• শিরোনাম

    “বিদায় ২০২০” মহামারীর কঠিনতম বছর!

    | ৩১ ডিসেম্বর ২০২০ | ১০:০৩ পূর্বাহ্ণ | পড়া হয়েছে 230 বার

    “বিদায় ২০২০” মহামারীর কঠিনতম বছর!

    মহামারীর মরণকামড়ে একটি অভিশপ্ত বছর কেটে গেল। একটি মাত্র ভাইরাস কেড়ে নিয়েছে বিশ্বের ১৮ লাখ মানুষের প্রাণ। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও কাটিয়েছে মহামারীর এ কঠিনতম বছর। সরকারি হিসাবেই জীবন গেছে সাড়ে ৭ হাজারের বেশি। উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু থেকে গেছে হিসাবের বাইরে। শুধু মৃত্যুই নয়, করোনা কেড়ে নিয়েছে অনেকের জীবিকা। কেড়ে নিয়েছে মানবিকতা। সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধন ফেলে দিয়েছে চ্যালেঞ্জের মুখে। কমিয়ে দিয়েছে মানুষে মানুষের যোগাযোগ।

    মহামারীর একই সময়ে বাংলাদেশে থেমে থাকেনি অমানবিক কর্মকান্ড ও রোমহর্ষক অপরাধ। করোনাভাইরাসের টেস্ট নিয়ে জালিয়াতি ও জীবন রক্ষাকারী মাস্ক নিয়ে কেলেঙ্কারি হয়েছে মহামারীতে। হাসপাতালে চিকিৎসা না পেয়ে ঘুরতে হয়েছে পথে পথে। হাসপাতালে প্রবেশের অনুমতি পাওয়ার আগেই মৃত্যু হয়েছে রোগীর। ভাইরাসের ভয়ে পরিবারের সদস্যরাই আসেননি লাশের পাশে। এ সময়ও থেমে ছিল না হত্যা, ধর্ষণের মতো অপরাধ। পরপর কয়েকটি ধর্ষণের বীভৎস ঘটনায় উত্তাল হয়েছে পুরো দেশ। অবশ্য অপরাধ নিয়ন্ত্রণের আলোচিত অভিযানও চলেছে এই সময়ে। জানা যায়, বাংলাদেশে করোনাভাইরাস আতঙ্কে একটি বড় সময় কেটেছে ঘোষিত সাধারণ ছুটিতে। প্রায় তিন মাসের বেশি বন্ধ ছিল সবকিছু। বাংলাদেশে আতঙ্কের শুরু হয় ৮ মার্চ। সেদিন বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের প্রথম সংক্রমণ ধরা পড়ে। প্রথম রোগী শনাক্তের ১০ দিন পর ১৮ মার্চ দেশে প্রথম মৃত্যুর কথা জানায় সরকারি দফতর। গতকাল পর্যন্ত এ মৃতের সংখ্যা ছিল ৭ হাজার ৫০৯। ৩০ জুন এক দিনে সর্বোচ্চ ৬৪ জনের মৃত্যু হয় বাংলাদেশে। গতকাল পর্যন্ত শনাক্ত হওয়া রোগীর সংখ্যা ৫ লাখ ১১ হাজারের বেশি। ২ জুলাই এক দিনে সর্বোচ্চ ৪ হাজার ১৯ জন রোগী শনাক্ত হন।



    কিন্তু এক মহাপরিকল্পনা নিয়ে ২০২০ সাল শুরু করেছিল বাংলাদেশ। বছরের শুরুতেই ১০ জানুয়ারি কাউন্টডাউন শুরু হয় এক মহাযজ্ঞের। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জনশতবার্ষিকী উপলক্ষে বছরজুড়ে উদ্যাপন শুরুর পরিকল্পনা ছিল ১৭ মার্চ। কিন্তু করোনা মহামারী ‘মুজিববর্ষ’ উদ্যাপনের সব পরিকল্পনা উল্টেপাল্টে দেয়। অবশ্য বছর শেষে আগামী বছরের ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়েছে মুজিববর্ষের বিস্তৃতি।
    দেশে করোনা মহামারীর শুরুর কয়েক দিনের মাথায় ২৫ মার্চ বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে জেল থেকে মুক্তি দেয় সরকার। দুটি দুর্নীতির মামলায় ১৭ বছরের সাজা নিয়ে তিনি দুই বছরের বেশি কারাগারে ছিলেন। কিন্তু করোনাভাইরাস সংক্রমণকালে দুই শর্তে তাঁর কারাভোগ স্থগিত করে মুক্তি দেওয়া হয়। প্রথমে ছয় মাসের জন্য মুক্তি দেওয়া হলেও পরে এ স্থগিতাদেশ এক দফায় বাড়ানো হয়েছে।

