• শিরোনাম

    যে বাঙালির কাছে জাপানের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই!

    সাইদুজ্জামান আহাদ | ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ৩:৩৩ অপরাহ্ণ | পড়া হয়েছে 404 বার

    যে বাঙালির কাছে জাপানের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই!

    যুগ যুগ ধরে একজন বাঙালিকে ঈশ্বরের মতো সম্মান করে আসছে জাপানীরা; যিনি বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে জাপানের পক্ষে সমর্থন জানিয়েছিলেন, তাঁর নামটা কি আমরা জানি? বাংলাদেশের সঙ্গে জাপানের কূটনৈতিক সম্পর্ক বরাবরই ভালো। রাজনৈতিক বা অন্যান্য নানা ইস্যুতে চীন-আমেরিকা এমনকি ভারতের মতো বন্ধুরাষ্ট্রও যেখানে অনেকসময় বাংলাদেশের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, সেখানে জাপান সবসময়ই বাংলাদেশের বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ বন্যায় আক্রান্ত হলে বড় রকমের ত্রাণ আর অর্থসাহায্য এসেছে, একের পর এক রাস্তাঘাট আর সেতু নির্মিত হয়েছে জাইকা কিংবা জাপান সরকারের সরাসরি অর্থায়নে। বিশ্বব্যাংক নানা সময়ে বাংলাদেশকে ঋণ দিতে আপত্তি জানালেও, জাইকা বরাবরই দুহাত বাড়িয়ে এগিয়ে এসেছে বাংলাদেশের সাহায্যে। আমাদের এই দেশটার প্রতি জাপানের খুব ছোট্ট হলেও যে একটা সফট কর্নার আছে, সেটা তো নিশ্চিত।

    বাঙালী বা বাংলাদেশীদের প্রতি জাপানীদের অন্যরকমের আবেগ থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। একজন বাঙালী যে জাপানের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন, যিনি বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে জাপানের পক্ষে সমর্থন জানিয়েছিলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে যুদ্ধাপরাধের দায়ে বিশাল অঙ্কের জরিমানা থেকে রক্ষা করেছিলেন দেশটাকে। এখনও জাপানের অনেকে তাকে ঈশ্বরের মতো সম্মান করে। মানুষটার নাম ড. রাধাবিনোদ পাল, তিনি ছিলেন অবিভক্ত ভারতের কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি। তার জন্ম হয়েছিল বর্তমান বাংলাদেশের কুষ্টিয়া জেলায়।



    বিচারপতি রাধাবিনোদ পাল কি এমন করেছিলেন জাপানের জন্যে, যে সেদেশের মানুষ তাকে এমন সম্মান দিয়েছে, এখনও দিচ্ছে? ঘটনাটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের সময়কার। অক্ষশক্তির দেশগুলো হেরে গেছে মিত্রশক্তির কাছে। জাপান-জার্মানী-ইতালীকে বিচারের কাঠগড়ায় তোলা হয়েছে, চলছে যুদ্ধাপরাধের বিচার। জাপানী জেনারেল হিদোকি তোজোর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছিল নানকিং গণহত্যার। চীনের লক্ষ লক্ষ মানুষ নিহত হয়েছিল জাপানের সেনাদের আক্রমণে। এই বিচারের নাম ছিল টোকিও ট্রায়াল।

    রাধাবিনোদ পাল ছিলেন এই ট্রাইব্যুনালের এগারোজন বিচারকের একজন। ট্রায়ালে জাপানের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়, গণহত্যার জন্যে প্রত্যক্ষ্য ও পরোক্ষভাবে জাপানের প্রতিটা মানুষকে দায়ী করা হয়। হিদোকি তোজোর ফাঁসি এবং জাপানকে বড় অঙ্কের জরিমানা করার দাবী জানানো হয় মিত্রশক্তির দেশগুলোর পক্ষ থেকে।

    বিচারকদের প্রায় সবাই মিত্রশক্তির দাবীর ব্যাপারে একমত প্রকাশ করলেও, বেঁকে বসেন বাঙালী রাধানাথ পাল। তিনি বলেন, নানকিং গণহত্যা করে জাপান যুদ্ধাপরাধ করেছে এটা শতভাগ সত্যি। কিন্ত জাপানের বিচারের সঙ্গে সঙ্গে হিরোশিমা আর নাগাসাকিতে যারা বোমা ফেলে লক্ষ লক্ষ নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করেছে, যারা এই পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত ছিল, যারা আদেশ দিয়েছে- সবার বিচার করতে হবে। আর এগুলো যেহেতু একই ধরনের অপরাধ, এই টোকিও ট্রায়ালেই এই অপরাধগুলোর বিচার করা যাবে।

