• শিরোনাম

    জাপানের শিক্ষা ব্যবস্থায় আমাদের নতুন প্রজন্ম, প্রস্ততি এবং বাস্তবতা (শেষ পর্ব))

    ড. সৈয়দ জামান (লিংকন) | ১২ অক্টোবর ২০২০ | ৮:২০ পূর্বাহ্ণ | পড়া হয়েছে 102 বার

    জাপানের শিক্ষা ব্যবস্থায় আমাদের নতুন প্রজন্ম, প্রস্ততি এবং বাস্তবতা (শেষ পর্ব))

    আগের পর্বগুলোতে যেমন বলেছিলাম, বাচ্চাদের জীবন গড়ার ব্যাপারে জুনিয়র/সিনিয়র স্কুলের অবদান সবচেয়ে বেশী, তাই আমি বিশ্বাস করি স্কুল নির্বাচন খুব ইম্পরট্যান্ট একটা বিষয়। তবে আপনি চাইলেই কিন্তু আপনার পছন্দমত স্কুল নির্বাচন করতে পারবেন না। স্কুল নির্বাচন করার জন্য আপনার অবস্থান, অর্থনৈতিক সামর্থ্য, সন্তানের পড়াশুনার মান 偏差値(Hensa-chi) ইত্যাদি বিষয় অবশ্যয়ই মাথায় রাখতে হবে।
    সরকারী বা পাবলিক জুনিয়র স্কুলে(公立中学校Kōritsu chūgakkō) ভর্তির জন্য কোন ধরনের প্রস্ততির ব্যাপার নেই। আপনার নিকটবর্তী স্কুলে সন্তানের ভর্তির জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা জাপানের সরকারই করে দেবে। জুনিয়র হাইস্কুলের পর অবশ্য সিনিয়র স্কুলে (高校) ভর্তির জন্য ভর্তি পরীক্ষায় বসতেই হবে যেটা আসলে বেশ কঠিন একটা পরীক্ষা, এবং এর জন্য জুনিয়র স্কুলের তিন বছরই কোচিং এর পেছনে দৌড়াতে হয়। এখানে কোচিং মানেই কাড়ি কাড়ি টাকা ঢালা, গড়ে আপনাকে মাসে ৫০,০০০-৭০,০০০ ইয়েন খরচ করতে হয়। কেউ যদি মনে করে কোন রকম একটা ব্যাচেলার ডিগ্রি হলেই হবে তাহলে অবশ্য এত কিছু চিন্তা না করে সরকার নির্ধারিত স্কুলে পড়াশুনা করলেই হয়ে যাবে।
    যাদের একটু সামর্থ্য তাদের জন্য ভাল উপায় হচ্ছে ন্যাশানাল জুনিয়র/সিনিয়র হাই স্কুল(国立中学校, kokuritsu chūgakkō)অথবা প্রাইভেট স্কুল (私立中学校Shiritsu chūgakkō) এর মাধ্যমে ৬ বছরের (স্কুল/কলেজ) জন্য শিক্ষাজীবন নিশ্চিত করে দেয়া। তবে এসব স্কুল কলেজে ভর্তির জন্য আপনার সন্তান বেশ কয়েক বছর ধরে প্রস্ততি নিতে হবে। সাধারনত প্রাথমিক স্কুলের চতুর্থ শ্রেণী থেকে আপানকে সচেতন হতে হবে। প্রাথমিক স্কুলে বার্ষিক কিংবা সমাপনী পরীক্ষা না থাকলেও দৈনিক, মাসিক বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা থাকে, পাশাপাশি থাকে প্রতিদিনের বাড়ীর কাজ। এসবের উপর ভিত্তি করে আপনার সন্তানের সেইসেকি বা গ্রেড নির্ধারিত হয়ে থাকে। ন্যাশানাল জুনিয়র/সিনিয়র হাই স্কুলে এবং কিছু কিছু প্রাইভেট স্কুলে ভর্তির জন্য সন্তানের গ্রেড এবং আচরণ কিংবা স্কুলে উপস্থিতির হার এর মত বিষয়গুলোও বিবেচিত হয়ে থাকে। এখাকার স্কুল শিক্ষকের দ্বারা ছাত্রছাত্রীদের মূল্যায়ন বা গ্রেডিং হয়ে কথা এবং কারচুপির কথা খুব একটা শুনা যায় না। বছর শেষে (মার্চ) আপনার সন্তানের সেইসেকি/গ্রেড সিট খেয়াল করুন, সাধারণত A গ্রেড কে খুব ভাল ফলাফল হিসেবে এবং B, C মোটামুটি মানের ধরা হয়ে থাকে।