    মহামারীর প্রথম কিছু দিনে অপরাধ কমে আসার তথ্য পাওয়া গেলেও কয়েক দিনেই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে। জুলাইয়ে বিশ্বে বাংলাদেশের দুর্নাম ছড়ায় রিজেন্ট হাসপাতাল ও জেকেজি হেলথকেয়ারের ভুয়া করোনা টেস্টের সার্টিফিকেট। টেস্ট না করেই হাজারে হাজারে পজিটিভ-নেগেটিভ সার্টিফিকেট দিয়ে যাচ্ছিলেন রিজেন্ট মালিক প্রতারক মো. সাহেদ ও জেকেজির মালিক ডা. সাবরিনা। এখন অবশ্য দুজনই কারাগারে আছেন।

    এর বাইরে কয়েকটি ধর্ষণের কারণে বছরজুড়ে আন্দোলন ছিল বিভিন্ন সময়। চাঞ্চল্যকর সিলেট এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে স্বামীকে বেঁধে রেখে স্ত্রীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, নোয়াখালীতে গৃহবধূ ধর্ষণ ও রাজধানীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ধর্ষণসহ দেশব্যাপী নারী নির্যাতনের প্রতিবাদ হয়েছে ব্যাপক মাত্রায়। পরে বহুল আলোচিত ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ডের বিধান যুক্ত করতে সংশোধিত ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) বিল-২০২০’ সংসদে পাস করা হয়। বছরের অন্যতম আলোচিত ঘটনা ছিল সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান হত্যাকান্ড। ৩১ জুলাই কক্সবাজারের টেকনাফে পুলিশের গুলিতে নিহত হন সাবেক এ সেনা কর্মকর্তা। এ হত্যা মামলায় টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশসহ ১৫ জনকে আসামি করে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে এ কারণে জেলার পুরো পুলিশ প্রশাসনকেই বদলে দেওয়া হয়েছে।

    মহামারীর মধ্যেও নতুন নতুন গডফাদারের মুখোশ উন্মোচিত হয়েছে। করোনাভাইরাসের প্রকোপ শুরুর আগেই ওয়েস্টিন হোটেলে কক্ষ ভাড়া নিয়ে কয়েকজন তরুণীকে দিয়ে ‘যৌন ব্যবসা’ চালানোর অভিযোগে গ্রেফতার হয়ে আলোচনায় আসেন নরসিংদী জেলা যুব মহিলা লীগ সাধারণ সম্পাদক (পওে বহিষ্কৃত) শামীমা নূর পাপিয়া। আর বছরের শেষ ভাগে নৌবাহিনীর এক কর্মকর্তাকে মারধরের ঘটনায় পুরান ঢাকার সংসদ সদস্য হাজী সেলিমের ছেলে ইরফান সেলিমের গ্রেফতার, উত্তরার ক্রিসেন্ট হাসপাতাল ও বাড্ডায় গোল্ড মনিরের বাড়িতে র‌্যাবের অভিযান ছিল আলোচনার কেন্দ্রে। দেশের বাইরে কুয়েতে লক্ষ্মীপুরের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য কাজী শহিদ ইসলাম পাপুলের গ্রেফতার অন্য ধরনের পরিস্থিতি তৈরি করেছে। মানব পাচার ও দুর্নীতির মামলায় এমপি পাপুলকে কুয়েতে দীর্ঘ কারাবাস করতে হতে যাচ্ছে। পার পাননি তার স্ত্রী সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সেলিনা ইসলামও। তার বিরুদ্ধে দেশে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। বছর শেষের আরেকটি অপরাধ দেশজুড়ে সাড়া ফেলে। ডিসেম্বরে কুষ্টিয়ায় বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙচুর করা হয়। অবশ্য এর আগের পরের ঘটনাপ্রবাহের এখনো কোনো সমাপ্তি টানতে পারেনি দেশের রাজনীতি।

