• শিরোনাম

    জাপানের শিক্ষা ব্যবস্থায় আমাদের নতুন প্রজন্ম, প্রস্ততি এবং বাস্তবতা পর্ব-৫ (জুনিয়র হাই স্কুল, জীবন গড়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ)

    ড. সৈয়দ জামান (লিংকন) | ০৭ অক্টোবর ২০২০ | ৮:২৬ পূর্বাহ্ণ | পড়া হয়েছে 406 বার

    জাপানের শিক্ষা ব্যবস্থায় আমাদের নতুন প্রজন্ম, প্রস্ততি এবং বাস্তবতা পর্ব-৫ (জুনিয়র হাই স্কুল, জীবন গড়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ)

    এই পর্বটা আমার জীবনের গল্প দিয়ে শুরু করতে চাই। তখনকার সময়ে প্রাথমিকের সমাপনী পরীক্ষায় গ্রামের স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়ে শহরের সরকারী স্কুলের ৬ষ্ট শ্রেণীর ভর্তি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে লজ্জা আর অপমানে পড়াশুনা প্রায় বন্ধই করে দিয়েছিলাম। পরিবার থেকে বকাঝকা শুনতে হয়নি, তবে পরিষ্কার বলে দেয়া হল, আবারও ৫ম শ্রেণীতে ১ বছর পড় তারপর পরের বছর আবারও সরকারী স্কুলে পরিীক্ষা দাও।

    আমি তখন প্রচন্ড বিধ্বস্ত, আমার মনের অবস্তা বুঝতে পেরে অবশ্য ৬ মাস পর ভিন্ন স্কুলের TC নিয়ে উক্ত সরকারী স্কুলে ভর্তির ব্যবস্থা করেছিল আমার পরিবার। ৭ম শ্রেণীতে উঠার পর আমার মধ্যে বেশ পরিবর্তন আসে এবং এর পেছনে আমার পরিবারের অনুপ্রেরণা বিশেষ করে তখনকার সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া আমার এক চাচার অবদান ছিল অনেক বেশি, উনার পরিষ্কার বক্তব্য ছিল তুই চেষ্টা করলে পারবি। আমি উনার কথায় আত্মবিশ্বাস খুঁজে পেয়েছিলাম এবং নিজ থেকে প্রচন্ড পড়াশুনা করেছিলাম, ফলাফল হিসেবে যে স্কুলে ভর্তি পরিীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছিলাম সেই স্কুলেই ৮ম শ্রেণীর একটি পরীক্ষায় প্রথম হয়েছিলাম এরপর অবশ্য আর পেছনে ফিরে থাকাতে হয়নি।
    আমার জীবন থেকে যা শিক্ষণীয়
    ১। একটি পরীক্ষায় অকৃতকার্য মানেই সব শেষ নয়
    ২। সন্তানের ব্যর্থতার পর পরিবারের সমর্থন, অনুপ্রেরনা সবচেয়ে বেশী জরুরী
    ৩। সন্তানের আত্মবিশ্বাসটা জাগ্রত করে দিতে পারলে আপনার বাকী কাজ অনেক সহজ হয়ে যাবে
    ৪। একবার ভালো ফলাফল করলে এর ধারাবাহিকতা ধরে রাখা অনেক সহজ, তবে সেটা যত কম বয়সে হয় ততই সহজ হয়।
    আমার এই গল্পটা বলার উদ্দেশ্য হল, আপনি আপনার সন্তানের আত্মবিশ্বাসটা জাগ্রত করে তুলুন দেখবেন আপনার সন্তানই আপনাকেই অনেক ব্যাপারে সহযোগিতা করছে। জাপানে জীবন গড়ার জন্য জুনিয়র স্কুলটাকে প্রথম সিড়ি বলা যায়।



    এই সিড়ি ভালোভাবে পার হওয়ার জন্য আমাদের মত বিদেশী বাবা-মা দের একটু সচেতন হওয়া জরুরী। আগের পর্বগুলোতে যেমন বলেছিলাম, জাপানে স্কুল সিস্টেমটা ভিন্ন এবং এখানে পড়াশুনার জন্য সরাসরি কোন প্রতিযোগিতা নেই। বাচ্চাদের মানসিক, শারীরিক এবং প্রাকৃতিকভাবে মেধার বিকাশ ঘটানোর উপর বেশী জোড় দেয়া হয়ে থাকে। আমরা যেহেতু ভিন্ন পরিবেশে এবং ভিন্ন সিস্টেমের ভিতর দিয়ে বড় হয়েছি তাই অনেক সময় আমরা জাপানের শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে ভুল ধারনা পোষণ করে থাকি।
    জাপানে উচ্চ শিক্ষা বলতে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার কিংবা ডক্টরেট ডিগ্রীধারী বুঝায় না। এখানে উচ্চ শিক্ষা মানে বিশ্ববিদ্যালয় এর গন্ডি (ব্যাচেলর) পার হওয়া, অর্থাৎ ১৬ বছর শিক্ষা জীবন শেষ করা। মাস্টার্স কিছু সংখ্যক ছাত্র-ছাত্রী করলেও পিএইচডি করার আগ্রহ প্রায় শুন্যের কোঠায়। বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও এদেশের বাচ্চাদের বড় একটা অংশ কলেজ শেষ করে চাকুরী কিংবা ডিপ্লোমা ডিগ্রি শেষ করে চাকুরীতে ঢুকে যায়। যেহেতু রাষ্ট্রের সিস্টেমে বেকারত্ব এর সংখ্যা শূন্যের কাছাকাছি তাই সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে জাপানিীজ বাবা-মা রা খুব বেশী টেনশন করে না। তবে কিছু কিছু বাবা মা তাদের সন্তানদের ভালো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি করাতে চায় এবং তারা এ ব্যাপারে প্রথম থেকে একটু সচেতন।

