ড. শেখ আলীমুজ্জামান, জাপান | ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১১:৩৫ পূর্বাহ্ণ | পড়া হয়েছে 183 বার
প্রবাসীদের কাছে বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশা অনেক। বর্তমানে দেশের অর্থনীতির প্রধান ভরসাও প্রবাসী আয়, সম্ভবত সে কারণেই তাদের রেমিট্যান্স যোদ্ধা তকমা দেয়া হয়েছে। অপর দিকে দেশের কাছেও কিন্তু প্রবাসীদের অনেক প্রত্যাশা আছে যার নির্যাস হচ্ছে, বাংলাদেশ নামটি শুনে ভীনদেশীদের চোখেমুখে যেন তাচ্ছিল্য না ফুটে ওঠে। তবে সেটা হবার মতো অবস্থা নেই কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে শ্রম বিক্রির জন্য প্রবাসী কল্যানের সাথে বৈদেশিক কর্মসংস্থান যুক্ত করে মূলত প্রবাসীদের ‘কামলা’ ইমেজকেই সামনে আনা হচ্ছে। গত বছর আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে প্রবাসীরা চাবি ভূমিকা পালন করে। প্রত্যাশা ছিলো দেশ তাদের ‘সফট পাওয়ার’ হিসাবে স্বীকৃতি দেবে। অভ্যত্থানের কিছুদিন পরে বিমানবন্দরে ‘প্রবাসী লাউঞ্জ’ সাজিয়ে শুধু চোখ ধোয়া হয়েছে, প্রত্যাশা পুরণ হয়নি। প্রতিদিন প্রায় ত্রিশ হাজার যাত্রী হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ব্যবহার করেন যার একটি বড় অংশ প্রবাসী। এদের অনেকে বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জগুলি ব্যবহার করে থাকেন, যেগুলোর মান প্রবাসী লাউঞ্জের চেয়ে অনেক উন্নত। অর্থাৎ তথাকথিত রেমিট্যান্স যোদ্ধা তকমাটি একটি কৌশলগত প্রচারণা মাত্র, ডায়াসপোরা হিসাবে স্বীকৃতি দিয়ে দেশের সফট পাওয়ার হিসাবে আপামর প্রবাসীদের ব্যবহার করার কোন রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা বর্তমানে নেই।
বিগত শতকের সত্তর দশকের মাঝামাঝি থেকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশসমূহে ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশিদের গমন শুরু হয়। সেটি ধারাবাহিকভাবে শক্তিশালি হয়ে ওঠার প্রেক্ষাপটে, আন্তর্জাতিক শ্রম বাজারে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি বৃদ্ধি করার উদ্দেশ্যে, ২০০১ সালে গঠিত হয় প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় । মন্ত্রনালয়ের নামকরণে প্রবাসী কল্যান শব্দটি থাকলেও এর অভিলক্ষ্য বৈদেশিক কর্মসংস্থান। মন্ত্রনালয়ের অধীনস্থ চারটি প্রতিষ্ঠান, জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি), বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও পরিষেবা কোম্পানি (বোয়েসেল), মজুরি উপার্জনকারী কল্যাণ বোর্ড এবং প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক, এর তিনটির কার্যক্রমই দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি কেন্দ্রিক। এভাবে রাস্ট্রীর ব্যবস্থাপনায় বহির্বিশ্বে জনশক্তি রপ্তাণির পাশাপাশি ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার মাধ্যমেও বিদেশ গমন অব্যাহত থাকে, যার ফলে পৃথিবীর নানা দেশে অবস্থানরত প্রবাসীদের সংখ্যা কোটির ঘর অতিক্রম করে। তবে এই দশকের শুরুতে রেমিট্যান্স প্রবাহের এক অপ্রত্যাশিত চিত্র তুলে ধরে বাংলাদেশ ব্যাংক। যেমন ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) প্রবাসী আয় পাঠানোর শীর্ষ দেশ যুক্তরাষ্ট্র। এর পরেই মধ্যপ্রাচ্যের সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব থাকলেও দেশের অর্ধেক রেমিট্যান্স আসছে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপিয় দেশ সমূহ, অস্ট্রেলিয়া ও দূরপ্রাচ্যের দেশ জাপান এবং দক্ষিন কোরিয়া থেকে। এসব দেশে প্রবাসীরা মূলত নিজ প্রচেষ্টায় গমন করেন, যার সাথে মন্ত্রনালয়ের বৈদেশিক কর্মসংস্থান কার্যক্রমের সম্পৃক্ততা কম। অর্থাৎ রেমিট্যান্স প্রেরণের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে প্রেরিত অভিবাসী কর্মীর চেয়ে নিজ প্রচেষ্টায় বিদেশে যাওয়া ডায়াসপোরাদের অবদান বেশী। এই পরিবর্তিত প্রেক্ষিতে ডায়াসপোরাদের বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রনালয় ২০২৩ সালে জাতীয় ডায়াসপোরা নীতি প্রণয়নের উদ্যোগ নিলেও তা এখনও খসড়া পর্যায়ে ফাইলবন্দী রয়ে গেছে।
‘ডায়াসপোরা’ শব্দটি স্বদেশ ছেড়ে অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে থাকা জনগোষ্ঠী বা জাতিকে বোঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয়। এই ইংরেজি শব্দটি গ্রীক শব্দযুগল ডিয়া ও স্পেইরো থেকে এসেছে। ব্যাবিলনের সম্রাট দ্বিতীয় নেবুচাদনেজার জেরুজালেম দখল করে ইহুদিদের বিতাড়িত করলে তারা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। কোন দেশ না থাকায় পরবর্তীতে তাদের ইহুদি ডায়াসপোরা বলা হয়, যে সূত্রে ডায়াসপোরা শব্দটি ব্যপক পরিচিতি লাভ করে। ২০২৩ সালে প্রস্তাবিত জাতীয় ডায়াসপোরা নীতির খসড়ায় প্রবাসীদের মোটা দাগে দুই ভাগ করা হয়েছে। অনিবাসী বাংলাদেশি (নন-রেসিডেন্ট বাংলাদেশি, সংক্ষেপে এনআরবি) যারা দীর্ঘ সময় স্থায়ীভাবে অন্য দেশে বসবাস করলেও নাগরিকত্ব (পাসপোর্ট) বা নাগরিক অধিকার পাননি এবং বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত (পিপল অফ বাংলাদেশি অরিজিন, সংক্ষেপে পিওবি) যারা ও যাদের পরবর্তী প্রজন্ম অন্যদেশের নাগরিকত্ব (পাসপোর্ট) পেয়েছেন। ডায়াসপোরাদের দেশে আসতে উৎসাহিত করতে ২০২২ সাল থেকে প্রতিবছর ১৮ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস পালন করার পাশাপাশি সরাকার ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় প্রবাসী দিবস উদযাপন শুরু করে। তবে সেই উদযাপন অনুষ্ঠানে আপামর বাংলাদেশী ডায়াসপোরাদের সম্পৃক্ততা চোখে পড়ার মতো নয়। সবচেয়ে হতাশজনক হচ্ছে, গত বছরের মতো এবছরেও, ১৮ ডিসেম্বর একই সাথে আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস ও জাতীয় প্রবাসী দিবস পালিতে হয়েছে, অর্থাৎ ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় প্রবাসী দিবসের আলাদা কোন সরকারি কর্মসূচী বাস্তবায়ন করা হয়নি।
তবে জাতীয় প্রবাসী দিবস উদযাপন করার বেসরকারি উদ্যোগ কিন্তু থেমে নেই। বিগত শতকের সত্তর দশকের মাঝামাঝি থেকে ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় বিদেশ গমনের মতোই, গত কয়েক বছর ধরে বেসরকারি উদ্যোগে বাংলাদেশী ডায়াসপোরাদের একত্রিত করে জাতীয় প্রবাসী দিবস উদযাপন করার কাজটি বর্তমানে করে চলেছে, প্রবাসীদের বৃহত্তম সংগঠন ‘এনআরবি ওয়ার্ল্ড’। এনআরবি ওয়ার্ল্ডের প্রতিষ্ঠাতা এনামুল হক এনাম জানিয়েছেন, এবছর জাতীয় প্রবাসী দিবসে বিশ্বের প্রায় ২৫টি দেশের অনাবাসী বাংলাদেশি (এনআরবি)রা, ঢাকায় অনুষ্ঠিত ‘এনআরবি গ্লোবাল কনভেনশন ২০২৫’ এ অংশগ্রহণ করেছেন, যাদের মধ্যে রয়েছেন উদ্যোক্তা, ডাক্তার, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, আইটি বিশেষজ্ঞ ও অন্যান্য পেশার গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ। এটি নিছক একটি মিলনে মেলা নয়, এই কনভেনশনের মাধ্যমে বাংলাদেশী ডায়াসপোরা মাতৃভূমিকে একটি ভিন্ন বার্ত দিতে চায়। সেটি হলো, দেশকে ডায়াসপোরাদের অনেক কিছু দেবার আছে, দেশ যেন তাদের ‘সফট পাওয়ার’ হিসাবে স্বীকৃতি দিয়ে কাজে লাগায়।
