• শিরোনাম

    পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন: যেভাবে জিতলেন মমতা

    | ০৪ মে ২০২১ | ৫:৪৯ অপরাহ্ণ | পড়া হয়েছে 112 বার

    পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন: যেভাবে জিতলেন মমতা

    পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে ২১৩টি আসনে জিতে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পরে তৃণমূল কংগ্রেসের সব নির্বাচিত বিধায়করা আবারো মমতা ব্যানার্জীকে পরিষদের দলনেত্রী হিসেবে নির্বাচিত করেছেন। বুধবার তিনি তৃতীয়বার মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবেন।

    ২১৩টি আসন তৃণমূল কংগ্রেস পেলেও তাদের সাথে এবার যাদের মুখোমুখি লড়াই হয়েছে, সেই বিজেপি দাবি করেছিল, তারা ২০০-র বেশি আসন পেয়ে পশ্চিমবঙ্গে ‘আসল পরিবর্তন’ আনবে।



    প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি থেকে শুরু করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, দলের সভাপতি জে পি নাড্ডারা বারবার ২০০-র বেশি আসন পাবেন বলে দাবি করছিলেন।

    রোববার ভোটের ফল যখন স্পষ্ট, তখন কালীঘাটে মমতা ব্যানার্জীর বাড়ির কাছে দাঁড়িয়ে এক তৃণমূল সমর্থক বলছিলেন, ‘মোদী-শাহ টার্গেট ঠিক করেছিল, আর টার্গেটটা পূরণ করলেন দিদি।’

    কাছেই তখন কয়েক শ’ সমর্থক সবুজ আবির মেখে তুমুল নাচ করছিলেন ‘খেলা হবে’ গানটির সাথে।

    মমতা ব্যানার্জী তার প্রতিটা সভাতেই মানুষের কাছে জানতে চেয়েছেন – ‘কী খেলা হবে তো?’

    সমর্থকরা চিৎকার করে বলেছেন – ‘হ্যাঁ খেলা হবে।’

    ‘দিদি বলেছিলেন না খেলা হবে? ভাঙ্গা পা নিয়েই খেলে ম্যাচ জিতে নিলেন দিদি,’ ওই নাচানাচির দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বলছিলেন ওই তৃণমূল সমর্থক।

    কীভাবে ম্যাচ জিতলেন মমতা ব্যানার্জী?
    বিশ্লেষক থেকে শুরু করে কলকাতার সাধারণ মানুষ বেশ কয়েকটি কারণ খুঁজে পাচ্ছেন তৃণমূল কংগ্রেসের এই বিপুল জয়ের পিছনে।

    রাজনৈতিক বিশ্লেষক তপশ্রী গুপ্তর কথায়, ‘তৃণমূলের এই সাফল্যের পিছনে বিজেপির পক্ষে নেতিবাচক একটা বড় কারণ কাজ করেছে। তারা বাইরে থেকে, বিশেষত হিন্দি বলয় থেকে নেতাদের নিয়ে এসেছেন এখানে ভোটের লড়াইতে নেতৃত্ব দিতে। সাথে আমদানি করেছেন একটা অ-বাঙালি সংস্কৃতির। তার মধ্যে একটা বড় দিক চূড়ান্ত ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতি, যা পশ্চিমবঙ্গের চিরাচরিত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ধারণার একেবারে বিপরীত।’

    সাধারণ মানুষদের একটা বড় অংশও কিন্তু একই কথা বলছেন।

    কাবেরী বিশ্বাস নামের আরেক নারী ভোটার বলছিলেন, ‘ধর্মীয় বিভাজন পশ্চিমবঙ্গের মানুষ, বাঙালিরা কখনোই পছন্দ করে না। বিজেপির বিরুদ্ধেই তাই বাংলার একটা বড় অংশ ভোট দিয়েছে বলে আমার মনে হয়।’

