• শিরোনাম

    জাপানে গ্রামবাসীর কদর

    আশির আহমেদ | ১২ অক্টোবর ২০২০ | ৮:৩১ পূর্বাহ্ণ | পড়া হয়েছে 144 বার

    জাপানে গ্রামবাসীর কদর

    গ্রামে বিদেশীদের কদর কেমন?  (মার্চ, ২০১৪) তাইওয়ানে কনফারেন্স শেষে এক ডিনারে বসে কথা হচ্ছিল। চার দেশের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন অধ্যাপক – জাপানীজ, তাইওয়ানীজ, কোরিয়ান আর চাইনিজ। একজন জিজ্ঞাস করলেন, “ধরুন আপনি কোথাও ভ্রমণ করছেন। রাত এগারোটা বাজে। আপনি ক্ষুধার্ত আর আপনার কাছে যথেষ্ট টাকা নেই। এমতাবস্থায় পৃথিবীর কোন জায়গা আপনার কাছে সবচেয়ে নিরাপদ? “

    সবাই সবার দিকে তাকাচ্ছে কিন্তু কেউ উত্তর দিচ্ছে না।
    আমি বল্লাম “এখলাছপুর”।
    এটা কোথায়?
    -আমাদের গ্রাম। আপনি যদি বিদেশী হন, আমাদের গ্রামবাসী আপনাকে সেরা বাড়ীটিতে থাকতে দিবে। সেরা বিছানাটি পেতে দিবে। সেরা রান্নাটি রেঁধে খাওয়াবে। এটা বাংলাদেশের যেকোন গ্রামের ক্ষেত্রেই সত্যি।
    প্রশ্নকর্তা যেন এই উত্তরটির জন্য-ই অপেক্ষা করছিলেন। বল্লেন, “এক্সাক্টলি। আমাদের এশিয়ান দেশের গ্রাম গুলোই সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা। আপনি আমেরিকার কোন শহরে রাত এগারোটায় দরজা নক করে দেখেন, আপনাকে শুট করে বসবে। ইউরোপের কোন শহরে যান, দরজা-ই খুলবে না। পুলিশ ডেকে বসবে। “
    -জ্বি। ক্ষমতার অভাব। মানুষকে বিশ্বাস করতেও একধরণের ক্ষমতা লাগে। এই ক্ষমতা গ্রামবাসীর আছে। একজন অপরিচিত কে ওরা অতিথি হিসাবে গ্রহণ করতে পারে । তথাকথিত সভ্যতার ছোয়া লাগা সমাজ সেটা পারেনা। আমার গ্রামের সব লোক সব লোককে চিনে। কিন্তু আমাদের শহরের ফ্লাটগুলোতে দেখেন, পাশের ফ্লাটের অধিবাসীকেই চেনে না। চেনার প্রয়োজন ও হয় না । স্বাবলম্বী।
    গ্রাম নিয়ে অনেক কথা হলো। আমি সুযোগ পেয়ে আমাদের গ্রামওয়েব (www.gramweb.net) [১] এর কথা বলতে লাগলাম। আমার গ্রাম, আমার গর্ব।
    জাপানের গ্রামগুলোর কি অবস্থা?
    ১৯৮৯ সালের কথা। অগাষ্ট মাস। গ্রীস্মের ছুটি। আমি থাকতাম জাপানীদের সাথে। ওইতা শহরের একটা ছাত্রাবাসে। গ্রীস্মের ছুটিতে ছাত্রাবাসে থাকার নিয়ম নেই। সবাইকে ছাত্রাবাস ছাড়তে হবে। জাপানী ছাত্রদের ফিরে যাবার বাড়ি আছে। বাবা-মা অপেক্ষা করছে