    সরকারী, বেসরকারি স্কুলের ভর্তি পরীক্ষার নিদিষ্ট কোন সিলেবাস নেই এবং প্রাথমিক স্কুলের যে সিলেবাস থাকে সেটা পড়লেও আসলে প্রস্ততি সম্পন্ন হয় না। স্কুলগুলোর ভর্তি পরীক্ষার প্রস্ততির জন্য আপনাকে কোচিং সেন্টারের গাইড লাইনের মধ্যে দিয়ে যেতে হবে। ক্লাস ফোর থেকে কোচিং শুরু করতে হয়, কেউ কেউ অবশ্য ক্লাস ফাইভ থেকেও শুরু করে। কোচিং এ ভর্তি করানোর সময় আপনাকে ডিসিশন নিতে হবে আপনার সন্তান ন্যাশানাল জুনিয়র/সিনিয়র হাই স্কুল নাকি প্রাইভেট স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা দিবে, দুটোর পরীক্ষার ধরন ভিন্ন তাই প্রস্ততিও ভিন্ন ভিন্ন ধরনের। ন্যাশানাল জুনিয়র/সিনিয়র হাই স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা বেশ কঠিন এবং একটির বেশী স্কুলে পরীক্ষায় অংশগ্রহন করা সম্ভব নয়, যেহেতু একই দিনে পরীক্ষা হয়ে থাকে। প্রাইভেট স্কুল চয়েস করাটা সহজ এবং ভর্তি পরীক্ষাও তুলনামূলকভাবে সহজ।
    এখানকার কোচিং আপনার সন্তানের দায়িত্ব নিবে বলে আপনাকে কথা দিলেও বাস্তবে আপনাকে কিন্তু সন্তানের পড়াশুনার জন্য প্রচুর শ্রম দিতে হবে। কোচিং সেন্টারগুলোর পড়াশুনা ভাল করালেও ওরা আপনার পকেট খালি করার জন্য অনেক ধরনের প্রলোভন দেখাবে। আমার কাছে এদেশের কোচিং সেন্টারগুলো কে সরকার পারমিটেড একধরনের সিণ্ডিকেট ব্যবসায়ী মনে হয়। যেহেতু এটা পরিবর্তন কিংবা বিকল্প আমাদের হাতে নাই, তাই মেনে না নেয়া ছাড়া উপায় নাই। সিণ্ডিকেট করে আপনার পয়সা নিলেও দিন শেষে ওরা কিন্তু পড়াশুনা ভালই করায় এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়। অনেকটা জাপানের ড্রাইভিং লাইসেন্স এর প্রশিক্ষণ এর মত, নগদ ৩০০,০০০ ইয়েন দিয়ে প্রশিক্ষণ শেষে যখন লাইসেন্সটা হাতে পাবেন তখন মনে হবে না আপনি ঠকেছেন।
    ভালো মানের স্কুলের ভর্তি পরীক্ষা অনেক কঠিন তবে সেটা নির্ভর করে আপনার সন্তানের মেধার উপর। কোচিং সেন্টারগুলোতেও প্রতিনিয়ত পরীক্ষা নেয় যার মাধ্যমে আপনি বুঝতে পারবেন আপনার সন্তানের মান কত এবং তার উপর ভিত্তি করেই আপনি স্কুল নিরর্বাচন করতে পারবেন। স্কুল কিংবা ছাত্রছাত্রী দের মান যাচাই এর জন্য ওরা 偏差値(Hensa-chi) বা লেভেল করে থাকে।
    偏差値(Hensa-chi) ৩৫-৪০ (নিন্ম মান)
    偏差値(Hensa-chi) ৪১-৫০ (গ্রহণযোগ্য)
    偏差値(Hensa-chi) ৫১-৫৯ (ভালো)
    偏差値(Hensa-chi) ৬০-৬৯ (খুব ভালো)
    偏差値(Hensa-chi) ৭০-৮০ (এক্সিলেন্ট)