    বছরের অন্যান্য আলোচিত ঘটনার মধ্যে ছিল ইতিহাসে সর্বোচ্চ দামে পিঁয়াজ বিক্রি। পাশাপাশি বছরের শেষ দিকে রোহিঙ্গাদের কক্সবাজার থেকে ভাসানচরে স্থানান্তরও ছিল আলোচনার একটি বিষয়। তবে মহামারীতে দেশে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে শিক্ষা খাতের। মার্চ থেকে বছরজুড়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকায় ইতিহাসে প্রথমবারের মতো অটো পাস দিতে হয়েছে এইচএসসি, জেএসসি, জেডিসি ও প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায়। অন্য শ্রেণিগুলোর শিক্ষার্থীরা বার্ষিক পরীক্ষায় পেয়েছে অটো প্রমোশন। মহামারীর বছর হলেও পিছু ছাড়েনি দুর্ঘটনায় মৃত্যু। বুড়িড়গঙ্গায় লঞ্চডুবিতে ৩২ মৃত্যু, নারায়ণগঞ্জে গ্যাসলাইনে বিস্ফোরণে ৩৪ মৃত্যু, জয়পুরহাটে বাস-ট্রেন দুর্ঘটনায় ১২ মৃত্যু কাঁদিয়েছে দেশবাসীকে।

    বছরের বিভিন্ন সময়ে এসেছে সুখবরও : বছরের শুরুতে দেশের জন্য এক বিশাল অর্জন বয়ে নিয়ে আসে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট দল। ফেব্রুয়ারিতে দক্ষিণ আফ্রিকায় আইসিসি অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ জয়ের অনন্য সাফল্য এনে দেয় দলটি। বাংলাদেশের জন্য এটাই প্রথম কোনো বিশ্বকাপ শিরোপা জয়ের ট্রফি। অবশ্য এরপর বছরজুড়েই খেলাধুলা ছিল মাঠের বাইরে। সুখবর এসেছে পদ্মা নদী থেকেও। পদ্মায় দেশের গর্বের সেতু দুই পাড়কে সংযুক্ত করে ফেলেছে এ বছরই। সুখবর আছে অর্থনীতিতেও। মহামারীর কারণে পুরো বিশ্বের অর্থনীতিই যখন টালমাটাল, তখন অনেকাংশেই কাটিয়ে উঠতে পেরেছে বাংলাদেশ। রেমিট্যান্সও জাগিয়েছে আশার আলো। ২০২০ সালের মতো এত রেমিট্যান্স এক বছরে বাংলাদেশে কখনো আসেনি। রেমিট্যান্সের ওপর ভর করে মহামারীর মধ্যেই বাংলাদেশের রিজার্ভ ৪৩ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক ছুঁয়েছে। এও বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। তবে সবকিছু ছাপিয়ে মহামারীতে কিছু ব্যক্তি ও সংস্থার ব্যতিক্রমী উদ্যোগ দেশের মানুষের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে। যখন মৃত্যু আতঙ্কে স্বজনরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছিলেন তখন এগিয়ে আসেন একদল মহামানব। মানবিকতার ইতিহাস গড়ে তারাই করেছেন করোনায় মৃত মানুষের দাফন। তারা প্রমাণ করেছেন, মানবতা পুরোপুরি ধ্বংস হয় না।

    Facebook Comments Box

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০

    ০৯ এপ্রিল ২০২০

    ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
    ১০১১১২১৩১৪
    ১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
    ২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
    ২৯৩০৩১  
  • ফেসবুকে দশদিক