• শিরোনাম

    বৃদ্ধদের পাঠশালা

    আশির আহমেদ | ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ১২:২০ অপরাহ্ণ | পড়া হয়েছে 42 বার

    বৃদ্ধদের পাঠশালা

    বিদেশে কখনো অর্থ(অন্ন) কষ্টে ভুগেছেন? ১৯৯৪ সালের এপ্রিল মাস। তোহকু বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সে ভর্তি হয়েছি। ফিন্যান্সিয়্যাল মিসম্যানেজমেনটের জন্য একটা বড় ধরনের শিক্ষা হলো। আন্ডারগ্র্যাড পর্যন্ত আমাদের বৃত্তির নিশ্চয়তা দিয়েছিলেন জাপানের শিক্ষা মন্ত্রণালয়। মাস্টার্সে উঠে প্রাইভেট বৃত্তির জন্য আবেদন করতে হলো। সি,জি,পি,এ বলেন, জাপানী ভাষার দক্ষতা বলেন, যোগ্যতার মাপকাঠিতে বাংলাদেশ থেকে আসা আমাদের ৩ ছাত্রেরই পজিশন অনেক উপরে। কিন্তু আমাদের বৃত্তি মিলছে না। আমার হাতে যা সঞ্চয় ছিল তার সিংহভাগই টিউশন ফি আর রিলোকেশনে খরচ হয়ে গেল।

    এর মধ্যে টোকিওর এক বাংলাদেশি বড় ভাই ২ লক্ষ ইয়েন (২ হাজার ডলার) ধার চেয়ে বসলেন। কথা ছিল ১ সপ্তাহের মধ্যে ফেরত দিবেন। আজ দিবেন কাল দিবেন করে এক মাস কাটিয়ে দিলেন (পড়ে শুনলাম উনি ও আরেক বড় বিপদে পড়েছিলেন)। সেন্দাই শহরে আমি তখন নূতন। এসেছি মাত্র ৩ সপ্তাহ হলো। ধার চাওয়ার মতো বন্ধু তখনো তৈরি হয়নি। হঠাৎ দেখি ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স শূন্য। খাবার কিনার টাকা টুকু ও নেই। আমার রান্নাঘর শুকনো হয়ে গেল। শুরু হলো দাবিহীন অনশন।



    ক্ষিধা যে কি জিনিসরে ভাই- রোযা রাখার মধ্যে একটা নিয়ত থাকে। ধর্মীয় কারণে কিনা জানিনা, মনে হয় শরীরের সব অন্ত্রগুলো সেই নিয়তের ইচ্ছা শক্তিকে সাপোর্ট দেয়। ক্ষিধাকে ক্ষিধা মনে হয়না।
    কিন্তু রে বাপ, এই ক্ষিধা সেই ক্ষিধা না। অভুক্তাবস্থার তৃতীয় দিন। আজও বড় ভাই পাওনা টাকা পাঠান নি। ইউনিভার্সিটি থেকে সাইকেল চালিয়ে এসে বিছানায় পড়ে গেলাম। পাকস্থলীর কোষগুলো বিরোধী দলের মত আচরণ শুরু করলো। পাকস্থলীকে সান্ত্বনা দেয়ার মত যা আছে তা হল ট্যাপের পানি। বায়োলজিক্যাল ব্যাখ্যাটি জানিনা, পানি খেলে ক্ষুধা আরও বেড়ে যাচ্ছে। পাকস্থলী সশস্ত্র হয়ে উঠছে। পেটের এই কোনায় ঐ কোনায় রীতিমত ঘাই দিয়ে বসছে। ক্ষণে ক্ষণে বজ্রপাত মার্কা গুড়গুড় গুড়গুড় বিদ্রোহের স্লোগান দিচ্ছে। সেই ডাকে অন্যান্য অরগ্যান গুলোও সায় দিয়ে বয়কট শুরু করলো।

    শরীরের সব অরগ্যান গুলো দুষছে আমার ব্রেন এর অর্থ মন্ত্রণালয় কে। “ব্যাটা তোর রিজার্ভ কই? তোর ব্রেনে ঘিলু নাই? বই মুখস্ত করে ভাল ফলাফল করা এক জিনিশ আর ফিন্যানশিয়াল ম্যানেজমেন্ট আরেক জিনিশ। গাধা কোথাকার। অর্থনীতি বুঝিস না তো মাথায় বসেছিস ক্যান? ব্যাটা হাঁটুতে নেমে আয়।”

