক্ষার প্রাপ্ত ফলাফলের যোগফলই হচ্ছে তার মেধা যাচাই।

    কোন বাচ্চা এসব পরীক্ষায় খারাপ ফলাফল করলে তারজন্য বার বার পরীক্ষা নেয়ার ব্যবস্থা থাকে। বাচ্চাদের ক্লাস দেখার জন্য বাবা মা দের আমন্ত্রণ জানানো হয় এবং শ্রেণী শিক্ষক বাচ্চার বাসার পরিবেশ দেখার জন্য বাসা পরিদর্শনে আসে। বাই দ্যা ওয়ে জাপানের বিদ্যালয়গুলোতে ফেল করার মত কোন বিষয় নেই। স্কুল ভীতি কিংবা স্কুল পালানো এদেশের বাচ্চাদের অভিধানে নেই বরং স্কুলটা তাদের কাছে আনন্দের জায়গা।
    এবার আসি, সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ার পেছনে আমাদের মত বিদেশী অভিবাবকদের ভুমিকা কি হওয়া উচিৎ সে প্রসঙ্গে। চাঁদের যেমন কলঙ্ক আছে তেমনি ওদের সিস্টেমে কিছু সমস্যা আছে। তাই অভিবাবকদের সচেতন হওয়াটা জরুরী।

    ১। বাচ্চার স্কুল নির্বাচন- আমাদের দেশে যেমন ভাল স্কুল, ভাল শিক্ষক আছে এদেশেও তাই। আপনার সন্তানের বয়স যখন ৪-৫ তখন থেকেই আপনাকে খোঁজ নিতে হবে কোন এলাকার স্কুল ভাল এবং সম্ভব হলে সেই এলাকায় আপনাকে শিফট করতে হবে। সাধারণত যেসব এলাকার স্কুল ভাল সেসব এলাকায় বাসা ভাড়া একটু বেশী, কারন অনেক বাবা মা ই চায় সেসব এলাকায় বাসা নিতে। আপনি যদি বাড়ি কিনতে চান তাহলে বাচ্চার স্কুলের কথা অবশ্যই বিবেচনা করবেন।

    ২। বাচ্চার ফলাফল- বার্ষিক পরীক্ষা না থাকলেও নিয়মত ক্লাস টেস্ট কিংবা মাসিক পরীক্ষায় আপনার সন্তান কি রকম ফলাফল করছে, সেটা আপনাকে খোঁজ রাখতে হবে। এসব পরীক্ষায় সাধারণত ৯০ এর বেশী নাম্বার পাওয়ার চেষ্টা থাকতে হবে। আপনার সন্তানের বাড়ির কাজ নিয়মিত জমা দিচ্ছে কিনা সেটার খোঁজ রাখতে হবে। স্কুলের মিটিংগুলোতে উপস্থিত থাকার চেষ্টা করুন।

    অন্য অভিবাবকদের সাথে বন্ধুত্ব করতে পারলে বিভিন্ন দরকারী ইনফরমেশন পেতে পারেন। আপনার সচেতনাতাই আপনার সন্তানের ভবিষ্যতের পাথেয়।

    ৩। ইংরেজি শিক্ষা- সাম্প্রতিক সময় জাপান সরকার বাচ্চাদের ইংরেজি শিক্ষার উপর বেশ জোড় দিয়েছে এবং প্রত্যেক স্কুলে মিনিমাম একজন করে নেটিভ ইংরেজি শিক্ষক বাধ্যতামূলক করেছে। তবে আমি ব্যক্তিগত ভাবে মনে করি, ইংরেজি শেখার জন্য বাচ্চাকে kumon কোচিং দিতে পারেন, অল্প পয়সায় ওরা ভাল শিখায়। জুনিয়র হাই স্কুল থেকে জাপানে ইংরেজি সিলেবাস বেশ কঠিন হয়ে যায় তাই প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে এ বিষয়টি গুরুত্ব দেয়া উচিত।

    ৪। বাচ্চাকে সময় দিন- ইদানীং গেইম, টিভি, ইউটিউব বাচ্চাদের অনেক ক্ষতির কারন হয়ে দাড়িয়েছে। সাধারনত লোনলি বাচ্চারা এসব দিকে বেশী ঝুঁকে তাই বাচ্চাকে সময় দিন। ডিজিটাল ডিভাইস থেকে বাচ্চাদের দূরে রাখা সম্ভব না, তাই সম্ভব হলে সময় বেধে দিন এবং পজিটিভ ব্যাবহারের উপায় খুঁজে বের করুন।

    ৫। ইজিমে (Bullying)- এটা জাপানের স্কুলগুলোর বেশ বড় একটা সমস্যা। এর শিকার হতে পারে যে কোন বাচ্চা। যেসব স্কুল ইজিমের জন্য পরিচিত সেসব এলাকা এভয়েড করতে পারেন। সাধারণত দুর্বল বাচ্চারা ইজিমের শিকার হয়। বাচ্চার সাথে সবসময় তার স্কুলের কথা জিজ্ঞেস করুন, যদি সন্দেহজনক কিছু মনে হয় তাহলে শিক্ষকদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখুন। যদিও জাপান সরকার চেষ্টা করছে ইজিমে বন্ধু করার জন্য তারপরও দেখা যায় প্রতি বছর কিছু দুর্ঘটনা ঘটছে।

    ৬। লেখা পড়ার ইনসুরেন্স(Gakushi hoken) – জাপানে যদি পার্মানেন্টভাবে থাকতে চান, তাহলে আপনার সন্তানের জন্য Gakushi hoken করতে পারেন। জাপানিজরা সন্তান জন্মের পর পরই এই ইনসুরেন্সটা করে ফেলে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময় বড় খরচের ঠেলাটা ইনসুরেন্স এর মাধ্যমে সমাধান হয়ে যায়।

    ৭। উচ্চ শিক্ষার প্রস্তুতি- আগের পর্বগুলোতে লিখেছিলাম, জাপানে ভাল কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি বেশ কঠিন, তবে আপনি যদি সচেতন হন তাহলে আপনার বাচ্চা সহজেই সফল হতে পারবে।
    পরের পর্বে এ বিষয়ে বিস্তারিত লিখব।

    Facebook Comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

    ২৪ জুন ২০১৯

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫১৬
    ১৭১৮১৯২০২১২২২৩
    ২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
    ৩১  
  • ফেসবুকে দশদিক