লাবিবা তাসনিম রাহমানী | ১৪ নভেম্বর ২০২২ | ৭:৩৭ পূর্বাহ্ণ | পড়া হয়েছে 81 বার
আজ থেকে প্রায় সাড়ে ১৪০০ বছর আগে এক অন্ধকার যুগে আবির্ভূত হয়ে ইসলাম ধর্ম যে অগ্নিশিখা প্রজ্বলিত করেছিল তা অনির্বাণ-অনির্বাপিত। যুগের ক্রান্তিলগ্নে নারীরা যেখানে পদে পদে বঞ্চিত ও নিগ্রহের শিকার সেখানে ইসলামই তাদেরকে তাদের যোগ্যতানুযায়ী মূল্যায়ন করেছে।
এই পৃথিবীতে নারীর যথাযোগ্য ভূমিকা ছাড়া মানবসম্প্রদায়ের অস্তিত্ব রক্ষা করাই ছিল অসম্ভব। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা এই যে, ইসলাম ধর্মের আগে পৃথিবীর কোনো ধর্ম নারীকে তার যোগ্য মর্যাদা দান করেনি। সৃষ্টির ক্ষেত্রে নারীর যে অনবদ্য গৌরবময় ভূমিকা, তার যথাযোগ্য স্বীকৃতিও কোনো ধর্ম প্রদান করেনি। নারী ছিল নিতান্তই নিগৃহীত। এ যেন জাহিলিয়াতের এক জয়জয়কার।
জাহিলিয়াতের অবসানে ইসলাম ধর্ম পুরো বিশ্বে এক শান্তির আলোকবর্তিকা হয়ে আবির্ভূত হয়। এই প্রথম একজন নারী ক্রীতদাসী, বাজারের পণ্য বা সম্পদ থেকে মুক্ত হয়ে প্রকৃত মানুষে রূপান্তরিত হয়েছে। কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন- ‘আর পুরুষদের যেমন স্ত্রীদের ওপর অধিকার রয়েছে, তেমনিভাবে স্ত্রীদেরও অধিকার রয়েছে পুরুষদের ওপর নিয়মানুযায়ী’ (সূরা বাকারা-২২৮)।
এভাবেই ঘোষিত হলো, নারী কেবল ক্রীতদাসী বা বাজারের পণ্য হয়ে জন্মগ্রহণ করেনি; বরং তার রয়েছে বিশেষ অধিকার। আল্লাহ তায়ালা নারীদেরকে সৃষ্টি করেছেন শান্তির আধার, সান্ত্বনার উৎস, প্রেম ও ভালোবাসার অর্ধাঙ্গিনী, মহীয়সী ও ফজিলত মর্যাদার অধিকারিণী হিসেবে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন- ‘তিনি তোমাদের মধ্য থেকে জীবনসঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যাতে করে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করতে পারো এবং তিনি তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক প্রেম-প্রীতি ও মায়া-মমতা সৃষ্টি করেছেন’ (সূরা রুম-২১)।
পবিত্র কুরআন একজন নারীকে জায়া হিসেবে যে ঘোষণা দিয়েছে, তা হলো- ‘তারা তোমাদের জন্য পোশাকস্বরূপ এবং তোমরা তাদের জন্য পোশাকস্বরূপ’ (সূরা বাকারা-১৮৭)।
আলোচ্য আয়াতে একজন নারীর প্রতি ইসলামের যে উদারতা ফুটে উঠেছে, তা যেন নারী জাতির প্রতি এক অনন্য মহানুভবতা।