    অভুক্তাবস্থার চতুর্থ দিন। সম্ভবত ১৯৯৪ সালের মে মাসের ৭ তারিখ, শনিবার। বাংলাদেশী বড় ভাই ভাবীগন ডরমিটরির লবিতে বসে আড্ডা মারছেন। বয়সে আমি সবার ছোট। আমার অন্তর্নিহিত ক্ষুধার রাজ্যের কথা কেউ জানেনা। ভাবছিলাম কিছু টাকা ধার চেয়ে বসবো। হাঁটু বলছে যা যা। ব্রেন বলছে না না। হাঁটুকে জয়ী করে দিয়ে লবি তে গেলাম। কিন্তু টাকা, ক্ষুধা এই টপিকের পরিবেশ পেলাম না। লবি থেকে ফিরছি। এমন সময় দেলোয়ার ভাই (রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, বর্তমানে নিউজিল্যান্ডে) বললেন, “আলু দিয়ে শাঁক রান্না করবো, ডাল আছে, ভাত খাবা?”। দেলোয়ার ভাই নিজে ও জানেন না উনি কি উপকারটি আমায় করেছেন।

    মানুষ সমস্যায় পড়লেই ক্রিয়েটিভ হয়ে উঠে। সেই ক্রিয়েটিভিটিই হোক, আর ভাগ্যের কারণেই হোক, পরবর্তি ৬ মাসের কয়েকটি এক্টিভিটি আমার জীবনের চাকা ঘুরিয়ে দিল। আমার ডিকশেনারিতে “সাস্টেইনেবিলিটি” শব্দটি যুক্ত হল।

    (পাঠকগন, আমি লিখা শুরু করেছি “বৃদ্ধদের পাঠশালা নিয়ে। এতক্ষণ লিখলাম ক্ষুধা নিয়ে। বৃদ্ধদের পাঠশালার সাথে কি সম্পর্ক তা জানতে হলে … ad বিরতি)

    ১৯৯৪ সালের অগাস্ট মাস। আমার চেয়ে বয়সে ১২ বছরের বড় এক জাপানীর সাথে বন্ধুত্ব হল। নাম কানো। আমরা বলি কানো সান। সর্বদা হাসি হাসি মুখ। যাহাই বলি তাহাই বুঝে যান। সেটা বাংলাতেই হোক আর হিব্রুতেই হোক। কিন্তু উনি বলেন শুধু জাপানিজ। ১ বছরে উনার সাথে এমন বন্ধুত্ব হল যে আমার ফ্যামিলির, আমার গ্রামের, বাংলাদেশ আর সেন্দাই এর আমার বন্ধুমহল সবাই উনাকে এক নামে চিনেন। কানো সান। কানো সান।

    উনার একটা আজব হবি ছিল – দিনে কমপক্ষে একজন করে নূতন মানুষের সাথে পরিচিত হবেন। উনার এই আন্দোলনে যোগ দিতে চাইলাম। । তবে দিনে ১ জন নয়, মাসে ৩০ জন নূতন মানুষের সাথে পরিচিত হবো। এই শর্তে রাজি হলেন।

    একদিন হঠাৎ হুমায়ুন আহমেদের হিমুর মত একটা বানী দিয়ে বসলেন।

    মানুষের উপকারে লাগো, টাকার পিছনে তোমাকে দৌড়াতে হবে না। টাকাই তোমার পিছনে দৌড়াবে।

    “ট্রাই টু বি ইউজফুল টু আদারস। ইয়ু ডোন্ট হ্যাভ টু গো লুক ফর মানি, মানি উইল চেইজ আফটার ইয়ু”।

    আমি তোমার স্কিল গুলোর একটা লিস্ট করেছি। তোমার যা আছে এতেই তুমি সেন্দাই আর আশেপাশের লোকজনের অনেক কাজে আসবে।

    আমি লিস্টটা দেখলাম। লিস্ট তো না কয়েকটা কি-ওয়ার্ড। এটাই সম্ভবত আমার প্রথম সি,ভি।

    (১) ভাষাঃ বাংলা, ইংরেজি, জাপানী (২) রান্না (৩) বাচনভঙ্গি, যাদু দেখানো (৪) কম্পিউটার।

    এই চারটি স্কিল নিয়ে উনার লিডারশীপে সমাজ সেবায় নেমে গেলাম।

    প্রায় প্রত্যেক শনিবার সকাল ১০ টার দিকে আমাকে এসে নিয়ে যান। উনার টয়োটা প্রাডো তে করে। একেক সপ্তাহে একেক শহরের কমিয়ুনিটি সেন্টার। ওখানে জড়ো থাকেন ৫০-৬০ জন বৃদ্ধ লোক। তার মধ্যে ১০-১৫ জন সেমি-বৃদ্ধ আর কেউ কেউ নাতি-নাতিনি ও নিয়ে আসেন। দুপুরে সবাই মিলে রান্না করি। রেসিপি লিখা আছে। মুরগি/খাসির মাংস। টিম ওয়ার্ক। আমি লিড দেই। খাবার আগে “ডান হাতে কিভাবে খেতে হয়” তার একটা ডেমো দেন কানো সান। খেতে খেতে আমি তিনটা বাংলা বাক্য শিখাই-