    । আমি যাবো কোথায়?
    প্রসংগ ক্রমে বলে রাখি- আমি আন্ডারগ্রাজুয়েটে (কলেজ অফ টেকনোলজি) মনবুশো নিয়ে বাংলাদেশ থেকে আসা প্রথম ব্যাচের ছাত্র। আমাদের উপরে কোন সিনিয়র ভাই-আপা ছিলেন না। ঠাই পাওয়ার কোন জায়গা নেই।
    ব্যাকপ্যাকার হয়ে বেড়িয়ে পড়লাম। এই জেলায় ঐ জেলায়। এই গ্রামে। ঐ গ্রামে। সব গ্রামে যে হোটেল/হোষ্টেল আছে তা নয়। ইন্টারনেট তখনো শুরু হয়নি। সার্চ করে থাকার জায়গা বুকিং দিব সেই অবস্থা নেই। ইউথ হোস্টেল গুলো কম দাম। ঠিকানা ধরে গেলেন, গিয়ে শুনলেন, রুম খালি নেই।
    একটা সুবিধা ছিল- সেটা হলো জু-হাচি টিকেট। জাপান রেলওয়ের এই একটি টিকেট দিয়ে আপনি একই দিনে (২৪ ঘন্টায়) যদ্দুর যাননা কেন টিকিটের মুল্য হলো মাত্র ২২০০ ইয়েন। এখন ২৩০০ ইয়েন [২] ।
    দিনের বেলায় এক শহর থেকে আরেক শহরে ভ্রমণ আর রাত বেলা যেখানে রাত সেখানেই কাত। বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই ষ্টেশনের বেঞ্চে রাত কাটিয়ে দিয়েছি। জাপানের অনেক গ্রামগঞ্জ চষে বেড়িয়েছি। এ পর্যন্ত জাপানের ৪৭ টি জেলার [৩] মধ্যে অকিনাওয়া ছাড়া বাকী ৪৬ টি জেলায় পা দিয়েছি।
    একদিন জাপানের দক্ষিণাঞ্চলের কাগোশিমার দিকে যাচ্ছি। উদ্দেশ্য সাকুরাজিমার জীবন্ত আগ্নেয়গিরি দেখব। সে অন্য এক কাহিনী। আগ্নেয়গিরি দেখে সন্ধ্যার দিকে এক ট্রেন চাপলাম। এক গ্রামে গিয়ে ট্রেন থামলো। রাত বারোটা ছুই ছুই করছে। গ্রামের ষ্টেশনের নামটা মনে করতে পারছিনা। সারা স্টেশনে আমরা দুইজন। আরেকটা জাপানী ব্যাকপ্যাকার ছিল। রাত কাটলো স্টেশনের বেঞ্চিতে । সকালে উঠে জাপানীকে পেলাম না। আমি পিঠে ব্যাগ ঝুলিয়ে গ্রামের ভিতর দিকে হাটতে শুরু করলাম।
    আশে পাশেই কিছুই নেই। শুধু জমি আর জমি। ৭-৮ বছরের দুটো ছেলে জমি থেকে পোকা ধরছিল। আমাকে দেখে চিৎকার করে বলে উঠলো – “হোরা গাইজিন দা, দেখ দেখ বিদেশী” । যেন ওরা একটা বড় পোকার সন্ধান পেয়েছে।
    গ্রামে গঞ্জে ১৯৮৯ সালে একজন বিদেশী একটা রেয়ার অবজেক্ট। হঠাৎ দেখে চমকে, নির্বাক হয়ে গেলো থমকে। আমি ওদের কৌতুহল দশগুন বাড়িয়ে দিতে চেষ্টা করলাম। বল্লাম, “আমি গাইজিন না, আমি কাসেই জিন। আমি মংগল গ্রহের লোক। “
    ওরা অবিশ্বাস করলো না । আমাকে ভেরিফাই করার চেষ্টা করলো ।
    ইংরেজি বলতে পারো (এইগো দেকিরু)?
    -হ্যা পারি।
    টুইঙ্কেল টুইঙ্কেল শুনিয়ে দিলাম। মনে হয় কবিতাটি আগে শুনেনি। তবে আমি যে ইংরেজী বলেছি এটা বুঝেছে।
    আরেকজন বললো – যোগ অঙ্ক জানো?
    -জানি।
    একশোর সাথে একশো যোগ করলে কত (হিয়াকু তাসু হিয়াকু ওয়া)?
    -দুইশো।
    পুরণ অঙ্ক পারো?
    -পারি।
    এমন একটা পূরণ অঙ্ক দিল যেটার উত্তর ওরা নিজেরাও জানেনা। যদ্দুর মনে পড়ছে, ৪ ডিজিট কে ৪ ডিজিট দিয়ে গুন। আন্দাজে একটা উত্তর দিলাম। মনে হলো পরীক্ষায় পাশ করেছি।
    হঠাৎ দুজন হাওয়া হয়ে গেল। একটু পর দেখি এই দুইবালক তাদের দাদীকে নিয়ে হাজির। দাদীজান মিটমিটে হেসে বললেন, “ তুমিই তাইলে সেই মংগল গ্রহের মানুষ” ।
    -জ্বি ।
    বল্লেন, টোকিও থেকে ঘন্টা দুই পরে আমার আরো দুইটা নাতি আসবে। এই মংগল গ্রহের মানুষটিকে দেখাতে চাই। আসবে আমাদের বাড়িতে কয়েক ঘন্টার জন্য?