পবিত্র কুরআনুল কারিমে ‘সূরা নিসা’ নামে নারীদের অধিকার সংবলিত একটি পূর্ণাঙ্গ সূরা রয়েছে। মূল কথা হচ্ছে, একজন নারী যখন স্ত্রী হয়ে একজন পুরুষের কাছে আসবে তখন প্রতিটি পুরুষকে এ কথাটি অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, সে তার মতোই একজন মানুষ। তার নিজের জীবনে যা প্রয়োজন রয়েছে, একজন নারীর জীবনেও তা রয়েছে। স্ত্রী ক্রয়কৃত দাসী নয় যে, তার সাথে অমানবিক আচরণ করবে।
এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘তোমরা স্ত্রীদের সাথে ভালো ব্যবহার করো’ (সূরা নিসা-১৯)।
পবিত্র কুরআনুল কারিমে স্ত্রীদের সাথে সদাচরণের আদেশ স্ত্রী হিসেবে নারী জাতির মর্যাদা প্রমাণ করে। একজন পুরুষের সামনে নারীর অবস্থান কোথায়, রাসূলুল্লাহ সা: এ বিষয়টি নিজ কর্মের মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছেন। তিনি ইরশাদ করেছেন- ‘তোমাদের মধ্যে উত্তম পুরুষ সে, যে তার পরিবার ও স্ত্রীদের কাছে উত্তম। আর আমি আমার স্ত্রীদের কাছে তোমাদের সবার চেয়ে উত্তম’ (তিরমিজি)।
নারীর অধিকার ইসলামে সুনিশ্চিতভাবে বিবৃত হয়েছে। ইসলামে অর্থ উপার্জন করা নারীর কর্তব্য নয়। তার দায়িত্ব আল্লাহ এবং নিজের পরিবারের প্রতি। আর সে যদি এই কাজটিই ঠিকভাবে করতে পারে, রাসূলুল্লাহ সা: জানাচ্ছেন, তা হলে এটিই তার নাজাতের জন্য যথেষ্ট। কিন্তু তার মানে এই নয়, একজন নারী তার পরিবারের প্রতি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ক্রীতদাসীর মতো খাটবে। অন্তত রাসূলুল্লাহ সা: ও তাঁর সাহাবিদের শিক্ষা কখনোই এমন নয়।
আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘তোমরা তাদের সাথে সৎভাবে জীবন যাপন করবে; তোমরা যদি তাদেরকে অপছন্দ করো, তবে এমন হতে পারে যে, আল্লাহ যাতে প্রভূত কল্যাণ রেখেছেন তোমরা তাকেই অপছন্দ করছ’ (সূরা নিসা-১৯)।
রাসূলুল্লাহ সা: নারীকে রাব্বাতুল বাইত বা ঘরের রানী হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাকে দেয়া হয়েছে সম্মান, নিরাপত্তা আর মর্যাদা। পুণ্যবতী স্ত্রী সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সা: চমৎকার একটি উপসংহার টেনেছেন। তিনি বলেছেন, ‘একজন ধার্মিক নারীই কারো জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ উপহার’ কথাটি খুবই প্রজ্ঞাপূর্ণ।
ইসলামে একজন নারী সর্বপ্রথম আল্লাহর দাসী, কোনো মানুষের নয়। আল্লাহর কাছে সে পুরুষের চেয়ে নিচু কেউ নয়। তবে এটি সত্য, ‘পুত্রসন্তান কন্যাসন্তানের মতো নয়’ (সূরা আলে ইমরান-৩৬)।