    ‘বিজেপি যেভাবে ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতি বাংলার ওপরে চাপিয়ে দিতে চাইছে, সেটা তো মেনে নেয়া যায় না! এর বিপরীতে তো অপশন একটা – তৃণমূল। আর বাকি যারা আছে, তাদের সংগঠন বা লোকবল তো সেরকম নেই যে বিজেপি’র বিরুদ্ধে লড়তে পারবে। বাকি কংগ্রেস বা বামফ্রন্ট তো বিজেপি বিরোধী সেই জায়গাটা নিতে পারেনি। সেজন্যই তৃণমূল কংগ্রেস এত ভোট পেয়েছে,’ বলছিলেন এক অরুন্ধতী চক্রবর্তী নামে এক ভোটার।

    ‘এটা তো স্পষ্ট যে বামফ্রন্ট-কংগ্রেস-আইএসএফ জোট বিজেপি বিরোধী অবস্থানটা স্পষ্ট করতে পারেনি। সেজন্যই স্বাধীনতার পর থেকে এই প্রথমবার বিধানসভায় একটা আসনও পায়নি কংগ্রেস বা বামদলগুলো। বিজেপি বিরোধী ভোট পুরোপুরিই গেছে তৃণমূলের দিকে,’ চায়ের দোকানে বন্ধুদের সাথে আড্ডা মারার ফাঁকেই বলছিলেন সুশোভন বসু নামে এক ভোটার।

    রাজনৈতিক বিশ্লেষক শুভাশীষ মৈত্রর ব্যাখ্যা, ‘এবারে বিজেপি বিরোধী সব ভোটই তৃণমূল কংগ্রেসই পেয়েছে বলে মনে হচ্ছে। এমনকি তাদের মধ্যে সেই সব ভোটার, যারা সাধারণভাবে তৃণমূল কংগ্রেসের সমালোচক, তারাও কিন্তু মমতা ব্যানার্জীকেই ভোট দিয়েছেন – কারণটা বিজেপিকে আটকাতে হবে – এই মানসিকতা তাদের মধ্যে কাজ করেছে।’

    ‘বিজেপি বিরোধী সব ভোটই যে প্রায় একচেটিয়াভাবে তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছে, তা নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের হিসাব থেকেও স্পষ্ট। আবার এটাও স্পষ্ট, যে ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতি করার চেষ্টা বিজেপি করেছিল, তা সফল হয়নি,’ বলছিলেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞ সব্যসাচী বসু রায় চৌধুরী।

    ‘পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যে দল মোটামুটিভাবে ৪৩-৪৪ শতাংশ ভোট পায়, তাদের জয় সুনিশ্চিত। এখন মোট ভোটার থেকে যদি প্রায় ৩০ শতাংশ মুসলিম ভোট বাদ দেন – কারণ ওই ভোট বিজেপি একটুও পায়নি, তাহলে ৭০ শতাংশ ভোট পড়ে থাকে। এই অমুসলিম ভোটই বিজেপির লক্ষ্য ছিল। ধর্মীয় বিভাজনটা তারা পুরোপুরি করতে পারেনি। মোটামুটিভাবে ৪৫ থেকে ৫০ শতাংশ তাদের বিভাজনের রাজনীতিতে বিশ্বাস করে ভোট দিয়েছে বলে মনে হচ্ছে। সেই হিসাবেই বিজেপির প্রাপ্ত ভোট ৩৮ শতাংশ, আর তৃণমূলের প্রায় ৪৭ শতাংশ,’ বিশ্লেষণ অধ্যাপক বসু রায় চৌধুরীর।

    ‘‘ধর্মীয় বিভাজন ছাড়াও যোগী আদিত্যনাথের মতো নেতারা এসেছেন, যার আমলে উত্তরপ্রদেশে অ্যান্টি রোমিও স্কোয়াড হয়েছে – যুবক-যুবতীদের একসাথে মেলামেশা প্রেম করা বা ভ্যালেন্টাইন্স ডে পালন করা এসব তারা ‘বরদাস্ত’ করে না। সেই জিনিষ যদি পশ্চিমবঙ্গেও শুরু হয়? এখানকার খোলামেলা, উদার সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত কম বয়সী ভোটারদের একটা বড় অংশ ভয় পেয়েছে, তাই তারা বিজেপিকে আসতে দিতে চায়নি,” মন্তব্য তপশ্রী গুপ্তর।