একটি দেশের সামরিক শক্তি বা অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের ক্ষমতাকে সেই দেশের হার্ড পাওয়ার বলা হয়। এটি সরাসরি, জোরপূর্বক ও দৃশ্যমান শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে অন্য গোষ্ঠী বা রাষ্ট্রকে নিজের অভিপ্রায় মেনে চলতে বাধ্য করে । পক্ষান্তরে সফট পাওয়ার হলো সামরিক বা অর্থনৈতিক চাপ ছাড়াই, শিল্প-সংস্কৃতি, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক মূল্যবোধ, বাণিজ্য ইত্যাদির মাধ্যমে অন্য গোষ্ঠী বা রাষ্ট্রকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা। যে সব দেশের হার্ড পাওয়ার বা সামরিক শক্তি তুলনামূলকভাবে কম, তারা তাদের সফট পাওয়ার দক্ষভাবে ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রভাব বিস্তার করে থাকে। যে কোন দেশের সবচেয়ে শক্তিশালি সফট পাওয়ার হচ্ছে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা সেই দেশের ডায়াসপোরা। পার্শ্ববর্তী রাস্ট্র ভারতকে উদাহরণ হিসাবে নিয়ে বিষয়টি ব্যাখা করা যেতে পারে। বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩ কোটি ৫০ লক্ষ ভারতীয় প্রবাসী রয়েছেন, যা বিশ্বের বৃহত্তম ডায়াসপোরা। যুক্তরাষ্ট্রের বহু প্রযুক্তি কোম্পানি যেমন, গুগল, মাইক্রোসফট, আইবিএম সহ অনেক কোম্পানির সিইও ভারতীয় বংশোদ্ভূত। পশ্চিমা দেশগুলির প্রধান মন্ত্রী, ভাইস-প্রেসিডেন্ট সহ রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী অনেকের ডায়াসপোরা ভিত্তিক সম্পৃক্ততার মাধ্যমে ভারতের একটি শক্তিশালী লবি গ্রুপ তৈরী হয়েছে। ডায়াসপোরাদের দেশের সাথে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত করার জন্য প্রবাসী বিষয়ক মন্ত্রনালয়টি ২০১৬ সালে পররাস্ট্র মন্ত্রনালয়ের সাথে একীভূত করে ভারত। একই ভাবে বাংলাদেশী ডায়াসপোরাদের কিভাবে সফট পাওয়ার হিসাবে দেশের কাজে সম্পৃক্ত করা যায়, সেটা ভাবতে হবে এবং সেই অনুযায়ী পরিকল্পনা সাজাতে হবে।
এ প্রেক্ষাপটে এরআরবি ওয়ার্ল্ডের মতো বেসরকরি সংগঠনগুলিকে মূল্যায়ন করতে হবে। এনআরবি গ্লোবাল কনভেনশন ২০২৫ এর মতো অনুষ্ঠানে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা বাড়িয়ে, প্রবাসীদের দেশমুখী কার্যক্রমের সাথে সম্পৃক্ত হতে হবে। সরকার বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রাণান্তকার চেস্টা করলেও দেশে আশানুরূপ বিনিয়োগ আসছে না। এর একটা উল্লখযোগ্য সমাধান হতে পারে প্রবাসীদের বিনিয়োগ বৃদ্ধির পরিকল্পনা করা। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বাংলাদেশী ডায়াসপোরা প্রতিনিধিদের দেশে ডেকে, সংশ্লিষ্ট স্টেক হোল্ডারদের সাথে নিয়ে, সার্বজনীন সমঝোতার মাধ্যমে একটি ডায়াস্পোরা নীতিমালা দ্রুত প্রণয়ন করার মাধ্যমে প্রবাসীদের বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা সম্ভব।
লেখক:
Dr. Sheikh Aleemuzzaman
Advisor, NRB World
Email: sheikhaleemuzzaman@gmail.com
Web: sheikhaleemuzzaman.com
| শনি | রবি | সোম | মঙ্গল | বুধ | বৃহ | শুক্র |
|---|---|---|---|---|---|---|
| ১ | ২ | ৩ | ৪ | |||
| ৫ | ৬ | ৭ | ৮ | ৯ | ১০ | ১১ |
| ১২ | ১৩ | ১৪ | ১৫ | ১৬ | ১৭ | ১৮ |
| ১৯ | ২০ | ২১ | ২২ | ২৩ | ২৪ | ২৫ |
| ২৬ | ২৭ | ২৮ | ২৯ | ৩০ | ||