• শিরোনাম

    বাংলাদেশ কি পারবে উচ্চ শিক্ষার ত্রিমাত্রিক উন্নয়নে জাপানের আগ্রহকে কাজে লাগাতে?

    | ১৯ জুন ২০১৯ | ১১:২১ পূর্বাহ্ণ | পড়া হয়েছে 940 বার

    বাংলাদেশ কি পারবে উচ্চ শিক্ষার ত্রিমাত্রিক উন্নয়নে জাপানের আগ্রহকে কাজে লাগাতে?

    ড. বিদ্যুৎ বরণ সাহা: বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা গত ৩০ মে জাপান সফরকালে জাইকার প্রধান ড. শিনিচি কিতাওকার সাথে এক সৌজন্য সাক্ষাতে মিলিত হন। জাইকা হচ্ছে জাপান সরকারের সর্ববৃহৎ সাহায্যকারী সংস্থা যেটি উন্নয়নশীল দেশগুলিতে অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সম্পৃক্ত। উক্ত সাক্ষাতে মত বিনিময়কালে “শিক্ষাব্যবস্থায় অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান বিনিময়” এর প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি প্রাধান্য পায়। বাংলাদেশের উচ্চ প্রবৃদ্ধি অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক উল্লেখ করে তিনি বাংলাদেশের সাথে জাইকার শিক্ষা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের কর্মসূচি আরও জোরদার করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। আলোচনাকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তরুণ প্রজন্মকে সুদক্ষ করার লক্ষ্যে বাংলাদেশে একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য জাইকার প্রতি আহবান জানান।

    আলোচনাটি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে যে দেশগুলো বাংলাদেশের পাশে দাড়িয়েছে তার মধ্যে জাপানের অবদান অন্যতম। ১৯৭২ সাল থেকে এখন পর্যন্ত জাপানের কাছ থেকে মোট ১১৩০ কোটি ডলার সহায়তা পেয়েছে, যার সবটুকুই বলতে গেলে খরচ হয়েছে অবকাঠামোগত উন্নয়নে। এছাড়াও রয়েছে মানবসেবায় হাসপাতাল ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন। ২০১৭ সাল থেকে জাপান চালু করে “Innovative Asia Scholarship”। এই স্কলারশিপের উদ্দেশ্য ছিলো জাপানের জন্য দক্ষ জনশক্তি তৈরি করার পাশাপাশি বন্ধু প্রতিম দেশে মানবসম্পদ উন্নয়নে তাদের ভূমিকা রাখা। এই স্কলারশিপের আওতায় বাংলাদেশের দুটি বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বুয়েট) থেকে প্রতিবছর স্বল্পসংখ্যক শিক্ষার্থী স্নাতকোত্তর ডিগ্রীর জন্য জাপানের বিভিন্ন বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ পায়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নের এক নতুন দুয়ার উন্মোচন করেছে। জাইকা প্রেসিডেন্ট আভাস দিয়েছেন, যে সব কার্যক্রমে “অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান বিনিময়” প্রাধান্য পাবে সেখানে তারা সর্বাধিক বিনিয়োগ করবেন। এ যেন বাংলাদেশের শিথিল হয়ে পড়া উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে ত্বরান্বিত করার এক সুবর্ণ সুযোগ। কিন্তু প্রশ্ন হল বাংলাদেশ কিভাবে এই সুযোগকে কাজে লাগাতে পারে??



    গনতন্ত্রের মানসকন্যা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গি, সততা ও কর্তব্যপরায়নতার সুবাদে ইতিমধ্যেই দেশটি বিশ্বের দরবারে মাথা উচু করে দাঁড়িয়েছে। তিনি ভালো ভাবেই জানেন যে একটি দেশের উন্নয়নের প্রধান স্তম্ভ হচ্ছে তার শিক্ষা ব্যবস্হার উন্নয়ন। ২০০৯ সালে তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদ অলংকৃত করেন এবং তখন থেকেই দক্ষ মানব সম্পদ উন্নয়নের লক্ষ্যে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। এই দক্ষ মানব সম্পদ তৈরিতে বিশেষ ভাবে প্রয়োজন ত্রিমাত্রিক উচ্চ শিক্ষা ব্যবস্থা। উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার তিনটি স্তম্ভঃ (১) শ্রেণীকক্ষ ভিত্তিক শিক্ষা, (২) গবেষণা এবং (৩) বিশ্বায়ন। শ্রেণীকক্ষ ভিত্তিক শিক্ষার জন্য দরকার দক্ষ শিক্ষক, শিক্ষার পরিবেশ এবং যোগ্য ছাত্র-ছাত্রী। যার সবকটি উপাদানই আমাদের দেশে কম বেশি আছে। গবেষণার মাধ্যমে মৌলিক জ্ঞানের সৃষ্টি, প্রয়োগ ও মেধা সত্ত্ব তৈরি করা উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার একটি অন্যতম প্রধান কাজ। এই জায়গাটিতে বাংলাদেশের অবস্থান পেছনের সারিতে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জ্ঞানের আদান-প্রদানের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান হতাশাব্যঞ্জক। ত্রিমাত্রিক শিক্ষাব্যবস্থার অভাবে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় গুলো ক্রমান্বয়ে পিছিয়ে পড়ছে। যদিও বর্তমান সরকার সম্প্রতি বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য “বঙ্গবন্ধু স্কলারশীপ” ও “প্রধানমন্ত্রী ফেলোশিপ”-এর মত আকর্ষনীয় কিছু উদ্যোগ গ্রহন করেছে যা দেশের বিশ্ববিদ্যালয় সমূহের গবেষণা উন্নয়নের জন্য যথেষ্ট নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে জাপানের শিক্ষা ব্যবস্থা অনেক পিছিয়ে ছিল। তারা সময় মত ৭ টি বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রাধান্য দিয়ে গবেষণায় বিনিয়োগ করে। এছাড়াও ২০০৭ সাল থেকে World Premier Research Center Initiative (WPI) নামে বেশ কয়টি অত্যাধুনিক ইন্সটিটিউট স্থাপন করে, যেখানে দেশ বিদেশের খ্যাতিমান গবেষকরা নিয়োজিত আছেন বিশ্বের বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে।