    “এখানে কিন্তু ২০১৪ সাল থেকে বিজেপি সরকার কী কাজ করেছে, তার খতিয়ানও নিয়েছেন সাধারণ মানুষ। অর্থে নরেন্দ্র মোদির পক্ষে একটা অ্যান্টি ইনকাম্বেন্সি ফ্যাক্টরও কাজ করেছে। বিশেষ করে নির্বাচনের প্রচারে যখন মোদি বারেবারে এই রাজ্যে আসছেন, যোগী আদিত্যনাথ ‘সোনার বাংলা’ গড়ার ডাক দিচ্ছেন তখন উত্তরপ্রদেশ সহ সারা দেশে করোনা মহামারী ভয়াবহ আকার নিয়েছে, এবং তা নিয়ন্ত্রণে মোদি বা যোগী আদিত্যনাথ ব্যর্থ,’ বলছিলেন শুভাশীষ মৈত্র।

    তাহলে কি শুধুই বিজেপি’র নেতিবাচক ভোট পেয়ে এত বড় সাফল্য পেল তৃণমূল কংগ্রেস?

    ‘নিশ্চয়ই না। কিছু সাফল্য নেতিবাচক ভোটের মাধ্যমে আসতে পারে, অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস গত ১০ বছরে যা যা করেছে, তারও সুফল ভোটযন্ত্রে নিশ্চয়ই পড়েছে। যদিও তৃণমূল কংগ্রেসের আমলে তেলবাজি, সিন্ডিকেট, দুর্নীতি এসবও ব্যাপকভাবে হয়েছে, কিন্তু দাঁড়িপাল্লার অন্যদিকটাও আছে যেখানে স্বাস্থ্যসাথী নামে স্বাস্থ্য বিমা প্রকল্প আছে, কন্যাশ্রীর মতো ছাত্রীদের সহায়তা দেয়ার প্রকল্প আছে – সেগুলোও একটা বড় ফ্যাক্টর নিশ্চয়ই,’ ব্যাখ্যা করছিলেন তপশ্রী গুপ্ত।

    পথচলতি এক মধ্যবয়সী সাধারণ ভোটার কেশব পাঠক।

    মমতা ব্যানার্জী যে এত বেশি আসনে জিতবেন, সেটা কি তিনি আশা করেছিলেন?

    জবাবে তিনি বলেন, ‘এত আসন পাবে তৃণমূল, সেটা আন্দাজ করিনি। ভেবেছিলাম ১৮০ থেকে ২০০-র মধ্যে হয়তো থাকবে।’

    তার আশার থেকেও বেশি আসন যে তৃণমূল পেল, তার কারণ কী – এই প্রশ্নের জবাবে কেশব পাঠক বলছিলেন, ‘মমতা ব্যানার্জী ১০ বছরে অনেক দিয়েছেন। কন্যাশ্রী, রূপশ্রী, স্বাস্থ্যসাথী – অনেক কাজ করেছেন তিনি। বিশেষ করে নারীদের জন্য তো প্রচুর করেছেন। তাই মানুষ তাকে ভোট দিয়েছে!’

    নারী ভোটারদের একটা বড় অংশই যে মমতা ব্যানার্জী পেয়েছেন, সেটা মনে করছেন অনেকেই।

    যেমন স্বাস্থ্যসাথী বলে একটি স্বাস্থ্য বীমা চালু করেছে রাজ্য সরকার, যা পরিবারের বিবাহিতা নারী সদস্যের নামে দেয়া হচ্ছে। ওই নারীর নামে কার্ডে তার স্বামী-সন্তানরা যেমন আছেন, তেমনই শ্বশুর-শাশুড়ি এমনকি ওই নারীর নিজের বাবা-মাও থাকছেন। এটা নারী ক্ষমতায়নে একটা বড় প্রকল্প বলে মনে করছেন অনেকেই।