    আমার নাম (বাবু)

    আমি (চিকেন কারী) পছন্দ করি

    মজা কিন্তু ঝাল

    তারপর একে একে সবাই বলেন। (ব্রাকেটের) জায়গাটুকু নিজেরা পুরন করে নেন। কেউ কেউ (চিকেন কারী) র জায়গায় নিজের বউয়ের নাম বলে দেন। তারপর “মজা কিন্তু ঝাল” বলবেন কি বলবেন না, চিন্তায় পড়ে যান। বউ লজ্জা পান, আর সেটা নিয়ে সবাই মিলে হাসেন।

    কেউ “মজা” উচ্চারণে ভুল করলেই কানো সান দৌড়ে যান। বলেন, “মজা, মজা। মোজা না”। মজা হলো “অইসিই” আর মোজা হল “কুতসুশিতা”। আর সবাই মিলে হো হো করে হাসেন।

    মানুষের মুখে হাসি ফোটানো একটি কঠিন কাজ। বিশেষ করে জাপানিজ দের।

    বাড়ি ফিরে কেউ কেউ চিঠিও লিখেন। কুকুর বিড়ালসহ পরিবারের সবার ছবি পাঠান। বাড়ি যাওয়ার দাওয়াত দেন। কয়েকজনের বাড়িতে ও গেলাম। বাড়িতো নয় যেন জাদুঘর। বছর দেড়েক এভাবে চলার পর, উনারাই একটা প্রস্তাব দিলেন। মাসে একবার করে মিলিত হবেন। আমাকে যেতে হবেনা (আমি পি,এইচ,ডি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেলাম), ওনারাই আসবেন সেন্দাই শহরে। প্রত্যেক মাসের শেষ শনিবার ২টা থেকে ৪ টা। ওনারা নাম দিলেন “সিনিয়র সিটিজেনস ক্লাস রুম”। আমি বলি “বৃদ্ধদের পাঠশালা”।

    অনেকেই এসেছেন মারাত্মক প্রফেশনাল ব্যকগ্রাউনড নিয়ে। এর মধ্যে আছেন রিটায়ার্ড পুলিশ অফিসার, আর্কিটেক্ট, ডাক্তার, লেখক, শেফ, ব্যবসায়ী …।

    পাঠশালার উদ্দেশ্য হলো ইংরেজি প্রাকটিস করা। এই বুড়ো বয়সে ইংরেজি কি কাজে লাগবে জানিনা, কিন্তু সেই সুবাদে আমারও স্পোকেন ইংরেজিটা ধারালো হয়ে উঠলো। এই পাঠশালার বৈশিষ্ট্য হল – কোন খাতা কলম আনা যাবেনা। শুধু কথা বলতে হবে। ভয়েস অনলি কমিয়ুনিকেশন। আমি শুরুতেই জিজ্ঞাস করতাম- হোয়াটস ন্যু (what’s new?) । সাধারণতঃ এই একমাসে কি কি ঘটনা ঘটলো তার আপডেট দেয়ার কথা। ওনারা শুরু করে দেন উনাদের লাইফ হিস্ট্রি। এক কথা থেকে অন্য কথা। ৬-৭ বছরের শিশুরা যেমন কথাই শেষ করতে চায়না। বাকি কথা শোনানোর জন্য আবার বাড়িতে দাওয়াত দেন। আমি কিসের ইংরেজি শিখাব? মনোযোগ সহকারে শুনতে থাকি। কোন সময় চোখের ভুরু কুঁচকে যায়, কখনও নিজের অজান্তেই চোখ ভিজে ওঠে। একেক জন একেকটা লাইব্রেরি। এক মাস পড়েই হয়তো শুনি একটা লাইব্রেরি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। পরবর্তি সিরিজ গুলো তে ওনাদের মুখ থেকে শোনা কয়েকটি কাহিনী শেয়ার করবো। স্টে টিউনড।

    জাপান-কাহিনী ২০/ আশির আহমেদ

    Facebook Comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২০

    ১২ সেপ্টেম্বর ২০২০

    ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২০

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১
    ১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
    ১৯২০২১২২২৩২৪২৫
    ২৬২৭২৮২৯৩০  
  • ফেসবুকে দশদিক