    আমরা বিদেশী বাবা-মা রা সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে জাপানীজ বাবা-মা দের তুলনায় অনেক বেশী সচেতন এবং সন্তানের সাফল্যের জন্যে আমরা সব কিছু করতে রাজি আছি।
    সন্তানের জাপানের শিক্ষা জীবনে জুনিয়র হাই স্কুল এর ভূমিকা অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ যেটা আগেই বলেছি। তাই জুনিয়র স্কুল নির্বাচনটা অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ। গত পর্বে জাপানের বিভিন্ন ধরনের জুনিয়র হাই স্কুল সম্পর্কে একটা ধারনা দিয়েছি।
    আপনার অবস্থান, অর্থনৈতিক সামর্থ্য এবং বাচ্চার মেধা অনুযায়ী আপনাকে স্কুল নির্বাচন করতে হবে। জাপানের সরকারী স্কুল গুলোতে একেবারেই পড়াশুনা হয় না, এই ধারনাটা বোধহয় ভুল, জাপানের বেশীর ভাগ বাচ্চাই সরকারী স্কুলে পড়াশুনা করে এবং এদের মধ্যে কেউ কেউ ভালো ভালো বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও পড়াশুনা শেষ করে। তবে সরকারী স্কুলে পড়লেও অনেক বাচ্চা কোচিং এর উপর নির্ভরশীল, যা কিন্তু বেশ ব্যয়বহুল। আমার অভিজ্ঞতা থেকে এতটুকু বলতে পারি একেবারে বিনে পয়সায় জাপানে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত যাওয়া প্রায় অসম্ভব। তবে এখানে যেহেতু চরম দরিদ্র বলতে কিছু নেই তাই সরকারেরও সব দায়িত্ব নিতে হয় না।

    সাধারণত প্রাথমিক স্কুলের চতুর্থ শ্রেনী থেকেই আপনাকে সচেতন হতে হবে, আপনার সন্তানের স্কুল নির্বাচন এবং ভর্তি প্রস্ততি সম্পর্কে। তিন ধরনের স্কুল আছে যা আগের পর্বেই বলেছিলাম
    ১। সরকারী জুনিয়র হাই স্কুল (তিন বছর মেয়াদী)- ভর্তি পরিীক্ষার প্রয়োজন নেই
    ২। সরকারী জুনিয়র/সিনিয়র হাই স্কুল (৬ বছর মেয়াদী)- ভর্তি পরিীক্ষার উত্তীর্ণ হতে হয়
    ৩। প্রাইভেট জুনিয়র/সিনিয়র হাই স্কুল (৬ বছর মেয়াদী)- ভর্তি পরিীক্ষার উত্তীর্ণ হতে হয়
    ১ নাম্বার টাইপের স্কুলে ভর্তি পরীক্ষার প্রয়োজন না হলেও সেখান থেকে তিন বছর শেষে সিনিয়র স্কুলে (কলেজে) ভর্তির জন্য ভর্তি পরীক্ষায় বসতে হবেই। অন্যদিকে ২ এবং ৩ নাম্বার টাইপের স্কুলে ভর্তি করাতে পারলে বিশ্ববিদ্যালয় এর আগ পর্যন্ত ভর্তি পরীক্ষার চিন্তা করতে হয় না, কোন কোন ক্ষেত্রে অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয় (University affiliated School) পর্যন্ত পড়াশুনা নিশ্চিত হয়ে যায়। তাই আমার মনে হয় আমাদের মত বিদেশীদের উচিত ২ কিংবা ৩ নাম্বার টাইপের স্কুলে ভর্তির করানোর চেষ্টা করা।
    পরের পর্বে ২ এবং ৩ নাম্বার টাইপের স্কুলের ভর্তি পরিীক্ষা এবং স্কুলের 偏差値(Hensa-chi) মান অনুযায়ী প্রস্ততি নিয়ে লিখবো।
    লিংকন টোকিও
    সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২০

    Facebook Comments Box

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

    ২৪ জুন ২০১৯

  • ফেসবুকে দশদিক