এ কারণেই আল্লাহ তায়ালা পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব তাদের ওপরই দিয়েছেন। তাদের ওপরই ন্যস্ত হয়েছে পরিবারের নেতৃত্ব। অধিকারের প্রশ্নে নারী পুরুষ সমান, যদিও পুরুষকে নারীর ওপর কর্তৃত্ব দেয়া হয়েছে। এসবের সাথে একজন নারীকে খাটো করার কোনো সম্পর্ক নেই। আল্লাহ তায়ালা স্পষ্ট বলে দিয়েছেন- ‘নিশ্চয়ই আমি তোমাদের মধ্যে আমলকারী কোনো নর বা নারীর আমল বিফল করি না; তোমরা একে অপরের অংশ’ (সূরা আলে ইমরান-১৯৫)।
আল্লাহর কাছে সে ব্যক্তিই সবচেয়ে বেশি সম্মানিত, মর্যাদাবান যার ঈমান বেশি, যার তাকওয়া বেশি। হোক সে নারী বা পুরুষ।
বর্তমান বাস্তবতায় একটি প্রশ্ন অবশ্য থেকেই যায়, ইসলাম নারী জাতিকে যে অধিকার ও মর্যাদা দিয়েছে, মুসলিম সমাজ বাস্তব জীবনে তা কতটা অনুসরণ করছে? এর উত্তর অবশ্যই সুখকর নয়। তাদের কর্তব্য হলো শিক্ষায়, অধিকারে ও মর্যাদায় নারীকে সেই অবস্থানে প্রতিষ্ঠা করা, যা ইসলাম নারীর জন্য নির্ধারণ করেছে। কিছু লোক আছে যারা এখনো তাদের অধীনস্থ নারীদের জীবন্ত কবর দেয়! হ্যাঁ, জীবন্ত। তফাৎটা এই, তারা কবরস্থ করে মানসিকভাবে। আল্লাহ মাফ করুন, তারা এসব বলে আদর্শ ও নীতির দোহাই দিয়ে! তাহলে তারা কার নীতি ও আদর্শ অনুসরণ করছে?
এটি তো রাসূলুল্লাহ সা:-এর সুন্নাহ তথা আদর্শ নয়। সুন্নাহ বা আদর্শ কী? রাসূলুল্লাহ সা: নিজের কাজ নিজে করতেন, নিজের ছেঁড়া জুতা তিনি নিজে সেলাই করতেন। স্ত্রীদেরকে ঘরোয়া কাজে সহযোগিতা করতেন। স্ত্রী আয়েশা রা:-এর সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা করতেন আর তাতে ইচ্ছে করে হেরে যেতেন। হেরে যেতেন, যেন আয়েশা রা: মনে কষ্ট না পান। হজরত আয়েশা রা: থেকে বর্ণিত- রাসূলুল্লাহ সা: ইরশাদ করেছেন, ‘মুমিনদের মধ্যে সে অধিকতর পরিপূর্ণ মুমিন, যে উত্তম ব্যবহারকারী এবং আপন পরিবারের পক্ষে নরম ও মেহেরবান’ (তিরমিজি)।
আমর বিন আস রা: থেকে বর্ণিত- ‘তিনি রাসূলুল্লাহ সা:কে জিজ্ঞাসা করেন, আপনার কাছে কোন ব্যক্তি সব চেয়ে প্রিয়? তিনি উত্তরে বলেন- ‘আয়েশা’ (বুখারি)।
স্বীয় স্ত্রীদের প্রতি সদয় হওয়ার এমন উচ্চবাণী সংবলিত বহু হাদিস বর্ণিত হয়েছে। হাদিসের প্রতি দৃষ্টিপাত করলেই অনুধাবন করা যায়, রাসূলুল্লাহ সা: স্ত্রীদের প্রতি কত সদয় ও আন্তরিকতার সাথে জীবন যাপন করেছেন এবং তাঁর সব উম্মতকে সে পথে আহ্বান করে গেছেন।
লেখিকা : শিক্ষার্থী, জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম মাদরাসা, ঢাকা
| শনি | রবি | সোম | মঙ্গল | বুধ | বৃহ | শুক্র |
|---|---|---|---|---|---|---|
| ১ | ২ | ৩ | ৪ | |||
| ৫ | ৬ | ৭ | ৮ | ৯ | ১০ | ১১ |
| ১২ | ১৩ | ১৪ | ১৫ | ১৬ | ১৭ | ১৮ |
| ১৯ | ২০ | ২১ | ২২ | ২৩ | ২৪ | ২৫ |
| ২৬ | ২৭ | ২৮ | ২৯ | ৩০ | ||