    রাজু খান নামের এক ভোটার বলছিলেন, ‘মেয়েদের জন্য মমতা ব্যানার্জী তো অনেক কিছু করেছে। স্বাস্থ্যসাথী, কন্যাশ্রী, রূপশ্রী – বহু প্রকল্প তো উনি মেয়েদের জন্যই করেছেন। তাই তারাও ভোট দিয়েছে ঢালাও। তা ছাড়া বাড়ির মেয়েদেরই তো রান্নাঘর সামলাতে হয়। রান্নার গ্যাসের দাম সাড়ে ৮০০ টাকার কাছাকাছি। সেটাও তো নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে গেছে – মেয়েদের দিক থেকে।’

    নির্বাচনের দিনগুলোতে দেখা গেছে সকাল থেকেই বুথের বাইরে নারী ভোটারদের বিরাট লাইন – যা কিছুটা আশ্চর্যের। সাধারণত নারীরা ঘরের কাজকর্ম সেরে তারপর বেলায় ভোট দিতে যান। এদের একটা বড় সংখ্যক ভোট মমতা ব্যানার্জীই পেয়েছেন বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

    তার একটা কারণ যদি হয় মমতা ব্যানার্জীর নেয়া নারী ক্ষমতায়নে নানা প্রকল্প, অন্যদিকে মমতা ব্যানার্জীকে বিজেপি নেতাদের এক নাগাড়ে ব্যঙ্গ করাটাও নারী ভোটাররা পছন্দ করেননি।

    প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রতিটা সভায় ‘দিদি —- ও দিদি’ বলে সুর করে ব্যঙ্গ করেছেন। বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ মিজ ব্যানার্জী পায়ে প্লাস্টার নিয়ে ভোট প্রচারের প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘যেভাবে উনি শাড়ি কিছুটা তুলে ভাঙ্গা পা দেখাচ্ছেন, তার থেকে বারমুডা পড়ে প্রচার করলেই পারেন।’

    নারী ভোটাররা একান্ত আলোচনায় বলছেন, দেশের একমাত্র নারী মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী। দুর্ঘটনায় পায়ে আঘাত পেয়েছেন। সেভাবেই তিনি দিন-রাত এক করে হুইল চেয়ারে করে প্রচার করছেন – আর তাকে সমানে ব্যঙ্গ করা হচ্ছে!

    “মমতা ব্যানার্জীর যে ইমেজ, যে ভরসার জায়গা, সেটা কিন্তু খুব জোরালো। তৃণমূল কংগ্রেসে দুর্নীতি আছে, অনেকে খারাপ কাজ করে ঠিকই, কিন্তু একটা ভরসা আছে, যে মমতার কাছে জানানো গেলে কিন্তু ফল পাওয়া যাবেই। এই যে ‘দিদিকে বলো’ হেল্পলাইন, সেখানে ফোন করে কিন্তু বহু মানুষ তাদের সমস্যার সমাধান করতে পেরেছেন,” বলেন অরুন্ধতী চক্রবর্তী।

    সেটা ধরতে পেরেছিলেন বলেই বোধহয় তৃণমূল কংগ্রেস যে ভোট কুশলী প্রশান্ত কিশোরকে ভোটের কৌশল ঠিক করতে নিয়োগ করেছিল, তার পরামর্শ মতো গোটা রাজ্যে লাখ লাখ হোর্ডিং – পোস্টারে ছেয়ে ফেলা হয়েছিল – যাতে মমতা ব্যানার্জীর মুখের পাশে স্লোগান ছিল ‘বাংলা নিজের মেয়েকে চায়’।

    সূত্র : বিবিসি

    Facebook Comments Box

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

    ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

    ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

    ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১
    ১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
    ১৯২০২১২২২৩২৪২৫
    ২৬২৭২৮২৯৩০  
  • ফেসবুকে দশদিক