    কয়েক ঘন্টা নয় কয়েক দিন নয়, সেই বাড়িতে আমি ৯ দিন কাটিয়ে দিলাম।
    ৭-১০ বছরের ৪ টি বাচ্চা। প্রতিদিন সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠেই আমার রুমে এসে হাজির হয়। আজ আমাকে কি শিখাবে, কি নিয়ে খেলবে তার বিস্তারিত পরিকল্পনা, সময়সূচী। কার আগে কে পরিকল্পনা বলবে, সে অন্য এক প্রতিযোগীতা। সকালবেলা খাবার টেবিল পর্যন্ত উত্তপ্ত থাকে এদের আলোচনায়। দাদীজান শান্তশিষ্ট আরেক বড় নাতি পেয়েছেন। প্রতি সকালেই নুতন কিছু রান্না করেন। নাস্তা সেরে আমরা পাচজন এক দৌড়ে মাঠে।
    বেসবলের রুল ওরাই প্রথম আমাকে শিখালো । বাবা-নুকি, জিজি-নুকি কত রকমের তাস খেলা। ভুতের গল্প, এদের বন্ধুদের গল্প, সব আমাকে শুনতে হয়। অনেক জাপানী শব্দ ও শিখালো। আমি হয়ে গেলাম একটি জীবন্ত পুতুল, যেন শর্ট সার্কিট ছবির সেই রোবট, বা স্টিভেন স্পিলবার্গের ET ছবি থেকে নেমে আসা এক আজব জীব।
    ১৩ থেকে ১৫ অগাষ্ট ওদের অবোন ফেষ্টিভাল। আমাদের বৈশাখী মেলার মত। সারা গ্রাম উৎসব মুখর হয়ে উঠে। আমার চার শিশু বন্ধু আর আমি মিলে নাচ প্রাকটিস করলাম। দাদীজান আমাদের একই রং এর পোষাক কিনে দিলেন। ওদের দলের হয়ে আরো শত শত মানুষের সাথে অবোন নাচ নাচলাম। স্থানীয় একটা পত্রিকা আমার ইন্টারভিউ নিল। ওদের লোকাল পত্রিকায় স্থান পাওয়ার পর ঐ বাড়িতে অতিথি বেড়ে গেল। দাদীজান মহাখুশী। সুযোগ পেলেই বলে বসেন- আমার এই বড় নাতি কিন্তু মংগল গ্রহের। আর হা হা করে হাসেন।
    উনার হাসি বেশি দিন টিকলো না। নয় দিন পর আমি বিদায় নিলাম। পরিবারের সবাই ষ্টেশন পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন। যেন বিদেশে চলে যাচ্ছি- সহসা ফিরবো না। দাদীজান সহ অনেকের চোখে-ই পানি। একটি ছেলে সারাক্ষণ আমার হাত ধরে ছিল । আমাকে সে কিচ্ছুতেই যেতে দিবে না।
    ১৯৮৮ সালে দেশ ছেড়ে আসার সময় ভাই-বোন, বাবা-মার চোখে পানি দেখেছি। আমি কাদিনি। নিজেকে হিমু করে রেখেছিলাম।
    কিন্তু এই গ্রাম ছেড়ে আসার সময় কেমন জানি গলা শুকিয়ে এল। ট্রেনে উঠে হাত নাড়লাম। ঢোক গিলে আর কতটুকু গলা ভিজানো যায়?
    শেষ কথাঃ দাদীজান মারা যাবার কয়েক বছর আগ পর্যন্ত উনাদের সাথে আমার নববর্ষের শুভেচ্ছা বিনিময় ছিল। নব্বই দশকের শেষের দিকে আমি তো ডিজিটালে চলে এসেছি। হাতে চিঠি লিখার অভ্যাস টুকু শিকেয় উঠেছে। দাদি-জান এনালগেই ছিলেন। ডিজিটাল ডিভাইডের বড় শিকার এই দাদী-নাতি ।
    দাও ফিরে সে অরণ্য, লও হে নগর।
    [১] গ্রাম ওয়েব www.gramweb.net
    [জাপান কাহিনী-৫]
    Facebook Comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২০

    ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২০

    ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২০

    ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০

    ০৪ অক্টোবর ২০২০

    ০১ অক্টোবর ২০২০

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫১৬
    ১৭১৮১৯২০২১২২২৩
    ২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
    ৩১  
  • ফেসবুকে দশদিক