| ১১ অক্টোবর ২০২১ | ১২:২৪ অপরাহ্ণ | পড়া হয়েছে 599 বার
ই-কমার্সের নামে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ অন্তত দেড় ডজন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। তাদের বিরুদ্ধে প্রতারণা ও ফৌজদারি মামলার পাশাপাশি আইসিটি আইনেও মামলা হচ্ছে। যদিও এতদিন এসব প্রতারক প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির বিরুদ্ধে কেবল প্রতারণার মাধ্যমে গ্রাহকের অর্থ আত্মসাতের মামলা হয়েছে। কিন্তু প্রতারণার মামলা যে ধারায় হয় তা জামিনযোগ্য। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই এরা জামিন নিয়ে বের হয়ে আসে। তাই তাদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টে মামলা করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি ব্যারিস্টার মাহবুবুর রহমান বলেন, যারা ই-কমার্স জালিয়াতিতে যুক্ত তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি দ-বিধি (প্যানেল কোড) এবং মানিলন্ডারিং আইনে মামলা হচ্ছে। কিন্তু ই-কমার্সের নামে এরা সাইবার অপরাধের সঙ্গেও যুক্ত। তাই মানিলন্ডারিং এবং ফৌজদারি দ-বিধির বাইরে সাইবার আইনেও মামলা হবে।
মাহবুবুর রহমান বলেন, তদন্ত করতে গিয়ে দেখা গেছে, ডিজিটাল প্ল্যাটফরম ব্যবহার করে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে অর্থ আয় করে এরা। এ ছাড়া অনেকেই মানিলন্ডারিংয়েও যুক্ত। সে কারণে তাদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল জালিয়াতি সংক্রান্ত ধারায় পৃথক মামলা করা হবে।
সূত্র জানায়, ফেসবুকসহ বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যমে চটকদার বিজ্ঞাপন ও মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে গ্রাহকদের আকৃষ্ট করত বিভিন্ন ই-কমার্স। গ্রাহকের সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগে ইতোমধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠানের মালিককে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে।
জানা যায়, কিউকমের মিডিয়া ও বিপণন পরিচালক আরজে নিরব রিমান্ডে গ্রাহকদের আকৃষ্ট করতে ফেসবুকে বিভিন্ন অফারের মাধ্যমে প্রলুব্ধ করার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। রেডিও জকির চাকরি ছেড়ে দিয়ে ই-কমার্স প্রতারণায় নেমেছিলেন নিরব। তিনি হেড অব সেলস (কমিউনিকেশন অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন) অফিসার হিসেবে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান কিউকমে চাকরি শুরু করেন। কিউকমে যোগদানের পরই মেতে ওঠেন কোটি টাকা হাতানোর প্রতারণায়। তিনি সোশ্যাল মিডিয়া ও ডিজিটাল মাধ্যমে কিউকম সম্পর্কে প্রচার চালিয়ে সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করতেন। আর তার কথায় বিশ্বাস করে সাধারণ মানুষ লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে পথে বসেছেন।
আরজে নিরব নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে কিউকম নিয়ে নানা প্রচার চালাতেন। গত ২৪ আগস্ট কিউকম নিয়ে একটি নিউজ শেয়ার দেন। সেখানে লিখেন, ‘পুরো দেশ আর দুনিয়াজুড়ে কিউকম ছড়াতে চাই, ইনশাআল্লাহ। আট বিভাগে নিজস্ব ডেলিভারি পয়েন্ট, ওয়ারহাউস, কাস্টমার কেয়ার চালু করবে কিউকম’। এ ছাড়াও নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে এমন অনেক স্ট্যাটাস আর নিউজ শেয়ারের মাধ্যমে কাস্টমারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতেন। এমনকি কিউকমের প্রতারণার বিষয়টি সামনে আসার পরও গত ২২ সেপ্টেম্বর নিরব তার ফেসবুকে লেখেন, মনে হয় এ শিল্পটা বন্ধ না করে কেউ থামবে না। একজন সৎ কর্মচারী হিসেবে বিপদের দিনে মালিকের পাশে থেকে কাজ করে যাচ্ছিলাম, যেন গ্রাহক তার টাকাটা ফেরত পায়। সঠিকভাবে গুছিয়ে কাজ করতে পারলে হয়তো তা সম্ভবও। কিন্তু মনে হচ্ছে, আপনারা পণ করে বসেছেন চাকরিটা না ছাড়া পর্যন্ত আমার পিছু ছাড়বেন না! তবে তাই হোক। এসব স্ট্যাটাসের বিষয়েও রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে আরজে নিরবকে। উত্তরে তিনি জানিয়েছেন, কোম্পানির ক্রান্তিলগ্নে গ্রাহকদের বিশ্বস্ততা ধরে রাখতে এটি ছিল তার অন্যতম কৌশল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, আরজে