    এই অবস্থা অনুধাবন করে ২০১৬ সালেই কিউশু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমি, জাপানের কিউশু বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন সহকর্মী নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য “বাংলাদেশ-জাপান ইন্টারডিসিপ্লিনারী ইন্সটিটিউট (BJI2)” নামে একটি সময়োপযোগী অত্যাধুনিক গবেষণা ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠার পদক্ষেপ নেই। গতানুগতিক ভাবে না সাজিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্যা গুলোর কথা চিন্তা করে বিজেআইটুর কার্যক্রম সম্পূর্ণ ভিন্ন ভাবে সাজানো হয়। প্রাধান্য দেওয়া হয় “অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান বিনিময়” এর বিষয়টি। পরিকল্পনা অনুযায়ী উক্ত ইন্সটিটিউটে থাকবে স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স ও পি.এইচ. ডি) শিক্ষা কার্যক্রম, যেখানে ভর্তি হবে বাংলাদেশের সবচাইতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা, তাদের জন্য থাকবে সম্মানজনক স্কলারশিপের ব্যবস্থা। গবেষণা করবেন ইনোভেশন নিয়ে, বের করবেন কিভাবে প্রযুক্তিকে সমাজের টেকসই উন্নয়নে কাজে লাগানো যায়।

    ঢাকা ও কিউশু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা স্নাতকোত্তরের গবেষণায় শিক্ষার্থীদের যৌথভাবে সুপারভাইজ করবেন। পরবর্তীতে ভাল ফলাফল করা শিক্ষার্থীদেরকে জাপানের কিউশু বিশ্ববিদ্যালয়ে স্কলারশিপ সহ পি,এইচ,ডি করার সুযোগ দেয়া হবে। দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা জাপানেও যৌথভাবে পি. এইচ. ডি. তে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের সুপারভাইজ করবেন। এতে সবাই উপকৃত হবেন। শিক্ষার্থীরা বিশ্বমানের গবেষণাগারে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণায় অংশগ্রহণ করার সুযোগ পাবে। পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও বিশ্বমানের গবেষণায় সম্পৃক্ত হয়ে মৌলিক ও প্রায়োগিক জ্ঞানের সৃষ্টিতে মুখ্য ভূমিকা রাখতে পারবেন বলে আশা করা যায়।

    ২০১৬ সালে প্রস্তাবিত BJI2 এর জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অভূতপূর্ব সাড়া পাওয়া যায়। তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ স স ম আরেফিন সিদ্দিক জাপান সফরে এসে, কিউশু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্টের সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা করে Memorandum of Understanding (MoU) এ স্বাক্ষর করে যান। কিউশু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্টেরও যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, কিন্তু বাধ সাধে হলি আর্টিজানের মতো কলঙ্কজনক ঘটনা। জাপান সরকার তার নাগরিকদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে সকল জাপানিজদের বাংলাদেশে যাতায়াত সীমিত করে দেয়। যেহেতু, ইন্সটিটিউটটির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল জাপানি অধ্যাপকের বাংলাদেশ এসে শিক্ষাদান করার, তাই উদ্যোগটি পিছিয়ে পড়ে। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোঃ আখতারুজ্জামান এবং কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মোঃ কামাল উদ্দীন কিউশু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ড. চিহারু কুবো সহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধিদের সাথে সাক্ষাতে বিজেআইটু চালু করার ব্যাপারে সম্মতি ও ঐকান্তিক আগ্রহ প্রকাশ করেন।

    ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বিজেআইটুর মত আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা প্রতিষ্ঠান হতে পারে বাংলাদেশের জন্য বড় অর্জন। পরবর্তীতে বাংলাদেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় গুলো BJI2 কে অনুসরণ করে নিশ্চিত করতে পারবে উচ্চ শিক্ষার ত্রিমাত্রিক কাঠামো। বাংলাদেশের প্রতি জাপান এখন অনেক বেশি সহানুভূতিশীল এবং বিনিয়োগে আগ্রহী। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেহেতু জাইকা প্রধানের কাছে জাপান সফরে একটি টেকনিক্যাল ইন্সটিটিউটের জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছেন, বিজেআইটু হতে পারে তাঁর আগ্রহের তাৎক্ষনিক প্রতিফলন। আমরা তাই আশা করতেই পারি, বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর সাহসী উদ্যোগে BJI2 এর মত অপার সম্ভাবনাময়ী প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন হবে। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও গড়ে উঠবে বিশ্বমানের পর্যাপ্ত ইন্সটিটিউট, যেখান থেকে তৈরি হবে বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়ার বিশ্বমানের শত শত আগামী দিনের কারিগর।

    লেখক:
    অধ্যাপক এবং মুখ্য গবেষক
    ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর কার্বন নিউট্র্যাল এনার্জি রিসার্চ
    এবং
    অধ্যাপক, যন্ত্র প্রকৌশল বিভাগ
    কিউশু বিশ্ববিদ্যালয়, জাপান।

    Facebook Comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০
    ১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
    ১৮১৯২০২১২২২৩২৪
    ২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১
  • ফেসবুকে দশদিক