    তার এই বক্তব্য শুনে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল বাদবাকী বিচারক আর মিত্রপক্ষের আইনজীবিরা। জেনারেল হিদোকি তোজোকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন বাকী বিচারকেরা, আটশো পৃষ্ঠার এক রায়ে তাদের যুক্তিগুলোকে স্তব্ধ করে দিয়েছিলেন রাধাবিনোদ পাল। তার দেয়া রায় জাপানের পক্ষে যাওয়ায় দেশে ফিরে বেশ বিপাকে পড়তে হয়েছিল রাধাবিনোদ পালকে। ভারতের সরকার তখনও বৃটিশদের অনুগত। প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু প্রকাশ্যে তার সমালোচনা করেছিলেন। তিনি তখন হাইকোর্টে যাওয়া কমিয়ে দিয়েছিলেন, কলকাতার বাড়িতেই কাটতো বেশিরভাগ সময়।

    রাধাবিনোধ পালের এই সাহসিকতার কথা জাপানীরা ভোলেনি। তাকে ‘জাপানবন্ধু ভারতীয়’ হিসেবে ঘোষণা দেয় জাপান সরকার। তার নামে জাপানে মন্যুমেন্ট স্থাপন করা হয়েছে, জাপানের স্কুলের পাঠ্যবইতে একটা অধ্যায় আছে তাকে নিয়ে, জাপানী শিশুরা বই পড়েই জানতে পারছে তার সম্পর্কে। ১৯৬৬ সালে সম্রাট হিরোহিতো তাকে জাপানের জন্যে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ রাষ্ট্রীয় পদক ‘পার্পল রিবন’ এ ভূষিত করেছিলেন।

    জাপানে রাধাবিনোদ পালের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভ
    এখনও কেউ জাপানের কিয়েতো শহরের রিজোয়েন গোকুকু নামের মন্দিরে গেলে রাধাবিনোদ পালের আবক্ষমূর্তিটা দেখতে পাবেন সেখানে। জাপানের রাষ্ট্রীয় চ্যানেলে তার মৃত্যুদিবসে তাকে নিয়ে ঘন্টাব্যাপী প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শিত হয়েছে, সেখানে তাকে উল্লেখ করা হয়েছে জাপানের চির উপকারী বন্ধু হিসেবে। জাপানী আর ইংরেজী ভাষায় তাকে নিয়ে লেখা ৩০৯ পৃষ্ঠার একটা বই প্রকাশ করেছে জাপান সরকার।

    কয়েকবছর আগে জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে ভারত সফরে এসে ভারতীয় পার্লামেন্টে বক্তৃতা দেয়ার সময় শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেছেন এই মানুষটার কথা। শিনজো আবে কলকাতায় ছুটে গিয়েছিলেন শুধু রাধাবিনোদ পালের ৮১ বছর বয়েসী ছেলের সাথে দেখা করবেন বলে! বাংলাদেশের কয়জন মানুষ রাধাবিনোদ পালের নাম জানেন? একজন বাঙালী বিচারক জাপানীদের কাছে ঈশ্বরের সম্মান পেয়ে আসছেন যুগ যুগ ধরে, তার নামটাও কি আমরা জানি?

    জাপানের এনএইচকে টেলিভিশনের পক্ষ থেকে প্রামাণ্যচিত্র তৈরির আগে একদল প্রতিনিধি এসেছিল কুষ্টিয়াতে, যেখানে রাধাবিনোদ পালের জন্ম। কুষ্টিয়ার মিরপুরে রাধাবিনোদ পালের পিতৃভূমিতে তার নামে হাসপাতাল করে দিতে চেয়েছিল জাপান সরকার। কিন্ত রাজনৈতিক দুর্বৃত্তরা সেই জায়গাগুলো দখল করে আছে অনেক আগে থেকে, সেকারণে কিছুই করা সম্ভব হয়নি।

    ১৯৬৭ সালের ১০ই জানুয়ারী কলকাতায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা এই গুণী মানুষটা জন্মেছিলেন এই বাংলায়, এখানকার মাটিতে। জাপানীরা তাকে নিয়ে গর্ব করে, রাধাবিনোদ পালের মতো একজন মানুষকে তারা তাদের ক্রান্তিলগ্নে পাশে পেয়েছিল। আমরা কি রাধাবিনোদ পালকে নিয়ে গর্ব করতে পারি?

    পাদটীকা- রাধাবিনোদ পালকে নিয়ে নেটফ্লিক্স একটা ওয়েব ফিল্ম বানানোর কাজে হাত দিয়েছিল। সেখানে রাধাবিনোদ পালের চরিত্রে অভিনয় করার কথা ছিল ইরফান খানের। গুণী এই অভিনেতা মারা গেছেন কয়েকদিন আগে, প্রোজেক্টটা পিছিয়ে যাচ্ছে তাই।

    তথ্যসূত্র- নিউইয়র্ক টাইমস, লাইভমিন্ট ডটকম, সাপ্তাহিক ২০০০।

    Facebook Comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২০

    ১২ অক্টোবর ২০২০

    ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০

    ০৪ অক্টোবর ২০২০

    ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২০

    ০১ অক্টোবর ২০২০

    ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২০

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫
    ১৬১৭১৮১৯২০২১২২
    ২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
    ৩০৩১  
  • ফেসবুকে দশদিক