নিরবের প্রচারে আকৃষ্ট হয়ে গ্রাহকরা কিউকমের প্রতি ঝুঁকেছিলেন। তাই কোনোভাবেই দায় এড়াতে পারেন না নিরব। সূত্র বলছে, আরজে নিরবের বিরুদ্ধেও আইসিটি আইনে মামলা করা হবে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্র জানায়, এ পর্যন্ত যতগুলো ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের মালিকদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তারা প্রত্যেকেই ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করে প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছেন। ফেসবুকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে চটকদার বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে প্রলুব্ধ করেছেন। ফলে গ্রাহকরা আকৃষ্ট হয়ে লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছেন। কিন্তু এখন পণ্য বা টাকা কোনোটিই ফেরত পাচ্ছেন না। এদিকে অনেক ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান মালিকেরই ধারণা যেসব জামিনযোগ্য ধারায় মামলা করা হচ্ছে, এতে তারা কিছুদিন পরই জামিনে বের হয়ে আসতে পারবেন। ফলে গ্রাহকের ওপর তাদের দায় অনেকটাই কমে যাবে।
এসব বিষয় মাথায় রেখেই প্রতারক ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টে মামলা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ই-কমার্স প্রতারণার দায়ে এ পর্যন্ত গ্রেপ্তার হয়েছেন অন্তত একডজন প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার। এর মধ্যে রয়েছে ইভ্যালির সিইও মোহাম্মদ রাসেল ও চেয়ারম্যান শামীমা নাসরিন। ইঅরেঞ্জের মালিক সোনিয়া মেহজাবিন ও তার স্বামী মাসুকুর রহমান এবং নেপথ্যে থাকা পুলিশ কর্মকর্তা সোহেল রানা। ধামাকা শপিংয়ের চিফ অপারেশন অফিসার (সিওও) সিরাজুল ইসলাম রানা, কিউকমের সিইও রিপন মিয়া, মিডিয়া ও বিপণন প্রধান আরজে নিরব। ‘টুয়েন্টিফোর টিকেটি ডটকম’ পরিচালক রাকিবুল হাসান, নিরাপদ ডটকমের পরিচালক ফারহানা আফরোজ এ্যানিসহ বেশ কিছু ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের নীতিনির্ধারকরা গ্রেপ্তার হয়েছেন। এ ছাড়া প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে দালাল প্লাস, আলাদীনের প্রদীপসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। প্রতারণার অভিযোগ থাকা সিরাজগঞ্জশপের মালিক জুয়েল রানাকেও খুঁজছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
এদিকে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান কিউকমের সিইও মো. রিপন মিয়ার স্ত্রী সৈয়দা তাসমিনা তারিন ও বাবা আইয়ুব আলীর বিরুদ্ধে মামলা করেছে প্রতারণার শিকার এক গ্রাহক। তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় গত বৃহস্পতিবার আবদুল্লাহ আল শৈশব নামের এ গ্রাহক মামলা করেন।
মামলার বিবরণীতে বলা হয়, গত ২১ জুন একটি আইডি থেকে দশটি ইয়ামাহা আর-১৫ বাইক অর্ডার করি। যার প্রতিটির দাম ৩ লাখ ২০ হাজার ২৫০ টাকা। সর্বমোট ৩২ লাখ ২০ হাজার ২৫০ টাকা। ২২ জুন একটি আইডি থেকে একই দামের পাঁচটি বাইক অর্ডার করি। যার মোট দাম ১৬ লাখ ১ হাজার ২৫০ টাকা। এ ছাড়া অন্য একটি আইডি থেকে ৩ লাখ ৭১ হাজার ৬১২ টাকার মূল্যমানের তিনটি বাজাজ মোটরসাইকেল, ২ লাখ ৭ হাজার ২৭৮ টাকা মূল্যমানের ২টি বাজাজ পালসার, ১ লাখ ১০ হাজার ৩৪৯ টাকা মূল্যমানের অন্য একটি পালসার, ১ লাখ ৬৪ হাজার ৭০০ টাকা দিয়ে এফজেড ক্রয় করি। কিউকমের অনলাইন প্রতিষ্ঠান ফোস্টার পেমেন্টের মাধ্যমে টাকা গ্রহণ করে। পণ্য ক্রয়ের ত্রিশ দিনের মধ্যে পণ্য বুঝিয়ে দেওয়ার কথা থাকলেও অদ্যাবধি পণ্য বুঝিয়ে দেয়নি। বিভিন্ন সময়ে পণ্যের জন্য অফিসে গেলেও মারমুখী আচরণ করে বের করে দেয়। সর্বমোট ৫৬ লাখ ৫৭ হাজার ৬৮৯ টাকা আত্মসাৎ করে কিউকম।
মামলায় কিউকমের সিইও রিপন মিয়া, স্ত্রী সৈয়দা তাসমিনা তারিন, বাবা আইয়ুব আলী, হেড অব সেলস আরজে নিরব ছাড়াও আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়।
| শনি | রবি | সোম | মঙ্গল | বুধ | বৃহ | শুক্র |
|---|---|---|---|---|---|---|
| ১ | ২ | ৩ | ৪ | |||
| ৫ | ৬ | ৭ | ৮ | ৯ | ১০ | ১১ |
| ১২ | ১৩ | ১৪ | ১৫ | ১৬ | ১৭ | ১৮ |
| ১৯ | ২০ | ২১ | ২২ | ২৩ | ২৪ | ২৫ |
| ২৬ | ২৭ | ২৮ | ২৯ | ৩০ | ||