    বাচ্চা ৬ষ্ট উঠার পর আপনি কোচিং সেন্টারের মাধ্যমে আপনার সন্তানের লেভেলটা জানতে পারবেন এবং সে অনুযায়ী স্কুল সিলেকশন করে শেষ সময়ের ফাইনাল প্রস্ততি নিতে হবে। শেষের এক বছর ভর্তি পরীক্ষার প্রস্ততির অনেক বেশি পরিশ্রম করতে হয় যেটা আসলে দূর থেকে বুঝা অনেক কঠিন।
    সামনের দিনগুলোতে জাপানে আমাদের সন্তানদের বড় একটা চ্যালেঞ্জ হবে চাইনিজ ছাত্রছাত্রীদের সাথে কম্পিটিশন করে ঠিকে থাকা। বর্তমানে চাইনা থেকে অনেক মেধাবী ছাত্রছাত্রী জাপানের ভালো ভালো বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে ভর্তি পরীক্ষা দিতে আসে এবং ভবিষ্যতে এই সংখ্যাটা আরও অনেক বাড়বে। তাই জাপানিজ এবং চাইনিজ এই দুই জাতীর সাথে পাল্লা দেয়ার জন্য আমাদের সন্তানদের প্রস্তত আমাদেরই করতে হবে।
    দেশে যেমন একটা কথা আছে, বই কিনে কেউ দেউলিয়া হয় না, ঠিক সেরকম আমি মনে করে আপানার সন্তানকে কোচিং করিয়ে আপনি দেউলিয়া হবেন না। ভর্তি পরীক্ষার প্রস্ততি নিতে গিয়ে আপনার সন্তানের বেসিক অনেক শক্তিশালী হবে যা পরবর্তী পড়াশুনায় অনেক কাজে আসবে। ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে আপনার সন্তান যে স্কুলে ভর্তি হবে সেখানে তার সহপাঠী হিসেবে তারই লেভেলের বন্ধুবান্ধব পাবে যার ফলে তার স্কুল কলেজ লাইফটা হবে অনেক বেশী কমফরটেবল।
    স্কুল কলেজ শেষ করে আপনার-আমার সন্তান তাদের ক্যারিয়ার তারাই ঠিক করতে পারবে।
    কয়েকটি পর্ব লিখে আসলে জাপানের শিক্ষা সম্পর্কে সব কিছু বলা সম্ভব নয়। আমি চেষ্টা করেছি অভারওল একটা ধারনা দিতে। যদি আপনাদের কোন প্রশ্ন থাকে আমাকে ইনবক্স করতে পারেন, যথাসাধ্য চেষ্টা করব।
    ভিন্ন একটি প্ল্যাটফর্ম থেকে জাপানের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে আপনাদের সামনে খুব শীঘ্রই হাজির হব, সবাই মিলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কে সহযোগিতা করব জাপানে ক্যারিয়ার গড়ে তুলতে।
    আর একটি কথা জাপানের স্কুল কলেজ গুলোতে ফেল বলে কিছু নেই এবং শিক্ষা জীবন শেষে সবাইকে পাশ সার্টিফিকেট দেয়া হয়ে থাকে। ছবিটি আমার বড় মেয়ের প্রাথমিক শিক্ষাজীবন শেষে সার্টিফিকেট প্রদান অনুষ্ঠানের।
    সবাইকে সহযোগিতা করার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ
    লিংকন টোকিও
    অক্টোবর ২, ২০২০

    Facebook Comments



    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

    ২৪ জুন ২০১৯

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫১৬
    ১৭১৮১৯২০২১২২২৩
    ২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
    ৩১  
  • ফেসবুকে দশদিক